• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৩ পূর্বাহ্ন

জগলুল হায়দারের ছড়া : ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কুঠারাঘাত

কাদের বাবু / ১০৩ Time View
Update : শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

সময়ের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ছড়াকার জগলুল হায়দারকে অনেকে ডাকেন ছড়াকার জাদুকর, অনেকে ছড়া সম্রাটও বলেন। সমকালীন যেকোনো বিষয় নিয়ে ছড়া লেখার ওস্তাদ জগলুল হায়দার। তা যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে হতে পারে, হতে পারে হাস্যরসাত্মক কিংবা গদির বিপরীতে শূলে চড়ানোর মতো তার ছড়ার ভাষা ও বিষয়! অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লিখে আসছেন দুই যুগের অধিক সময়। পতিত সরকার যখন ক্ষমতায় সে সময়ও তিনি প্রতিনিয়ত লিখে গেছেন যেকোনো দেশবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে! যেমন সরকার হয়তো ভারতের স্বার্থে কোনো কাজ করছে, জগলুল হায়দারের কলম তখন গর্জে ওঠে দুর্বার গতিতে। দেশের মানুষ ন্যায় বিচার পাচ্ছে না, তার ছড়া চাবুকের মতো চপেটাঘাত করে সরকারের অন্যায় ক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে! রাজনৈতিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা দলকে হেয় করা হয়, ফুঁসে ওঠে জগলুল হায়দারের কথায় কথায়, ছড়ায় ছড়ায়!
পতিত সরকারের সময় বেশিরভাগ লেখক-কবি-সাহিত্যিক যখন দলবাজিতে ব্যস্ত তখন যে কয়জন লেখক মাথা উঁচু করে লিখেছেন তার মধ্যে জগলুল হায়দার অন্যতম। তার লেখার এসব উদাহরণ পাওয়া যায় ‘স্বাধীনতা সবার’ এবং ‘হায়দারি হাঁক’ বইয়ের পাতায় পাতায়! এসব বই সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ২০২২ ও ২০২৪ সালে পতিত সরকারের সময় লিখেন।


হায়দারি হাঁক বইয়ের প্রথম ছড়ার নাম ছিল সবার আমি টিচার। এ ছড়ায় তিনি লিখেনÑ ‘বিশ্ব-জোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি টিচার/আমার কাছে শিখবে সবাই হিউম্যানিটির বিচার।/ শিখবে মানুষ গুম করা আর গুপ্তহত্যার আচার/আস্ত মানুষ কইরা গায়েব পাশের দেশে পাচার!/ ক্রসফায়ারও শিখবে আবার গণগ্রেপ্তার আটক/শিখবে কোর্ট আর কেসের নামে প্রহসনের নাটক।/ শিখবে কেতা, কেমনে জেলে রক্ষকই হয় কিলার/শিখবে এসে বাস্তবে সব হলিউডি থ্রিলার!/ শিখবে হামলা ভুয়া মামলা করতে হুকুম তামিল/কেমনে তাতে প্রবাসী আর মৃতও করবে শামিল।/শিখবে আরো কত্তো কিছু মিথ্যা কলাম ফিচার/বিশ্ব-জোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি টিচার!
কতটা সাহসী হলে জোরালো কণ্ঠে তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে এমন ছড়া লিখতে পারেন।
তার লেখায় পাওয়া যায় স্বতন্ত্র স্বর। যেমন এই যে ব্রো; বলছি তোমায় ছড়ায় তিনি লিখেনÑ
‘এই যে তরুণ যুগের অরুণ দুঃখ করো পোস্টে/ভোট দেয় না বলে পচাও ইসিকে খুব রোস্টে। লিখছো কমেন্ট, দিচ্ছো আলাপÑ হচ্ছে সময় নষ্ট/ চোদ্দ বছর ভোটার তবু ভোট দিলাম না, কষ্ট!’/বলছো ভালো মনের কথা, কিন্তু খুলে কর্ণ/এই কথাটা শুনো না ব্রো, লিখতে ভোটের বর্ণ/নামতে হবে পথে তোমায় ব্যাপার পুরা সাচ্চা/ লড়াই ছাড়া সের দূরে থাক, দেয় না তো কেউ কাচ্চা!/ ছোট্টসোনা ও ভাই-ব্রো আজ পার হয় তোমার তিরিশ/ ভোটের কপাল কে দেয় মুছে ঘইসা পেপার সিরিশ!/জানো যদি তাইলে উপায় করতে হবে এবার/করতে হবে ভোট আদায়ে নিজকে নিজে ফেবার।/নয় কি তোমার ভোট অধিকার আকাশ থেকে পড়বে/তুমি যদি না লড়ো কে তোমার হয়ে লড়বে?/তুমি লড়ো মিছিল গড়ো দেশটা কাঁপাও গর্জে/জুলুম রোধে লড়াই তো প্রায় ফর্জে আইন ফর্জে!
তোমার দেশে তোমার আওয়াজ সবার থেকে উচ্চ/ তুমি, তুমি লাখো তুমির শক্তি কতো বুচ্চো!/ বিশ্ব সাপোর্ট লাগবে কাজে তোমরা হলেই মুখ্য/এই যদি না বুঝো তবে বাড়বে ভোটের দুঃখ!
সিলের ভোট ছড়ায় তিনি লিখেনÑ ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না/ হুদাই ভয়ে ভচকাবে না আর/ জনতা এবার নিজের পায়ে ভর দিয়ে/ সে করবে নিজকে ফেবার।/ বারেবারে ঘুঘু তোমার ধান খাওয়া আর চলবে না তোমার/ সুরে সুর মিলিয়ে কেউ তো কথা বলবে না/ যাবে না কেউ সেই ভোটে আর/ যেই ভোটে সিল মারে খালি তোমার ভোটের লেবার।
আন্দোলন সংগ্রামে এবার বেশ কিছু কথা বেশ আলোচিত ছিল। এরমধ্যে ছিল চেটে নয় খেটে খাও। এসব সেøাগানের উপজীব্য ছিল এসব ছড়াÑ সরকারি দল তরকারি খায় দরকারি ঝোল চাইট্টা/ আর জনতা পায় না তেমন সারাটা দিন খাইট্টা।/সরকারি দল সর কারি খায় দেশের গুদাম ঘাইট্টা/তাই তো ভুখা লোকের জীবন ম্যারম্যারা আর মাইট্টা।/সরকারি দল ধরকারি হয় ভোটের টিকেট কাইট্টা/আর তো মানুষ হচ্ছে কাহিল কেবল পথে হাইট্টা।/সরকারি দল ভরকারি হয় আঙুল ফুলে-ফাইট্টা/ আর মানুষের স্বপ্ন-আশা দিন দিনই হয় বাইট্টা!
শাপলা চত্বরে আলেমদের ওপর চলেছিল চরম অত্যাচার। অসংখ্য আলেমকে হত্যা করা হয় শাপলা চত্বরে। তিনি নির্ভয়ে লিখেনÑবারবার এই দুবার কইলেনÑ‘শাপলা থেকে করুণ হবে!’/মাইনা নিলাম, না হয় আবার শাপলা চত্বর ধরুন হবে!/তার আগে কন তাইলে এবার শাপলা চত্বর কি হইছিলো/আগে কইতেন কিছুই না স্রেফ ‘পান্তা ভাতে ঘি হইছিলো’?/ধর্মের কল বাতাস নাড়ায় প্রবাদ আগেই তা কইছিলো/শাপলা চত্বর সত্যি তবে ভয়াবহতা হইছিলো!
জগললু হায়দার সবসময় বিপ্লবী! তাই তো ছড়ায় ছড়ায় বিপ্লবীদের আহ্বান করেন জনতার রাজ ছড়ায়Ñক্ষমতা চিনেছো বিপ্লব দ্যাখোনি/ দ্যাখোনি দ্রোহের কাল/আঁধারে যতোই ঢাকো না রাত্রী/ভোর হবে ঠিক লাল।/জীবনে থাকে চড়াই উতরাই/ সংগ্রামে থাকে ধাপ/মানুষ জাগলে ভেসে যায় সব/ অনাহৃত অপলাপ।/ সময় আসে না, সময়ের আগে/ গুনে যাও তবে দিন/ শোধ দিতে হবে হিসাব খাতায়/ জমে গেছে যতো ঋণ।/ভেবো না মানুষ মুষড়ে পড়েছে গুটিয়ে নিয়েছে হাত/ আঘাত করেছো যতো, জেনো তার পাবে ঠিক প্রতিঘাত।/সাক্ষী আলোক মানুষ চালক/ আছে যতো শুভ সাজ/আনবে জনতা; সোনার দেশে জনতারই হবে রাজ।


আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডিবি হারুন দেশের অসংখ্য মানুষকে এনে ভাত খাইয়ে ছবি তুলে তা প্রচার করতেন। এসব ছবিকে ব্যঙ্গ করে জগলুল হায়দার লিখেনÑসচিত্র ভাতের হোটেল ছড়ায়Ñআসেন আসেন জলদি বসেন, আসেন ভায়া খাইবেন/এই হোটেলের টেস্টটা কেমন খেলেই তা টের পাইবেন।/সচিত্র এই হোটেল-ভোজের নিউজ হইব জাইনেন/ভর্তা-ভাজি চিকেন-কারি থালা ভইরা তাই নেন। (২৩ সালের এই হোটেলের গ্রাহক যারা হইবেন/ টক অব দ্যা কান্ট্রি হইয়া ইতিহাসে রইবেন!)/ বিল নিয়া তো নাই টেনশন ইচ্ছামতো লইবেন/খানাদানা কেমন হইল চ্যানেলে জাস্ট কইবেন।/ চ্যানেল-ট্যানেল না পোষাইলে ইউটিউবে যাইবেন/ফেবুর পোস্টেও পাবেন ছবি দেখতে যদি চাইবেন।/ চান না সেটা? না চাইলেই কি আমরা তো ঢোল পিটাইমু/আপনি খাইছেন বইলা গায়ে এত্ত কাদা ছিটাইমু।/খাইয়া দাইয়া তলে তলে ম্যানেজ হইছেন ছড়াইমু/দ্রোহের ইমেজ মুইছা তাতে দালালি দাগ ভরাইমু।/ ভাতের হোটেল-হাতের হোটেল, হাত ইশারায় চালাইমু/এই হোটেলের কাস্টমারের পিত্তি পুরা জ্বালাইমু।/এই হোটেলে যে খাবে তার ক্যারিয়ারো ধ্বসাইমু/আসেন আসেন কায়দা কইরা, ধইরা খাইতে বসাইমু।
স্বাধীনতা সবার ছড়ার নাম ছড়াতে জগলুল হায়দার লিখেনÑস্বাধীনতার বিপক্ষ নাই/স্বাধীনতা সবার/কলম স্বাধীন লিখতে যেমন/মুছতে স্বাধীন রবার।/সকল জাতের সকল মানুষ/সবাই তো এ দেশের/স্বাধীনতা ইভেন বাংলার/গরু ছাগল মেষের।/সকল দলের সকল মানুষ/সবাই তো এ মাটির/মুক্তিযুদ্ধ ইভেন বাংলার
পাট ও শীতলপাটির।/সকল শ্রেণি সকল পেশার/মুক্তিযুদ্ধ সবার/স্বাধীনতার পক্ষে শপথ/গোলাপ যুথি জবার।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসময় কলম সরব তার। তিনি লিখেনÑ দুর্নীতিতেও ‘নীতি’ আছে/শুইনা পরান ফাইটা যায়/মালটি পেলে ফাইল নাকি/ঘোড়ার মতোন হাঁইটা যায়।/নয় তো থাকে গ্যাঁট হয়ে সব/ধুলার ধরায় বইসা দ্যাখ/ফাইল কারো মালের মেশিন/টাকার কিন্তু অই স্বাদ এক!/হারাম আয়ের আরাম দিয়া/পকেট তাদের ভাইসা যায়/নানান কিছিম নকশা দিয়া/জীবন তারা তাই সাজায়।/ধরার জীবন যতই সাজুক/পুলসেরাতে উপায় নাই/দেখবে তখন এত্ত গতির/একটুও আর দু’ পা’য় নাই!/সেই গতিটা চাইলে তবে/হালাল রুজিই চাইতে হয়/দুর্নীতিটা তফাত থাকুক/এই গীতি তাই গাইতে হয়।

বাজারে যখন পণ্যেল উর্ধ্বগতি। তিনি বস্তাভরা টাকায় পকেট ভরা সদাই! ছড়ায় ব্যঙ্গ করে লিখেনÑকমছে টাকা হচ্ছে কাগজ/দিচ্ছে ডলার হাসি/কালকে থাকা ১শ টাকা/আজ হয়ে যায় আশি।/কমতে কমতে তেজপাতা হয়/বাড়ছে কমার গতি/কে থামাবে অর্থনীতির/এই অহেতুক ক্ষতি?/না থামে তো সদাইপাতি/হবেই খালি চড়া/বস্তাভরা টাকায় জুটবে/সদাই পকেট ভরা!
শ্রীলঙ্কার রাজা ভেগে যাওয়ার পর বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে ভাগলো রাজাপক্ষে ছড়ায় লিখেনÑপাওয়ার ফাওয়ার/গাটুমু গুটুম/তাকধিনাধিন/তাত্তা পুটুম/রাবন রাজের/নগদ কুটুম/ছিলেন তাজা পক্ষে/এখন হাতে/হারিকেনে/সঙ্গে বাঁশের/সারি কেনে/দেশ জনতার/কলজে ছেনে/ভাগেন রাজাপক্ষে!/ভাগেন ভাগেন/ভাগেন রাজা/প্রাণ বাঁচানোর লক্ষে/সার্কে যত/রাজা রানি/আছেন ভয়ের অক্ষে!

এমন সব ঝাঁঝালো ছড়া স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সরকারের সময় লেখা। বইটিও ২০২৪ এর মেলায় প্রকাশিত। কতটা সাহস বুকে থাকলে এভাবে লেখা যায় তা জগলুল হায়দার দেখিয়ে দিয়েছেন। জগলুল হায়দার তাই বিপ্লবী কণ্ঠস্বর, প্রতিবাদী ছড়ায় অনন্য! তার দুটি বই জনপ্রিয়তা পাক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category