• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৩ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের এআই নীতি ২০২৬ যেসব সংশোধনগুলো ছাড়া নীতি অকার্যকর থেকে যাবে

Reporter Name / ৫৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

ফেব্রুয়ারি -২০২৬ সংখ্যা

ফেরদৌস হোসেন

বাংলাদেশ অবশেষে বৈশ্বিক এআই গভর্ন্যান্স আলোচনায় প্রবেশ করেছে। খসড়া এআই নীতি ২০২৬-কে নিছক প্রতীকী দলিল বলা যায় না। এতে ঝুঁকিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, অ্যালগরিদমিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। কাগজে-কলমে এটি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার প্রতিফলন।
কিন্তু অস্বস্তিকর সত্য হলো ভালো উদ্দেশ্য নাগরিককে অ্যালগরিদমিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে না। দুর্বল নীতি অসৎ বা অবহেলাকারী আচরণ ঠেকাতে পারে না। আর তিন বছরের আইন প্রণয়নের সময়সীমা সেই কর্মীর কোনো উপকারে আসে না যাকে আজই একটি এআই সিস্টেমের সিদ্ধান্তে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলো।
বাংলাদেশে সাত বছর কর্পোরেট আইনচর্চার অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানে নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল’-এ এআই ও ডেটা গভর্ন্যান্স অধ্যয়নের অভিজ্ঞতা থেকে এই নীতিকে আমি দুইটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি: আইনি কার্যকারিতা এবং বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা। ফলাফল হলো, এই নীতির মধ্যে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু এমন কিছু গুরুতর ফাঁক রয়েছে, যেগুলো পূরণ না হলে নীতিটি প্রতীকী দলিল হয়ে থাকবে। এখন প্রশ্ন হলো কোথায় পরিবর্তন দরকার?
তিন বছরের ফাঁক: নীতিগত বিলম্বের সমস্যা: নীতিটি আইন মন্ত্রণালয়কে ২০ ফড়ংংরবৎং সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন খসড়া করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি ইতোমধ্যেই এআই ব্যবহার করছে। বিদেশি জেনারেটিভ এআই প্ল্যাটফর্ম তথ্যপ্রাপ্তির ধরন নির্ধারণ করছে। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম চাকরি, সেবা গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতার বিপরীতে আইনি সুরক্ষার যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি সামান্য ঘাটতি নয়; বরং এটি একটি গভীর খাদ।
সমাধান অপেক্ষা নয়। বাংলাদেশের কাছে ইতোমধ্যে এমন কিছু বিদ্যমান আইন ও অধ্যাদেশ আছে, যেগুলোর মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন বাধ্যতামূলক প্রয়োগ সম্ভব। যেমন: আইসিটি আইন, ২০০৬; ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় ডেটা গভর্ন্যান্স অধ্যাদেশ, ২০২৫; সাইবার সেফটি অধ্যাদেশ, ২০২৫।
এই আইনগুলোর অধীনে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে যেমন বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তাৎক্ষণিকভাবে বাধ্যতামূলক বিধিমালা জারির নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে নীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে, এআই-সংক্রান্ত বিষয় ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই নীতির নীতিমালা বিবেচনায় নেবে। এটি পূর্ণাঙ্গ আইনের বিকল্প নয়, কিন্তু এতে নীতিটি আদালতের কাছে ব্যবহারযোগ্য রেফারেন্সে পরিণত হবে।
শব্দ আছে, অর্থ নেই: নীতিতে “এআই সিস্টেম”, “হাই-রিস্ক এআই”, “ডিপলয়ার”, “অ্যালগরিদমিক বায়াস”, এই শব্দগুলো বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু কোথাও স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটি কোনো তুচ্ছ কারিগরি ত্রুটি নয়। আইনে সংজ্ঞা অলংকার নয়, এটাই অধিকার ও দায়বদ্ধতার ভিত্তি। সংজ্ঞা না থাকলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বুঝবে না তারা ডিপলয়ার কি না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বুঝবে না কোন সিস্টেম হাই-রিস্ক। নাগরিক জানবে না “অ্যালগরিদমিক বৈষম্য” বলতে আইন কী বোঝে। নীতিতে একটি পৃথক সংজ্ঞা অধ্যায় থাকা আবশ্যক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইন বা যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো এআই আইন অনুসরণ করে অন্তত এসব বিষয় সংজ্ঞায়িত করতে হবে: এআই সিস্টেম কী, হাই-রিস্ক নির্ধারণের মানদণ্ড, ডেভেলপার ও ডিপলয়ারের পার্থক্য, অ্যালগরিদমিক বৈষম্যের আইনি অর্থ এবং কোন সিদ্ধান্তগুলো “কনসিকোয়েনশিয়াল”। কারণ চাকরি, শিক্ষা, ঋণ, স্বাস্থ্য, বীমা বা বিচারপ্রাপ্তির ওপর প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্তই নাগরিকের মৌলিক অধিকার স্পর্শ করে। সংজ্ঞা ভুল হলে, সুরক্ষাও থাকবে না।

ঝুঁকিভিত্তিক কাঠামো আছে, কিন্তু ব্যবহারবিধি নেই: নীতির ৪.১ ধারায় চার স্তরের ঝুঁকি শ্রেণিবিন্যাস দেওয়া হয়েছে: নিষিদ্ধ, হাই-রিস্ক, সীমিত-ঝুঁকি ও নিম্ন-ঝুঁকি। নকশাটি ভালো, কিন্তু প্রয়োগের কোনো পদ্ধতি নেই। কে ঝুঁকি নির্ধারণ করবে? কোন মানদণ্ডে? কোন প্রক্রিয়ায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কাঠামোটি কার্যকর হয় না। সমাধান হলো: নিরপেক্ষ মানদণ্ড নির্ধারণ, স্ব-মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনার যৌথ ব্যবস্থা।
ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, কিন্তু কিসের ভিত্তিতে?: অ্যালগরিদমিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু নীতিতে বলা হয়নি এতে কী থাকবে, কে করবে, কতদিন সংরক্ষণ হবে। ন্যূনতমভাবে এই অ্যাসেসমেন্টে থাকতে হবে: উদ্দেশ্য, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, ডেটার উৎস, সীমাবদ্ধতা, স্বচ্ছতা ব্যবস্থা, স্থাপন-পরবর্তী নজরদারি এবং মানবীয় তদারকি। না হলে এটি দায় এড়ানোর কাগজে পরিণত হবে।
শাস্তি ছাড়া নিয়ন্ত্রণ মানে অনুরোধ: নীতি প্রয়োগের কথা বললেও শাস্তির কোনো কাঠামো দেয়নি। এটাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। নিষিদ্ধ চর্চায় বার্ষিক টার্নওভারের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা, হাই-রিস্ক ক্ষেত্রে অনিয়মে ৩ শতাংশ এবং নথিপত্র ও স্বচ্ছতায় ব্যর্থতায় ১ শতাংশ জরিমানার বিধান না থাকলে বড় প্রতিষ্ঠান নীতি মানবে না।
অধিকার আছে, কিন্তু প্রয়োগের পথ নেই: ব্যাখ্যার অধিকার, মানবীয় পর্যালোচনার অধিকার: সবই আছে। কিন্তু নাগরিক কীভাবে এই অধিকার দাবি করবে, তা স্পষ্ট নয়। নির্দিষ্ট সময়সীমা, প্রক্রিয়া ও ভাষাগত নিশ্চয়তা না থাকলে অধিকার কাগজেই থেকে যাবে।
বিদেশি প্ল্যাটফর্মের প্রশ্ন: বাংলাদেশের মানুষ চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং আরও অনেক জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে, কিন্তু নীতির আওতার বাইরে। স্থানীয় প্রতিনিধি, সীমান্তের বাইরে প্রয়োগযোগ্যতা এবং নথিভিত্তিক দায়বদ্ধতা, সবই অনুপস্থিত। এর ফলে নীতি কেবল দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করবে, বিদেশি প্ল্যাটফর্ম থাকবে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আগে চালু সিস্টেমগুলোর কী হবে?: রূপান্তরকালীন বিধান ছাড়া ব্যবসা অন্ধকারে থাকবে। গ্রেস পিরিয়ড, নিষিদ্ধ চর্চা বন্ধ এবং নতুন হাই-রিস্ক ব্যবহারে তাৎক্ষণিক প্রয়োগ, সব স্পষ্ট করা জরুরি। এটি কোনো একাডেমিক বিলাসিতা নয়। প্রতিদিন এআই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে: চাকরি, ঋণ, সেবা ও বিচার বিষয়ে। এআই নীতি ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কিন্তু নীতি আর আইন এক জিনিস নয়। সংজ্ঞা, প্রক্রিয়া, শাস্তি ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ছাড়া নীতির ভেতরে অধিকার জন্ম নেয় কিন্তু বেশিদিন টিকে না।

লেখক, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। বর্তমানে এলএল.এম. শিক্ষার্থী (ব্যবসা, ডেটা প্রাইভেসি ও এআই আইন) নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল’, বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category