• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন

বিপর্যয়ের ভাষায় মানবতার অনুসন্ধান: লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখার দর্শন

Reporter Name / ১৩৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

আসিফ কামাল

এক অন্ধকার পৃথিবীর মাঝে শিল্পের অনন্ত আলো। ২০২৫ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী হাঙ্গেরীয় লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই আজকের বিশ্বসাহিত্যে এক গভীর ও আলোচিত নাম। নোবেল কমিটি তাঁর সাহিত্যকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, “বিপর্যয়ের মাঝেও শিল্পের শক্তিকে পুনর্নিশ্চিত করে, এমন এক বায়বাহী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাহিত্য।”
এই ঘোষণাই প্রমাণ করে যে, ক্রাসনাহোরকাই কেবল একজন লেখক নন, তিনি মানব আত্মার অন্ধকার ও আলোর দ্ব›েদ্ব দাঁড়ানো এক দার্শনিক লেখক, যিনি ধ্বংসের ভেতর দিয়ে মানবতার শিকড় অনুসন্ধান করেন।

সাহিত্যিক পরিচয় ও চিন্তার প্রেক্ষাপট
১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির এুঁষধ শহরে জন্ম নেওয়া ক্রাসনাহোরকাই বেড়ে উঠেছেন সমাজতান্ত্রিক ইউরোপের এক উদ্বেগময় সময়ে। হাঙ্গেরির রাজনৈতিক পরিবর্তন, পূর্ব ইউরোপের পতন, সমাজব্যবস্থার ভাঙন, এই প্রেক্ষাপটই তাঁর সাহিত্যে ছড়িয়ে আছে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ঝধঃধহঃধহমড় (১৯৮৫) প্রকাশের পরই বোঝা যায়, তিনি প্রচলিত ইউরোপীয় ধারার লেখক নন। ধ্বংস, একঘেয়েমি, মানবিক বিচ্ছিন্নতা এবং অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা, এইসব বিষয় তাঁর মূল অবলম্বন হয়ে ওঠে।

তাঁর সাহিত্যিক দর্শন গড়ে উঠেছে তিনটি স্তম্ভে: ক. ধ্বংসের ভেতরেও অর্থের অনুসন্ধান খ. পূর্ব ও পশ্চিমের দর্শনের সংলাপ গ. ভাষার প্রতি অস্তিত্বমূলক বিশ্বাস।

দীর্ঘ বাক্যের ভেতর চিন্তার নদী
ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখনশৈলী প্রচলিত নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। তিনি লিখেন এমন দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন বাক্যে, যা একেকটি কয়েক পৃষ্ঠা পর্যন্ত চলে যায়। যেমন তাঁর সা¤প্রতিক উপন্যাস ঐবৎংপযঃ ০৭৭৬৯ (২০২৪) পুরোপুরি এক বাক্যে রচিত, প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠা জুড়ে! এই অবিরাম বাক্য তাঁর চিন্তার প্রবাহের প্রতীক।
“ঞযব পড়সসধ, ভড়ৎ যরস, ংুসনড়ষরংবং ঢ়বৎংরংঃবহপব: ঃযব ফবপরংরড়হ ঃড় পড়হঃরহঁব ঃযব ংবহঃবহপব, ঃড় শববঢ় মড়রহম যিবহ ফবংঢ়ধরৎ ঃবসঢ়ঃং ংরষবহপব.”
— ঘড়নবষ চৎরুব ঈড়সসরঃঃবব (২০২৫)

অর্থাৎ, কমা তাঁর কাছে কেবল ব্যাকরণের চিহ্ন নয়; এটি মানবীয় স্থিতিশীলতার প্রতীক, যেমন মানুষ থেমে না গিয়ে এগিয়ে চলে, তেমনি তাঁর বাক্যও থেমে থাকে না। এই ধীরগতি ও দীর্ঘতা আসলে এক ধরণের পাঠ-ধ্যান (ৎবধফরহম সবফরঃধঃরড়হ)। পাঠক তাড়াহুড়া করে এগোতে পারে না; বরং বাধ্য হয় চিন্তা করতে, স্থির হতে, বাক্যের স্রোতে ভেসে যেতে।

বাস্তবতা ও কল্পনার সীমা ভাঙা
তাঁর লেখায় বাস্তবতা, কল্পনা, উন্মাদনা ও যুক্তি, সবকিছু একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। ঝধঃধহঃধহমড় কিংবা ঞযব গবষধহপযড়ষু ড়ভ জবংরংঃধহপব-এ দেখা যায়, একটি ছোট শহর বা গ্রাম ক্রমে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু সেই ধ্বংস যেন বাস্তব ও রূপকের মিলনবিন্দু।

এই মিলনই তাঁর দর্শনের মূলে, বাস্তবতা কখনো স্থির নয়; অর্থ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। “জবধষরঃু রং হবাবৎ ভরীবফ; রঃ রং পড়হংঃধহঃষু নবরহম ৎবনড়ৎহ ঃযৎড়ঁময ঢ়বৎপবঢ়ঃরড়হ.”
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই (এক সাক্ষাৎকারে, অংুসঢ়ঃড়ঃব ঔড়ঁৎহধষ) এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে কেবল সাহিত্যিক নয়, এক প্রকার “অস্তিত্বদার্শনিক” করে তোলে।

পূর্বের ধ্যান ও পশ্চিমের বিশ্লেষণ
যদিও ক্রাসনাহোরকাই ইউরোপীয় সাহিত্য ঐতিহ্যের সন্তান, তাঁর চিন্তা ও দর্শন বহন করে পূর্বের নীরব ধ্যানময়তা। জাপান, চীন ও মঙ্গোলিয়ায় তাঁর দীর্ঘ ভ্রমণ তাঁর ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর বিখ্যাত বই ঝবরড়ন, ঞযবৎব ইবষড়ি (২০০৮) পুরোপুরি নির্মিত জাপানি নান্দনিকতা ও বৌদ্ধধর্মীয় ধ্যানচিন্তার ওপর।
এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয় একটি সংখ্যাবিন্যাসে (ঋরনড়হধপপর ংবয়ঁবহপব), যা প্রকৃতি ও সৃষ্টির অনন্ত পুনরাবৃত্তির প্রতীক। এইভাবে পূর্ব ও পশ্চিম তাঁর চিন্তায় মিশেছে, যেখানে বুদ্ধি ও অনুভ‚তি, ধ্যান ও বিশ্লেষণ একাকার হয়ে যায়।“নীরবতার মধ্যেই সত্যের জন্ম।” লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

চলচ্চিত্রের মতো গদ্য
ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাহিত্য পড়লে মনে হয় যেন একটি ধীর, মন্থর সিনেমা চলছে।
তাঁর গদ্য এতটাই দৃশ্যমান ও চিত্রসমৃদ্ধ যে অনেকেই বলেন, তিনি “লিখে চলচিত্র নির্মাণ করেন”। হাঙ্গেরীয় পরিচালক ইল্কষধ ঞধৎৎ তাঁর উপন্যাস ঝধঃধহঃধহমড় এবং ঞযব গবষধহপযড়ষু ড়ভ জবংরংঃধহপব-কে রূপান্তর করেছেন বিখ্যাত চলচ্চিত্রে। বিশেষত ঝধঃধহঃধহমড় সিনেমাটি ৭ ঘণ্টা দীর্ঘ, যা সাহিত্যের গদ্য ও সিনেমাটিক সময়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, ক্রাসনাহোরকাই শুধু শব্দে নয়, চিত্রে লেখেন। তাঁর লেখার দৃশ্যমানতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষাও এক প্রকার ক্যামেরা; শব্দও পারে আলোর মতো কাজ করতে।
অন্ধকারের ভেতরেও প্রতিরোধের গান ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাহিত্য নিঃসন্দেহে অন্ধকারাচ্ছন্ন। তবে তাঁর অন্ধকার নৈরাশ্যের নয়, বরং প্রতিরোধের। ধ্বংসের ভেতরেও তিনি দেখেন মানুষের দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা।
ঞযব গবষধহপযড়ষু ড়ভ জবংরংঃধহপব-এ তিনি লেখেন এমন এক সমাজের কথা, যেখানে ভয়, বিভ্রান্তি ও পতনের মাঝেও মানুষ কোনোভাবে মানবতা বাঁচিয়ে রাখে।
এই ধারণাই তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে, “ওভ সধহ পধহ ংঃরষষ ংঃধহফ ধসরফ ৎঁরহং, ঃযধঃ রঃংবষভ রং ঃযব ারপঃড়ৎু ড়ভ যঁসধহরঃু.”

ভাষা, শূন্যতা ও বিশ্বাসের ত্রিভুজ
ক্রাসনাহোরকাই ভাষাকে শুধুই যোগাযোগের মাধ্যম মনে করেন না; এটি তাঁর কাছে অস্তিত্বের পরীক্ষাক্ষেত্র।
তাঁর লেখায় ভাষা আশ্রয়ও, আবার শূন্যতার প্রতিফলনও।
এই তিনটি উপাদান, ভাষা, শূন্যতা, বিশ্বাস, তাঁর সাহিত্য দর্শনের মূল ত্রিভুজ।
ভাষা: মানুষের চেতনার একমাত্র আশ্রয়; যতক্ষণ শব্দ আছে, ততক্ষণ মানুষও আছে।
শূন্যতা: অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা, যা আমাদের চিন্তাকে প্রসারিত করে।
বিশ্বাস: এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানবতার ধারকশক্তি।
“অং ষড়হম ধং ঃযবৎব ধৎব ড়িৎফং, ঃযবৎব রিষষ নব যঁসধহ নবরহমং.” লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

আজকের পৃথিবীতে কেন প্রাসঙ্গিক

ক. দ্রæতগতির যুগে ধৈর্যের নান্দনিকতা: আজকের যুগ তাড়াহুড়োর, ‘স্ক্রল’-এর, দ্রæত খবরের। ক্রাসনাহোরকাই আমাদের শেখান ধীরতায় ফিরে যেতে। তাঁর সাহিত্য এক ধরনের ংষড়ি ৎবংরংঃধহপব—যেখানে চিন্তা, পাঠ ও সময়ের সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক ফিরে আসে।
খ. হতাশার বিপরীতে আশার সম্ভাবনা: যে সমাজ, রাষ্ট্র বা মনই হোক—ধ্বংস ও অস্থিরতা সর্বত্র। তাঁর সাহিত্য বলে, “অন্ধকারেরও নিজস্ব আলো আছে।” এই বিশ্বাসই আজকের সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ।
গ. ভাষার শক্তিতে মানবতার পুনরাবিষ্কার: তাঁর উপন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের শেষ আশ্রয় ভাষা ও শিল্প। যতক্ষণ শব্দ থাকবে, ততক্ষণ মানুষও টিকে থাকবে। বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য ক্রাসনাহোরকাইয়ের পাঠ জরুরি কারণ, তিনি আমাদের শেখান ধীরগতির পাঠের সৌন্দর্য। তাঁর থিম, ধ্বংস, বিশ্বাস, মানবতা, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও অনুরণিত। তাঁর দর্শন থেকে আমরা শিখতে পারি, সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়, চিন্তার যাত্রা। বাংলা অনুবাদে তাঁর রচনাগুলো এখনো অল্পসংখ্যক, তবে তাঁর দর্শন ইতিমধ্যেই বিশ্বসাহিত্যে এক নতুন অধ্যায় খুলেছে।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় লেখক, কারণ তিনি আমাদের শেখান অন্ধকারেও আলো খুঁজতে। তিনি দেখান, শব্দ এখনো জীবিত, চিন্তা এখনো সম্ভব এবং ধ্বংসের ভেতরেও মানুষ এখনও সুন্দর হতে পারে। “ঐব ফড়বং হড়ঃ বহঃবৎঃধরহ ঃযব ৎবধফবৎ — যব রহঃবৎৎড়মধঃবং ঃযবস.”
— ঘড়নবষ চৎরুব ঈড়সসরঃঃবব, ২০২৫
এই প্রশ্নই তাঁকে আজকের যুগের এক অপরিহার্য সাহিত্যিক করে তুলেছে। এক ব্যস্ত পৃথিবীতে তিনি আমাদের শেখান, চিন্তা ধীরে করা যায়, শব্দে মুক্তি আছে, আর শিল্পই শেষ প্রতিরোধ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category