• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন

প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অগ্নিপরীক্ষা

Reporter Name / ৫৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

জেসমিন আক্তার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের সংসদীয় প্রেক্ষাপট এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আছে। দীর্ঘ সময় পর এবং নানামুখী প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যখন প্রথমবারের মতো সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হলো, তখন তা কেবল একটি দলের সাফল্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনীতির মেরুকরণে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে মাঠপর্যায়ের আন্দোলন এবং জনমতের যে জোয়ার দলটি তৈরি করেছিল, তার প্রতিফলন এখন জাতীয় সংসদের আসনে দৃশ্যমান। এই নতুন পথচলায় দলটির সামনে যেমন অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে জনগণের গগনচুম্বী প্রত্যাশা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ।
জামায়াতের এই উত্থান হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতির এক সুসংগত ধারা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা যে ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স বা জনকল্যাণমুখী রাজনীতির মডেল সামনে এনেছে, তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। প্রথম রমজানে যখন দেশের প্রথাগত রাজনীতিবিদরা অভিজাত রেস্তোরাঁয় উচ্চবিত্তদের আপ্যায়নে ব্যস্ত ছিলেন, তখন জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা রাস্তার ধারের নিম্নবিত্ত মানুষ, রিকশাচালক এবং শ্রমজীবী মানুষের কাছে ইফতার নিয়ে পৌঁছে গিয়েছে। এই যে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে দাঁড়ানোর মানসিকতা, এটিই দলটিকে একটি গণমুখী শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। রাজনীতির চিরাচরিত বলয় ভেঙে তারা প্রমাণ করেছে যে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া নয় বরং জনগণের সেবক হওয়াই রাজনীতির মূল মন্ত্র হওয়া উচিত।
বিদেশী কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও এখন জামায়াতে ইসলামী একটি কৌতূহলের বিষয়। অতীতে এই দলটিকে নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিশ্বনেতাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এখন জামায়াতের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করছে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে। তারা দেখতে পাচ্ছে যে, দলটি কেবল আদর্শিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা আধুনিক রাষ্ট্রের চাহিদা এবং জনগণের নাগরিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হচ্ছে। এই কূটনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো, জামায়াত এখন কেবল একটি দেশীয় শক্তি নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির পথে হাঁটছে।
তবে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংসদের ভেতরে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলগুলো প্রায়ই সংসদ বর্জন বা কেবল নামমাত্র বিরোধিতার সংস্কৃতি লালন করে এসেছে। জামায়াতের কাছে জনগণের প্রত্যাশা হলো তারা এই প্রথা ভাঙবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব সমস্যা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা সরকারকে গঠনমূলক চাপে রাখবে এটাই সাধারণ মানুষের চাওয়া। সংসদের ভেতরে তারা যদি কেবল দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে মগ্ন থাকে, তবে তাদের এই বিশাল জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হবে। তাদের প্রতিটি কথা এবং কাজ হতে হবে জনগণের হাহাকার আর স্বপ্নের প্রতিফলন।
দলটির ছাত্র সংগঠন যেভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে ইফতার বিতরণ এবং সেবামূলক কাজে অংশ নিচ্ছে, তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তরুণ সমাজ এখন কেবল স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি চায় না, তারা চায় কর্মমুখী এবং নৈতিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব। জামায়াত যদি তাদের এই তরুণ শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে এবং সংসদীয় বিতর্কে মেধা ও যুক্তির প্রদর্শন করতে পারে, তবে তারা আগামী দিনের রাজনীতির প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠবে। সাধারণ মানুষ এখন এমন এক বিরোধী দল চায় যারা গদি দখলের লড়াই বাদ দিয়ে রাজপথে যেমন সক্রিয় থাকবে, তেমনি সংসদকেও প্রাণবন্ত রাখবে।
পরিশেষে বলা যায় যে জামায়াতে ইসলামীর এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছে এক বিশাল দায়িত্ববোধের কাঁধে ভর করে। তারা কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং জনগণের শেষ আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। তাদের ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স যদি কেবল নির্বাচনের মৌসুমি ফল না হয়ে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে টিকে থাকে, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। বিদেশী শক্তির আগ্রহ এবং জনগণের অগাধ বিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা যদি সংসদের ভেতরে এবং বাইরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে, তবেই তাদের এই সাফল্য সার্থকতা পাবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে তাদের প্রিয় এই সংগঠনের দিকে, যারা অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথ দেখাবে এবং গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে।
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রথমবারের মতো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। মাঠের রাজনীতি আর সংসদীয় রাজনীতির ব্যাকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ সময় পর এই বড় পরিসরে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষেত্রে দলটির সামনে যে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো আসতে পারে তার একটি বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।

সংসদীয় বিতর্কে গুণগত মান বজায় রাখা
বিরোধী দল হিসেবে প্রধান কাজ হলো সরকারের প্রতিটি নীতি ও বিলের গঠনমূলক সমালোচনা করা। জামায়াতের সাংসদদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য ও উপাত্তভিত্তিক যুক্তি দিয়ে সংসদে কথা বলা। বাজেট অধিবেশন থেকে শুরু করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা কতটা কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে তাদের সংসদীয় সফলতা।
জনআকাক্সক্ষা ও রাজপথের ভারসাম্য
সাধারণ মানুষ এখন জামায়াতের কাছে কেবল সংসদের এসি রুমে বসে বক্তৃতা আশা করে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা জনদুর্ভোগের সময় তারা রাজপথেও দলটির সক্রিয় উপস্থিতি দেখতে চায়। সংসদীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেন তারা সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে, সেই ভারসাম্য রক্ষা করা তাদের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা।
ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স বা জনকল্যাণমূলক রাজনীতির স্থায়িত্ব
নির্বাচনের আগে বা রমজানে তারা যে সেবামূলক কাজ দিয়ে নজর কেড়েছে, তা বিরোধী দলে থাকাকালীন সারা বছর বজায় রাখা কঠিন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়া নিজেদের তহবিল দিয়ে দেশজুড়ে এই সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া এবং একে একটি টেকসই মডেলে রূপ দেওয়া তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক মহলের গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনীতি
বিদেশী কূটনীতিকরা এখন জামায়াতকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। দলটির জন্য চ্যালেঞ্জ হলো তাদের অভ্যন্তরীণ আদর্শ এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে একটি সমন্বয় ঘটানো। বিশেষ করে মানবাধিকার, নারী অধিকার এবং সংখ্যালঘু ইস্যুগুলোতে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং বিশ্বশক্তির আস্থা ধরে রাখা তাদের দীর্ঘমেয়াদী রাজনীতির জন্য জরুরি।
তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ
বাংলাদেশের একটি বিশাল অংশ তরুণ ভোটার। এই প্রজন্ম কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং আধুনিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়। জামায়াতকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল একটি আদর্শিক দল নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তাদের কাছে দক্ষ জনবল ও আধুনিক পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণদের সৃজনশীলতাকে রাজনীতির মূলধারায় যুক্ত করা তাদের জন্য বড় একটি কাজ হবে।
সরকারি দলের চাপ ও আইনি প্রতিবন্ধকতা
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা সরকারের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। রাজনৈতিক মামলা বা নানা প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়েও সংসদীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হবে। যেকোনো উস্কানির মুখে ধৈর্য ধরে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি বজায় রাখাই হবে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং জামায়াতের কৌশল:
একটি দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর জন্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা এবং নিজস্ব একটি বিকল্প অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটি কীভাবে অর্থনৈতিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তার একটি বিশ্লেষণ নিচে।
বিকল্প বাজেট ও ছায়া অর্থনীতি
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হতে পারে প্রতি বছর সরকারি বাজেটের বিপরীতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বাজেট পেশ করা। এতে সাধারণ মানুষের করের বোঝা কমানো, অপচয় রোধ এবং আয়ের নতুন উৎসগুলো নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা থাকতে পারে। যখন তারা সংসদীয় বিতর্কে ডাটা বা পরিসংখ্যান দিয়ে সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে, তখন শিক্ষিত সমাজ ও ব্যবসায়িক মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ইসলামী অর্থব্যবস্থা ও আধুনিকায়ন
জামায়াতে ইসলামী ঐতিহাসিকভাবেই সুদবিহীন অর্থনীতি বা ইসলামী অর্থব্যবস্থার কথা বলে আসছে। তবে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কেবল তাত্ত্বিক কথা না বলে, কীভাবে ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থায়নকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়, সেই মডেল তারা সংসদে উপস্থাপন করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য সহজ শর্তে বিনিয়োগের ব্যবস্থা এবং যাকাত ভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে সমন্বয় করার প্রস্তাব তারা দিতে পারে।
দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধে কঠোর অবস্থান
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ক্ষত হলো দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচার। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত যদি প্রতিটি সংসদ অধিবেশনে এই ইস্যুগুলো নিয়ে সোচ্চার থাকে এবং নির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণসহ শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, তবে তারা সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন পাবে। অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের জিরো টলারেন্স নীতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে তাদের আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলবে।
শ্রমিক ও নিম্নবিত্তের অধিকার রক্ষা
আপনার আগের তথ্যে যেমনটি এসেছে, নিম্নবিত্তদের ইফতার করানো বা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়া, এই ইমেজের সাথে মিল রেখে তাদের শ্রমঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক নীতি নিতে হবে। পোশাক শিল্প শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর আইনি জটিলতা নিরসন এবং কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তাদের সংসদীয় তদারকি সেল গঠন করা জরুরি। এতে করে তৃণমূলের বিশাল ভোটব্যাংক তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করবে।
বেকারত্ব দূরীকরণ ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি
জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ও যুব উইংকে কাজে লাগিয়ে তারা দেশজুড়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরির প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। সরকারি চাকরির আশায় বসে না থেকে তরুণরা যাতে ফ্রিল্যান্সিং বা স্টার্টআপের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পলিসি সাপোর্ট এবং সিড ফান্ডের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা তাদের অন্যতম প্রধান কাজ হওয়া উচিত।
বিদেশী বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ী সমাজের আস্থা অর্জন
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে হবে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে বা বিরোধী দলে থেকে কোনোভাবেই হরতাল বা জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো অর্থনীতি ধ্বংসকারী কর্মসূচি দেবে না। ব্যবসায়ী চেম্বারগুলোর সাথে নিয়মিত বৈঠক করে তাদের সমস্যাগুলো শোনা এবং সেগুলো সমাধানে সংসদে সোচ্চার হওয়া তাদের জন্য একটি বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক চাল হতে পারে।
সারসংক্ষেপে বলতে গেলে, জামায়াতে ইসলামী যদি কেবল আবেগ নয় বরং বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক যুক্তি ও জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে, তবে তারা বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হবে।

আবার জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তাদের ওপর আসা রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক চাপগুলো মোকাবিলা করতে বেশ কিছু কৌশলগত পন্থা অবলম্বন করতে পারে। যেমন
গঠনমূলক সংসদীয় তৎপরতা বৃদ্ধি
বিরোধী দল হিসেবে কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে সরকারকে তথ্যের ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করা উচিত। প্রতিটি সরকারি বিল বা বাজেটের ওপর বিকল্প ছায়া প্রস্তাবনা পেশ করার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে পারে যে কেবল রাজপথ নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তাদের মেধা ও প্রস্তুতি রয়েছে। এটি সাধারণ জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
ওয়েলফেয়ার পলিটিক্সের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান
রমজানে ইফতার বিতরণ বা সাময়িক সহযোগিতার বাইরে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের জন্য স্থায়ী প্রকল্প হাতে নেওয়া একটি শক্তিশালী পন্থা হতে পারে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ক্ষুদ্র ঋণ, কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র বা ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিকের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করলে সরকারি চাপের মুখেও তৃণমূলের জনসমর্থন তাদের ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
দক্ষ ও আধুনিক কূটনৈতিক সেল গঠন
আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহকে কাজে লাগাতে জামায়াত একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উইং তৈরি করতে পারে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে নিয়মিত সংলাপ, মানবাধিকার ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে তাদের ভাবনাগুলো বিশ্বদরবারে তুলে ধরা জরুরি। এতে করে কোনো সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হবে।
প্রযুক্তি ও তরুণদের সম্পৃক্তকরণ
বর্তমান যুগে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম একটি বড় শক্তির উৎস। আইটি সেলকে আরও শক্তিশালী করে সরকারি ভুলভ্রান্তিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া এবং তরুণ প্রজন্মের চাওয়া অনুযায়ী আধুনিক নীতি প্রণয়ন করা উচিত। তরুণদের মেধা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা রাজনৈতিক প্রচারে নতুনত্ব আনতে পারে।
উস্কানি এড়িয়ে সহনশীল রাজনীতির চর্চা
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা অনেক সময় উস্কানিমূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। এক্ষেত্রে অত্যন্ত ধৈর্যশীল হওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিকূলতা মোকাবিলা করা তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা। হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা অব্যাহত রাখলে মধ্যপন্থী সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন সহজ হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা
বিরোধী দল হিসেবে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া তাদের রাজনৈতিক ইমেজকে আরও উদার ও সর্বজনীন করে তুলবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং তাদের সমস্যাগুলো সংসদে তুলে ধরার মাধ্যমে তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায় যে জামায়াত যদি তাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে এই আধুনিক ও কৌশলগত পন্থাগুলো গ্রহণ করে, তবে তারা কেবল চাপ মোকাবিলা করবে না বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অপরিহার্য শক্তি হিসেবে নিজেদের স্থান চিরস্থায়ী করতে পারবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category