স্বাধীনতার পর এই প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশিরা সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ৭৫টি দেশের প্রবাসীরা যুক্ত হচ্ছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, রাষ্ট্র ও প্রবাসীর সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক পুনর্গঠন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু পরিবর্তন আসে নীরবে, কিন্তু তার অভিঘাত থাকে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার তেমনই এক পরিবর্তন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলিত প্রবাসী জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ ৭ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮০ হাজারের বেশি প্রবাসী ভোটার বিশ্বের ৭৫টি দেশ থেকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রবাসীদের দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের অবসান নির্দেশ করে।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা এতদিন ছিলেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ভেতর। তাঁরা ছিলেন দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মূল সিদ্ধান্তে তাঁদের কোনো প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না। প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠানো এই মানুষগুলো দেশের সংকটে ছিলেন ভরসা, কিন্তু ভোটের বাক্সে ছিলেন অনুপস্থিত।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সেই প্রবাসীরাই আবার প্রমাণ করেছেন, তাঁরা কেবল অর্থ পাঠান না, মতও গঠন করেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা, সবখানেই তাঁরা সংগঠিত হয়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছেন, আন্তর্জাতিক মহলে জনমত গড়েছেন। এই বাস্তবতায় তাঁদের ভোটাধিকার দেওয়া ছিল কোনো অনুগ্রহ নয়, ছিল রাষ্ট্রের দায়।
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনে শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব ২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি। এরপর মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান ও কুয়েত। অর্থাৎ যেখানে রেমিটেন্স প্রবাহ বেশি, সেখানেই ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহও প্রবল। এটি প্রমাণ করে, প্রবাসীরা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নন বরং সুযোগের অভাবে এতদিন বাইরে ছিলেন
দেশের ভেতরেও ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’ ক্যাটাগরিতে ৫ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। কুমিল্লা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শীর্ষে থাকা জেলাগুলো দেখিয়ে দেয়, নাগরিকদের ভোটবিমুখতার বড় কারণ ছিল ব্যবস্থাগত জটিলতা, অনীহা নয়।
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ চালুর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৪৮টি দেশ থেকে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধন, ভোটার আইডির মাধ্যমে আবেদন, এমনকি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও ভোটার হিসেবে বিবেচনার সুযোগ, সব মিলিয়ে এটি একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ।
ভোটারদের আগ্রহের কারণে নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। এটি দেখায়, কমিশন এখানে কেবল নিয়ন্ত্রক নয়, বরং সাড়া দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখতে চাইছে।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা, ব্যালট সময়মতো পৌঁছানো ও ফেরত আসা, গোপনীয়তা রক্ষা, এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গ্রহণযোগ্যতা।
প্রবাসী ভোটার যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে বাধ্য। প্রবাসীরা সাধারণত স্থানীয় প্রভাব, পেশিশক্তি কিংবা ক্ষণস্থায়ী সুবিধার বাইরে চিন্তা করেন। তাঁদের কাছে গুরুত্ব পায় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন আর শুধু ভেতরের ভোটব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। প্রবাসীদের ভাষায় কথা বলতে হবে, তাঁদের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। এটি রাজনীতিতে জবাবদিহির একটি নতুন চাপ তৈরি করবে।
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো ব্যালট ট্র্যাকিং সুবিধা। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ ডাউনলোড ও রেজিস্ট্রেশন সাকসেস হওয়ার পর একই অ্যাপের মাধ্যমেই জানা যাচ্ছে, ব্যালট পাঠানো হয়েছে কিনা, কোন পর্যায়ে রয়েছে, এমনকি রিটার্নিং কর্মকর্তা তা গ্রহণ করেছেন কি না।
ফ্রান্সে বসে এই লেখাটি লিখতে লিখতেই যখন অ্যাপটি চালু করে নিজের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করি, তখন দেখি তা সফল হয়েছে। ট্র্যাকিং অপশনে গিয়ে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, আমার ব্যালট কোথায় আছে, কী অবস্থায় রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আমার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও ভোটার হিসেবে নিবন্ধনে কোনো বাধা আসেনি। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, এটি কেবল ঘোষণার উদ্যোগ নয়, বাস্তবেই কার্যকর একটি ব্যবস্থা।
এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সূচনা। প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারবেন। তবে এখানেই শেষ নয়। ভবিষ্যতে দূতাবাসভিত্তিক ভোটকেন্দ্র, ইলেকট্রনিক ভোটিং কিংবা আরও আধুনিক ব্যবস্থার দিকে এগোতেহবে।
তবু আজ এটুকু স্পষ্ট, রেমিটেন্স যোদ্ধারা আর নীরব নন। তাঁরা এখন ভোটার। এটাই এই সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।