• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৬ পূর্বাহ্ন

জুলাই বিপ্লবের মহীমা ও আগামীর বাংলাদেশ

অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল আজিজ / ১৪১ Time View
Update : সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ভূমিকা

এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে জুলাই বিপ্লব ২০২৪ কে জাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল এবং জাতিস্বত্তার নবজাগরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সূচিত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সাল অবধি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং ভারত বিভাগ তথা স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠন, ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবকে জাতির আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রগঠনের নবতর অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের অভিনবত্ব, বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য অনুধাবনের লক্ষ্যে ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, চীনা বিপ্লব, ইরানি বিপ্লব এবং কিউবান বিপ্লবের সাথে জুলাই বিপ্লবের তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। প্রবন্ধটি তিনটি প্রধান অধ্যায়ে বিন্যস্ত; প্রথম অধ্যায়ে ১৭৫৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ ভূখণ্ডে সংঘটিত প্রধান ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। এতে উপস্থাপিত হয়েছে যে, জুলাই বিপ্লবের সূচনা ছিল অভিনব, সুসংগঠিত, সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে পরিচালিত, আত্মজাগরণমূলক ও বিদেশী শক্তি এবং তাদের দালাল শ্রেণির বিরুদ্ধে জনগণের মহাবিস্ফোরণ বা অভুত্থান। এ অভূত্থান শুধুমাত্র কোন শাসক শ্রেণির পালাবদল নয় বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মান এবং এদেশের নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক, ভূরাজনৈতিক ও জাতিস্বত্তাগত শক্তিমত্তা চিহ্নিত করা হয়েছে। তৃতীয় অংশে বাংলাদেশকে বিপ্লব পরবর্তি একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, উদীয়মান জাতিরাষ্ট্রে রুপান্তর করার লক্ষ্যে মানবসম্পদসহ যেসব সম্ভাবনা রয়েছে সেদিকে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রবন্ধকার জুলাই বিপ্লবকে ভেতর থেকে দেখার অভিজ্ঞতার সাথে সংশ্লিষ্ট গবেষণা, প্রবন্ধ, সংবাদ বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন দ্বিতীয়ক উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্তের সমন্বয়ে এই প্রবন্ধ রচনা ও সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছেন।

প্রথম অধ্যায় 

একঃ ১৭৫৭ থেকে ২০২৪: স্বাধীনতার জন্য অব্যাহত লড়াই

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। শুরু হয় উপমহাদেশে উপনিবেশিক শাসন। সমৃদ্ধ সুবাহ বাংলা পরিণত হয় দুর্ভিক্ষপীড়িত ও পশ্চাৎপদ অঞ্চলে। ১৯০ বছরের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই-সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ভারত বিভক্ত হয়ে গঠিত হয় স্বাধীন পাকিস্তান। স্বাধীন পাকিস্তানের অংশ হিসসেবে এঅঞ্চলের (পূর্ব পাকিস্তানের) জনগণও পায় রাজনৈতিক মুক্তির স্বাদ, যা কেবল ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি নয়, বরং জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও নাগরিকত্বের স্বীকৃতি অর্জনের সূচনা। এ স্বাধীনতাই ছিল ভবিষ্যৎ জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রথম ধাপ।

পাকিস্তান রাষ্ট্র শুরুর পরপরই শাসকদের অদূরদর্শিতা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের অবমূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক বৈষম্য পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রভাষা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নামে এক বিভ্রান্তিকর উপ-জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি রাজনৈতিক সংঘাতকে তীব্র করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ্যতম অর্জন স্বাধীনতা লাভ করে।

স্বাধীনতা অর্জন এ জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ্যতম অর্জন হলেও, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের জনগণ কাক্সিক্ষত অধিকার ও মর্যাদা থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত হতে থাকে। ভারত কৌশলে স্বাধীনতা যুদ্ধে বন্ধুত্বের আড়ালে বাংলাদেশকে রুপান্তর করতে থাকে তার এতটি করদরাজ্যে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সকল মহীমা কৌশলে আত্বসাৎ করে এ যুদ্ধকে অভিহীত করে ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে। শুরু হয় নব্য উপনিবেশ ‘ভারতীয় অধিপত্যবাদ’।  বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা তাই ১৯৭১ পরবর্তি বাংলাদেশকে ‘বেহাত বিপ্লব’ আখ্যা দেন। সংবিধানে ভারতীয় ধারার চার মূলনীতি সংযোজন, গনতন্ত্রকে হত্যা করে প্রবর্তন করা হয় বাকশালী শাসন ফলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অপমৃত্যু ঘটে। দুর্ভিক্ষ ও অরাজকতার পটভূমিতে ১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুত্থানে একদলীয় আওয়ামী বাকশালী শাসনের অবসান ঘটে এবং তৎপরবর্তি ঘটনাপ্রবাহে ১৯৭৮ সাল হতে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির যাত্রা সূচিত হয়। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনে গণতন্ত্র আবারও বিপন্ন হয়, যা ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু ২০০৭ সালে সেনা-পৃষ্ঠপোষিত এক-এগারোর শাসন ও ২০০৯ সালে পাতানো ও পরিকল্পিত ফলাফলের নির্ববাচনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ পুনরায় গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ কওে ফেলে। শুরু হয় দমন-পীড়ন, গুম, দুর্নীতি, ভোটাধিকার হরণ এবং অর্থ পাচার। এসবের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের রূপ লাভ করে। সকল প্রকার মানবিক অধিকার নির্বাসিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, যাকে অভিহীত করা হয় নানাভাবে- ‘জুলাই গণঅভূত্থান’, ‘জুলাই বিপ্লব’, যা প্রকৃতপক্ষে শুধুমাত্র  ক্ষমতাসীনদের পতনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিপূর্ণ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নতুন অভ্যুদয়ের সম্ভাবনা। নিচের সারণীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন অধ্যায় ও প্রধান প্রধান ঘটনাবলী তুলে ধরা হলো।

সারণী-১: ১৭৫৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের প্রধান প্রধান অধ্যায় ও ঘটনাবলি

১৯৪৭ ব্রিটিশ উপনিবেশের অবসান এবং ভারত বিভাগ পাকিস্তান’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যূদয়:

১৯৭১ বাাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পাকিস্তানের বিভক্তি স্বাধীনতা অর্জন ও বাংলাদেশ নামে নতুন জাতিরাষ্ট্রের অভ্যূদয়। ১৯৯০ জেনারেল এরশাদেও স্বৈরশাসন বিরোধী গণ-অভ্যুত্থান স্বৈরশাসনের অবসান এবং গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা। ২০২৪ জুলাই গণঅভুত্থান তথা জুলাই বিপ্লব ২০২৪ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের অবসান, বৈষম্যহীন সাম্য ও মানবিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ  বিনির্মানের নতুন অভিযাত্রা।

দুই-‘গণঅভ্যুত্থান’ বনাম ‘বিপ্লব’!

জুলাই বিপ্লব ২০২৪ এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অভিহীত করা হয়েছে নানাভাবে;  প্রধানত দুটি অভিধায়- ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ এবং ‘জুলাই বিপ্লব। এ অভিধা নিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মতদ্বৈধতা। গণঅভ্যুত্থান হিসেবে অভিহীত করার যুক্তি হচ্ছে একটি দুঃসহ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং ব্যাপকভিত্তিক রাজনৈতিক পালাবদল। ক্ষমতার পালাবদলের দ্রুততা, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের উপেক্ষা, সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকার অস্পষ্টতা এবং আন্দোলনকারী তথা জনগণের ক্ষমতা সর্বময় হয়ে উঠার অভিনব প্রকাশ। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতৃবৃন্দসহ আন্দোলনের পরিপূরক রাজনৈতিক শক্তিগুলো এটিকে একটি ’বিপ্লব’ তথা ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর সূচনা’ হিসেবে দেখতে আগ্রহী। স্বয়ং গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার প্রধান ড. মোহাম্মদ ইউনুস এটিকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ ‘দ্বিতীয়  স্বাধীনতা’ প্রভৃতি অভিধায় প্রকাশ করেছেন। ৫ আগষ্ট ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান হতে অদ্যাবধি বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে বিগত ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে এক নতুন ও অভিনব শাসনব্যবস্থার মধ্য দিয়ে, যার প্রধান চালিকাশক্তি নাগরিক বন্দোবস্ত এবং ঐকমত্য। এ শাসনব্যবস্থা না পরিপূর্ন সাংবিধানিক না পরিপূর্ণ বৈপ্লবিক। গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের সকল রাজনৈতিক পক্ষের ঐক্যের ভিত্তিতে চলমান রয়েছে ব্যাপকভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার কার্যক্রম। সেইসাথে দাবী উচ্চকিত রয়েছে জুলাই বিপ্লবের একটি ঘোষনাপত্রের ।

এ প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ বনাম ‘জুলাই বিপ্লব’ এর উপর একটি তাত্বিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন । ৫ আগষ্ট তারিখের শাসনতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রকাঠামোর পালাবদলের ঘটনাকে ‘অভ্যুত্থান’ বা ‘আংশিক বিপ্লব বিগত প্রায় এক বছরের পরিক্রমায় এটি রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার গভীরতার দিকে যাত্রা শুরু করেছে, যা কেবল ক্ষমতা বদলের ‘কুপ বা অভ্যুত্থান’ নির্ভর ঘটনা নয়; বরং গণঅভ্যুত্থান সহায়ক একটি বিপ্লবের অভিযাত্রা হিসেবে গণ্য। তবে সূচিত বিপ্লবের সফলতা নির্ভর করবে সংস্কার উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্পন্নের ওপর। জুলাই ২০২৪ সেখানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। সব মিলিয়ে এটিকে জনগণ সমর্থিত ব্যবস্থাগত বিপ্লবের প্রথম অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা যায়। অর্থাৎ চরিত্রের বিচারে এটি ‘বিপ্লবের সূচনা’, যদি সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচন যথাযথভাবে সম্পন্ন করে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা যায়। সামগ্রিকভাবে বলা যায় যে, জুলাই ২০২৪-এর পরিবর্তন তাৎক্ষনিকভাবে ‘একটি অভ্যুত্থান’ হলেও এর মধ্যে বিপ্লবের বীজ নিহীত রয়েছে। কারণ এতে জনগণের সামগ্রিক শক্তির কাছে রাষ্ট্রের কাঠামো অকার্যকর হয়েছে, রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পতন ঘটেছে। এজন্য অভ্যুত্থান দিয়ে শুরু হলেও একে ‘বিপ্লবের রূপান্তরমূলক ধাপ’ হিসেবে দেখাই যৌক্তিক। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন নেতৃত্ব কতটা গণমুখী, অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে পারে-সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এটি সত্যিকারের বিপ্লব কিনা। নিচের সারণীতে গনঅভ্যুত্থানের বৈশিষ্টগত সীমাবদ্ধতা এবং বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য পাশাপাশি তুলে ধরা হলো।

সারণী-০২ গণঅভুত্থান বনাম বিপ্লব: একটি তাত্বিক বিশ্লেষণ

বৈশিষ্ট্য গণঅভ্যুত্থান বিপ্লব

সংজ্ঞা: হঠাৎ ও দ্রত পন্থায় (কোন কোন সময় সহিংস পন্থায়)  রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল প্রক্রিয়া, যা সাধারণত সেনা/নিরাপত্তা বাহিনী বা অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী দ্বারা সংঘটিত হয়।বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংঘটিত হয় অংশগ্রহণকারী সাধারনত অভিজাত গোষ্ঠী বা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অংশ বৃহৎ জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল, শ্রমিক, ছাত্র, নাগরিক সহিংসতা সীমিত পরিসরে সহিংসতা এবং নির্দিষ্ট টার্গেটভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগ্রাম/ প্রতিরোধমূলক আন্দোলন

লক্ষ্য: কেবল ক্ষমতা দখল বা ক্ষমতার পরিবর্তনরাষ্ট্র কাঠামোর ব্যাপক ও মৌলিক পরিবর্তন, সামাজিক পুনঃগঠনের অঙ্গিকার, প্রেরণা ক্ষমতার পুনঃবণ্টন বা নিরাপত্তা স্বার্থ আদর্শ, জনগণের সামগ্রিক চাহিদা, ন্যায্যতা, মানবিক অধিকার

তিন- ‘বিপ্লব’ এর সাফল্য পরিমাপক সূচক

রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে ‘বিপ্লব’ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়, যা বিপ্লবের প্রকৃতি, এবং সফলতার মাত্রা নির্ধারণে সহায়ক। জার্মান-আমেরিকান দার্শনিক হান্না আরেন্ডট তাঁর আলোচিত গ্রন্থে (১৯৬৩)-এ বিপ্লবকে কেবল ক্ষমতা দখলের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং নাগরিক স্বাধীনতা, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সূচনা ও সামাজিক চুক্তির পুনর্গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, একটি বিপ্লব তখনই প্রকৃত অর্থে বিপ্লব হয়ে ওঠে, যখন তা মুক্তির পথ পেরিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের নতুন প্রক্রিয়া শুরু করে। অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন তাঁর গ্রন্থে বিপ্লবকে একটি ব্যবস্থাগত রুপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে সামাজিক কাঠামো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠিত শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতি নতুনভাবে গঠিত হয়। তাঁর মতে বিপ্লবের প্রকৃত চেহারা নির্ধারণ হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা ও তার পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। এই দুটি প্রভাবশালী তত্ত¦ বিশ্লেষণ করে বিপ্লবের সফলতা নির্ধারণে পাঁচটি পরিমাপক সূচক নির্ধারণ এবং সে আলোকে জুলাই বিপ্লবের তাৎপর্য, সাফল্য ও যুক্তিকতা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ পরিমাপকগুলো হচ্ছে- জনগণের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাত্রা, শাসকগোষ্ঠীর পতনমাত্রা ও প্রকৃতি, নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত রুপান্তর এবং নতুন আদর্শিক ও নৈতিক রাজনৈতিক চুক্তির প্রবর্তন বা প্রচেষ্টা।

উপরোক্ত সূচকগুলোর ভিত্তিতে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ বিপ্লবে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক, আত্মপ্রাণ ও নেতৃত্ব-নির্ভরশীলতার উর্ধ্বে। শাসকগোষ্ঠীর আকস্মিক পতন এবং নির্বাচনপদ্ধতির সংকট, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থার প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা-সব মিলিয়ে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি জন-অসন্তোষ অভূতপূর্ব রূপ নেয়। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় হলো নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে এক ধরনের ‘নন-কুপিস্ট’ বিপ্লবের সূচনা ঘটিয়েছে, যা সমকালীন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তন নয়, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে একটি নতুন আদর্শিক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথ তৈরি হয়েছে, যা জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি রচনা করতে পারে। অর্থাৎ এটি একটি রুপকল্পভিত্তিক বিপ্লব যেখানে একটি নায্যতা ভিত্তিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাংখ্যার তীব্রতা বিদ্যমান, রাজপথে অগনন বিদারী স্লোগানে ভরপুর তরুনদের গণআকাংখা। এসব পর্যালোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, জুলাই বিপ্লব ২০২৪ রাজনৈতিক পালাবদলের পাশাপাশি একটি বৃহৎ সামাজিক রুপান্তর ও কাঠামোগত সম্ভাবনা পথে অভিযাত্রা, যা একটি সফল বিপ্লবে পরিনত হতে পারে। নিচের সারণীতে জুলাই বিপ্লবের সফলতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সারণী-০৩: সাফল্য পরিমাপক সূচকের আলোকে জুলাই বিপ্লব

সফলতার সূচক ঘটনাপ্রবাহ ও তথ্য সফলতার মূল্যায়ন

গণঅংশগ্রহণ লক্ষ লক্ষ ছাত্র জনতা ৩৬ দিনের লাগাতার আন্দোলনে অংশগ্রহন, দেড় সহস্রাধিক প্রাণহানি, ত্রিশ সহস্রাধিক অংগহানি। দাবানলের মতো দেশের প্রতিটি প্রান্তে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় বিদ্যমান। শাসক গোষ্ঠীর বৈধতা ও পতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট সদলবলে পদত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করেন, যা এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অভূতপূর্ব। সরকার ব্যবস্থার পুরোপুরি অবসান ঘটে। রাষ্ট্রের কোন অংগ কার্যকর ছিলনা। বিপ্লবের কার্যকারণ এখানে দৃশ্যমান। পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় বিদ্যমান

নিরাপত্তা/ সেনাবাহিনীর ভূমিকা সেনাবাহিনী গুলি না চালিয়ে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানে থাকতে বাধ্য হয়, ক্ষমতা গ্রহনও অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরবর্তি ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর ভূমিকায় দ্বৈত্যতা লক্ষ্য করা যায়। আধা সামরিক বাহিনীগুলো ছিল নিস্ক্রিয়, অকার্যকর ও আত্বরক্ষায় ব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন নিরাপত্তা বাহিনী অবস্থানের পরিবর্তন ও নিস্ক্রিয়তা  প্রাতিষ্ঠানিক রুপান্তর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস এর নেতৃত্বে অন্তর্বতী সরকার গঠন; রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমূহের মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ চলমান পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় বিদ্যমান কাঠামোগত সংস্কার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বৈপ্লবিক আকাংখা ও সংস্কারের জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা দৃশ্যমান পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় বিদ্যমান

চার- জুলাই বিপ্লবের মহিমা!

১৯৪৭ এর পাকিস্তান রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা, ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং ১৯৯০’র স্বৈরাচারবিরোধীআন্দোলন – এই চারটি ঐতিহাসিক ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ভিন্ন মহিমায় আত্মপ্রকাশ করেছে। এ বিপ্লব একদিকে মুক্তি সংগ্রামের অংশ, অপরদিকে তা অভিনব ও রুপান্তরকামী বিপ্লব যা রাষ্ট্র কাঠামো, সমাজ চেতনা ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের বার্তাবাহক। জুলাই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কার তথা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দিয়ে, যার নেপথ্যে ছিল বঞ্চনা ও ফ্যাসিবাদী শাসন, কোটা আন্দোলন দ্রতরূপ নেয় সর্বাত্মক আন্দোলনে যার বক্তব্য শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না হয়ে রাষ্ট্রের নতুন বন্দোবস্ত, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনঃসংজ্ঞায়ন এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। আন্দোলনের বৈচিত্রের মহিমায় এটি ছিল অনন্য ও অভূতপূর্ব। এ বিপ্লবকে জাতিরাষ্ট্র বিনির্মানের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও সহীহ বিপ্লব হিসেবে অ্যাখ্যা দেয়া যায়, যার অভিনব ও প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল নিম্নরুপ:

৪.১ একক নেতৃত্বের পরিবর্তে সামষ্টিক নেতৃত্ব

বলা হয় জুলাই বিপ্লব কোন একক ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের ফসল নয় বরং সামষ্টিক নেতৃত্বের এক অপূর্ব উদাহরণ। সরকার যেন নেতৃত্ব সমূলে উৎপাটন বা র্নিমূল করতে না পারে সেজন্য এটা ছিল এক অভিনব কৌশল, যাকে বলা হয় মেটিকুলাস প্লানিং। একের পর এক সামনের সারির সমন্বয়কারীকে গ্রেফতার করার পরও আন্দোলনে কোন ভাটা পড়েনি। অজ্ঞাত অসংখ্য সমন্বয়কারী অবির্ভূত হয়েছে বিভিন্নভাবে, বৈচিত্রময় কর্মসূচি নিয়ে। এ যেন ছিল এক অভিনব সামষ্টিক নেতৃত্বের প্রদর্শনী, যা আগের সব আন্দোলন থেকে ভিন্ন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত প্রত্যেকটি আন্দোলন ছিল সুস্পষ্ট নেতৃত্বনির্ভর। পাকিস্তান আন্দোলনে ছিল মুসলিম লীগের রাজনীতি, ভাষা আন্দোলনে ছাত্রনেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবীদের আহ্বান, ১৯৭১-এ রাজনৈতিক দল ও সামরিক নেতৃত্ব এবং ১৯৯০-এ ছাত্র ও বিরোধী জোটের ভূমিকা। কিন্তু জুলাই ২০২৪ বিপ্লব ছিল মূলত ‘অজ্ঞাত নেতৃত্বে’ পরিচালিত – বিকেন্দ্রীকৃত, স্বতঃস্ফূর্ত এবং বহুমাত্রিক জনসম্পৃক্ততা নির্ভর।

৪.২ সামাজিক ও ভার্চুয়াল নেতৃত্ব 

যেখানে নির্দেশনা আসত নামহীন, চেহারাহীন কণ্ঠে – তবুও কর্মসূচি ছিল সুসংগঠিত, প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক এবং জনস্রোত ছিল অভূতপূর্ব। এভাবে এটি হয়ে উঠে একবিংশ শতকের ‘ডিজিটাল গণ-আন্দোলনের’ একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৪.৩ তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রতিবাদের নতুন ভাষা 

জুলাই বিপ্লবের আরেকটি বৈচিত্রময় বৈশিষ্ট্য ছিল তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের কৌশলগত ব্যবহার। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউব, টেলিগ্রাম এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপগুলোর মাধ্যমে সংবাদ প্রচার, কর্মসূচি ঘোষণা, গণসংযোগ এবং আন্তর্জাতিক সস্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। ইন্টারনেট শাটডাউন ও মিডিয়া সেন্সরশিপ সত্ত্বেও বিপ্লবকারীরা, স্ক্রিনশট প্রচার, অডিও বার্তা এবং লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে একটি ভার্চুয়াল প্রতিরোধ ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এবং ইন্টারনেট সাটডাউনেও সরকার আন্দোলনের লাগাম টানতে পারে নাই।

৪.৪ আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তি 

জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসের এক যুগাত্নকারী ঘটনা । ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ এই স্লোগান ছিল কেবল প্রতিবাদের আওয়াজ নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ঘোষনা। ১৯৭১ সালে ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করলেও এ স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের দুরভিসন্ধি ছিল ভিন্ন রকম; স্বাধীন বাংলাদেশের আড়ালে ভারতীয় করদরাজ্য প্রতিষ্ঠা করা যা তারা করেছে পরবর্তি ৫৪ বছরে। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি সবকিছুতে ছিল ভারতীয় দাদাগিরি। তাই জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুধু ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা নয় ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এটা হয়ে উঠে মনস্তাত্ত্বিক সংস্কৃতিক ও জাতিগত আত্বজাগরণ। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং কূটনৈতিক মহল এই বিপ্লব দমন করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। তাই জুলাই বিপ্লব জাতীয় আত্মমর্যাদা ও ভূরাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নে অতীব তাৎপর্যপূর্ণ।

৪.৫ জাতির আত্মজাগরণ 

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ জুলাই বিপ্লব শুধু একটি শাসনব্যবস্থার পালাবদল নয়, বরং এক দীর্ঘকালব্যাপী দমন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণের এক মহাকাব্যিক আত্মমুক্তির আন্দোলন। ইতিহাসের ধারায় এটি এক নতুন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্কের মৌলিক রুপান্তর। যেখানে জনগণ কেবল ভোটাধিকার নয়, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্বের অনিবার্য অংশ হতে চায়। সেই অর্থে, ২০২৪ সালের এই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম রুপান্তরমূলক অভ্যুত্থান । সারণী-৪ এ অপরাপর আন্দোলনের সাথে জুলাই বিপ্লবের মহিমা তুলনা করা হলো।

সারণী-০৪: জুলাই বিপ্লবের সাথে অপরাপর মুক্তি আন্দোলনের তুলনমূলক চিত্র

আন্দোলন/বিপ্লব সময়কাল প্রধান লক্ষ্য নেতৃত্ব বৈশিষ্ট্য বহিঃশক্তির ভূমিকা প্রযুক্তির ব্যবহার ফলাফল

পাকিস্তান আন্দোলন ১৯৪৭ মুসলিম জাতিস্বত্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন মুসলিম লীগ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রাধান্য ব্রিটিশ সমর্থনে বিভাজন নগন্য ভারত বিভাজন, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা’র স্বীকৃতি ছাত্র সমাজ, বুদ্ধিজীবী সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রবোধ দৃশ্যমান নয় নগন্য বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি। স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৯৭১ পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা আওয়ামী লীগ ও সশস্ত্র বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম, গণযুদ্ধ ভারতীয় সামরিক সহায়তা সীমিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ছাত্র সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বৃহৎ জোটভিত্তিক গণআন্দোলন আন্তর্জাতিক চাপ (সীমিত) নেই স্বৈরশাসনের পতন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা জুলাই বিপ্লব ২০২৪ বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা, জাতীয় পুনর্জাগরণ ছাত্র ও তরুণ প্রজন্ম, বিকেন্দ্রীকৃত নেতৃত্ব অজ্ঞাত নেতৃত্ব, ডিজিটাল সংগঠন, গণ-অংশগ্রহণ ভারতের তীব্র বিরোধিতা সোশ্যাল মিডিয়া, অও, এনক্রিপশন সরকার পতন, নতুন রাষ্ট্রীয় বন্দেবস্তের সূচনা, ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন এবং জাতীয় মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

পাঁচ-বিশ্বের অপরাপর বিপ্লবের সাথে জুলাই বিপ্লবের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বিশ্বের প্রায় সব বড় বিপ্লবেরই রাজনৈতিক কাঠামো ও শাসনব্যবস্থার রুপান্তর হতে সময় লেগেছে প্রায় ৫-২০বছর। সে তুলনায় জুলাই বিপ্লব পরবর্তি বিপ্লবী সরকার না হয়েও এবং বিদ্যমান ফ্যাসীবাদি শাসন কাঠামোর মধ্যে অন্তর্তিকালীন সরকার কাজ শুরু করলেও মাত্র এক বছরের মধ্যে ৬টি মৌলিক সংস্কার কমিশন গঠন এবং নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর অভিপ্রায়ে সমাজ সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিত পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য বিপ্লব ছিল প্রায়শই একক নেতৃত্বনির্ভর (মাও, লেনিন, খোমেনি, নেপোলিয়ন), যেখানে জুলাই বিপ্লব সমন্বিত ও বিকেন্দ্রীকৃত নেতৃত্ব কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত। প্রযুক্তি ব্যবহারে জুলাই বিপ্লব ছিল অনন্য, যেখানে পূর্ববর্তী বিপ্লবগুলোতে প্রযুক্তির ভূমিকা ছিল প্রায়ই নগণ্য। জুলাই বিপ্লবকে বলা যায় একটি  ব্লকচেইন, সামাজিক মিডিয়া, বিকল্প সংবাদ প্ল্যাটফর্ম, ডাটা এনক্রিপশন, ইউটিউব যাবতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রাষ্ট্রের দমনযন্ত্রকে অকার্যকর করে তোলে।

সহিংসতার বিচারে জুলাই বিপ্লব আপাত দৃষ্টিতে কম হলেও তা ছিল সুসংগঠিত প্রতিরোধমুখী  ও সর্বাত্বক; গ্রাম শহর, নগর, উচ্চ থেকে মধ্য নিম্নবিত্ত কেউ এ বিপ্লবের বাইরে ছিলনা। এটিকে একটি  বিপ্লব হিসেবে অভিহীত করা যায়। জনগণের সক্রিয়তা ও জাতীয় চেতনা ফরাসি বা রুশ বিপ্লবগুলোতে শ্রেণি সংগ্রাম ছিল মূল চালিকা শক্তি, কিন্তু জুলাই বিপ্লব জনগণের জাতীয় চেতনার পুনরুত্থান এবং ১৯৪৭ ও ১৯৭১ এর জাতিস্বত্ত্বার অমিমাংসিত বিষয়গুলির ঐতিহাসিক ভিত্তিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। সামগ্রিক বিশ্লেষণে জুলাই বিপ্লব একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আধুনিক, প্রযুক্তি-নির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম দৃষ্টান্ত। একে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং একটি সভ্যতাগত এবং জাতিস্বত্তার রুপান্তরের সূচনা হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়। বিশ্ব ইতিহাসের বড় বিপ্লবগুলোর তুলনায় এটি সময়, সহিংসতা, নেতৃত্ব কাঠামো ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে ব্যতিক্রমী এবং ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক রুপান্তরের জন্য একটি নতুন মডেল। সারনী-৫ এ বিশ্বের বিভিন্ন বিপ্লবের সাথে জুলাই বিপ্লবের একটি তুলামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো।

সারণী-০৫: বিশ্বের উল্লেখযোগ্য বিপ্লবের সাথে জুলাই বিপ্লবের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বিপ্লবের নাম সময়কাল (১ম পর্ব) রুপান্তর কাল নেতৃত্ব কাঠামো রুপান্তর সাফল্যকাল প্রযুক্তির ভূমিকা জনগণের সক্রিয়তা রক্তপাত/সহিংসতা জুলাই বিপ্লবর সাথে তুলনা

ফরাসি বিপ্লব ১৭৮৯-১৭৯৯ রাজতন্ত্র → প্রজাতন্ত্র → সামরিক শাসন অরাজক রাজনৈতিক গোষ্ঠী, জ্যাকোবিনরা প্রায় ১০ বছর সীমিত উচ্চ ব্যাপক দীর্ঘ, রক্তাক্ত; নেতৃত্বে দ্বন্দ্বরুশ বিপ্লব ১৯১৭-১৯২২ রাজতন্ত্র → সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলশেভিক একক নেতৃত্ব (লেনিন) প্রায় ১০ বছর সীমিত উচ্চ উচ্চ দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও সহিংস ক্ষমতা দখল চীনা বিপ্লব ১৯২৭-১৯৪৯ গৃহযুদ্ধ শেষে পিআরসি প্রতিষ্ঠা মাও-এর একক নেতৃত্ব ২০-২২বছর সীমিত দীর্ঘস্থায়ী গণসংযোগ উচ্চ দীর্ঘ, দলবদ্ধ নেতৃত্ব অনুপস্থিত। ইরানি বিপ্লব ১৯৭৮-১৯৭৯ রাজতন্ত্র → ইসলামিক শাসন আয়াতুল্লাহ খোমেনি-নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় কাঠামো ৩-৫বছর সীমিত ধর্মীয় আবেগপ্রবণ অংশগ্রহণ মাঝারি ধর্মীয় নেতৃত্বকেন্দ্রিক কিউবান বিপ্লব ১৯৫৩-১৯৫৯ সামরিক শাসন → সমাজতন্ত্র ফিদেল কাস্ত্রো ৬ বছর সীমিত গেরিলা-ভিত্তিক উচ্চ একক নেতার প্রতিষ্ঠা।

জুলাই বিপ্লব ২০২৪ (বাংলাদেশ) ২০২৪ একনায়কতন্ত্র → অন্তর্বতী সরকার → সংস্কার কমিশন সমন্বিত নেতৃত্ব (ছাত্র, নাগরিক, প্রবাসী, পেশাজীবী) ১-২বছরের মধ্যে কাঠামোগত রুপান্তর ঞবপযহড়-চড়ষরঃরপধষ ডিজিটাল ও রাস্তায় শক্তিশালী অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম একক নেতৃত্বের পরিবর্তে সমন্বয় ও প্রযুক্তি নির্ভরতা

ছয়-বিপ্লবের প্রভাব ও ফলাফল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে গঠিত অন্তর্বতীকালীন সরকার বিপ্লবকে সফল করার লক্ষ্যে ছয়টি মৌলিক সংস্কার কমিশন গঠন করে, কমিশনগুলোর প্রধান দিকগুলো হচ্ছে-সংবিধান সংশোধন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার, সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার এবং গণমাধ্যম ও তথ্য অধিকার বিষয়ক। এ সংস্কার প্রচেষ্টা জাতিকে একটি রুপান্তর প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করিয়েছে যার ফলে প্রথাগত ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে অংশগ্রহনমূলক রাজনীতির ভিত্তি রচিত হচ্ছে। জুলাই বিপ্লব বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে পূর্ববর্তী গণঅভ্যুত্থানগুলো (১৯৪৭, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০) প্রায়শই একটি নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতায় আনলেও, সময়ের ব্যবধানে সেই নেতৃত্ব জনআকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি মৌলিক ব্যতিক্রম সৃষ্টি করেছে, ছাত্র নেতৃত্ব, রাজনীতিক, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, প্রবাসী এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব সব পক্ষ এক অভূতপূর্ব ঐক্যে পৌঁছায়, যা ‘একক নেতৃত্বের পরিবর্তে সমন্বিত নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তুলেছে। অ্যানটনী গ্রামসী’র ভাষায়, “বিপ্লবটি উপনিবেশ বিরোধী শক্তির উত্থান, যেখানে বিকল্প রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিসমূহ একত্রিত হয়ে রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠনে বৈপ্লবিক রূপদান করে।  জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বহু বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং হতাশা এক সুসংগঠিত রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নেয়। রাজপথের নতুন স্লোগানগুলো যেমন “দিল্লি না ঢাকা”, “ক্ষমতা না জনতা” ইত্যাদি বর্ণময় প্রতিফলন। এগুলোর মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিক দলীয় বৃত্তের বাইরে গিয়ে নিজেদের সক্ষম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। জুলাই বিপ্লবের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রচার ব্যবস্থা রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে ভেঙে দেয়। এটাই ছিল আধুনিক কালের রাজনীতির প্রযুক্তি বিপ্লবের এক বড়ো উদাহরণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, প্রবাসী, মানবাধিকার সংস্থা, বিদেশি মিডিয়া জুলাই বিপ্লবকে কম আলোচিত কিন্তু বিপ্লবাত্মক গণঅভ্যুত্থান হিসেবে মনে করে। নিচের সারণীতে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনে জুলাই বিপ্লবের সম্ভাব্য প্রভাব ও ফলাফল একনজরে তুলে ধরা হলো।

সারণী-৬: জুলাই বিপ্লব পরবর্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে রুপান্তর প্রক্রিয়া

রুপান্তর অধিক্ষেত্র বিপ্লব পরবর্তি বৈশিষ্ট্য

রাজনৈতিক বয়ান ও চেতনার এ বিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয় স্বার্থকে উচ্চকিত  করা। এক্ষেত্রে রাজপথের স্লোগান ‘দিল্লী না ঢাকা’ খুবই পরিস্কার করে দেয় । বিপ্লব পরবর্তি ভারত কর্তৃক নানা উস্কানী স্বত্ত্বেও চেতনা আরো শানিত হবার লক্ষন দেখা দিয়েছে জাতীয় পরিচয় বাংলাদেশ কেন্দ্রীক জাতীয়তাবোধের আকাংখা দিন থেকে দিন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে বাংলাদেশের আত্বপরিচয়ই মুখ্য শাসনকার্যের সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় শাসনকার্যযের মৌলিক সংস্কারে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহুমত বহুপথের রাজনৈতিক পক্ষকে জাতীয় ঐক্য ও নিয়মিত মতবিনিময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। সামাজিক পরিস্থিতি একটি ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মতপার্থক্য স্বত্বেও একটি সামাজিক ঐক্যের সূচনা হয়েছে। অর্থনৈতিক শক্তি বিন্যাস দলীয় মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্ত করার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা সামাজিক সচেতনতা ও জবাবদিহীতার সংস্কৃতি প্রচেষ্টা।

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ উদীয়মান জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ

একঃ ১৯৪৭-এ স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের পেছনে মানুষের আকাংখা ছিল একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র বিনির্মান। জুলাই বিপ্লব সেই ধারাবাহিকতারই মাইলফলক যাতে উচ্চকিত ছিল বৈষম্যহীন জাতিরাষ্ট্রের অঙ্গিকার। বাংলাদেশের রয়েছে ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, ভূরাজনৈতিকভাবে একটা শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠার অফুরন্ত সম্ভাবনা। বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা যথার্থভাবেই বলেছেন, “বাংলাদেশ, সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আধুনিক ও সম্ভাবনাময় দেশ।” বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী ছাড়াও বাংলাদেশের সম্ভাবনার ভিত্তি হলো নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সুনীল অর্থনীতির সম্ভার। বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের বাণিজ্যিক প্রবেশপথ বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল। অন্তর্বতীকালীন সরকার প্রধান ড. মোহাম্মদ ইউনুস যথার্থই বলেন, “দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের (ভারত ও চীন) অনিবার্য প্রয়োজনেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এর বাইরে আর কোনো পথ নেই”। চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত বিনিয়োগ ও কৌশলগত ক্রমবর্ধমান আগ্রহ সেকথারই প্রমাণ বহন করে। জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশ হবে স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মনির্ভরশীল জাতিরাষ্ট্র যা অতীতের আন্দোলন সংগ্রাম আর বিপ্লবের ধারাবাহিকতা এবং অপূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করার গভীর অঙ্গিকার।

দুই: বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের শক্তিমত্তা

পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হচ্ছে বাংলাদেশ, যার হৃদয়ে রাজধানী ঢাকা। পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় গায়ক নচিকেতা একবার হিন্দি গানের অনুরোধ পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, “আমি বাংলা গাই, বাংলা বলি, আমার পরিচয় আমি বাঙালি। হিন্দি চাপিয়ে দেবেন না।” পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষাচর্চার এই রুগ্ন বাস্তবতায় জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের অভিমত বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এক অভিভাষণে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার  ভাষাগত ও রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনামূলক মূল্যায়ন করে বলেছিলেন, “বাংলা আমাদের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় ভাষা, একটি জাতির ভাষা। কিন্তু সীমান্তের ওপারে এটি একটি আঞ্চলিক ভাষা মাত্র। পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্যের যত পরিণত ভাব থাকুক না কেন, সেখানে কোনো ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি নেই।

বাংলাদেশের সাহিত্যে রয়েছে আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনা। বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা জাতি হতে চেয়েছে, অন্য কিছু নয়।” (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৬)। এই বিশ্লেষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনকে, যখন বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলো। তখনই শুরু হয় বাংলাভাষা আন্দোলন; এবং সেইপথ ধরে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা একটি জাতির ভাষা, জাতীয় ভাষা। একটি জাতির ভাষার মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সে জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা কেবল একটি দেশের রাজধানী নয়, বরং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেরও রাজধানী। আশির দশকে কবি আল মাহমুদ ঘোষণা করেছিলেন, “ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী।” অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, “আমরাই বাংলা সাহিত্যকে ডমিনেট করবো।” এই সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে পরবর্তি পৃষ্টায় প্রদত্ত ভাষাভিত্তিক মানচিত্রে যদি আমরা উপমহাদেশকে দেখি, তবে দেখা যাবে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল বিস্তৃত পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের অংশ, এবং বাংলাদেশের সমগ্র ভূখন্ডজুড়ে। কিন্তু এই পুরো অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র এখন ঢাকা। এই বাস্তবতা আমাদের জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের সামনে একটি অনন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়: “ঢাকা কেবল বাংলাদেশের রাজধানী নয়, বরং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রাজধানী।”

‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ’ একটি বিভ্রান্ত জাতীয়তাবাদী তত্ত্ব!

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে মতলববাজ এদেশীয় কিছু বুদ্ধিজীবী তথাকথিত ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ নামে এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু করে, তারা ‘তুমি কে? আমি কে? বাঙালি বাঙালি’ শ্লোগানের মাধ্যমে এ ভূখন্ডের মানুষের জাতি হয়ে উঠার যে স্বকীয় ঐতিহ্য ও চেতনাকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ যেন জাতিরাষ্ট্রের ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে সর্বভারতীয় হবার মরিচিকায় হারিয়ে যায়। যেটা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবিদের ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পটভূমিতে। সেই গ্লানি তারা মুছতে চায় এদেশের স্বাধীন জাতিস্বত্তার ধারণাকে মুছে দেয়ার মাধ্যমে। আর এ প্রকল্পের নামই হচ্ছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ! কিন্তু এধারণাটি যে অলীক এবং অবাস্তব তা ১৯৪৭ পরবর্তি পশ্চিমবঙ্গ ঠিকই বুঝতে পেরেছে। তাদের জন্য বাংলা ভাষা রক্ষা করাও এখন দুস্কর হয়ে উঠেছে। তবে বাংলাদেশের পথভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবিদের কোন ক্লান্তি নেই। তারা তথাকথিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ছদ্মাবরণে রাষ্ট্রকে দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের মুখোমুখি হতে দেখেও অনুশোচনা নেই।

বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদেও নামে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে বিচ্চিন্নতাবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে, এতেও বিন্দুমাত্র আত্বোপলদ্ধি নেই! জুলাই বিপ্লবের অনন্য মহিমা হচ্ছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উর্দ্ধে উঠে সকলকে পরিচয়ে বাংলাদেশী করে তোলা। বাংলা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হলেও এটি দেশের সকল জনগোষ্ঠীর ভাষা নয়। এদেশে অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি রয়েছে, তারা রাষ্ট্রের নাগরিক এবং বাংলাদেশী। বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, ভাষাগতভাবে তারা বাঙালি, জাতিগতভাবে নয়। জুলাই বিপ্লব অর্ধশতাব্দীকালের বিভ্রান্তিকর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদেও অসাড়তাকে পরাজিত করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সার্বভৌম চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করেছে। এটাও জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্রের সম্ভাবনা।

তৃতীয় অধ্যায়ঃ বিপ্লবোত্তর অমিত সম্ভাবনার বাংলাদেশ!

বাংলাদেশ মানবসম্পদের দিক থেকে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটির বেশি। বিশ্বের মোট জনসংখ্যা (প্রায় ৮.১ বিলিয়ন) এর তুলনায় বাংলাদেশের অংশ মাত্র ২% হলেও, তরুণ জনগোষ্ঠীর উচ্চ অনুপাত একটি কৌশলগত সম্পদ। এছাড়াও  জনমিতিক সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে গুরুত্বপৃর্র্ণ সময়কাল অতিক্রম করছে। গবেষকরা ২০০১ থেকে ২০৫১ সাল পর্যন্ত সময়কে বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা প্রাপ্তির সুবর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (এঊউ, ২০২০)। বর্তমানে দেশের প্রায় ৬৩ শতাংশ জনগণ কর্মক্ষম বয়সসীমা ১৫-৬৪ বছর, যার মধ্যে তরুণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত প্রায় ৩২ শতাংশ (টঘঋচঅ, ২০২৩)। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হবে ১২৮ মিলিয়ন। এ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনমুখীতে রুপান্তর করা হলে এটি জাতীয় প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন এবং বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধরাষ্ট্রে পরিণত করতেও গুরুত্বপৃর্র্ণ ভূমিকা রাখবে।

সারণী-০৭ : বিশ্বের সর্বোচ্চ জনসংখ্যার ১০টি দেশ (২০২৩ সালের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী)

জুলাই বিপ্লব জাতিকে উপহার দিয়েছে এক নতুন প্রত্যয়, স্বাধীনতা ও মুক্তির নতুন উপলব্ধি। বিগত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে অপশাসন, দুর্নীতি, বেকারত্ব, বৈষম্য, উন্নয়নের ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভাঙিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের আত্মঘাতী রাজনীতি। এই বিপর্যয়ের পথ থেকে উত্তরণের জন্য একটি মৌলিক রুপান্তর প্রয়োজন ছিল, যা জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সূচিত হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে একদিকে যেমন সুযোগ, অন্যদিকে তেমনি কঠিন চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে জাতীয় ঐক্য সংহত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করে মেধাবীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ও তার ধারক-বাহকদের সরিয়ে দিতে হবে এবং তদস্থলে গড়ে তুলতে হবে সৎ, যোগ্য, দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় – প্রতিটি বিপ্লবই চ্যালেঞ্জ, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে নিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও গড়ে উঠেছে একটি মানবিক ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন প্রত্যয়।

জাতি পুনর্গঠনের এ যাত্রা হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার একটি সচেতন প্রক্রিয়া। এ বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি যে তরুণ, ছাত্র, যুবক এবং আপামর সাধারণ মানুষ এ বিপ্লবের অংশ নিয়েছে তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপৃর্র্ণ নিয়ামক। এই প্রজন্মকে একটি সমৃদ্ধ জাতিরাষ্ট্র গঠনের মৌলিক দর্শন ও কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করাই হবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রাধিকার। একটি বিপ্লব তখনই মহিমান্বিত হয়, যখন তা জাতিকে জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মমর্যাদার উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। প্রসঙ্গক্রমে সাম্প্রতিক ইরানের একটি দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করতে চাই। ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের প্রাণহানির পর আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেছিলেন: “তোমরা আমাদের বিজ্ঞানীদের হত্যা করতে পারো, কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর আমরা যে জ্ঞানের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছি, তা কখনও ধ্বংস করতে পারবে না।”

এই আত্মবিশ্বাস জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভরতা উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমেই জন্ম নেয়। আল্লাহ কোনো জাতিকে বিনা চেষ্টায় শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন না। বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জাতির অন্তর্গত শক্তিকে জাগ্রত করা। তাই জুলাই বিপ্লবকে সত্যিকার অর্থে মহিমান্বিত করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলপত্র তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমেই অর্থনৈতিকভাবে টেকসই, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হবে বিপ্লবোত্তর নতুন বাংলাদেশ।

                                                                                                                লেখকঃ শিক্ষক, লেখক ও গবেষক।  ইমেইল- syedaziz61@gmail.com

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category