সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিমÐলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়ন প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখছেন। এটি নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ধরনের টানাপোড়েন, অবিশ্বাস ও সংঘাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফেরানোর ঘোষণা কেবল উৎকণ্ঠাই বাড়ায়নি, রাজনৈতিক সংকটও বৃদ্ধি করেছে। প্রায় ২ হাজার তাজা প্রাণের হরণকারি দল আবার যদি তাদের কর্মকাÐে সচল হয় তাহলে দেশের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়া। পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে কি না, এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি দিন দিন প্রকট হচ্ছে। একটি অংশ বিশ্বাস করে পিআর পদ্ধতি বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করবে, আবার অন্য অংশ আশঙ্কা করছে, এতে মাঠপর্যায়ে তাদের শক্তি ক্ষীণ হয়ে যাবে। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, মিছিল, সমাবেশ অনেকটা ঘটা করেই শুরু হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ ভোটারদের মনে যে আস্থা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা উল্টো ক্ষয়ে যাচ্ছে।
ওদিকে রাজনীতির এই দ্ব›েদ্বর সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক অস্থিরতা। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম প্রতিদিনই নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। শ্রমজীবী ও নি¤œ আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। বাজারে গেলে মানুষের মুখে শোনা যায় হাহাকার। “আজকে আর কী কিনতে পারবো?” এ পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতাকেও বাড়িয়ে তুলছে।
রাজনীতি ও অর্থনীতির এই টানাপোড়েন এখন পাড়া-মহল্লাতেও প্রভাব ফেলছে। চায়ের দোকান, হাট-বাজার কিংবা রিকশা স্ট্যান্ড, সবখানেই রাজনৈতিক বিতর্কে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও তা হাতাহাতি বা সংঘর্ষেও গড়াচ্ছে। সমাজে বিভক্তির রেখা যেন আরও গাঢ় হচ্ছে।
এ অবস্থায় সামনে কী পথ? আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কেবল রাজনীতিবিদদের জন্য নয়, ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের বাহন। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, বরং আস্থার ভিত্তি। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা, শত্রæ হিসেবে নয়। সংলাপ, সমঝোতা ও আস্থার জায়গা তৈরি না করলে এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে জাতিকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।
প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের ক‚টনৈতিক অর্জন। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে যে সংকট তৈরি হচ্ছে, তা সমাধান না করলে বাইরের সাফল্য ভিতরে টিকবে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নির্বাচনী পদ্ধতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—এসব বিষয়ে এখন জরুরি ভিত্তিতে সর্বসম্মত রোডম্যাপ প্রয়োজন।
সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ আজ স্থিতিশীলতা চায়। তারা চায় ন্যায্য মূল্য, নিরাপদ জীবন ও নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার দ্ব›েদ্ব এ আকাক্সক্ষা যেন বারবার উপেক্ষিত না হয়। তাই এই মুহূর্তে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, সমঝোতার রাজনীতি ছাড়া বিকল্প নেই।