মে- ২০২৬ সংখ্য
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে এক বিশাল ও উদীয়মান জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে আমরা এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারছি না। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সাময়িক অনুদান বা ভাতার পরিবর্তে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। আর এই পরিবর্তনের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো আমলাতন্ত্রকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করা। যখন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক স্তরে স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিত হবে, তখনই প্রান্তিক মানুষের কাছে তাদের ন্যায্য অধিকার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সরকারি সেবা ও বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা যেন কোনোভাবেই মধ্যস্বত্বভোগী বা অসাধু চক্রের পকেটে না যায়, তা নিশ্চিত করতে আমলাদের জবাবদিহিতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় দেখা যায়, দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে দীর্ঘকাল ধরে নানা ধরনের ভর্তুকি ও অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এই সহায়তাগুলো উপকারি মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা জনগণকে পরনির্ভরশীল করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করে। রাষ্ট্রের কার্যকর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হওয়া উচিত এই চিরস্থায়ী ভর্তুকির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত ‘জনশক্তি’ তৈরিতে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ করা। মানুষকে সাময়িক ত্রাণ না দিয়ে বরং তাকে স্বাবলম্বী হওয়ার মতো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদান করাই হলো প্রকৃত উন্নয়ন। জনগণকে যদি আধুনিক যুগের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তোলা যায়, তবে তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে।
আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের একটি বড় অংশই অদক্ষ শ্রমিক। ফলে তারা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও আন্তর্জাতিক বাজারে কাক্সিক্ষত পারিশ্রমিক বা মর্যাদা পান না। রাষ্ট্র যদি তার জনগণকে প্রয়োজনীয় কাজ শিখিয়ে এবং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে বিদেশে পাঠাতে পারে, তবে বর্তমান রেমিট্যান্সের চেয়ে শতগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। উচ্চ মজুরির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না।
এর পাশাপাশি রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগী হতে হবে। কেবল মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং উন্নত বিশ্বের নতুন নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে। এটি সম্ভব হবে তখনই যখন আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও শক্তিশালী হবে এবং আমরা ওই দেশগুলোর বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহ করতে পারব। প্রতিটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে যখন একজন নাগরিক তার শ্রমের প্রকৃত মূল্য পাবে, তখনই দেশ থেকে দারিদ্র্য চিরতরে বিদায় নিতে শুরু করবে।
‘মাসিক আলোচনা’ ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, কেবল সাময়িক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে জনশক্তি সৃষ্টিতে অত্যন্ত সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র, ন্যায্য অধিকারের সামাজিক নিশ্চয়তা এবং কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তারই হতে পারে দারিদ্র্যমুক্ত এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার মূল চাবিকাঠি। আমাদের বিশাল জনসংখ্যাকে যদি বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবেই আগামীর বাংলাদেশ হবে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর ও শক্তিশালী।