• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০২ অপরাহ্ন

ডা. আব্দুল ওয়াহাবের মানবিক উদ্যোগ: বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পেল পাঁচ শতাধিক মানুষ

প্রতীক ওমর, মেহেরপুর থেকে ফিরে / ৯০ Time View
Update : সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬
২৩শে মার্চ, ২০২৬। মেহেরপুরের শ্যামপুর-শালিকা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে‘রাবেজান মঞ্জিল’ ও ‘আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন’-এর সৌজন্যে এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) প্রফেসর ডা. মো. আব্দুল ওয়াহাব-এর ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা।

বসন্তের স্নিগ্ধ সকাল। কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের আলো যখন মেহেরপুরের শ্যামপুর-শালিকা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সবুজ ঘাসে আলতো পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, তখন থেকেই সেখানে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা। হাতে টোকেন নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান শত শত রোগী। কারও চোখে ছানি, কারও চর্মরোগের যন্ত্রণায় মলিন মুখ, আবার কেউ এসেছেন দীর্ঘদিন পুষে রাখা ব্যাধির সুরাহা পেতে। এটি এক মহতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২৩শে মার্চ, ২০২৬। সোমবার সকাল ৮টা বাজার আগেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ বিভিন্ন ধরনের রোগীতে ভরে যায়। ‘রাবেজান মঞ্জিল’ ও ‘আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন’-এর সৌজন্যে এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) প্রফেসর ডা. মো. আব্দুল ওয়াহাব-এর ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা। চক্ষু, চর্ম, যৌন, নাক, কান, গলা, মেডিসিন, গাইনিসহ নানাবিধ রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ সেবা প্রদান করেন।

সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা আর চিকিৎসকের মানবিকতা—এই দুয়ের এক অপূর্ব সমন্বয় প্রফেসর ডা. মো. আব্দুল ওয়াহাব। অবসরের পর যখন অনেকেই বিশ্রামের বিলাসিতায় মগ্ন থাকেন, তখন তিনি বেছে নিয়েছেন শেকড়ের মানুষের সেবা। নিজের কষ্টার্জিত অর্থে বিগত ১৭ বছর ধরে তিনি এই অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য চিকিৎসার দুয়ার অবারিত করে রেখেছেন।

এবারের আয়োজন সম্পর্কে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ডা. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, “আমি মনে করি, মানুষের সেবাই পরম ধর্ম। এই যে শত শত মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন, তাদের চোখে যে আশার আলো দেখি, সেটাই আমার জীবনের সার্থকতা। আমি চাই না অর্থের অভাবে কেউ বিনা চিকিৎসায় মারা যাক বা পঙ্গুত্ব বরণ করুক। আমার মা রাবেজান বেগমের স্মৃতি আর আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আমি এই সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। যত দিন বেঁচে আছি, এই মাটির মানুষদের জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। এখানে শুধু পরামর্শ নয়, অপারেশনসহ যাবতীয় চিকিৎসাও আমরা বিনামূল্যে দিচ্ছি।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার এবং চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার মো. ছাইদুর রহমান পিএইচডি বলেন, “সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে ডা. আব্দুল ওয়াহাব স্যারের এই অবদান সত্যিই অনুকরণীয়। বিশেষ করে চর্ম ও যৌন রোগের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রান্তিক মানুষের সচেতনতা খুব কম। তিনি যেভাবে বিশেষজ্ঞ সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন, তা স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। একজন ডাক্তার হিসেবে আমি জানি, ব্যক্তিগত অর্থায়নে দেড় যুগ ধরে এমন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা কতটা কঠিন। এটি কেবল একটি ফ্রি ক্যাম্প নয়, এটি মানবতার এক বিশাল পাঠশালা।”

সেবাপ্রাপ্ত সত্তরোর্ধ্ব নিছারন বেওয়া দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চোখে ঘোলা দেখতেন। টাকার অভাবে অপারেশন করাতে পারেননি। আজ বিনামূল্যে ডাক্তার দেখালেন এবং তার চোখের অপারেশন করার আশ্বাস প্রদান করেন। সেই আশ্বাসে তার মুখে ফুটেছে প্রশান্তির হাসি। তিনি বলেন, “ওয়াহাব সাহেব আমার চোখের ছানি কেটে দেওয়ার কথা বলেছেন। একটা টাকাও লাগবে না। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ওনাকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখেন।”

অন্যদিকে, নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে আব্দুল আজিজ, বকুল হোসেনসহ কয়েক শত মানুষ এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। তারা বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। বড় বড় ডাক্তার দেখানোর সাধ্য নাই। এখানে এসে বড় ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার সাহেবরা খুব মন দিয়ে কথা শুনেছেন। আমাদের মতো মানুষের দিকে কেউ এভাবে তাকায় না, কিন্তু আব্দুল ওয়াহাব স্যার আমাদের আপন করে নিয়েছেন। উনার মতো মানুষ ঘরে ঘরে থাকলে দেশের কোনো মানুষ বিনা চিকিৎসায় কষ্ট পেত না।”

দুপুর গড়িয়ে ২টা বাজলেও সেবাপ্রার্থীদের ভিড় কমছিল না। প্রতিটি মানুষের মুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ। শ্যামপুর-শালিকা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিটি কক্ষ আজ যেন এক একটি ছোটখাটো হাসপাতালে পরিণত হয়েছিল। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস পরিশ্রম আর ডা. আব্দুল ওয়াহাবের সুনিপুণ তদারকিতে সম্পন্ন হলো আরও একটি সফল সেবা দিবস।

এই মানবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার মোঃ রেজাউল আলম রেজা, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. এম আর সিদ্দিকী মামুন, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. মো. গোলাম মোস্তফা রাফি। এছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ৩০ জন চিকিৎসক এই সেবা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category