সম্পাদকীয়
দীর্ঘ প্রতীক্ষা, আত্মত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পর বাংলাদেশ অবশেষে এক রক্তপাতহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক নতুন ভোরের দেখা পেয়েছে। এই নির্বাচন ছিল কোটি কোটি মানুষের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান এবং লুণ্ঠিত ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের মহেন্দ্রক্ষণ। ব্যালট বাক্সে জনমতের এই প্রতিফলন প্রমাণ করে যে, এদেশের মানুষ শান্তি ও শৃঙ্খলার পক্ষে এবং তারা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়। তবে এই রাজনৈতিক বিজয়ের আনন্দ পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন রাজপথের এই বিজয় সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে। অর্থাৎ, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করাই হবে এই নবগঠিত সরকারের প্রধান এবং সবচেয়ে কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যেভাবে দুর্নীতির উইপোকা দিয়ে কুরে কুরে খাওয়া হয়েছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। উন্নয়নের চাকচিক্যময় পর্দার আড়ালে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, আর অন্যদিকে সাধারণ শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষ প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছে। তথাকথিত প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান যখন উৎসব পালন করছিল, তখন টিসিবির ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ হওয়া লাইনগুলো বলছিল অন্য এক করুণ বাস্তবতার কথা। ধনীরা আরও ধনী হয়েছে এবং দরিদ্ররা আরও পিষ্ট হয়েছে, এই চরম বৈষম্যই ছিল গত আমলের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। অর্থের এই ভারসাম্যহীনতা অর্থনৈতিক সংকট ছিল সামাজিক অবিচার। তাই মজলুম জনগণের এখন প্রধান চাওয়া হলো লুণ্ঠিত অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং বাজারের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দেওয়া।
দারিদ্র্যের কারণগুলো এখন আর অজানা নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ব্যাংক খাতের লুটপাট, অর্থ পাচার এবং মেগা প্রজেক্টের নামে অর্থের অপচয়ই ছিল আমাদের অর্থনীতির রক্তক্ষরণের মূল উৎস। নতুন সরকারকে সবার আগে এই ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে হবে। যারা অবৈধভাবে সম্পদ পাহাড় সমান করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা সময়ের দাবি। একই সাথে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আয়ের পথ সুগম করতে হবে। কেবল দাতা সংস্থার ঋণের ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রফতানি বাণিজ্যে গতি ফেরানো গেলে তবেই থমকে যাওয়া বাণিজ্য আবার প্রাণ ফিরে পাবে। দরিদ্রদের কেবল ত্রাণ দিয়ে নয়, বরং তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে মূলধারার অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করাই হবে টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনের আসল পথ।
এই সরকার যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসা-বাণিজ্য আবার চাঙ্গা হবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি, কারণ তারা দীর্ঘকাল বঞ্চনার শিকার হয়েছে। মজলুমের দীর্ঘশ্বাস যেন আর ভারী না হয়, সেই লক্ষ্যেই সরকারকে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, যদি সঠিক নেতৃত্ব এবং সততার সমন্বয় ঘটে, তবে এই ভঙ্গুর অর্থনীতি কেবল পুনর্গঠিতই হবে না, বরং বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে একটি শক্তিশালী ও বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। গণতন্ত্রের এই নতুন যাত্রায় জয় হোক সাধারণ মানুষের, অবসান হোক সকল অর্থনৈতিক শোষণের।