• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন

বগুড়া-০১ আসন (সোনাতলা-সারিয়াকান্দী) ভোট যুদ্ধের যোদ্ধা যারা

আলোচনা প্রতিবেদন / ২২০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)

প্রাচীন পুন্ড্রনগর ছিল সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানের বগুড়া। প্রায় দেড় হাজার বছর পুÐ্রনগর প্রাদেশিক রাজধানী ছিল মহাস্থানগড়। ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায় বগুড়া একটি প্রাচীন সভ্যতার শহর। উপ-মহাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীও বগুড়ার মানুষ। বগুড়ায় তার কবর। বাংলাদেশের আরেক নক্ষত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও বগুড়ার মানুষ। বোঝাই যাচ্ছে এখানকার মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতি মিশে আছে। এখানে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যাও বেশি।
জেলার অন্যতম একটি আসন হচ্ছে সোনাতলা-সারিয়াকান্দী। বগুড়া-১ আসন। জেলার মধ্যে এই আসনে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা যেমন বেশি তেমনি দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বেশি। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় দেশে বর্তমান দরিদ্র মানুষ ১৩% সেখানে সোনাতলা-সারিয়াকান্দীতে ৪২% দরিদ্র মানুষের বসবাস। এই দরিদ্রতাকে পুঁজি করে বিগত ১৬ বছর আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরা আসনটি নিজেদের মত করে নিয়ন্ত্রণ করতো। এখানে সাধারণ মানুষের ভাগ্য ক্রমাগত নিচের দিকে নেমেছে। রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যে কোথাও কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। আওয়ামী লীগের শক্তিশালী একজন শক্তিশালী সাংসদ মরহুম আব্দুল মান্নান তার পরিবারকে দুই উপজেলায় নানাভাবে শক্তভাবে বসিয়ে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর সহধর্মিণী সাহাদারা মান্নান এখানে সাংসদ হন। বিনা ভোটে এমপি হওয়া স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করেছেন। কাপল এমপির ছেলে সারিয়াকান্দী উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সাহাদারা মান্নানের ভাই সোনাতলা উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে ফ্যাসিস্ট আমল কাটিয়েছে। ওই পরিবারের হাতে দুই উপজেলার সাধারণ মানুষ এমন কি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরাও জিম্মি হয়ে ছিলো। আসনটিতে মূলত ১৯৭৩ সালের পর সাধারণ মানুষ কখনোই আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। জোরপূর্বক এখানে আওয়ামী লীগ বারবার সাংসদ হয়েছে।
এবারে জেন জি ভোটার অবশ্যই পরিবর্তন চায় এখানে। তরুণ ভোটাররা তাদের ভোট দিতে না পারার বেদনা ভুলতে চায়। শিক্ষিত সৎ এবং কাজ করার মানসিকতাসম্পন্ন নেতা নির্বাচন করতে চায়। এছাড়াও নির্বাচনে নানা সমীকরণ, নানা হিসাব-নিকাশ চলছে আসনজুড়ে। কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে তা নিয়েও দলগুলো এখনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। এজন্য জাতীয় রাজনীতির দিকে তাকিয়ে আছে অনেকে। এর মধ্যেও বিএনপি এবং জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে সরব দেখা যাচ্ছে।
বগুড়া বিএনপির আতুর ঘর হওয়ার কারণে খোদ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নজর রাখেন দলটির দিকে। তার সিদ্ধান্তের বাইরে এখানে তেমন কিছু হয় না। তবুও সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজের উপস্থিতি জানান দিতে নানাভাবে মাঠে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত বিএনপির বেশ কিছু নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। তারা আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে চয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া জেলা ড্যাবের সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. শাহ মো. শাজাহান আলী, জিয়া শিশু-কিশোর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বগুড়া জেলা বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোশারফ হোসেন চৌধুরী, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির, বগুড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদ উন নবী সালাম, মনি পঞ্চায়েত কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বিএনপি মহিদুল ইসলাম রিপন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম, মানবজমিনকে বলেন, বিগত সরকারের সময় গোটা বগুড়া বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। আমার আসনে তারা কোনো উন্নয়ন করেনি। আমি সাংসদ থাকতে নদীভাঙ্গন নিয়ে কাজ করেছি, অসংখ্য ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছি। মানুষ আমার সময়ের কাজগুলোকে মনে রেখেছে। আমি আমার শেষ বয়সে এসে জনগণের জন্য ভালো কিছু করতে চাই। তিনি মনে করেন, দল তাকে মনোনয়ন দিলে সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় আবারও ধানের শীষকে বিজয় করতে পারবেন।
বিএনপি থেকে মোশাররফ হোসেন চৌধুরী মনোনয়ন চান। তিনি একজন সংগ্রামী ও মানবিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্তত আছেন।
তিনি মানবজমিনকে বলেন, দলের দুঃসময়ে রাজপথে উপস্থিত থেকেছি। দলের জন্য সব কিছু করেছি। আমি ধানের শীষ পেলে নিশ্চিত জয়লাভ করতে পরবো। আর সাধারণ মানুষের যে চাহিদা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যমুনা নদী শাসনের মাধ্যমে হাজার হাজার পরিবারকে রক্ষা করবো। তিনি আরো বলেন, আমাদের দলীয় কাঠামো অনেক শক্তিশালী। প্রতিটি ওয়ার্ডে আমরা গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তাদের দাবি-দাওয়ার কথা শুনছি। নির্বাচনের জন্য আমরা মাঠে প্রস্তুত।
বগুড়া জেলা ড্যাবের সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. শাহ মো. শাজাহান আলী মানবজমিনকে বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান এবার শিক্ষিত, যোগ্য এবং সৎ মানুষকে মনোনয়ন দেবেন। আমি আশাকরি এমন প্রার্থীর তালাকায় আমার নাম থাকবে। তিনি আরো বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকাÐের সাথে জড়িত আছি। ফলে আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি খুব কম পরিশ্রমেই বিজয়ী হবো।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন চান আরেক নেতা মনি পঞ্চায়েত কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আলহাজ মহিদুল ইসলাম রিপন। তিনিও শীতের কম্বল, ঈদ উপহার, বাঁধ নির্মাণে অর্থ সহায়তা, চিকিৎসা ক্যাম্পসহ দলীয় ব্যানারে নানামুখী কর্মকাÐ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনিও দাবি করেন, এলাকার মানুষ তার মত একজন সৎ, যোগ্য মানুষকে এবার এমপি হিসেবে নির্বাচন করতে চায়। তার সাথে কথা বললে তিনি মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমি এলাকার মানুষের সাথে সম্পৃক্ত আছি। তাদের সুখে-দু:খে পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করি। আমি বিশ্বাস করি দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আসটি উপহার দিতে পারবো। তিনিও এমপি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে নিজেকে নিবেদিত করবেন বলে সাধারণ ভোটারদের আশ্বস্ত করেন।
বগুড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদ উন নবী সালাম, তিনি দাবি করেন এলাকায় দলীয় কর্মকাÐের জন্য দল তাকেই মনোনয়ন দেবেন আর মনোনয়ন দিলে তার জন্যও বেরিয়ে আসা সহজ।
মো: ইয়াসির রহমতুল্লাহ ইন্তাজ নামের আরেক প্রার্থী। যিনি এর আগে স্বতন্ত্র থেকে দুই বার নির্বাচন করেছিলেন। এবার তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন। তার সাথে কথা বললে তিনি বলেন আমি ২০২৪ সালের ৫ মার্চ বিএনপিতে যোগ দিয়েছি। এবার নির্বাচন যদি করি তাহলে দল থেকে মনোনয়ন চাইবো। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো। তিনি আরো বলেন, আমি অনেক আগে থেকেই এলাকায় সামাজিক কার্যক্রমের সাথে জড়িত আছি। মানুষের ভালোবাসা আমাকে নির্বাচন করতে উৎসাহিত করে। কখনো সাংসদ হতে পারলে মানুষের জন্য আরো বেশি কাজ করতে পারবো।
অপর দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী হিসেবে দলটির নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন বেশ আগে থেকেই মাঠে সরব আছেন। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে দুই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম গঞ্জে সাধারণ মানুষের সাথে মতবিনিময় করে যাচ্ছেন। জামায়াত নির্বাচনের মাঠে সরব থাকার পাশাপাশি নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া জাতীয় ইস্যু নিয়েও সাধারণ মানুষের কথা বলছেন। বিশেষ করে পিআর পদ্ধতির ভালো মন্দ ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছানো হচ্ছে সারা দেশের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাধ্যমে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত কেন সঠিক, কেন পিআর চায় জামায়াত সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর তারা জনগণের কাছে তুলে ধরছে।
নির্বাচন নিয়ে কথা হয় জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনের সাথে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, জাতীয় কতগুলো ইস্যু অমীমাংসিত থাকায় নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ অনেক সংশয় প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে জুলাই সদদের আইনি ভিত্তি না দেওয়া পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিস্ট আমলের নির্বাচন আর দেখতে চায় না। তারা চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ মুক্ত একটা সরকার চায়। আমি মাঠে প্রান্তিক মানুষের সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছি এবারে মানুষ ইসলামী শাসনব্যবস্থা চায়। তারা মনে করেন ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েম হলে বাংলাদেশে শান্তি ফিরে আসবে।
আরেকজন সম্ভাব্য প্রার্থী কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান শ্যামল। তিনি একজন কৃষিবিদ। জাতীয় অর্থনীতিতে তার অবদান রয়েছে। তিনি দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অন্যতম একজন। সোনাতলা-সারিয়কান্দী আসনের মানুষদের জন্য তার টান রয়েছে। এর আগে স্বতন্ত্র থেকে তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সাহাদারা মান্নানের বিরুদ্ধে ভোটে লড়েছিলেন। এবারো তিনি নির্বাচন করতে পারেন বলে এলাকায় আওয়াজ আছে। তবে তিনি কোনো দল থেকে নাকি আবারও স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করবেন তা পরিষ্কার হওয়া যায়নি।
নির্বাচন বিষয়ে তার সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি মানবজমিনকে বলেন, সোনাতলা সারিয়াকান্দী অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার হার জেলার মধ্যে সর্বাধিক হলেও এই অঞ্চলের মানুষ বেশি দরিদ্র। কারণ এখানে কৃষি ছাড়া কোনো শিল্প কলকারখানা গড়ে ওঠেনি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকার পরেও পর্যটন জনপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। এই বিষয়ে কেউ নজরও দেয়নি। ফলে সরকারি বেসরকারি ছোটোখাটো পদে চাকরি করেই তাদের পরিবার চালাতে হয়। এখানে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যারা দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেছেন তাদের বিরুদ্ধে জনগণের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তারা এই অঞ্চলে মানুষের কর্মসংস্থানের কোন সুযোগ তৈরি করেননি। ফলে মানুষ ক্রমান্বয়ে দরিদ্রের দিকে ধবিত হয়েছে। আমি এলাকার সমস্যাগুলো খুব কাছে থেকে জানি। এসব সমস্যা সমাধানের পথও আমার জানা আছে। এমন অবস্থায় এলাকার পরিবর্তনের স্বার্থে, এলাকার মানুষের উপকারের জন্য হলেও কোনো দলা বা গোষ্ঠী আমাকে চাইলে আমি তাদের ভালো উদ্যোগের সাথে অবশ্যই শামীল হবো। যা আমি অতীতেও ছিলাম।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, বগুড়া-১ আসনে অন্তর্ভুক্ত সোনাতলা উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬১ হাজার ১৬১ জন। অন্যদিকে সারিয়াকান্দি উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বগুড়া-১ আসনের সংসদ-সদস্যের মৃত্যুর কারণে এখানে একবার উপ-নির্বাচন হয়। সব মিলিয়ে ১৩ বার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছয়বার, বিএনপি পাঁচবার এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী দুইবার নির্বাচিত হন।

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category