• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫০ পূর্বাহ্ন

জামায়াতের তিন প্রজন্ম ও পারিভাষিক বিবর্তন

বাপ্পা আজিজুল / ১৪৭ Time View
Update : শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ইসলামপন্থি দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তবে দলটির ইতিহাস, আদর্শগত বিবর্তন এবং গণতন্ত্র বিষয়ে তাদের অবস্থান সময়ের সাথে নানা পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে জামায়াতের তিনটি প্রজন্ম-প্রতিষ্ঠাতা মৌলানা আবুল আ’লা মওদূদী, বাংলাদেশ পর্বের রূপকার গোলাম আজম এবং সাম্প্রতিক সময়ে দলের মুখপাত্র ডা. শফিকুর রহমানকে হাজির করা হয়েছে। মওদূদী জামায়াত প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৪১ সালে, একটি ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ কায়েমের লক্ষ্যে। তাঁর মূল ভাবনা ছিল ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কাঠামোও। গণতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর অবস্থান ছিল দ্বৈতধর্মী—তিনি একদিকে পশ্চিমা উদ্ভূত সেক্যুলার গণতন্ত্রের সমালোচনা করেন, অন্যদিকে “ইসলামি গণতন্ত্র” (ইসলামি) নামে একটি ধারণা উপস্থাপন করেন যেখানে সার্বভৌমত্ব আল্লাহর, জনগণ নয়। যা মওদূদীর ‘হাকিমিয়্যা দর্শন’ নামেও পরিচিত, যদিও দর্শনটি তাঁর নিজস্ব নয়; বরং ইসলামের একটি মৌলিক ধারণা। তাঁর আগে ইমাম ইবনে তাইমিয়া এই দর্শনকে প্রথম জনসম্মুখে আনেন।
মওদূদীর গণতন্ত্র চিন্তা মূলত ছিল “নেতৃত্ব আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত হবে, তবে জনগণ শুরা বা পরামর্শের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করবে।” এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার তুলনায় একরকম মডেল—যা গণতন্ত্রের রূপগত কাঠামো গ্রহণ করে, কিন্তু আত্মিক দিক আলাদা রাখে। তাঁর ভাষায়, “ইসলামের মধ্যে গণতন্ত্র এমন নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই সর্বোচ্চ হবে, বরং ইসলামি শাসনে শরিয়াহর সীমারেখার মধ্যে থেকেই জনগণ মত প্রকাশ করবে।”
স্বাধীনতা-পরবর্তী জামায়াতের নেতৃত্বে গোলাম আজম ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নেতা। তাঁর আমলে দলটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে কৌশলগতভাবে গ্রহণ করে। মওদূদীর “সর্বোচ্চ রাষ্ট্র” চিন্তার তুলনায় গোলাম আজম এক ধরনের ব্যবহারিক গণতন্ত্র বাদ-এর পথে হাঁটেন। তিনি ‘ইসলাম ও গণতন্ত্র’ নামে একটি পুস্তিকাও লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, “প্রকৃতপক্ষে সরকার গঠন ও সরকার পরিবর্তনের বিশেষ একটি পদ্ধতির নামই গণতন্ত্র। ইসলামের রাজনৈতিক নীতিমালার সাথে গণতন্ত্রের গণতন্ত্র বাদ পাঁচটি মূলনীতির কোন বিরোধ নেই”। তিনি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতেন। এর ফলে ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে জামায়াত সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, জোট গঠন করে, এমনকি ক্ষমতার অংশীদারও হয়। গোলাম আজম গণতন্ত্রকে একদিকে “যুদ্ধের ময়দান”, অন্যদিকে “আস্তে আস্তে ইসলামীকরণ”-এর কৌশল হিসেবে দেখতেন। তবে এর একটি সীমাবদ্ধতা ছিল—তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে গণতন্ত্র ছিল একটি মাধ্যম, নিজস্ব তন্ত্র (ইজম) নয়। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার, বা ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা বিষয়ক কোনো শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি।

২০১০-এর দশকে জামায়াতের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধাপরাধ ট্রায়াল ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার ফলে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটে। ডা. শফিকুর রহমান এই প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর সময়ে গণতন্ত্র সম্পর্কে জামায়াতের অবস্থান হয়ে পড়ে এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক গণতন্ত্রবাদ—অর্থাৎ, গণতন্ত্রের কথা বলা হয় মূলত দমন-পীড়নের বিরুদ্ধাচরণে। ডা. শফিক গণতন্ত্রের পক্ষে বারবার বক্তব্য রেখেছেন, কিন্তু তাঁর দল এখন কার্যত নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। তাই এই প্রজন্মের গণতন্ত্র ভাবনায় নেই মওদূদীর মতবাদভিত্তিক কাঠামো, কিংবা গোলাম আজমের বাস্তববাদী কৌশল। বরং এটি হচ্ছে “সংশোধিত ভাষায় সংবিধান ও আইনের মধ্য দিয়ে জামায়াতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা”-র এক আহ্বানমূলক সংলাপ। ডা. শফিকুর রহমানের গণতন্ত্র ভাবনা তাই প্রতিরক্ষামূলক ও প্রতিক্রিয়াশীল, ভাষাগত সমন্বয় এবং জনসম্পৃক্ততামূলক। “আমরা সংবিধান মানী, গণতন্ত্র চাই, শান্তিপূর্ণ রাজনীতি করি।”
তবে এসব বক্তব্যের প্রেক্ষাপট হলো রাজনৈতিকভাবে দমন-পীড়ন ও আইনি নিষেধাজ্ঞা। ফলে গণতন্ত্র ভাবনা এখানে আত্মরক্ষামূলক কৌশল মাত্র। আদর্শিক ব্যাখ্যার চেয়ে দলীয় টিকে থাকার প্রয়োজনই মুখ্য। জামায়াতের গণতন্ত্র ভাবনার বিবর্তন হলো আদর্শবাদ থেকে কৌশলবাদ এবং শেষপর্যায়ে আত্মরক্ষামূলক পটভূমিতে রূপান্তরের ইতিহাস। এ তিন প্রজন্মের নেতারা যে পরিবেশে ছিলেন, সেই প্রসঙ্গ বিবেচনা করলে তাদের চিন্তা ও কৌশল বুঝতে সুবিধা হয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায়, জামায়াত কি আবার গণতন্ত্রের কোনো মৌলিক সংজ্ঞা উপস্থাপন করতে পারবে, নাকি কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই আবদ্ধ থাকবে? জামায়াতে ইসলামীর গণতন্ত্র ভাবনা মূলত ছিল ক্ষমতা, আদর্শ ও প্রাসঙ্গিকতার মধ্যে টানাপোড়েনের এক ধারাবাহিক বিবর্তন। মওদূদী চেয়েছিলেন থিও ডেমোক্রেসির মাধ্যমে গণতন্ত্রের স্বরূপ পরিবর্তন করতে, ইসলামিকরণ করতে; গোলাম আজম কিছুটা পিছু হটে চেয়েছিলেন ইসলাম ও গণতন্ত্রের সমন্বয় করতে। মওদূদীর চিন্তার দার্শনিক ভিত্তি থেকে শুরু করে গোলাম আজমের কৌশলগত সংশ্লেষ এবং শফিকুর রহমানের প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্য—সবই দলটির সময়-সংশ্লিষ্ট অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে ভবিষ্যতে এই দল আদর্শ ও গণতন্ত্রকে কীভাবে সামঞ্জস্য করবে, সেটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এরপর রাষ্ট্রের ধরণ সম্পর্কেও জামায়াতের অবস্থানগত বিবর্তন বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। মওলানা মওদূদীকে দেখা হয় ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার নবায়নকারী হিসেবে। তাঁর “খিলাফতে ইলাহিয়া” ধারণা ছিল একটি আল্লাহপ্রদত্ত সার্বভৌমত্বভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে আইন হবে শুধুমাত্র শরিয়াহভিত্তিক, এবং জনগণ হবে “খলিফা”— আল্লাহর প্রতিনিধি, কিন্তু সীমাবদ্ধ। সেখানে ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা থেকে ইসলামি রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের তাগিদ, পশ্চিমা সেক্যুলারিজম ও জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া, উম্মাহভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার আধুনিক রূপ এবং সর্ব ইসলামবাদী চেতনার মিশেল। অর্থাৎ মওদূদীর জন্য “গণতন্ত্র” ছিল উপাদান নয়, বরং শরিয়াহ দ্বারা সীমাবদ্ধ একটি আদর্শিক খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথ। এবং রাষ্ট্রটি অবশ্যই খেলাফতী রাষ্ট্র। গোলাম আজম মওদূদীর অনুসারী হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদর্শিক খিলাফতের কথা সরাসরি বলেননি। বরং তিনি “ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্র” শব্দটি ব্যবহার করতেন—একটি ব্যবহারিক পরিভাষা, যা একদিকে ইসলামি আদর্শের কথা রাখে, আবার অন্যদিকে আধুনিক ইসলামি সাথেও আপস করে। এর কারণ হতে পারে, বাংলাদেশের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে জামায়াতের টিকে থাকার প্রয়োজন; ইসলামি শব্দটির পাশাপাশি “কল্যাণ” রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো; বহুদলীয় রাজনীতিতে ইসলামি ইসলামি কৌশলগতভাবে উপস্থাপন ইত্যাদি। গোলাম আজম ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণাকে “জনসাধারণের সেবা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় কাঠামো”-র মাধ্যমে জনপ্রিয় করতে চেয়েছেন।

ইদানিং, ডা. শফিকুর রহমান, ডা. তাহের প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ বললেও সেখানে “ইসলামি” শব্দটিও বাদ দিয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে। এটি নিয়ে অন্য ইসলামি অঙ্গন তো বটেই, খোদ দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দ্বারাও তাঁরা সমালোচনার শিকার হয়েছেন। জামায়াত কী তাহলে তার আদর্শগত অবস্থান থেকে অফিসিয়ালি সরে দাঁড়িয়ে একটি উত্তর আদর্শবাদ (চড়ংঃ-রফবড়ষড়মু) সময়ের সূচনা করল? তবে আমি মনে করি, এটি এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক ও বাস্তববাদী ভাষা বিন্যাস, যেখানে ইসলামি রাজনীতির ভাষা নয়, বরং নাগরিক রাজনীতির ভাষা ব্যবহার করা হয়। কারণ জামায়াতের সামনে রয়েছে রাজনৈতিক নিষিদ্ধতা ও যুদ্ধাপরাধ বিচার-পরবর্তী বৈধতা সংকট উত্তরণ, ইসলামপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিরোধ নিরসন এবং আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মহলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল রপ্ত করার তাড়না। তরুণ প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় পরিভাষার তুলনায় সামাজিক ন্যায়বোধেরর ভাষা বেশি গ্রহণযোগ্য। এতে কানেক্টিভিটি বাড়ে। “কল্যাণরাষ্ট্র” শব্দের মাধ্যমে জামায়াত তাদের ইসলামি রাষ্ট্র দর্শনের “ংড়ভঃ াবৎংরড়হ” উপস্থাপন করে, যাতে রাষ্ট্রের ইসলামিক রূপ পরোক্ষ থাকে, সরাসরি নয়। কিন্তু এই রূপান্তর একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়: জামায়াত কি আদর্শের পরিবর্তে ভাষার বিবর্তন করেছে, নাকি ভাষার ভেতর দিয়ে আদর্শই পরিবর্তিত হয়েছে? একপক্ষ বলবে—এটি কৌশলগত কাব্যিকতা; অন্যপক্ষ বলবেন এটি আদর্শচ্যুতি। আসলে মওদূদীর শুদ্ধতাবাদ আজকের বাস্তবতায় টেকেনি, আর গোলাম আজমের কৌশলগত তর্জমা এখনও শোনায় পুরোনো। ডা. শফিকের ভাষা, “কল্যাণরাষ্ট্র”, যতটা সহজ, ততটাই নিরীহ। আর সেখানেই নিহিত রয়েছে ইসলামপন্থি রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট: ভাষার নিরাপত্তা বনাম আদর্শের স্বাতন্ত্র্য। জামায়াত যে ইউরো শাসিত ‘কল্যাণরাষ্ট্রের’ সাফাই গাইছে, সেটিও এখন পুরোনো কলের গান। কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা খোদ ইউরোপ, কানাডা কিংবা আমেরিকাতেও মুখ থুবড়ে পড়েছে। কল্যাণরাষ্ট্রের মৌলিক ধারণা হলো সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা। পাশ্চাত্য দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা বলতে বোঝায় প্রধানত রাষ্ট্র প্রদত্ত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, যার মধ্যে রয়েছে-বেকারত্ব বীমা, পেনশন পদ্ধতি, বিনামূল্যে অথবা ভর্তুকিতে চিকিৎসা প্রদান, বিকলাঙ্গদের আশ্রয় সেবা প্রদান ইত্যাদি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় জনগণের দেওয়া কর-রাজস্ব থেকে। চলতি সময়ে, অধিকাংশ সরকার এবং করদাতাদের কাছে পুরো পদ্ধতিটাই মোটের ওপর ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’। বহুমাত্রিক কর্মসূচিগুলো সামাল দিতে গিয়ে ব্যয়বহুল আমলাতন্ত্র ব্যাঙেরছাতার মতো গড়ে উঠেছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে মৌলিক অনেক চাহিদাই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। যেমন- যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সে করদাতাদের দেয়া বাসা ভাড়ার ভর্তুকি আবাসন সংকটের সামান্যই সমাধান করতে পারবে।

নেদারল্যান্ডসে বিকলাঙ্গতা পরিকল্প, বেকারেরা অপব্যবহার করে, তারা মিথ্যা দাবি করে এবং অনেক বেশি ফায়দা হাসিল করে। ফলে, সরকারকে এই ব্ল্যাকমেইল এবং সংশ্লিষ্ট কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আইন তৈরি করে প্রতিহত করতে হয়। অপরদিকে, সুইডেনে অসুস্থতা কল্যাণ ভাতা, চাকরিজীবীদের কর্মস্থলে সর্বোচ্চ অনুপস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে পশ্চিম জার্মানিতে এই সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা সরকারি চাকরিতে তরুণ কর্মীদের কর্মস্পৃহা ভয়ংকরভাবে অবনমিত করেছিল। অন্যদিকে, এই কল্যাণরাষ্ট্রটি বেশি বেশি দুর্বৃত্ত পয়দা করেছে এবং তাদের আর্থিক পলিসির ওপর বেশি বেশি চাপ তৈরি করেছে। সুইডেন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিয়নগুলো ইতোমধ্যে সরকার কর্তৃক এসব বিষম-বিপন্ন স্বাস্থ্য-বীমা সুবিধা এবং শিক্ষাখাতে ভর্তুকি কর্তনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। কিছু কিছু দেশ যেমন-বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডে সামাজিক ব্যয় সংকোচনের প্রচেষ্টা মন্ত্রিপরিষদে সংকটের সৃষ্টি সর্বোচ্চ। পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিক, ছাত্র, চিকিৎসক প্রভৃতি পেশার প্রতিবাদ তো আছেই, পশ্চিম ইউরোপে রাজস্ব সংকটের কারণে সামাজিক নিরাপত্তা পদ্ধতি এখন সংগ্রামে লিপ্ত অথবা ভয়ংকর পরিণতির সম্মুখীন।

ইতোমধ্যে গ্রন্থিবদ্ধ রশিকে কতটুকুই বা ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব? কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে? ইউরোপের মন্ত্রীরা সমস্যা সম্পর্কে সম্যক অবগত কিন্তু এখনও জনসাধারণকে সতর্ক করা শুরু করেনি। এই ধরনের অবাঞ্ছিত ও অপ্রিয় বার্তা জনগণকে পৌঁছে দিতে গড়িমসি করার কারণ সহজেই অনুমেয়, যদি দেয়ও তারও সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। এখানে আয়রনি হল, সামাজিক নিরাপত্তার বুলি ভোটারদের কাছে এখনও আসক্তির পর্যায়ে, অথচ সরকারের আর কিচ্ছুটি করার সক্ষমতা নেই। এখানে মজার বিষয় হলো পশ্চিম ইউরোপের নতুন প্রজন্মরা তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সুবিধাগুলো কড়ায় গন্ডায় উসুল করে এবং তারপর আরও বেশি দাবি করে। ১৯৫০ এর দশক থেকে ৬০ এর দশক পর্যন্ত দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আমলে যখন বর্ধিত অর্থনীতির জোগান দ্বারা কল্যাণমূলক কার্যক্রমগুলো গ্রহণ করা হয়, তখন বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায় ফলে সরকারকে চাহিদা পূরণে তেমন বেগ পেতে হয়নি (পশ্চিমে ধীরে ধীরে পদ্ধতিটি বিস্তার লাভ করেছে তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে উপনিবেশ থেকে সম্পদ লুণ্ঠন করে)। কিন্তু ঙঊঈউ এর সেক্রেটারি জেনারেল, এমিলি ভ্যান লিউনেপ বলেছেন, বিষয়টি আমাদের কাছে পুরো স্পষ্ট নয়, শিল্পোন্নত গণতন্ত্রের যুগে আমরা ১৯৬০ এর দশকের সফলতায় তখনকার মাথার কাছে নিজেদের মাথাগুলোকে নিক্ষেপ করছি। আমাদের জনসংখ্যার বর্ধিত চাহিদা মোতাবেক, বর্ধিত হারে দাতব্য বা কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে আমরা আমাদের অর্থনীতির ওপর অত্যাধিক, অতি-নিয়ন্ত্রিত এবং মোটেও লাভজনক নয় এমন বোঝা চাপিয়ে দিয়েছি।
এই কল্যাণমূলক পদ্ধতির দৈত্যাকার তহবিল জোগাড় করতে গিয়ে আমরা ইংল্যান্ডে টরি সরকার এবং বিরোধী লেবার পার্টির রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (মিসেস থ্যাচার) এই সামাজিক নিরাপত্তা পদ্ধতির অত্যাধিক বোঝার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছিলেন। পশ্চিম ইউরোপের বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে বাঁচাতে থ্যাচার ঝুঁকি, প্রণোদনা এবং পুরস্কারের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে ‘মহানিরীক্ষা’র প্রচলন করেছিলেন। তিনি জাতীয় অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির চাইতে উৎপাদনের ওপর জোর দিতে চেয়েছিলেন। থ্যাচার বিশ্বাস করতেন ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক দুর্দশা অতিরক্ষণশীল এবং সামাজিক সমানাধিকার মনোভাবের কারণে তৈরি। এই প্রবণতার কারণে এমন একটি পদ্ধতি দাঁড়িয়ে গেছে যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেকারত্বের কারণে প্রাপ্ত সুবিধা চাকরির চেয়েও অধিক। থ্যাচারের মতে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাজ কল্যাণ ও শিল্প খাতে সরকারি ভর্তুকি কমিয়ে দেয়া। থ্যাচারের প্রস্তাবনা বিরোধী লেবার পার্টির রোষানলে পড়ে।

ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে প্রবৃদ্ধির হার থমকে গেছে। বিনিয়োগের প্রান্তিক সক্ষমতা ক্রমাগত কম যাচ্ছে। এরকম শ্লথগতির প্রবৃদ্ধি কালে, সামাজিক সুবিধাসমূহ বিদ্যমান পর্যায়ে কেবল তখনই টেকসই হবে যদি অন্যান্য খাতে বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে আনা হয়। উদাহরণস্বরূপ, নেদারল্যান্ডে ১৯৮০ সালে কোন প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত ছিল না, কিন্তু বিদ্যমান সামাজিক ব্যয় বহাল রাখতে গিয়ে ১৯৮০ সালে বার্ষিক ব্যয় জিডিপির ২% বৃদ্ধি করতে হয়েছিল। তখন তাহলে কী করার ছিল? সরকার বেতন-ভাতা বন্ধ করে রেখেছিল ফলে তা অবরোধ-অচলাবস্থার সৃষ্টি করে, পরিণামে সামাজিক সংহতি বিনষ্ট হয়।
এই হলো পশ্চিমা কল্যাণরাষ্ট্রের নিয়তির বর্তমান পরিণতি। কিন্তু কী তা ঘটবে? এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ চিহ্নিত হয়েছে (পশ্চিম জার্মানি বাদে), তারা নিজেদের চলার মতো যথেষ্ট সম্পদ অর্জন করতে পারেনি। পশ্চিম জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, “আমরা প্রথমে আমাদের উৎপাদনের সক্ষমতা করেছিলাম, সামাজিক নিরাপত্তার ধাপ তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল”। তিনি আরও যোগ করেন, “স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো এবং ব্রিটিশরা চাইলে উলটো পথে যেতে পারে অথবা তাদের দায়বদ্ধতা পাশ কাটিয়ে যেতে পারে তাতে তাদের অর্থনীতি টেকসই হবে”। কল্যাণ ভঙ্গুর কল্যাণরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো-ব্যক্তিগতভাবে সম্পদশালী হওয়ার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সামাজিক পলিসির কারণে প্রশাসন যন্ত্রের ব্যাপকতা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে নিষ্পেষণমূলক কর আরোপ করে যে সমাজকে তারা মূলত সাহায্য করতে চেয়েছিল তা এখন হিংস্র হয়ে উঠেছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এন্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক র‌্যালফ বিশ্বাস করেন এটির পরিণতি চরম শোচনীয়। তিনি লিখেছেন, “সমাজকল্যাণ কার্যক্রমের প্রশাসন যন্ত্রের দিকে তাকালে ম্যা. ওয়েবারের ‘বদ্ধ লোহার খাঁচা’র দুঃস্বপ্ন হতো যাতে শীঘ্রই আধুনিক মানুষ নিজেকে খুঁজে পাবে, এটি আর কোন দূর ভবিষ্যতের হুমকি নয়। এমন দিন আসবে যেদিন ইতিহাসবিদেরা বিস্ময়ের সাথে লিখবে যে, সরকার জনগণের জীবনের প্রত্যেকটি দিক ভার্চুয়ালি পরিচালনা করবে যতক্ষণ তাদের ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের সীমা আবিষ্কৃত না হয়”।

পাশ্চাত্য কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য সুদূরবর্তী এবং এমনকি আশু হুমকি হল ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগণ। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলোর প্রভাব এখন দৃশ্যমান। গত দুই যুগে জন্মহারের নাটকীয় হ্রাসের ফলে, জনসংখ্যা সংকুচিত হয়ে গেছে এবং প্রতিবছর বিপুল পরিমাণে অবসরপ্রাপ্ত মানুষকে সহযোগিতা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (ওখঙ), জেনেভা এর তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল ফ্রান্সিস ব্লানচার্ড, এই সংকটের দিকটি লক্ষ্য করেন এবং তিনি মনে করেন এই বুড়িয়ে যাওয়া প্রক্রিয়ার কারণে জেনারেশন গ্যাপের বিস্ফোরণ ঘটবে। ধারণা করা হয়, ২০২০ সাল নাগাদ পশ্চিম ইউরোপীয়দের সক্রিয় শ্রমবলের প্রায় ৩৫% অবসরে যাবে যাদেরকে অবসরকালীন ভাতা দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা গে ও লিসবিয়ানিজম জনসমর্থন সংকোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের সর্বত্রই এখন নারী-পুরুষের এই প্রকৃতি বিরুদ্ধ সম্পর্ককে গৌরব পদযাত্রার সংগঠনগুলো পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ বিশেষত সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে জনপ্রিয় গণমাধ্যম ও বিনোদন তারকারা প্রায়ই উপস্থিত হয়। এই আন্দোলনের শ্রেণি প্রভাবের ব্যাপারটি কল্পনা করুন।
ইতোমধ্যে সুইডেনেও এই ধরনের ভবিষ্যতের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। প্রায় ২ মিলিয়ন সুইডিশ কর্মচারীকে ১.২ মিলিয়ন পেনশনারের ভার বহন করতে হবে। সুইডেনের রাজকীয় দীর্ঘমেয়াদি একটি চাকরি কমিশন রিপোর্ট করেছিল, ৮০ থেকে ৯০ দশকের তাদের যে জনসংখ্যা ছিল পরবর্তী দশকে তা দ্বিগুণ হয়ে যাবে এবং তারা তাদের শিশুদের ভরণপোষণে অক্ষম হয়ে পড়বে। এই কমিশনের সদস্য ভালো করেছিলেন একই বয়সে তাদের শিশুরাও অবসর গ্রহণ করবে। সামান্য পার্থক্য হলেও প্রায় সকল ইউরোপীয় দেশগুলো জনসংখ্যাগতভাবে একই সমস্যার মুখোমুখি হবে। সুতরাং, জামায়াত যে কল্যাণরাষ্ট্রের সাফাই গাইছে তা ঠিক কোন পলিসির ওপর ভিত্তি করে হবে? সেটি স্পষ্ট করতে হবে। কার্যকরী সংজ্ঞা (ড়ঢ়বৎধঃরড়হধষ ফবভরহরঃরড়হ) প্রদান করতে হবে। ইউরোপ বাহিত অচল মালকে চালিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখলে তা জামায়াতের জন্য দুঃস্বপ্নই হবে বৈকি! অতি সম্প্রতি, জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল, মিয়া গোলাম পরওয়ার ‘কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা.’ নামে একটি পুস্তিকা লিখেছেন। সেখানে তিনি কোরআন, হাদিস ও ইতিহাসের ভিত্তিতে ইসলামি রাষ্ট্রের সার্বজনীন ও সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। কিন্তু দেশ-কাল-ঐতিহ্য অর্থাৎ সমকালীন বিশ্বে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামি তা ক্রমধারা অনুসারে কতটুকু বাস্তবায়ন করা হবে, সেই সংক্রান্ত কোন রূপরেখা কিংবা বিস্তারিত আলাপ করেননি।
                                                                                                                                                                                                            লেখক: কবি ও চিন্তক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category