• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২১ পূর্বাহ্ন

গোলটেবিল বৈঠক মূল প্রবন্ধ: ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা ও প্রত্যাশা’

Reporter Name / ১০৩ Time View
Update : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফারুক হোসেন

সমীকরণের প্রেক্ষাপট: জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্র। এটি কেবল সরকার পরিবর্তনের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি জাতির সম্মিলিত আকাঙ্খা ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে যখনই নির্বাচনের ডামাডোল বাজে, তখন কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যেও শুরু হয় এক জটিল ‘ভোটের সমীকরণ’ মেলানোর প্রক্রিয়া। এই সমীকরণের একদিকে থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি, বিগত দিনের কাজের হিসাব এবং কৌশল; অন্যদিকে থাকে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবনের সুতীব্র আকাঙ্খা। এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো, সেই আকাঙ্খাগুলোর গভীরে প্রবেশ করা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করা।
জনআকাঙ্খার বহুমাত্রিক রূপ: মৌলিক চাওয়া থেকে সুশাসন বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্খাগুলো কখনোই একরৈখিক ছিল না। এর বহুমাত্রিকতা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে। এই আকাঙ্খা গুলোকেপ্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:


ক. দৈনন্দিন জীবনের স্থিতিশীলতা (ওসসবফরধঃব ঘববফং): ভোটের সমীকরণে সাধারণ মানুষ প্রথমত যে স্থিতিশীলতা চায়, তা হলো তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বর্তমানে জনগণের প্রধান উদ্বেগের একটি। সাধারণ ভোটার তার ব্যালটে এমন একটি অঙ্গীকার দেখতে চায়, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহজলভ্যতা ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো মৌলিক সেবাসমূহের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাও এই স্তরের অন্যতম প্রধান চাওয়া।
খ. অর্থনৈতিক মুক্তি ও নিরাপত্তা (ঊপড়হড়সরপ ঊসঢ়ড়বিৎসবহঃ): তরুণ সমাজ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রধান আকাঙ্খা অর্থনৈতিক মুক্তি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন চাকরির সুযোগ তৈরি করা নির্বাচনী ইশতেহারের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কৃষকের ন্যায্য দাম, শ্রমিকের উপযুক্ত মজুরি এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি এই স্তরের আকাঙ্খার মূল চালিকাশক্তি। জনগণ এমন একটি ভবিষ্যৎ চায় যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে আসবে এবং প্রত্যেকের জন্য উন্নতির সমান সুযোগ থাকবে।

গ. সুশাসন, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার (এড়াবৎহধহপব ধহফ ঔঁংঃরপব): আকাঙ্খার সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এই চাওয়াটি কোনো দল বা ব্যক্তির প্রতি নয়। আইনের শাসন সর্বজনীন, বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার এই স্তরের সবচেয়ে জোরালো দাবি। জনগণ চায় এমন একটি সরকার, যারা ক্ষমতায় এসে কেবল নিজেদের দলের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিটিও জনগণের আস্থার প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে।

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল: সমীকরণের জটিলতা বাংলাদেশের ভোটের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে জনগণের মধ্যে বিরাজমান বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল। রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ায়, তখন সাধারণ মানুষ বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো যাচাই করে নেয়।
আস্থার সংকট: বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রতিশ্রুত উন্নয়ন বাস্তবায়নে বিলম্ব বা ব্যর্থতা জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। এই সংকট ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ‘ভোট দিতে যাওয়া বা না যাওয়ার’ দ্বিধা সৃষ্টি করে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
উন্নয়নের প্রত্যাশা: অন্যদিকে, বিগত দশকগুলোতে অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা জনগণের মধ্যে এক ধরনের নতুন প্রত্যাশাও সৃষ্টি করেছে। জনগণ এখন আর কেবল মৌলিক চাহিদা পূরণে সন্তুষ্ট নয়, তারা চায় মেগা-প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জীবনযাত্রা। এই উন্নয়নকে ধরে রাখার বা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্খা বিদ্যমান। এই বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের পাল্লাতেই নির্ধারিত হয়, জনগণ স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখবে, নাকি পরিবর্তনের জন্য নতুন মুখের সন্ধানে ভোট দেবে।
তরুণ প্রজন্ম ও নারীর আকাঙ্খা: নতুন মাত্রা বাংলাদেশের মোট ভোটারের একটি বিশাল অংশ হলো তরুণ প্রজন্ম, যারা তাদের প্রথম বা দ্বিতীয়বার ভোট দেবেন। তাদের আকাঙ্খা ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন।

তরুণের আকাঙ্খা: তারা চায় পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রশাসন এবং বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা। তারা রাজনৈতিক বিতর্কেও গঠনমূলক আলোচনা ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রতিফলন দেখতে চায়। তাদের ভোটের সমীকরণে ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
নারীর আকাঙ্খা: দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তাদের আকাঙ্খা কেবল নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করাতেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম-অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধিত্ব এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাদের ভোট মূলত তাদের ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতার প্রতীক।
ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের আকাঙ্খার গুরুত্ব: ভোটের সমীকরণ কেবল বিজয়ী দলের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। এর আসল সফলতা নিহিত থাকে জনগণের আকাঙ্খা পূরণের মাধ্যমে। যখন একটি সরকার জনগণের মৌলিক চাওয়া-পাওয়াগুলোকে গুরুত্ব দেয়, তখনই রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তি ফিরে আসে। জনগণের আকাঙ্খাকে উপেক্ষা করা হলে, তা ধীরে ধীরে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি করে, যা গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। তাই, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের আকাঙ্খা হলো সেই গাইডলাইন, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল নির্বাচনের আগে নয়, বরং পাঁচ বছরের মেয়াদকালেও অনুসরণ করতে হবে। জনগণের চাহিদা যেখানে, সেখানেই রাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রয়োজন।
উপসংহার: সমাধানের দিকে যাত্রা ভোটের সমীকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি চূড়ান্ত ফল ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় না, বরং নতুন সরকারের কাছে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তখনই উজ্জ্বল হবে, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণের আকাঙ্খাকে কেবল নির্বাচনী কৌশল হিসেবে ব্যবহার না করে, সেটিকে দেশ পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করবে।

জনগণের চাওয়া অত্যন্ত স্পষ্ট: স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, এবং সুশাসনসহ একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের এই আকাঙ্খাই ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ করে। এই আকাঙ্খাকে সম্মান জানানোর মধ্যেই নিহিত আছে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও উন্নত বাংলাদেশের জন্মসূত্র। এই গোলটেবিল আলোচনা এই আকাঙ্খাগুলোর ওপর আলোকপাত করে জাতিকে সমাধানের দিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

লেখক, সহকারী অধ্যাপক, রাস্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারী মহিলা কলেজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category