ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা এবং আকাঙ্ক্ষা। এটি কিন্তু একেবারেই কমন একটি কথা এবং সাধারণ মানুষ কী ভাবনা ভাবে, আমি ওটাই ভাবি। কারণ আমিও সাধারণ মানুষ, আমরা সকলেই সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের ভাবনা নতুন করে জানার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না, এটা আমরা সকলেই জানি ভাবনাটা কী। তাহলে নতুন করে কী ভাবনা ভাবব?
আমি খুব সংক্ষেপে কয়েকটি কথা বলব একটু ভিন্ন ধরনের। একটু খুঁজে দেখতে হবে যে, বাংলাদেশী জনমণ্ডলীর যে মানস গঠন, আমি মনে করি একজন শিক্ষক হিসেবে সারাজীবন ছাত্র পড়িয়েছি, তার এই যে পড়ানোর যে অভিজ্ঞতা, তার আলোকে আমি বলতে চাই, আমাদের যে জাতীয় মানস, এইটাকে সুস্থতার দিকে নিতে হবে। পেতে চাই তো অনেক কিছু, দিতে চাই কী? যখন আমি পেতে চাইব, আমাকে দিতে চাওয়ার একটা মানসিকতা থাকতে হবে।
একেবারে খুব নগদ একটা উদাহরণ যদি দেই, ৫ আগস্টের পর থেকে এমন একটি দিন যাচ্ছে না, দাবি কেন্দ্রিক আন্দোলন নেই। অথচ প্রায় দেড় যুগ ধরে এই দাবিগুলি সব কোমায় চলে গিয়েছিল, ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ করে আমাদের চেতনা জেগে উঠলো, সবার চাই।

যুগে যুগে ইতিহাস যা বলে, রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে যিনি থাকবেন বা রাষ্ট্র ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে যারা থাকবেন, তারা
প্রেসের সামনে যখন যাবেন, দুরুদুরু বুক নিয়ে যাবেন, ভয় নিয়ে যাবেন যে সাংবাদিক কী প্রশ্ন করবে আর আমি কী জবাব দিব, কেমন হয়ে যাবে? আমাদের দেশের সাংবাদিক সাহেবেরা কী করলেন, আমরা কী করলাম? আমরা সরকার প্রধানের সামনে গিয়ে সরকার প্রধানকে প্রশ্ন আর কী করব, আমরাই তাকে মানুষ থেকে অতি মানুুষে তুলে দিচ্ছি। আমরা সরকার প্রধানকে আর মানুষ থাকতে দিচ্ছি না, অতি মানব বানিয়ে ফেলছি, ঈশ্বর বানিয়ে ফেলছি। আর যখন কেউ ঈশ্বর হয়ে যায়, তখন তার কারো কাছে জবাবদিহিতা থাকে না। এটা কিন্তু আমরা বিগত স্বৈরশাসকের আমলে ওই কাজটা করেছি। এই জিনিসটা ভেবে দেখা দরকার আছে।
শুধু সাংবাদিকরা করেছেন তা না, আমি কবি, উনি করেন। কবি, সাহিত্যিক বা লেখকের কলমের কালি থেকে বের হওয়া কথা কর্তৃত্ববাদী শক্তিকে আতঙ্কিত করে না, বিচলিত করে না, সেই লেখা কখনো জনগণের পক্ষে লেখা হতে পারে না। হ্যাঁ? আমরা যারা কবি-সাহিত্যিক, আমরা সরকার প্রধানের আমন্ত্রণে গিয়া শীতের পিঠা খাই আর গদগদ ভাবে তাকে অনৈতিকভাবে প্রশংসা করে, তাকে আমরা আকাশে তুলে দেই।

সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, সংস্কৃতি কর্মীর সাথে আমরা শিক্ষকরাও তাই করেছি। শুধু ব্যক্তি অস্তিত্ব টিকানোর জন্য আমরা সকল জায়গাতে আপোষ করেছি। আমরা সকল জায়গাতে নতি স্বীকার করেছি। আমি শিক্ষক, এখনে প্রিন্সিপাল রয়েছেন, উনি একটা ইউনিভার্সিটির এখন ভাইস চ্যান্সেলর। দেখেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভিতরে লেখা ছিল, “শিক্ষা নিয়ে গর্বের দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ।” কেন? উনার যে নির্বাচনগুলি হয়েছে, তা নিয়ে তো লক্ষ কোটি প্রশ্ন রয়েছে, প্রশ্নগুলো সরিয়ে দিলাম। ধরেই নিলাম যে নির্বাচন ভালো হয়েছে, উনি নির্বাচিত দলের প্রধানমন্ত্রী। তাহলে উনি তো একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাহলে গোটা দেশটা উনার কেমন করে হয়ে গেল? যে “শিক্ষা নিয়ে গর্বের দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ।” সংবিধান বলছে বাংলাদেশ জনগণের, আর আমরা সবাই এক সুরে গেয়ে যাচ্ছি, “শেখ হাসিনার বাংলাদেশ”। কোথাও থেকে কোন প্রতিবাদ আসেনি। এইভাবে আমরা যখন এরশাদের সময় কোনো একজন মন্ত্রী সম্ভবত শাহ আজিজ বলেছিলেন যে, আমার নেতার প্রশংসা লিখতে গিয়ে যদি বঙ্গোপসাগরের সমস্ত পানিকে কালি করা হয়, তারপরও লেখা শেষ হবে না। এইভাবে যখন শাসককে আমরা অবতার বানাই, ভগবান বানাই, ঈশ্বর বানাই, তখন তিনি ভুলে যান যে আমি জনগণের প্রতিনিধি, জনগণের কাছে আমার দায় আছে, জবাবদিহিতা আছে। আমরা যেন তাদেরকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে তুলে না দেই। একজন খুব চমৎকার কথা বলেছেন, যিনি নির্বাচিত হবেন, টাইম টু টাইম তিনি জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন।
আরেকটি দারুণ কথা এসেছে। সেটি হলো মেম্বার অফ পার্লামেন্ট, তারা ল-মেকার। কিন্তু আমি, আপনি, আমরা সকলেই আমাদের নিজ নিজ এলাকার এমপিদেরকে দেখেছি, তিনি তার নির্বাচনী এলাকাতে গড হয়ে যান। এই এই যে গড হওয়ার প্রক্রিয়াটা থামানো যাবে কীভাবে, সেইটা নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন আছে। এমপি এসে উপজেলা চেয়ারম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করে, পৌরসভার চেয়ারম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সকলেই এমপির আজ্ঞাবহ হয়ে যায়। কিচ্ছু বলার নেই, কিচ্ছু করার নেই। আর কোনো চেয়ারম্যান যদি সামান্য প্রতিবাদ করে, তার সমস্ত বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। এই কালচারটা বন্ধ করা যায় কীভাবে? এখানে আইনের লোকজন রয়েছেন, তোমাদেরকেও বলছি। তুমি চমৎকার কথা বলেছো, তুমি ঢাকায় থাকো, কেন্দ্রে থাকো, এগুলো যেখানে বললে ফোকাস হবে সেখানে বলো। তবে এখানে প্রতীক ওমরকে ধন্যবাদ জানাই যে, খুব পেরিফেরাল হলেও, ক্ষুদ্র আকারের হলেও, এমন আয়োজন শুরু করার জন্য। কথা বলার একটা ফোরাম তো তৈরি হলো। কথা হতে থাক, কথা উচ্চারিত হতে থাক।