• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ন

সংস্কৃতির আগ্রাসন ও নির্বাচনি প্রভাব

Reporter Name / ৬০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

ফেব্রুয়ারি -২০২৬ সংখ্যা

মনজু রহমান

পৃথিবীর প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতি নানাভাবে নানা রকমের নানা কায়দায় প্রভাব বিস্তার করে। সাহিত্য-সংস্কৃতির ভালো প্রভাবগুলো সমাজ গঠনের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে আমাদের মতো স্বল্প বা মধ্যম আয়ের বা দরিদ্রপীড়িত দেশগুলোতে এর প্রভাব যথেষ্ট লক্ষণীয়। বাংলাদেশে এর ভয়াবহতা আরও বেশি; বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
একটি রাজনৈতিক দলের মূল উপাদান সে দলের অঙ্গসংগঠন। কৃষক-শ্রমিক, যুব, পেশাজীবী, ছাত্রসহ নানা নামের সংগঠন মূল দলকে সহযোগী-চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং তারা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দলকে শক্ত ভিত তৈরিতে সহযোগী হিসেবে কাজ করে। তেমনি সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনগুলোও প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলের সমর্থনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। আর ভূমিকা রাখে বলেই দলের বিপদমুহূর্তে তারা মূল দলের হয়ে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে, যা দৃশ্যত প্রকাশ্যে বিপদমুক্ত বা বিপদের ঝুঁকি না নিয়েই। সুবিধা হলো: তারা মূল দলের প্রকাশ্যে লেবাস নিয়ে কাজ করে না। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে। কিন্তু সচেতন ব্যক্তি মাত্রই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
ধরা যাক, বিভিন্ন সামাজিক-সাহিত্য-সংস্কৃতি-গোষ্ঠী-চক্র-কুঞ্জ-উদীচী-সংঘ-এ রকম নানা নামের প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে রাজনৈতিক লেবাস বা ছত্রছায়ায় মূল দলের সমর্থনপুষ্ট বা সাহায্য-সহযোগিতায় তারা অবাধে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে এবং যাচ্ছে। এর প্রমাণ তো আমরা আগেও দেখেছি আর এখন তা ভয়াবহ আকারে দেখছি। স্বাধীনতা-উত্তর বাম ঘরানার দলগুলো এই প্রথা চালু করেছিল যা এখনো বহাল তবিয়তে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মূল দলের পাশাপাশি উদীচী নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলে যেখানে সংস্কৃতির নানা মাধ্যম নিয়ে কাজ করে আসছে বছরের পর বছর। তেমনি গণ-অভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলেও এবং তাদের সহযোগী বা অঙ্গসংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বর্তমান সময়ে অবাধে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে নানাভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে। কারণ সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মকাণ্ড পরিচালনায় কোনো বাধা নেই। কথা হচ্ছে এসব বড় মাপের কাজ করতে যে মোটাদাগের অর্থের প্রয়োজন হয়, সেসব অর্থ কোথা থেকে কীভাবে আসছে তার খোঁজ বা অনুসন্ধান কেউ করছে না। এরাই মূলত পতিত পলাতক সরকারের মূল শক্তি। যেমন: জাতীয় কবিতা পরিষদ। জাতীয় কবিতা পরিষদ নামক সংগঠনটির জেলায় জেলায় এর শাখা-উপশাখা জাল বিছিয়ে রেখেছে। গত ১৬ বছরে এই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে বা যারা আছে এরা কারা? পতিত সরকারের গোপন অর্থায়নে, এমনকি প্রশাসনের আর্থিক সহায়তায় তারা সাড়ম্বরে ঢাকায় দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠান করছে, নতুন কমিটি করছে; কিন্তু যারা করছে তারাই ঘুরেফিরে মূল দায়িত্বে আসছেন। মানে নতুন পাতিলে পুরোনো চাল। অনেকের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় এই সংগঠনটি পতিত সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখছে। এতো গেল পতিত আওয়ামী সরকারের সাহিত্য-কবিতা-সাংস্কৃতিক ভিত্তিক সংগঠন। এ ছাড়াও তাদের পতিত সরকারের নানা নামের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছড়িয়ে রয়েছে যারা পতিত সরকারের বিপদের দিনে শক্ত হাতে হাল ধরতে পারছে।
এরপর আছে জামায়াতের নানা রকম সংগঠন। জামায়াতই একমাত্র দল যাদের আছে অসংখ্য নানামুখী সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান। কোচিং সেন্টার, ক্লিনিক, হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্রসহ নানা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে অর্থের সমস্যা বা মূল দলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না; বরং তারাই নানাভাবে মূল দলকে অর্থনৈতিক সাপোর্ট করতে পারে। তারা চূড়ান্ত বিপদের দিনে নিজেরাই নিজেদের সামলে নিতে পারে। কিন্তু দেশের সর্ববৃহৎ দল বিএনপি এদিকটায় আগাগোড়ায় উদাসীন। জাসাস নামের তাদের একটি সামাজিক সংগঠনের অস্তিত্ব থাকলেও তারা সংগঠনটিতে অদ্যাবধি তারুণ্যের মধ্যে বিস্তার ঘটাতে পারেনি। পারেনি ঠিক নয়, বিস্তার ঘটাতে চায়নি। বরং কিছু কবি-অসাহিত্যিক নামধারী ব্যক্তি এই সংগঠনকে কীভাবে নিজেদের পকেট সংগঠন বা কুক্ষিগত করা যায় তার বিবিধ মতলব এঁটেছে। আমাদের দেশের তরুণদের ধারণা মূলদলের নেতারা চাননি দলের বাইরে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিজন নিয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি ফোরাম গঠিত হোক। এটা যে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কতো বড় ভুল, সে মাসুল বুঝবারও ক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। যদি তারা সংস্কৃতির অঙ্গনে অন্যান্য দলের মতো অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে দেশব্যাপী সংগঠনকে ছড়িয়ে দিতে পারতেন, গত ১৫ বছরে আজ তারাও নানা ধরনের অনুষ্ঠানাদি করে মূল দলকে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ভেতরে ভেতরে সাপোর্ট দিতে পারতেন। অনেকের ধারণা আওয়ামী লীগ, বামদল, জামায়াত-এর মতো বিএনপির নেতারা উদার নন, তারা নিজেদের স্বার্থের বাইরে কখনোই বের হতে পারেননি। পারেনি একটিও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে যেখানে তাদের দলীয় বা অঙ্গদলীয় কর্মীরা শারীরিক-মানসিকভাবে বা অযাচিত সরকার বা প্রশাসনের হুলিয়া আক্রান্ত হলে, সেইসব নেতা-কর্মীদের আর্থিক সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, আক্রান্ত কর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে সেইসব কর্মীদের বা পরিবারের পাশে যদি দাঁড়াতে পারতো মূল দলের প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকের ধারণা দলটির সাংগঠনিক ভিত আরো শক্ত হতো। বিষয়টি এখনই ভাববার আছে বলে দলটির অগণিত শুভানুধ্যায়ী মনে করেন। অথচ দলটি তিন টার্মে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল।
২. প্রসঙ্গ টানার কারণ এই জন্য যে, পতিত সরকার পতনের আগে, পতিত সরকারের বিশাল বাহিনীর কর্মীদের দ্বারা বিশাল কর্মী বাহিনীর লুটপাট, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, খুন জখম হরিলুটের মহড়া চলছিল। হাসিনা সরকারের পতনের পর, সেই লুটপাট বা চাঁদাবাজির তকমা বিএনপি দলীয় সমর্থক বা কর্মীদের উপর পড়তো না। পড়লেও তা কথিত আগ্রাসীরূপ নিতে পারতো না। অস্বীকার করার জো নেই যে, বিএনপি একটি দেশের ব্যাপক জনসমর্থন মুখী দল। মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নেতা, স্বাধীনতার ঘোষক, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্তম্ভ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তাঁর পথপ্রদর্শক আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে নানাবিধ অত্যাচারে প্রায় মৃত্যুর মুখে দেশত্যাগ করে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইস্পাতকঠিন মনোভাব ও দৃঢ়চিত্তে দলকে নানা ঝুটঝামেলার মধ্যে টিকিয়ে রেখেছেন। ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে দলের সর্বস্তরের নেতাকে পরামর্শ দিয়েছেন সে কারণেই দলটির সারাদেশে লক্ষ-কোটি সাধারণ জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন আজ অবধি ধরে রেখেছে। বর্তমানে তারেক রহমানই বিএনপির জিয়নকাঠি। তাঁর পরামর্শেই চলছে দেশের বৃহত্তম দল। তারপরও কথা থেকে যায়, এতো বড় বৃহৎ দলের সাহিত্য-সংস্কৃতি-ব্যাংক বা আর্থিক সংগঠন না থাকার কারণে আমাদের দেশে জাতীয়তাবাদের মতাদর্শের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান না গড়ে ওঠার কারণে, সামাজিকভাবে এর বিকাশও হয়নি বিধায় দেশের অভ্যন্তরে জেল-জুলুম-হুলিয়া নিয়েও নেতাকর্মীরা বা তাদের পরিবার সাহায্য-সহযোগিতার ছিটেফোঁটা অংশও পায়নি। যার ফলে তাদের কোর্ট-কাচারি, আইনজীবী-পুলিশকে সামাল দিতে তারা বা তাদের পরিবার বলতে গেলে নিঃস্ব হয়েছেন। আশার কথা এই যে, এরপরও অত্যাচারিতরা দল ত্যাগ করেননি; বরং তারা আরও ভেতরে ভেতরে নিজেদের মধ্যে শক্ত বন্ধনে বেঁধে রেখেছেন। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ।
জামায়াতের অর্থনৈতিক শক্তি অনেক বেশি থাকার কারণে এবং পতিত সরকারের বারংবার দোসর হওয়ার কারণে এমনকি তাদের ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক পরিকল্পনা বদলানোর কারণে তারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর এক বক্তব্যে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের মতোই দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তারা আশানুরূপ ফল লাভ করবেন। তিনি কীভাবে গোটা দেশ জরিপ করেছেন আমাদের জানা নেই, তবে এটুকুন বলা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। জাতীয় নির্বাচনে সর্বশ্রেণির জনতার অংশগ্রহণ থাকে। চাষী-দিনমজুর-খেটে খাওয়া মানুষ এই নির্বাচনের বড় অংশ। কারণ একটি নির্বাচনের আসনে হাজার নয় লক্ষ লক্ষ ভোটার থাকে। এই দুই নির্বাচনের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। এটুকু বোধ জনাব আমির সাহেবের মাথায় নেওয়া উচিত। নির্বাচনে কিন্তু তাদের এই ধারণার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়নি।
পরিশেষে, আমরা চাই দেশব্যাপী আগামী দিনগুলোতে জাতীয়তাবাদী সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিকল্পিত ধারার মুক্ত বিকাশ। যে ধারায় হাজারো কর্মীবাহিনী মূল দল বিএনপিকে সংস্কৃতির নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারে। এর জন্য মূল দলের নেতাদের কার্পণ্য নয়, উদারচিত্তে সংস্কৃতি কর্মীদের জন্য আর্থিক, নৈতিক এবং প্রশাসনিক সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। মনে রাখা দরকার সাহিত্য-সংস্কৃতির ভারসাম্য ঠেকাতে অনুরূপ আরেকটি ভারসাম্য দরকার। তবেই অন্যদের সংস্কৃতির আগ্রাসনের বাড়বাড়ন্ত কমাতে পারে। সে আগ্রাসন কবিতা হোক, সাহিত্য হোক, সংস্কৃতির হোক। বিষয়টি এখনই বিএনপি বা জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ভেবে দেখা দরকার।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category