• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৪ অপরাহ্ন

‘অজানা গন্তব্যের দিকে রওনা হচ্ছে দেশের শিল্প খাত’- ডা. শফিকুর রহমান

প্রতীক ওমর / ৩২ Time View
Update : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকসহ পুরো শিল্প উৎপাদনে চরম ধস নেমেছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আমীর ডা. শফিকুর রহমান। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং বাংলাদেশ থেকে অর্ডার অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধ, ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই এবং ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়ে দেশ এক অনিশ্চিত অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।


বগুড়া সার্কিট হাউজে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়, শিল্প খাতের স্থবিরতা ও সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, শিল্পের মূল চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ এবং জাতীয় সংসদের সরকারি দলের ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যরাও সংসদে স্বীকার করেছেন যে শিল্প খাত এখন এক অজানা গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের অজুহাত দিয়ে সরকার ছয় মাস পার করলেও কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম দিয়ে সরকারকে বিনামূল্যে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বিদ্যুতের লাইন লম্বা হওয়া সংক্রান্ত নানা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলে সংকটকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো গুরুতর বিষয়ের পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গণভোটের প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে দেশ এক ভয়াবহ ট্রমা ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে। বহু রাজনৈতিক নেতা গুম হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন এবং শত শত পরিবার এখনও স্বজন হারানোর কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের শাসনযন্ত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে চব্বিশের বিপ্লবের পর একটি ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের সংস্কারকামী দলগুলো এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং দেশের ৮২.২ শতাংশ জনগণ এই সংস্কার ও গণভোটের পক্ষে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই জনগণের সাথে করা ওয়াদার বরখেলাপ করেছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করছে। ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায় অমান্য করার কারণেই দেশে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। জনগণের ভোটের রায়কে অবহেলা বা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারো নেই; গণরায় অমান্য করা মানেই জনগণকে অপমান করা।

বিদ্যুৎ সংকট সমাধান এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ মোট ৬টি মৌলিক দাবিতে জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। বাকি দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশে বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণ, বেপরোয়া দলীয়করণ বন্ধ করা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে আনা এবং কৃষকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করা।
আন্দোলনের কৌশল ব্যাখ্যা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের ভেতরে দাবি আদায়ের পথ রুদ্ধ দেখে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। আন্দোলনের প্রথম পর্যায় শেষে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রতীকী কাফেলা নিয়ে লংমার্চ কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। লংমার্চের গাড়ি ব্যবহার ও জ্বালানি খরচ নিয়ে সরকারের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আন্দোলনরত মানুষেরা জাতীয় প্রয়োজনে ও জনগণের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করছেন। সরকারের নানামুখী ভয়ভীতি ও আশঙ্কার তোয়াক্কা না করে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ এই কর্মসূচিতে যোগ দিলেও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি, আন্দোলন সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ ছিল। আগামী দিনে ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় পর্বের লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হবে এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই অহিংস আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি ঘোষণা দেন।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ স্বীকার করা হলেও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রধান প্রহরী। গণমাধ্যম যদি সত্য ও সততার ওপর শক্তভাবে দাঁড়ায়, তবে প্রশাসনের বাকি তিন বিভাগ সঠিকভাবে চলতে বাধ্য হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে বক্তব্যের খণ্ডাংশ প্রকাশ বা বিকৃতি (টুইস্টিং) করার প্রবণতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি সাংবাদিকদের সঠিক ও দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশনের আহ্বান জানান।
বগুড়ার স্থানীয় উন্নয়ন ও অবহেলা প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্বাধীনতার আগে বগুড়া ছিল পুরো উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও এই অঞ্চলটি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে সার্বিকভাবে বঞ্চিত রয়েছে। বগুড়ায় কেবল একটি মেডিকেল কলেজ ছাড়া বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি, রাস্তাঘাটের অবস্থাও নাজুক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অন্য কোনো কারণে বগুড়াকে অবহেলিত রাখা সমীচীন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেশের যেকোনো প্রান্তের অসংগতি ও দাবির পাশাপাশি বগুড়ার ন্যায্য পাওনা আদায়েও তিনি সংসদে সোচ্চার ভূমিকা পালন করবেন।
মত বিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন, জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগরীর আমির আবিদুর রহমান সোহেল, ঢাকা মহানগর উত্তরের যুব বিভাগের সেক্রেটারী ড. ফয়সাল পারভেজ, বগুড়া জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক নূর মোহাম্মাদ, মহানগরীর আইন সম্পাদক শাহীন মিয়া, মহানগরীর প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক ইকবাল হোসেন, নুরুল ইসলাম আকন্দ, আইবিডাব্লুএফ এর মহানগরী সভাপতি মাহফুজুল হক মোল্লা।

ভোরে ডা. শফিকুর রহমান বগুড়ার ধুনটে শহীদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেন। এরপর জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগরীর আমির আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডা. শফিকুর রহমান। রুকন সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন, আঞ্চলিক সহকারি পরিচালক নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় শ্রমিক কল্যাল ফেডারেশনের সহসভাপতি গোলাম রব্বানী, কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের সদস্য ও দারুসসুফফা ট্রাস্ট্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল আজিজ, বগুড়া জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল হক, মহানগরের নায়েবে আমির আব্দুল হালিম বেগ, জেলা নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হাকিম, অধ্যাপক আব্দুল বাসেদ, মহানগর জামায়াতের সেক্রটরী আসম আব্দুল মালেক। বগুড়া জেলা জামায়াতের সেক্রটারী মানছুরুর রহমান।

 

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category