আলোচনা: আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনের মূল প্রেরণা কী ছিল?
এস এ জাহিদ: আমি এক সময় চাকরি খুঁজছিলাম। এমন একটা সময় ছিল যখন প্রতিদিন চাকরির জন্য আবেদন করতাম, ইন্টারভিউ দিতাম, অপেক্ষায় থাকতাম, কিন্তু কিছুই হচ্ছিল না। তখন বুঝলাম, শুধু চাকরি না, জীবনের নিরাপত্তা দরকার নিজের হাতে। এখান থেকেই আমার চিন্তায় আসে যদি আমি নিজেই কিছু শুরু করি, তাহলে শুধু নিজের জন্য না, আরও অনেকের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারব।
সেই ভাবনা থেকেই শুরু করি ইনটেক এগ্রো। কারণ, আমি চাইতাম দেশীয় কৃষিপণ্যের ভরসায় একটি স্বনির্ভর উদ্যোগ দাঁড় করাতে যেখানে প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হবে, ভোক্তা বিশুদ্ধ খাবার পাবে, আর কিছু মানুষ কর্মসংস্থান পাবে।
আলহামদুলিল্লাহ, আজ ইনটেক এগ্রোর মাধ্যমে ৪০-৫০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জাতীয় যুব পুরস্কার পেয়েছি। যেটা শুধু একটা সম্মান না, বরং আমার এই যাত্রার স্বীকৃতি। আমার মূল প্রেরণা ছিল নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

মাননীয় উপদেষ্টার হাত থেকে জাতীয় যুব পুরস্কার নিচ্ছেন এসএ জাহিদ
আলোচনা: শুরুর সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল এবং আপনি কীভাবে তা মোকাবিলা করেছেন?
এসএ জহিদ: ইনটেক এগ্রো শুরু করার সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পুঁজি ও বিশ্বাস, নিজের বিশ্বাস, পরিবারের বিশ্বাস, এবং সমাজের বিশ্বাস। আমি যখন বললাম “চাকরির পেছনে না ছুটে ব্যবসা করব”অনেকেই বলেছিল, এটা সম্ভব না। কেউ বলেছিল, “তুমি ব্যবসা জানো না, কেউ বলেছিল, “গ্রামের পণ্য দিয়ে কেউ বড় হতে পারে না।” এই মানসিক চাপ ছিল প্রথম বাধা।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক সমস্যা। পুঁজি ছিল না, তাই প্রাথমিক পর্যায়ে নিজের সঞ্চয়, কিছু বন্ধুর সাহায্য, আর সবচেয়ে বড় কথা—সৎ উদ্দেশ্য ও পরিশ্রম এই জিনিসগুলোকে পুঁজি বানিয়েছিলাম। আমি নিজেই পণ্য সংগ্রহ করতাম, নিজে প্যাকেট করতাম, ডেলিভারি দিতাম।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষকে বিশ্বাস করানো যে, “আমরা আসল দেশীয় পণ্য দিচ্ছি, ভেজালমুক্ত, সৎভাবে।” সেটার জন্য আমি বারবার পণ্যের গুণমান যাচাই করতাম, খোলা মুখে বলতাম “আপনারা খেয়ে দেখুন, পছন্দ না হলে ফেরত দিয়ে দেবেন।” এই ভরসা থেকে প্রথম দিককার কাস্টমাররা আজও আমাদের সঙ্গে আছে।
সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল অবিশ্বাসের ভিড়ে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা।
আলহামদুলিল্লাহ, সেই পথচলার ফল আজ ইনটেক এগ্রো ৪০-৫০ জন মানুষের জীবিকার উৎস হয়েছে। এবং আমি নিজেও পেয়েছি জাতীয় যুব পুরস্কার যা আমার এই লড়াইয়ের সম্মান।

জাতীয় যুব পুরস্কার হাতে এসএ জাহিদ
১. ধৈর্য (ঝধনৎ): উদ্যোক্তা হওয়ার মানেই হলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। আজকের বিনিয়োগ কালই লাভ দিবে, এমন না। কখনও বিক্রি হবে না, কখনও লোকসান হবে। ধৈর্য না থাকলে আপনি শুরু করেও শেষ করতে পারবেন না। ইনটেক এগ্রোর শুরুতে বহুবার এমন হয়েছে, যখন মনে হয়েছে সব ছেড়ে দিই। পরে ধৈর্য আমাকে ধরে রেখেছে।
২. বিশ্বাসযোগ্যতা ও সততা (ঞৎঁংঃ ্ ঐড়হবংঃু): আজকের বাজারে অনেকেই ছোট লাভের জন্য বিশুদ্ধতার সাথে প্রতারণা করে। কিন্তু একজন উদ্যোক্তা যদি সত্যিকারের বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেন, মানুষ তাকে ভুলবে না। আমি আমার পণ্য নিয়ে খোলাখুলি বলি যদি পছন্দ না হয়, ফেরত দিন। এই মনোভাবেই ইনটেক এগ্রো আজ একটা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
৩. নিজের ওপর বিশ্বাস (ঝবষভ-ইবষরবভ): সবাই বলবে তুমি পারবে না, এটা সম্ভব না। কিন্তু একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা। আমি নিজে কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম, অনেকেই উপহাস করেছিল, কিন্তু নিজের ওপর আস্থা রেখেছি। আজ জাতীয় যুব পুরস্কার প্রমাণ করে আমি ভুল ছিলাম না।
পরিশ্রম করা যাবে, ভুলও হতে পারে যদি ধৈর্য, সততা আর আত্মবিশ্বাস থাকে, তাহলে আপনি থামবেন না বদলে দেবেন নিজেকে ও সমাজকে।
আলোচনা: ব্যর্থতাকে আপনি কীভাবে দেখেন, এবং আপনার জীবনের কোনো ব্যর্থতা থেকে শিখেছেন কী?
এসএ জাহিদ: আমি ব্যর্থতাকে দেখি একটা পাঠশালা হিসেবে যেখানে সবচেয়ে দামি শিক্ষাগুলো বিনা পয়সায় নয়, বরং কষ্টের বিনিময়ে শেখা হয়। আমার জীবনের শুরুতে এমন অনেক কাজ ছিল, যেগুলোতে আমি চেয়েছিলাম সফল হব, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। যেমন ধরুন একবার আমি খুব আশাবাদী হয়ে একটা পণ্য বাজারে এনেছিলাম, ভেবেছিলাম খুব চলবে, কিন্তু সেটা একেবারেই চলেনি। স্টক পড়ে ছিল, টাকা আটকে গিয়েছিল, লোকসান গুনতে হয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল এটাই কি শেষ? কিন্তু সেখান থেকেই শিখলাম:
ক. কাস্টমার চায় কী, আগে সেটা বোঝা দরকার
খ. বাজার গবেষণা ছাড়া আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ব্যর্থতা আসবেই
গ. ব্যর্থতা মানে আমি খারাপ না, মানে আমার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল এবং সেটা সংশোধনযোগ্য
সেই ভুল থেকে শিখে আমি পরে ইনটেক এগ্রোর পণ্যে বিশুদ্ধতা, কাস্টমার চাহিদা, প্যাকেজিং, মার্কেটিং সবকিছুতে বাস্তবতা মাথায় রেখেছি। এবং আজ আলহামদুলিল্লাহ সেই শিক্ষা আমাকে সফল করেছে।
ব্যর্থতা আমাকে ভেঙে দেয়নি বরং গড়ে তুলেছে। ব্যর্থতা না এলে আমি আজকের “আমি” হতে পারতাম না।
আলোচনা: আপনার মতে বাংলাদেশে তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ কোন খাতে রয়েছে?
এসএ জাহিদ: আমার মতে, বাংলাদেশে তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় ও টেকসই সুযোগ রয়েছে কৃষিভিত্তিক খাত (অমৎড়-নধংবফ ংবপঃড়ৎ)-এ। কেন?
১. বাংলাদেশের মূল ভিত্তি কৃষি: ৮০% এর বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। অথচ আমরা নিজেদের দেশীয় কৃষিপণ্যের যথাযথ মূল্যায়ন করি না। এখানেই তরুণদের বড় সুযোগ।
২. বিশুদ্ধ খাবারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে: মানুষ এখন ভেজালহীন, স্বাস্থ্যকর খাবারের পেছনে বিনিয়োগ করতে রাজি। ইনটেক এগ্রোর মতো উদ্যোগ যদি ঘি, সরিষার তেল, মধু, চাল, মসলা নিয়ে কাজ করতে পারে, তাহলে শতশত তরুণও এটা করতে পারে এবং তারা গ্রামে থেকেই আয় করতে পারে।
৩. প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিকে ব্যবসায় রূপান্তর সম্ভব: অনলাইন মার্কেটিং, প্যাকেজিং, ডেলিভারি সিস্টেম, সোশ্যাল মিডিয়া এসব এখন সহজলভ্য। একজন তরুণ চাইলে নিজের এলাকায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে ঢাকায়, এমনকি বিদেশেও বিক্রি করতে পারে।
৪. কম মূলধন দিয়ে শুরু করা যায়: একজন তরুণ ২০-৩০ হাজার টাকায়ও নিজের কৃষিভিত্তিক প্রডাক্ট শুরু করতে পারে। এমনকি আজকাল ক্রাউড ফান্ডিং এর মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহ করাও সম্ভব যেটা আমরা ইনটেক এগ্রোতে সফলভাবে করছি। কৃষি এখন কষ্টের খাত না, উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার সোনার খনি। আমি নিজে তার প্রমাণ। তাই আমি বিশ্বাস করি যে তরুণ সত্যিকারের কিছু করতে চায়, তার জন্য “কৃষি” খাতেই সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।
আলোচন: আপনার ব্যবসার প্রথম ব্রেকথ্রু বা সাফল্যের মুহূর্তটি কেমন ছিল?এসএ জাহিদ: আমার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণ এক ঘটনা থেকে। একদিন আমি আমার পরিবারের জন্য ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই তৈরি করছিলাম। তখন ভাবলাম নিজে খাচ্ছি ভালো কিছু, অন্যদেরও যদি খাওয়াতে পারি, কেমন হয়?
আমি সেই সেমাই কিছুটা সুন্দরভাবে প্যাকেট করলাম, পরিচিত কয়েকজনকে দিলাম। খরচ হয়েছিল মাত্র ১৮০ টাকা প্রতি কেজিতে, কিন্তু বিক্রি করতে পারলাম বেশ ভালো লাভে। যারা খেল, সবাই বলল “এত সুস্বাদু সেমাই অনেকদিন খাইনি!” সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো আমি তো পারি!
ছোট একটা জিনিস দিয়ে যদি মানুষ খুশি হয়, আর আমি লাভও করতে পারি তাহলে এটাকে তো বড় আকারে করা যায়!
সেখান থেকেই আমার সাহস আর উদ্যোগের জন্ম। সেমাই ছিল একটা সিম্পল শুরু, কিন্তু আজ তা রূপ নিয়েছে ইনটেক এগ্রোর মতো একটি ব্র্যান্ডে—যেখানে আমরা ঘি, সেমাই, সরিষার তেল, দেশীয় মসলা ও অন্যান্য বিশুদ্ধ কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ করছি।
আলোচনা: আপনার দৈনন্দিন রুটিনে এমন কোন অভ্যাস আছে যা আপনাকে সফল হতে সাহায্য করেছে?
এসএ জাহিদ: আমার সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আমার নিয়মিত অভ্যাসগুলো যেগুলো আমি জীবনের খুবই ব্যস্ত সময়েও মানতে চেষ্টা করি।
১. প্রতিদিন সকালের শুরুটা আমি ধ্যান ও পরিকল্পনায় দিয়ে শুরু করি। কিছু সময় নীরব হয়ে নিজের লক্ষ্যগুলো চিন্তা করি, দিনটাকে কীভাবে ভালোভাবে কাটানো যায় সেটা ঠিক করি।
২. স্মল টাস্কের গুরুত্ব আমি বুঝেছি। বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যাই। এতে অজান্তেই দিন শেষে অনেক কিছু সম্পন্ন হয়।
৩. শিখতে ভালোবাসা দুপুরের সময় বা রাতে আমি নিয়মিত নতুন কিছু শিখি। কখনও বই পড়ি, কখনও অনলাইনে উদ্যোক্তা ও মার্কেটিং নিয়ে পড়াশোনা করি। এটি আমাকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
৪. পরিবার ও কর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানো আমার দৈনন্দিন রুটিনের অপরিহার্য অংশ। এটা আমাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী ও প্রেরণা পূর্ণ রাখে।
আলোচনা: যারা এখনই কিছু শুরু করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী হবে?
এসএ জাহিদ: যারা নতুন করে কিছু শুরু করতে চান, তাদের জন্য আমার সবচেয়ে বড় পরামর্শ হলো “দু:সাহস না করে, ছোট থেকেই শুরু করুন, এবং সবসময় শেখার মনোভাব রাখুন।”
১. নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন: সবার প্রথম বাধা নিজের মনে ভয়, অনিশ্চয়তা আর সন্দেহ। এগুলোকে জয় করতে হবে। আমি নিজে শুরু করেছিলাম রান্নাঘরের ছোট ঘিয়ে ভাজা সেমাই থেকে। তাই আপনি বড় কিছু না করতে পারলেও শুরু করতে পারেন ছোট থেকে।
২. পরিকল্পনা ও পরিশ্রম একসাথে থাকলে সফলতা সম্ভব: শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখলে হবে না, সঠিক পরিকল্পনা আর কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন। প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করুন।
৩. ব্যর্থতা ভয় পাবেন না: ব্যর্থতা হলো শেখার অংশ, এটি থেকে বিচলিত না হয়ে শেখার সুযোগ হিসেবে নিন।
৪. পরিবার ও কাছের মানুষের সমর্থন নিন: তারা আপনাকে মানসিক শক্তি দেবে, আর কঠিন সময়েও পাশে থাকবে।
৫. নতুন প্রযুক্তি ও বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলুন: আজকের দিনে অনলাইন মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নিজের পণ্য বা সেবা পৌঁছে দিন গ্রাহকের কাছে। সর্বোপরি, শুরু করাটা গুরুত্বপূর্ণ। একবার পা ফেললেই পথ খুলে যাবে। কাজেই দেরি না করে আজই নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যান।