• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন

গোলটেবিল বৈঠক:নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানিপুলেশন: ফেক নিউজ, বট-নেটওয়ার্ক ও অনলাইন প্রোপাগান্ডা

বাপ্পা আজিজুল / ২৩৯ Time View
Update : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

বাপ্পা আজিজুল

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবোত্তর ন্যানোটেকনোলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্যের প্রবাহ এত বিপুল, এত দ্রুত যে সত্য ও মিথ্যার সীমানা বহুসময়েই অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল যেমন প্রসারিত হয়েছে, তেমনি এক নতুন বিপদেরও জন্ম দিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানিপুলেশন। নির্বাচন সামনে এলে এই বিপদ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ফেক নিউজ, বট-নেটওয়ার্ক ও পরিকল্পিত অনলাইন প্রোপাগান্ডা, এই তিনটি উপাদান মিলেই গঠিত হয় আধুনিক রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের ‘ডার্ক ল্যাবরেটরি’। যে ল্যাবরেটরি থেকে তৈরি মিথ্যা, বিভ্রান্তি, আবেগ-উত্তেজনা কিংবা গোপন ভয়ের সুনামি মুহূর্তেই ভোটারদের মনোজগতে আঘাত করে।

এক. তথ্যযুদ্ধের নতুন রূপ

প্রচলিত মিডিয়ায় তথ্য নিয়ন্ত্রণের লড়াই নতুন কিছু নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচন উপলক্ষে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেল টানা ৯৬ ঘন্টা চেতনার অনুষ্ঠানমালা নিয়ে হাজির হয়েছিল। ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধের বাইনারি দ্বন্দ্বকে উসকে দিয়ে জনমতকে শেষতক প্রভাবিত করার ফ্যাসিস্ট তৎপরতায় নেমেছিল। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া এই লড়াইকে করেছে বহুস্তরীয়, ব্যক্তিগত এবং প্রায় অদৃশ্য। খবরের কাগজ বা টেলিভিশনে যা প্রচারিত হত কেন্দ্রীয়ভাবে, সেখানে আজ ব্যক্তিগত স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনেই ঢুকে যাচ্ছে রাজনৈতিক বার্তা, ছবি, ভিডিও, গুজব, যার উৎস মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত কঠিন। যাচাই করার আগেই ভাইরাল।
এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন শুধু ভোটের সংঘর্ষ নয়, বরং তথ্যযুদ্ধেরও প্রতিযোগিতা। কোন দল বেশি সংগঠিতভাবে তথ্য ছড়াতে পারবে, কার ন্যারেটিভ দ্রুত মানুষকে প্রভাবিত করতে পারবে, কে বেশি দক্ষভাবে প্রতিপক্ষকে ‘মরাল ডিফিট’ দিতে পারবে, এসবই হয়ে উঠছে নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু।

দুই. ফেক নিউজের মনস্তত্ত্ব: মিথ্যা কেন দ্রুত ছড়ায়?

ফেক নিউজ বা ভুয়া তথ্য যে কেবল রাজনীতিকরাই ছড়ায় বা এর লক্ষ্য কেবল ভোটার নয়, এ ধারণা ভুল। মিথ্যা তথ্যের বিস্তারকে ব্যাখ্যা করে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ:
আবেগ-চালিত শেয়ারিং: মানুষের মনের ৩ ভাগ করেছেন মনোবিজ্ঞানী মার্শাল লিনহ্যাম। ইমোশনাল বা আবেগীয় মন, র‌্যাশনাল বা যুক্তিবাদী মন এবং ওয়াইজ বা প্রজ্ঞাবান মন। বাঙালি আবার দুইপ্রকার। হুজুগে ও সুযুগে। মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। রাগ, ভয়, ক্ষোভ বা উচ্ছ্বাস, এই অনুভূতিগুলোকে উদ্দীপ্ত করতে পারলে তথ্য শেয়ার হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। সবার আগে আপডেট জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাহ্বা কুড়ানো বা পপুলিজমের মানসিকতা এটাই প্রমাণ করে যে অধিকাংশ মানুষ ফ্রয়েডের শ্রেণি অনুযায়ী অদ (ওফ) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
কনফার্মেশন বায়াস: মানুষ সেই খবরেই বিশ্বাস করতে চায় যা তার পূর্বধারণাকে সমর্থন করে। খুব কম মানুষ প্রিজুডিস থেকে বের হয়ে আসতে পারে। এইটা একটা ফ্যাসিস্ট সাইকোলজি। ফলে রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে নিজেদের পক্ষে তৈরি “ইকো-চেম্বার” আরও দৃঢ় হয়।

অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত: ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের অ্যালগরিদম আকর্ষণীয় কনটেন্টকে সামনে আনে, সত্য না হলেও। প্রকৃত তথ্যের তুলনায় নাটকীয় বা চাঞ্চল্যকর ভুয়া খবর তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য ব্যবহৃত হতে পারে কালো টাকা কিংবা বাইরে পাচার হওয়া কোটি কোটি অর্থ। ফলাফল হচ্ছে, একটি গুজব রাতারাতি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, যদিও সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিন. বট-নেটওয়ার্ক: ডিজিটাল ভিড়ের ছদ্মবেশ
সোশ্যাল মিডিয়ায় জনসমর্থনের ধারণা আজ প্রায়ই বিভ্রান্তিকর। অনেক সময় একটি রাজনৈতিক বার্তা বা স্লোগানের নিচে দেখা যায় হাজার হাজার লাইক, মন্তব্য, শেয়ার। মনে হয় যেন জনতা এককথায় রায় ঘোষণা করেছে। বাস্তবে সেই ‘জনতা’র বড় অংশই মানুষ নয়, এরা বট।
বট-নেটওয়ার্ক হলো স্বয়ংক্রিয় বা অর্ধস্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টগুলোর সমষ্টি, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একযোগে পোস্ট করে, শেয়ার করে বা “ট্রেন্ড” তৈরি করে। এখন প্রশ্ন, বট এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
জনমত তৈরি করার ভান সৃষ্টি: বট দিয়ে একটি স্লোগান বা হ্যাশট্যাগ বারবার ছড়ালে মানুষ মনে করে এটি জনপ্রিয়।
বিপুল সংখ্যায় আক্রমণ: কোনো রাজনৈতিক সমালোচককে বট দিয়ে হয়রানির মন্তব্যে ডুবিয়ে দেওয়া যায়।
ইকো-চেম্বারকে শক্তিশালী করা: বট সক্রিয় থাকে এমন সকল গ্রুপে যেখানে রাজনৈতিক বার্তা প্রচার করতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী সময়ে বটের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে দেখা যায়, হঠাৎ করে একটি কয়দিন পুরনো অ্যাকাউন্টে শত শত পোস্ট, একই বাক্য পুনরাবৃত্তি, একই ধরনের ছবি বা ভিডিও, এসবই বট-চালিত প্রচারণার চিহ্ন।
চার. অনলাইন প্রোপাগান্ডা: ক্ষমতার নতুন অস্ত্র
প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা সবসময় খারাপ নয়। কিন্তু যখন এর লক্ষ্য হয় তথ্য বিকৃতি, প্রতিপক্ষকে দানবায়ন, কিংবা সমাজে বিভাজন তৈরি, তখন এটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
অনলাইন প্রোপাগান্ডায় ব্যবহৃত হয় কয়েকটি কৌশল:
ডিপ ফেক ভিডিও: কোনো নেতার মুখ বসিয়ে তার নামে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো। সিলেক্টিভ এডিটিং: একটি বক্তব্যের অংশ কেটে দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ তৈরি করা।
মাইক্রো-টার্গেটিং বিজ্ঞাপন: নির্দিষ্ট বয়স, লিঙ্গ, লোকেশন বা আগ্রহের ভিত্তিতে ভোটারদের লক্ষ্য করে বার্তা পাঠানো। হোয়াটসঅ্যাপ/মেসেঞ্জার চেইন: ভুয়া লিংক, গুজব, চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভ্রান্তি কিংবা নির্বাচনী ভয়, সব ছড়ানো হয় ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে। এই প্রোপাগান্ডা একদিকে যেমন ভোটারের মনোভাব বদলায়, অন্যদিকে গণ-আলোচনার কেন্দ্র স্থানচ্যুত করে। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য দুর্বল হয়ে গেলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আগামি নির্বাচনে জনমত গঠন কিংবা ম্যানিপুলেশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ইউটিউবার ও অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সাররা। তাদের রয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার কিংবা ফলোয়ার। ইউটিউবারদেরকে জাহেলি যুগের গণকদের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। জাহেলি যুগে গণকদের বশে থাকতো জিন, যারা আকাশের দরজায় গিয়ে ফেরেশতাদের আলাপচারিতা শুনে এসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গণকদের তথ্য দিত। গণকেরা তার সাথে সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে বিভিন্ন প্রেডিকশন হাজির করত। বর্তমানে ইউটিউবারদের কাছে টিপ স্টেট কিংবা এজেন্সির লোকেরা টুকটাক কিছু তথ্য বিনিময় করে, তার সাথে ইউটিউবাররা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে , উর্বর (?!) মস্তিষ্কপ্রসূত বিভিন্ন অ্যানালিসিস দাড়ঁ করায়, প্রেডিকশন হাজির করে। যা অধিকাংশ সময় গুজব, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ও মব সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আসন্ন নির্বাচনে যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই বিপক্ষ মতের ইউটিউবাররা বিপদজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।

পাঁচ. গণতন্ত্রে এর প্রভাব
সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানিপুলেশন শুধু অনলাইন ঝড় নয়; এটি সরাসরি গণতন্ত্রের কাঠামোকে আঘাত করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়: ভুয়া তথ্যের বন্যায় মানুষ প্রকৃত ঘটনার সঠিক তথ্য পায় না।
মেরুকরণ বৃদ্ধি পায়: গুজব বা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব মানুষকে মানসিকভাবে বিভক্ত করে, যার রাজনৈতিক ফায়দা তোলে বিভিন্ন দল।
গণতান্ত্রিক আলোচনার অবনতি: যুক্তি-প্রমাণের জায়গায় আবেগ-উত্তেজনা জায়গা দখল করে নেয়।
ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ক্ষুন্ন হয়: যখন একটি জনগোষ্ঠী ভুল তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটি গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে। এক কথায়, অনলাইন প্রোপাগান্ডা গণতান্ত্রিক সমাজকে ধীরে ধীরে ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা সত্য-উত্তর বাস্তবতায় ঠেলে দেয়।
ছয়. সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট
সোশ্যাল মিডিয়ার কোম্পানিগুলো বারবার দাবি করে যে তারা মিথ্যা তথ্য প্রতিহত করতে অ্যালগরিদম আপডেট করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই কোম্পানিগুলোর মূল ব্যবসা ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখা। ফলে আবেগ-উদ্দীপক ও বিভ্রান্তিকর তথ্যই বেশি ছড়ায়, কারণ সেগুলো ক্লিক পায়, শেয়ার হয়, বিতর্ক তৈরি করে, যা প্ল্যাটফর্মের লাভের জন্য উপকারী।
সামাজিক দায়বদ্ধতার ঘাটতি এখানেই।
রাজনৈতিক দলগুলোও এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগায়; কারণ ফেক নিউজ, বট-নেটওয়ার্ক বা প্রোপাগান্ডা তাদের তাৎক্ষণিক স্বার্থ পূরণ করে।
সাত. প্রতিরোধের পথ কোথায়?
এ সমস্যার সমাধান তাৎক্ষণিক নয়; বরং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন:
১. ডিজিটাল লিটারেসি বৃদ্ধি: স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় তথ্য যাচাই, সোশ্যাল মিডিয়ার ঝুঁকি, রিফ্লেকটিভ থিংকিং শেখানো জরুরি। মানুষকে জানতে হবে—কোনো খবর শেয়ার করার আগে দুই মিনিট থেমে যাচাই করা কেন গুরুত্বপূর্ণ। এইটা কিন্তু মুসলমানদের ধর্মীয় বিধানেরও অংশ।
২. স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম: রাষ্ট্রনির্ভর নয়, বরং নাগরিক-নির্ভর স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।
৩. প্ল্যাটফর্ম রেগুলেশন: বিগ টেক কোম্পানিকে বাধ্য করতে হবে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে।
যেসব অ্যাকাউন্ট সন্দেহজনক, বট-চালিত, বা গুজব ছড়ায়, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে।
৪. রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক প্রতিশ্রুতি: যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রচারণায় ফেক নিউজ বা বট ব্যবহার না করার অঙ্গীকার করে, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
৫. গণমাধ্যমের ভূমিকা: প্রচলিত গণমাধ্যমকে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই করে সঠিক খবর প্রচারে আরও সক্রিয় হতে হবে। এটাই জনআস্থা পুনর্গঠনের একমাত্র পথ। কিন্তু তার আগে গণমাধ্যমকেও ফ্যাসিস্ট মুক্ত হতে হবে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এখন নির্ণায়ক। এই প্রভাব ইতিবাচকও হতে পারে, যদি এটি নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ায়, ন্যায্য আলোচনা নিশ্চিত করে, বৈচিত্র্যময় মতামত সামনে আনে। কিন্তু যখন এটি মিথ্যা তথ্য, বট-চালিত বিভ্রান্তি এবং অনলাইন সন্ত্রাসের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আমাদের সামনে তাই দুটি পথ মিথ্যার স্রোতে ভেসে গিয়ে অন্ধ রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেয়া, অথবা তথ্যের স্বাধীনতা ও সত্যের রাজনীতি রক্ষায় সচেতন হয়ে ওঠা। কারণ ডিজিটাল ম্যানিপুলেশনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রযুক্তির নয়, এটি মূলত মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তির লড়াই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category