• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ন

পেশাদার খেলোয়াড়, সংগঠক তৈরির জন্য পাবলিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক

প্রতীক ওমর / ৯৫ Time View
Update : শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশে ক্রীড়া অঙ্গন দিন দিন উন্নতি করলেও ক্রীড়া শিক্ষার জন্য উচ্চতর প্রতিষ্ঠান এখনো সীমিত। পেশাদার ক্রীড়াবিদ তৈরির পাশাপাশি ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে আধুনিক ক্রীড়া শিক্ষার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত আকারে ক্রীড়া ও শারীরিক শিক্ষার বিভাগ থাকলেও, তা একটি পূর্ণাঙ্গ ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা কাঠামোর অভাব পূরণ করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক দেশেই ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে দক্ষ কোচ, সংগঠক, বিশ্লেষক ও গবেষক তৈরি করা হচ্ছে, যা তাদের ক্রীড়াঙ্গনকে শক্তিশালী করেছে।

বাংলাদেশেও এমন একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় হলে তা শুধু ক্রীড়া খাত নয়, জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বাড়বে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যের হার।
তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি জাতীয় ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত, যেখানে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি ক্রীড়া বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মনোবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়েও শিক্ষাদান হবে। এটি হবে দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বর্তমানে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও, সেগুলোতে উচ্চতর গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার শিক্ষা যথাযথভাবে প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দক্ষতা বাড়ানো যাচ্ছে না, আবার খেলোয়াড়দেরও পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক ও পেশাগত সহায়তা।

ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (যুক্তরাষ্ট্র)

আন্তর্জাতিকভাবে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় কেবল মাঠের খেলা শেখানোর প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এগুলোতে ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, ক্রীড়া চিকিৎসা, পারফরমেন্স অ্যানালাইসিস, ডায়েট অ্যান্ড নিউট্রিশন, ক্রীড়া সাংবাদিকতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা হয়। জার্মান, ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই এরকম বিশ্ববিদ্যালয় সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় দেশে গড়ে উঠলে খেলোয়াড় তৈরি ছাড়াও দক্ষ কোচ, প্রশিক্ষক, ক্রীড়া সংগঠক এবং প্রযুক্তিনির্ভর ক্রীড়া বিশ্লেষক তৈরি সম্ভব হবে। একইসাথে তৈরি হবে হাজারো নতুন কর্মসংস্থান। দেশের তরুণ প্রজন্ম খেলাকে শুধু বিনোদন নয়, বরং পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশে ক্রীড়া অঙ্গনের সম্ভাবনা বহুদিন ধরেই আলোচিত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ক্রীড়াবিদদের বিচ্ছুরিত সাফল্য এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক ক্রীড়ামোদী জনগোষ্ঠী, সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী ক্রীড়া অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা প্রতিনিয়তই অনুভূত হচ্ছে। তবে, দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো পর্যন্ত দেশে কোনো পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় বাংলাদেশে একটি জাতীয় ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে ক্রীড়া অঙ্গনের সম্ভাবনা ও আগ্রহ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ংঢ়ড়ৎধফরপ সাফল্য থাকলেও, আমাদের ক্রীড়া কাঠামো এখনো সুসংগঠিত নয়। মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি ক্রীড়া-সম্পৃক্ত শিক্ষিত ও পেশাদার জনবল গড়ে তুলতে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাষ্ট্র)

 

শুধু খেলোয়াড় নয়, আধুনিক ক্রীড়াবিশ্বে ক্রীড়া অর্থনীতি, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া বিশ্লেষণ, ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়া সাংবাদিকতা ও গবেষণা এসব ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ জনবলের প্রয়োজন। একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারবে, যা বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত।
প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও কার্যক্রমে যাযা থাকবে: এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলে বিভিন্ন শাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে যেমন ক্রীড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কোচিং ও প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা ও বিপণন, ক্রীড়া ও মনোবিদ্যা, শারীরিক শিক্ষা ও ফিজিওথেরাপি, ক্রীড়া পরিচালক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ। এছাড়াও ক্রীড়া অর্থনীতি (ঝঢ়ড়ৎঃং ঊপড়হড়সরপং) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান লাভের সুযোগ থাকবে।
ক্রীড়া অর্থনীতি হলো একটি বিশেষায়িত শাখা যা ক্রীড়ার সাথে যুক্ত আর্থিক কার্যক্রম, এর সামাজিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করে। ক্রীড়া শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এটি এখন একটি বৈশ্বিক শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখে। ক্রীড়ার মাধ্যমে তৈরি হয় নতুন কর্মসংস্থান, বাড়ে পর্যটন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ক্রীড়া অর্থনীতি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ। বিশ্বকাপ, অলিম্পিক, আইপিএল বা বিপিএল-এর মতো আয়োজনগুলোর পেছনে বিশাল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থাকে। বাংলাদেশেও ক্রীড়া খাতকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে প্রয়োজন অর্থনীতি-বিশেষজ্ঞদের, যারা এই খাত বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনায় দক্ষ হবে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন (যুক্তরাজ্য)

ক্রীড়া অর্থনীতির ভিত্তি: কীভাবে এটি কাজ করে?: ক্রীড়া অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্র হলো:
১. ক্রীড়া ইভেন্ট এবং এর আয়: ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ উপার্জিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমস, আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) বা এনবিএ (ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন) এর মতো ইভেন্ট থেকে টিকিট বিক্রয়, টিভি সম্প্রচার সত্ত্ব এবং স্পন্সরশিপের মাধ্যমে আয় হয়। ২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, এবং জার্মানির মতো দলগুলো শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য নয়, তাদের ব্র্যান্ডিং এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও বিশাল পরিমাণ আয় করেছে।
২. টেলিভিশন সম্প্রচার এবং মিডিয়া আয়: ক্রীড়া ইভেন্টের সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি থেকে বড় অঙ্কের আয় হয়। উদাহরণস্বরূপ, আইপিএলের সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। টিভি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্রীড়া ইভেন্টগুলির সম্প্রচার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র।
৩. স্পন্সরশিপ এবং ব্র্যান্ডিং: বড় বড় ব্র্যান্ড ক্রীড়া দলের সাথে যুক্ত হয়ে তাদের পণ্য প্রচার করে। উদাহরণস্বরূপ, ঘরশব, অফরফধং, চঁসধ এবং ঈড়পধ-ঈড়ষধ এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রীড়ার মাধ্যমে তাদের ব্র্যান্ডকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেছে। খেলোয়াড়রাও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। যেমন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং বিরাট কোহলির মতো খেলোয়াড়েরা তাদের স্পন্সরশিপ থেকে মিলিয়ন ডলার আয় করেন।
৪. পর্যটন শিল্প ও ক্রীড়া: আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট পর্যটন শিল্পে বড় ভূমিকা পালন করে। যেমন অলিম্পিক বা বিশ্বকাপের জন্য হাজার হাজার দর্শক বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ করেন। কাতার ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপের সময় পর্যটন খাতের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ক্রীড়া অর্থনীতির সামাজিক প্রভাব: ক্রীড়া শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানুষকে একত্রিত করে, জাতীয় গর্ব বৃদ্ধি করে এবং সামাজিক সংহতি তৈরি করে।

ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (যুক্তরাষ্ট্র)

১. জাতীয় গর্ব এবং ঐক্য: একটি দেশের দল যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে জয়লাভ করে, তখন পুরো জাতি উদ্যাপন করে। এটি জাতীয় গর্ব এবং ঐক্য বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে ভারতের বিশ্বকাপ জয় দেশের মানুষের মধ্যে এক বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি করেছিল।
২. ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য: ক্রীড়া অর্থনীতির একটি বড় দিক হলো এটি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ায়। বিভিন্ন দেশ তাদের জনগণকে ক্রীড়া কার্যক্রমে উৎসাহিত করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য।
৩. ক্রীড়া এবং শিক্ষা: অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্রীড়া কার্যক্রমের জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করে। ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দলগত কাজ এবং নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তোলে।
ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা: আমাদের ক্রীড়াঙ্গণে দক্ষ পেশাজীবীর অভাব রয়েছে। অনেক খেলোয়াড় প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে হারিয়ে যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা নিয়ে দক্ষ সংগঠক, টিম ম্যানেজার, ইভেন্ট প্ল্যানার তৈরি হলে ক্রীড়া প্রশাসনে গুণগত পরিবর্তন আসবে। এছাড়া ক্রীড়া বিশ্লেষক ও গবেষক তৈরিও অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলোয়াড়দের পারফর্মেন্স অ্যানালাইসিস, ইনজুরি প্রিভেনশন, প্রশিক্ষণ কৌশল ও প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা হয়। বাংলাদেশে এসব বিষয়ে গবেষণা অবকাঠামো না থাকায়, আমরা এখনো পিছিয়ে। ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় এসব চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
বর্তমানে দেশে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা বিভাগ থাকলেও, তা গবেষণা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা-ভিত্তিক আধুনিক ক্রীড়া শিক্ষার চাহিদা পূরণে অক্ষম। তাই একটি জাতীয় ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় গঠন কেবল সময়োপযোগী নয়, বরং অপরিহার্য। এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়াকে শুধুই খেলার বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। ফলে, ক্রীড়া হবে পেশা, গবেষণার ক্ষেত্র এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস যেখানে তরুণরা আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যাবে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাষ্ট্র)

ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা: আজকের যুগে স্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতি এবং মানসম্পন্ন জীবনযাত্রার জন্য ক্রীড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রীড়া শুধু শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য নয়, বরং মানসিক সতর্কতা, দলগত কাজের দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মনোযোগ বৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে, ক্রীড়া ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা হিসেবে একটি বিশেষায়িত ক্রীড়া বিশ্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
প্রয়োজনীয়তার কারণসমূহ
১. পেশাদার ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন: ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, বিজ্ঞানভিত্তিক ক্রীড়া বিশ্লেষণ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চ মানের খেলোয়াড় তৈরি করতে পারে। ২. গবেষণা ও জ্ঞান সম্প্রসারণ: ক্রীড়া বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, ফিজিওথেরাপি, মনোবিজ্ঞান, এবং অন্যান্য সম্পর্কিত শাখায় গবেষণা বৃদ্ধি পায়, যা আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া উন্নয়নে সহায়ক। ৩. জাতীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়ন: ক্রীড়া শিল্পে নেতৃত্বদানকারী উচ্চমানসম্পন্ন প্রশিক্ষক ও কর্মকর্তা তৈরি হলে দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেতাব অর্জনে সহায়ক হবে। ৪. সুষ্ঠু ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ: ক্রীড়া পেশাকে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, যেখানে ক্রীড়া বিজ্ঞান, কোচিং, ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ক্যারিয়ার গড়ে উঠবে।
৫. সংস্কৃতি বিকাশ: ক্রীড়া বিশ্ব বিদ্যালয় দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিকাশে সহায়ক হবে এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে সৌহার্দ্য, পরিশ্রম ও ধৈর্য বাড়িয়ে তুলবে।
একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কারণ ও উপকারিতা: ১. কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান: একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় খেলোয়াড়দের শুধু মাঠের প্রশিক্ষণ নয়, বরং ক্রীড়া বিজ্ঞান, ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, বায়োমেকানিক্স, ফিজিওথেরাপি, এবং ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, এই সকল বিষয়কেও একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবে।
২. আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় তৈরিতে সহায়তা: আধুনিক ক্রীড়ায় প্রতিযোগিতা করতে হলে খেলোয়াড়দেরকে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, পুষ্টিবিদ্যা, রিকভারি পদ্ধতি ও মানসিক প্রশিক্ষণ দিতে হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এই সকল উপাদান সহজলভ্য করা যাবে।
৩. দক্ষ প্রশিক্ষক, কোচ ও গবেষক তৈরি: বাংলাদেশে কোচিং ও প্রশিক্ষণে অনেক সময় বিদেশিদের উপর নির্ভর করতে হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষ কোচ, স্পোর্টস ম্যানেজার, এবং গবেষক তৈরি করতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভরতা গড়বে।
৪. ক্রীড়া গবেষণার পথ উন্মুক্ত করা: আঘাত প্রতিরোধ, প্রশিক্ষণের সময়সূচি, আবহাওয়ার প্রভাব, মানসিক চাপ ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করে ক্রীড়া উন্নয়নে গঠনমূলক অবদান রাখা সম্ভব হবে।
৫. ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণের পথ সুগম করা: অনেক তরুণ খেলোয়াড় বয়সের সাথে সাথে ক্রীড়াকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন কারণ ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণের উপযুক্ত অবকাঠামো নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে তারা উচ্চশিক্ষা এবং খেলাধুলা— দুইটিই একত্রে চালিয়ে যেতে পারবেন।
৬. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নীতিমালা ও প্রশাসনে দক্ষ নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রীড়া প্রশাসন বিষয়ে পড়ালেখা করে ক্রীড়া ফেডারেশন, অলিম্পিক কমিটি, এবং সরকারি পর্যায়ে দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি হবে, যারা ক্রীড়ার নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নে দক্ষতা দেখাতে পারবে
আর্থ-সামাজিক প্রভাব: বেকারত্ব হ্রাস: ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট পেশায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। স্বাস্থ্য সচেতন সমাজ গঠন: খেলাধুলা বাড়লে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আন্তর্জাতিক গৌরব অর্জন: অলিম্পিক, এশিয়ান গেমসসহ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও পদক অর্জনের সম্ভাবনা বাড়বে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাষ্ট্র)

দেশে দেশে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়: ক্রীড়া শিক্ষার নতুন দিগন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রীড়া শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রসারিত করতে গড়ে উঠেছে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্রীড়াবিদ তৈরির কারখানাই নয়, বরং এখানে ক্রীড়াবিজ্ঞান, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, ফিজিওথেরাপি, মনোবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, এবং প্রশিক্ষণ কৌশল সহ নানা শাখায় উচ্চতর শিক্ষা দেওয়া হয়। আধুনিক ক্রীড়াবিদদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বের কিছু বিখ্যাত ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়:
১. জার্মান স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি, কোলোন (এবৎসধহ): ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো ও সম্মানজনক ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে স্পোর্টস সায়েন্স, বায়োমেকানি, স্পোর্টস মেডিসিন, ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণালব্ধ জ্ঞান জার্মানির অলিম্পিক ও পেশাদার ক্রীড়া উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
২. লাফবোরো ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য: বিশ্বের ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থান ধরে রাখা লাফবোরো ইউনিভার্সিটি শুধুমাত্র খেলোয়াড় নয়, ক্রীড়া বিজ্ঞানে দক্ষ গবেষক ও পেশাজীবী তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বমানের স্টেডিয়াম, অ্যাথলেটি ট্র্যাক, ল্যাবরেটরি এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা নিয়ে গঠিত। ব্রিটিশ অলিম্পিক দলের বহু ক্রীড়াবিদ এখান থেকেই উঠে এসেছেন।
৩. পেইকিং স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি, চীন: ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চীনের ক্রীড়া উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এখানে ২০টিরও বেশি বিষয়ে স্নাতক ও গবেষণামূলক কোর্স রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পরিকল্পনার সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে যুক্ত।
৪. ন্যাশনাল স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি, ভারত: ২০১৮ সালে মনিপুরে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভারতের তরুণ প্রজন্মকে ক্রীড়া শিক্ষা, কোচিং, ফিজিওথেরাপি, এবং ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তুলতে কাজ করছে। এটি ভারতের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্যের জন্য একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাষ্ট্র)

৫. রাশিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটি অব ফিজিক্যাল এডুকেশন, স্পোর্টস, ইয়ুথ অ্যান্ড ট্যুরিজম: রাশিয়ার এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ক্রীড়া বিজ্ঞান ও অলিম্পিক প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্বখ্যাত। এখান থেকে বহু অলিম্পিক পদকজয়ী অ্যাথলেট বের হয়েছেন।
ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন: ক্রীড়া বিশ্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বাংলাদেশে খুব বেশি চোখে পড়েনি। তবে বগুড়ার একজন ক্রীড়াপ্রেমী সৈয়দ আরিফ আহমেদ সুমন এবং তার কয়েকজন সহযোগী ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য পত্রিকায় লেখালেখি এবং বগুড়া শহরে পোস্টার লাগিয়েছিলেন। সরকার যদি কখনো ক্রীড়া বিশ্বাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে বগুড়ায় করার জন্য সুমন জোড় দাবি করেছেন। তবে উত্তরের জেলা গাইবান্ধা নানা কারণে সব সরকারের আমলেই অবহেলিত ছিল। এখনো অবহেলার শীর্ষে রয়েছে গাইবান্ধা। যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, বাঙালি নদী বেষ্টিত ওই জেলার মানুষ ক্রীড়ামোদী। গ্রাম-গঞ্জে মাঠের অভাব হলেও আবাদি জমিতে এখনো বিকেলে কিশোর-তরুণদের ফুটবল বা ক্রিকেটের ব্যাট হাতে খেলতে দেখা যায়। গাইবান্ধাবাসীর পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের প্রতি বিশেষ আবেদন এই জেলাতেই বাংলাদেশের প্রথম ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক।

                                                                                                                                                                                                    লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category