• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫০ পূর্বাহ্ন

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থার ভালো-মন্দ

জুবায়ের হাসান / ১০২ Time View
Update : সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল চাইছে বর্তমানে প্রচলিত ব্রিটিশ পদ্ধতির সংসদ নির্বাচন। যা সাবেক ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে গত ৯০ বছর যাবত অনুসৃত হয়ে আসছে। চলমান এ পদ্ধতিকে বলা হয় ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি)। এ পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী একাধিক প্রার্থীর মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট লাভ করেন তিনি হন চূড়ান্তভাবে বিজয়ী। এভাবে ৩০০টি আসনের প্রত্যেকটিতে যারা বিজয়ী হন তারাই সংসদে যান। আর তাদের মধ্যে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারীরা সরকার গঠন করেন। সংসদ নির্বাচনের এ পদ্ধতিকে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দল মানতে চাইছে না। এর পরিবর্তে তারা চাইছে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন। যাকে বলা হচ্ছে পিআর ( প্রপোরশনাল রিপ্রেজেনটেশন) পদ্ধতি। এই সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতিতে সারাদেশে আসনভিত্তিক কোনো প্রার্থী থাকে না। অর্থাৎ দেশকে নির্দিষ্ট কতগুলো নির্বাচনী আসনে বিভক্ত না করে পুরো দেশকেই একটি একক আসন গণ্য করা হয়। এতে ভোটাররা আসনভিত্তিক প্রার্থীকে ভোটদানের পরিবর্তে নিজ নিজ পছন্দের রাজনৈতিক দলের প্রতীকে ভোট দেন। অতঃপর ভোট গণনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সারাদেশে যে দল মোট যত শতাংশ ভোট লাভ করে সেই অনুপাতে ওই রাজনৈতিক দলগুলোর আসন নির্ধারিত হয়। যেমন কোনো দল সারাদেশে মোট ১০ শতাংশ ভোট লাভ করলে ৩০০ টি আসনের মধ্যে সে দল ৩০ টি আসন লাভ করবে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশনে প্রার্থী তালিকা জমা দিয়ে তা প্রকাশ করলে সে পদ্ধতিকে বলা হয় মুক্ত পদ্ধতি। আর প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করলে তাকে বলা হয় বদ্ধ পদ্ধতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই মুক্ত কিংবা বদ্ধ উভয় পদ্ধতির সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। সুতরাং এই সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন কোনো অভিনব নির্বাচন পদ্ধতি নয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত এফপিটিপি পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন ধরা যাক, বর্তমান পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি আসনে চারটি দল থেকে মোট চারজন প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়ালেন। সেই নির্বাচনে ভোট পড়লো ৯০ শতাংশ। এর মধ্যে তিনটি দলের তিনজন প্রার্থী যথাক্রমে ১৫, ২০ ও ২৫ শতাংশ হারে মোট ৬০ শতাংশ ভোট পেলেন। অপরদিকে চতুর্থ দলের প্রার্থী একা পেলেন ৩০ শতাংশ ভোট। বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী এই চতুর্থ প্রার্থীই ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসাবে বিজয়ী হবেন। ফলে বাকি তিনটি দলের প্রাপ্ত মোট ৬০ শতাংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট কোনো কাজেই আসলো না। এভাবে যদি সারাদেশে ৩০০টি আসনেই একই হারে ভোট পেয়ে ওই চতুর্থ দলটির প্রার্থীরা জয়লাভ করেন তাহলে মাত্র ৩০ শতাংশ ভোট নিয়েই তারা সরকার গঠন করবে এবং সংসদে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। অথচ বাকি তিনটি দল ৬০ শতাংশ ভোট পাওয়ার পরও সংসদে তাদের কোনো প্রতিনিধি থাকলো না। ফলে জাতীয় সংসদে প্রকৃত অর্থে সবার প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ থাকলো না এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত উপেক্ষিত হলো।

সুতরাং প্রচলিত এ ব্যবস্থায় প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্ব প্রতিফলিত না হওয়ায় তা কার্যত এক দলীয় স্বৈরতন্ত্রকে উসকে দেয়। বাংলাদেশের বিগত ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পরও সেই সরকারের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবর্তে একনায়কতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। যে দলই ক্ষমতায় এসেছে তারা নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে। আর বিরোধীদল ও ভিন্নমতের কণ্ঠকে দমন করবার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে সীমাহীনভাবে ব্যবহার করেছে। এসবেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

বর্তমানে প্রচলিত এফপিটিপি পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থায় ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০ টি আসন লাভ করে। অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ আসন আওয়ামী লীগ একাই লাভ করে। এ থেকেই আওয়ামী লীগ সংবিধান তছনছ করে গণতন্ত্র ও সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়। অথচ আওয়ামী লীগ ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছিল। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলো। যাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলা চলে না। কেননা ৫২ শতাংশ ভোটার আওয়ামী লীগের বাইরে ভোট দিয়েছিল। বস্তুত প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসন লাভের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেবলমাত্র তাকেই বলা যায় যেখানে ১০০ জন ভোটারের মধ্যে অন্তত ৫১ জন ভোটারের সমর্থন কারো পক্ষে থাকবে। এদিকে ২০০৮ সালের ওই নির্বাচন বিএনপিকে ভীষণ বেকায়দায় ফেলে দেয়। বিএনপি মাত্র ৩০ টি আসন লাভ করে। অথচ তারা প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন লাভ করেছিল। যদি সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকতো তাহলে বিএনপি আনুপাতিক হারে ১০০ টির কাছাকাছি আসন পেতে পারতো। এছাড়া অন্যান্য ছোট দলগুলোও আনুপাতিক হারে আসন লাভ করতো। ফলে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে পারতো না। কেননা ৪৮ শতাংশ ভোটের বিপরীতে আনুপাতিক হারে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা হতে পারতো প্রায় ১৪৮ টি। যা সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ আসনের চেয়ে যথেষ্ট কম সংখ্যা। এমনকি আওয়ামী লীগের পক্ষে এককভাবে সরকার গঠন করাই সম্ভব হতো না, অন্য দলের সমর্থনের প্রয়োজন হতো।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ টি আসন পেয়েছিল এবং সারাদেশে প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ ছিল প্রায় ৪১%। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৬২ টি আসন এবং প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ ছিল প্রায় ৪০%। ওই নির্বাচনে যদি আনুপাতিক হারে আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হতো তাহলে বিএনপি ১২৩ এবং আওয়ামী লীগ ১২০ টি করে আসন লাভ করতো।

উল্লেখ্য, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পরের বিরুদ্ধে সমমনাদের নিয়ে জোট-মহাজোট গঠন করেছিল। একদিকে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামীসহ ডানপন্থি ও ইসলামি ভাবধারার দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠিত হয়েছিলো। অপরদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিসহ বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার দলগুলোকে নিয়ে মহাজোট গঠিত হয়েছিল। ফলে বিএনপি’র ধানের শীষে বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য সমমনাদের ভোট জমা হয়েছিলো। তেমনিভাবে আওয়ামী লীগের নৌকায় তার সমমানাদের ভোট জমা হয়েছিলো। এ কারণে ওই দুই নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নিজ নিজ মোট প্রাপ্ত ভোটের শতাংশকে একক আদর্শ (ইউনিক স্ট্যান্ডার্ড) হিসাবে গণ্য করা চলে না। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোট প্রাপ্তির হারকে একক আদর্শ হিসাবে ধরতে হলে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনকে বিবেচনায় রাখতে হবে। কেননা ওই দুই নির্বাচন জোট-মহাজোটের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রত্যেক রাজনৈতিক দল আলাদা আলাদা নির্বাচন করেছিল।

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসাবে গণ্য করা হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন লাভ করে। কিন্তু ভোট লাভ করে মাত্র ৩১ শতাংশ (প্রায়)। অপরদিকে আওয়ামী লীগ আসন লাভ করে ৮৮ টি এবং ভোট প্রাপ্তির হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। ওই নির্বাচনে যদি আনুপাতিক হারে আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হতো তাহলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যথাক্রমে ৯৩ ও ৯০ টি করে আসন লাভ করতো। এভাবে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১১৬ টি এবং আওয়ামী লীগ ১৪৬ টি আসন লাভ করে। কিন্তু ভোট প্রাপ্তির শতাংশ হারে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ৩৩.৬% এবং ৩৭.৪%। যদি আনুপাতিক হারে আসন নির্ধারণ করা হতো তাহলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা হতো যথাক্রমে ১০১ ও ১১২ টি।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালে। তাই ১৯৯১ কিংবা ১৯৯৬ সালের ভোট প্রাপ্তির শতাংশের হিসাবকেও একক আদর্শ হিসেবে গণ্য করা চলে না। কেননা এই দীর্ঘ সময়ে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা হয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাছাড়া ২০০৮ সালের পর থেকে বিগত ১৭ বছর ভোটের মাধ্যমে কোনো জনমত প্রতিফলিত হতে পারেনি। এমনকি ২০০৮ সালের পর থেকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট কেন্দ্রেই যাননি। অধিকাংশ ভোটারের কাছে আগামী ২০২৬ সালের নির্বাচন হতে যাচ্ছে জীবনের প্রথম ভোট প্রদানের উপলক্ষ্য। ভোটারদের মনোজগতের ওপর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দুঃসহ স্মৃতি এবং ৫ আগস্টের বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের প্রভাব দৃঢ়ভাবে কাজ করবে। তাই ৩০-৩৫ বছর আগেকার ভোট প্রাপ্তির শতাংশের হিসাবনিকাশ ও সমীকরণ আসন্ন নির্বাচনে খুব সামান্যই প্রতিফলিত হবে। সুতরাং এটা ভাববার কোনো কারণ নেই যে ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো অতীতের ভোট প্রাপ্তির শতাংশের ধারা অনুযায়ীই ভোট লাভ করতে পারবে।

এফপিটিপি পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থায় আসনভিত্তিক সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করার ফলে অনেক ছোট ছোট দল সারাদেশে মোট ৫, ১০ কিংবা ১৫ শতাংশ ভোট লাভ করলেও সংসদে তাদের প্রতিনিধি থাকে না। এমনকি ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য থাকলেও অনেক দল সংসদে একটি আসনও পায় না। তাই এফপিটিপি পদ্ধতির এই নির্বাচনী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করতেই অনেকে সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতির নির্বাচনকে বিকল্প সমাধান হিসাবে মনে করে থাকেন। কেননা এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে সব মানুষের সব দলের প্রতিনিধি থাকতে পারে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে সব ভোটারদের মতামতের প্রতিফলন ঘটে। ভোটারদের প্রদত্ত প্রত্যেকটি ভোট কাজে লাগে এবং প্রতিটি ভোট সংসদে সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। ন্যূনতম ভোট পেলেও সংসদে সব রাজনৈতিক দলেরই প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ থাকে। এ কারণে অনেকে মনে করেন, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করবে এবং সুশাসন নিশ্চিতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার বিষয়ে যদি একমত হয় তবে এটি হতে পারে সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি।

সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থার আরো কিছু ভালো দিক রয়েছে। যেমন এ পদ্ধতিতে নির্বাচনী সহিংসতা হ্রাস পেতে পারে এবং নির্বাচনী পরিবেশ অধিকতর শান্তিপূর্ণ হতে পারে। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার মনোবেদনা ও প্রতিহিংসা কাউকে গ্রাস করবে না। এলাকায় হানাহানি-রেষারেষি ও কোনো সংসদ সদস্যের ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ থাকবে না। তেমনি জাতীয় পর্যায়ে কোনো দলের স্বৈরাচারী সরকার হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও কমে যাবে। নির্বাচন উপলক্ষ্যে নিজ এলাকায় সন্ত্রাস ও কালো টাকার ব্যবহার কমে আসবে। ভোট কারচুপির সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করার সুযোগ কমে আসবে এবং তাদেরকে অর্থ দিয়ে প্রভাবিত করার সম্ভাবনাও কমে যাবে। সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট এলাকা না থাকায় তারা তাদের মূল কাজ সংসদে আইন প্রণয়নে মনোযোগী হতে পারবেন। এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মাস্তানি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদিতে প্রশ্রয় দানে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। প্রত্যেক সাংসদের কাজের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিষয়াবলিতে। এলাকার কিংবা আঞ্চলিকতার সস্তা রাজনীতির জায়গা থাকবে না। এছাড়া এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, নিজ দলের মধ্যে উপদলীয় কোন্দল এবং টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন প্রতিযোগিতারও অবসান হবে। রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের প্রাধান্য হ্রাস পাবে। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বিপরীতে যোগ্যতম নেতৃত্বের চর্চা ও গুরুত্ব বাড়বে। সংসদে কোনো বিল পাশ করতে হলে অন্যান্য দলের অংশগ্রহণ ও মতামত গুরুত্ব পাবে। গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ড বাধার সম্মুখীন হবে। জাতীয় স্বার্থে ঐক্যমত্যের পরিবেশ তৈরি হবে। এভাবে জবাবদিহিমূলক সংসদ প্রতিষ্ঠা পাবে। এ ব্যবস্থায় বড় দলগুলোর বাইরেও অনেক ছোট ও বিকাশমান দল রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। এতে গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় হবে এবং রাজনীতিতে প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা হতে পারবে। রাজনৈতিক দলগুলো অধিকতর সৎ, শিক্ষিত, দক্ষ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সংসদে পাঠানোর বিষয়ে মনোযোগী হবে। এতে সংসদের মান, পরিবেশ ও কার্যক্রম উন্নত হবে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থায় একাধিক আসনে একই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকবে না। এছাড়া কোনো সংসদ সদস্যের মৃত্যু কিংবা পদত্যাগের কারণে উপনির্বাচনেরও প্রয়োজন পড়বে না। নারীদের সংরক্ষিত আসনের জন্যও আলাদা নির্বাচনের প্রয়োজন হবে না।

এদেশে আগে কখনও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু শুধুমাত্র এই যুক্তিতেই একে বাতিল করে দেয়া যায় না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে এর উপযোগিতা বিশ্লেষণ করে। নতুন এই নির্বাচনী ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে বড় দলগুলো স্বভাবতই আপত্তি জানাবে। আর ছোট দলগুলো এতে সমর্থন করবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পক্ষ-বিপক্ষের সুবিধাবাদী আচরণ কাম্য নয়। কেননা আজ যে বড় দল আগামীতে সে ছোট দলে পরিণত হতে পারে। আবার বর্তমানে যে ছোট দল ভবিষ্যতে সেও বড় দলে পরিণত হতে পারে। সুতরাং সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থা বড় কিংবা ছোট দলের ঝগড়াঝাঁটির বিষয় নয়, বরং তা জাতীয় স্বার্থ ও গণতন্ত্রের বিষয়। বিশেষ করে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়ে কোনো বড় দলের ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কেননা কেউ যদি সত্যিই বড় দল হয়ে থাকে তাহলে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সে-ই সবচেয়ে বেশি শতাংশ ভোট পাবে এবং সে অনুপাতে আসনও বেশি পাবে।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থার বিপক্ষে যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে এতে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট বা দুর্বল সরকার গঠিত হতে পারে। কিন্তু এ যুক্তি যথাযথ নয়। কেননা প্রচলিত এফপিটিপি পদ্ধতির নির্বাচনেও ঝুলন্ত পার্লামেন্ট কিংবা কোয়ালিশন সরকার গঠিত হতে পারে। যেমন ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি। ফলে বিজয়ী দলকে অন্য আরেকটি দলের সমর্থনে সরকার গঠন করতে হয়েছিল।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রকৃত মন্দ দিক হলো, ভোটাররা তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন না। যোগ্য জনপ্রতিনিধির অভাবে এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো অনুচ্চারিত থেকে যেতে পারে। এছাড়া প্রত্যেকটি সংসদীয় আসনে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা থাকে সেটিরও অবসান হয়। এতে করে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যেতে পারে। অপরদিকে দল কেন্দ্রীয়ভাবে মনোনয়ন দান করায় দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব এবং মনোনয়ন বাণিজ্য আরও প্রকট হতে পারে। এছাড়া নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর সস্তা সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে কিংবা সংখ্যালঘু কার্ড প্রয়োগ করে কোনো রাজনৈতিক দল হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে উদ্যত হতে পারে। যা দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। উপরন্তু দেশের গণতন্ত্রের শত্রু কোনো পরাজিত শক্তি সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী ভাবধারার কোনো রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটতে পারে। অবশ্য বর্তমানে প্রচলিত এফপিটিপি পদ্ধতির নির্বাচনের মাধ্যমেও আওয়ামী ভাবধারা সম্বলিত দলের উত্থান ঘটতে পারে। তবে আশা করা যায়, নতুন প্রজন্মের কাছে আওয়ামী লীগের কোনো আবেদনই নেই। কেননা সে নবপ্রজন্মের দ্বারাই উৎখাত হয়েছে। তাই আগামীতে আওয়ামী ভাবধারার কোনো রাজনৈতিক দলের ভোট প্রাপ্তির হার নিশ্চিতভাবেই ভীষণ নিচে নেমে যাবে। কিন্তু তারপরও আওয়ামী পুনরুত্থানের উদ্বেগকে আমলে নিতে হবে। অতএব সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির এ মন্দ দিকগুলো থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায় সেটা নিয়েও যথেষ্ট ভাবতে হবে। আসলে এফপিটিপি কিংবা পিআর উভয় ধরনের নির্বাচনী পদ্ধতিতেই যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বস্তুত ১৯৯১ সাল থেকে চালু হওয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য সুখকর হয়নি। এই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, এদেশের জন্য সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা অধিকতর উপযোগী। এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিকভাবে একই জাতীয় (হোমোজেনাস) বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। তাই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা এদেশের জন্য অধিক কার্যকর, স্থিতিশীল ও কল্যাণকর।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন ইস্যুতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে একে অপরের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে রয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের কয়েক দফা গোলটেবিল বৈঠকেও তারা একমত হতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে মাঠে ময়দানে বক্তৃতা করছেন। আগামী দিনগুলোতে এ অবস্থার অবনতি ঘটে তা রাস্তার রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ লাভ করতে পারে। ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে দেশের রাজনীতিতে চরম সংঘাত ঘটেছিল। সেসময় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রচণ্ড বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলের দাবি মেনে নেয়। কিন্তু ততক্ষণে দেশ,জাতি ও রাজনীতির ভীষণ ক্ষতি হয়। তাই পুনরায় আরেকটি সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য প্রয়োজনে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো গণভোটের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। কোনো বড় দল যদি তাদের বিপুল জনসমর্থনের প্রতি আস্থাশীল থাকে তাহলে তারা যে-সব বিষয় চাইছে তা গণরায়ের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত থাকা উচিত। গণভোটের ফলাফলের প্রতি কারো কোনো আপত্তি থাকবে না। সাংবিধানিক প্রশ্নে আমাদের দেশে সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। ওই গণভোটের মাধ্যমেই বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে বর্তমানের ব্রিটিশ পদ্ধতির সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিলো।

                                                                                                                                                                                                লেখক:  রাজনৈতিক বিশ্লেষক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category