একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন সিফাত। গত এক মাস আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয় তার শরীরে। থাকতেন রাজধানীর মধুবাগ এলাকায়। ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে কথা হয় তার মায়ের সঙ্গে। তার মা জানান, আল্লাহ আমার ছেলেকে বাঁচিয়েছেন। তার প্লাটিলেট অনেক কমে গিয়েছিল। ওই সময় প্রতিটি মুহূর্তই ছিল আমাদের পরিবারের জন্য খুব আতঙ্কের। তিনি অভিযোগ করেন, তাদের এলাকায় সরকার মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো ভ‚মিকা নিতে দেখেননি। প্রচুর মশা তাদের এলাকায়। স্থানীয় সরকার মনে হচ্ছে- মশা নিয়ন্ত্রণের কথা ভুলে গেছে। পুরান ঢাকার আজিমপুর এলাকার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হান্নান মিয়া জানান, এবছর মশার ওষুধ কম দিচ্ছে সিটি করপোরেশন। এখনো সন্ধ্যার পরপরই প্রচুর মশা দেখা যায় তাদের এলাকায়। ফলে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। সেদিকে নজর নেই তাদের।
এদিকে, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন দেশের প্রায় সব এলাকার জনগণ। এর আগে এই রোগ রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার তা একযোগে সারা দেশে বিস্তার লাভ করেছে। গত এক সপ্তাহে সারা দেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল ২৯ জনের। আর চলতি বছরে ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে ৩০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৭৬ হাজারের বেশি মানুষ। এডিস মশা থেকে বিভিন্ন ধরনের রোগ হলেও এবার ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, দেশের সিংহভাগ এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার কাঠামো নেই। যদিও ঢাকার দুই সিটিসহ সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় কমবেশি জনবল রয়েছে। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা না করায় সেখান থেকে কার্যত সুফল মিলছে না। এর বাইরের এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বলে কিছুই নেই। এই অবস্থায় এডিসের বিস্তার যেমন হওয়ার কথা তেমনই হচ্ছে। সব মিলিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত সরকার কার্যত ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তারা আরও বলেন, ২০০০ সালে শুরু হওয়া এডিস মশার উপদ্রব এখনো বলবৎ রয়েছে। শুরুর পর প্রতিবছরই কমবেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে মানুষ। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাসসহ বহুবিধ রোগের বাহক এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে সরকার অবগত হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় তা নিরসন হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩০৭ জন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটিতেই ১৯৬ জন রয়েছেন। বাকিরা ঢাকার বাইরে মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। এর মধ্যে নারী ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং পুরুষ ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। ডেঙ্গুতে জানুয়ারি মাসে মারা গেছেন ১০ জন, ফেব্রæয়ারিতে ৩ জন, মার্চে মৃত্যু নেই, এপ্রিল মাসে ৭ জন, মে মাসে ৩ জন, জুন মাসে ১৯ জন, জুলাই মাসে ৪১ জন, আগস্টে ৩৯ জন, সেপ্টেম্বরে ৭৬ জন, অক্টোবরে ৮০ জন এবং নভেম্বরের ৭ দিনে ২৯ জনের প্রাণ নিয়েছে ক্ষুদ্র এই প্রাণী।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে কমবেশি জনবল থাকলেও বাইরের বিশাল এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণে কোনো জনবল নেই। সেদিকে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। মশক নিবারণী পরিদপ্তরকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। সেটা না হলেও সরকারকে অন্য বিকল্প ভাবতে হবে। কেননা, বাংলাদেশের মতো আবহাওয়ার দেশগুলোতে এডিস মশার প্রজনন থাকবে। সেটা হলে সিটি ও পৌর এলাকার বাইরের জনগণকেও এডিস মশার হাত থেকে বাঁচাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
কীটতত্ত¡বিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত¡ গবেষণাগারে সব সময়ই মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ে গবেষণা করা হয়। সেখানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, মাঠ পর্যায়ে এডিস মশার ঘনত্ব, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতাসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে মাল্টিভেরিয়্যান্ট অ্যানালাইসিস করে ফোরকাস্টিং মডেল তৈরি করেছে। এর মধ্যে ওই এডিস মশার ঘনত্বের আগাম ধারণা দেয়া যায়। ওই গবেষণাগার থেকে এখন পর্যন্ত যত আগাম তথ্য দেয়া হয়েছে, তার সবগুলোই সঠিক হয়েছে। তিনি জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তার নেতৃত্বে গবেষণাগারের সদস্যরা একটি মডেল তৈরি করেছেন। ওই মডেল বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে দাবি এই কীটতত্ত¡বিদের। তার মডেলে বলা হয়েছে, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়-স্বাস্থ্যকর্মী, ক্লিনার, মশককর্মী, সুপারভাইজার, সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা থাকবে। যাদের কাজ নির্ধারিত থাকবে, তারা সেগুলো যথানিয়মে পালন করবে। এসব কর্মী স্থায়ীভাবে নেয়ার প্রয়োজন নেই, আউটসোর্সিংয়েও করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত কীটনাশকের সংস্থান, রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে। তিনি আরও জানান, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু যেহেতু সিটি করপোরেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সেহেতু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের প্রতিটি জায়গায় মশক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় করা হচ্ছে। কিন্তু সেখান থেকে কার্যকর সুফল মিলছে না। মশার ওষুধ শুধু সিটি করপোরেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সব এলাকার জন্য সরকারকে এই আয়োজন করতে হবে।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)-এর কীটতত্ত¡ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, দেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভেক্টর বাহিত রোগ বিশেষ করে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলছে। ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার বাহক এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নেই। মশার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অবশ্যই তার প্রজনন স্থল নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিতে হবে। তার জন্য প্রজনন স্থল চিহ্নিতকরণের জন্য নিয়মিত সার্ভিলেন্স প্রয়োজন। প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন। আমাদের দেশে এই সার্ভিলেন্স করার কাজটি নিয়মিত সম্পাদন করত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি হেল্থ-এর আওতাধীন কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসি। এই জরিপ করা হতো প্রতিবছর তিনটি ধাপে। প্রি মুনসুন, মুনসুন এবং পোস্ট মুনসুন। অর্থাৎ বর্ষাকাল শুরুর পূর্বে একটি জরিপ করার মাধ্যমে মশার ঘনত্ব কেমন রয়েছে তা একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা পাওয়া এবং সেই ঘনত্ব অনুযায়ী স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় মশা দমনের ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করবেন। একইভাবে মুনসুন বা বর্ষাকাল চলাকালীন সময়ে আরেকটি জরিপ পরিচালনা করা হতো। যাতে, করে বর্ষাকালে বর্ধিত মশার প্রজননস্থলে মশকের ঘনত্ব অনুসারে নিয়ন্ত্রনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। একই ধারাবাহিকতায় বর্ষা পরবর্তী জরিপ করা হয় পরবর্তী বছরের জন্য কেবল প্রস্তুতি প্রয়োজন সেটার ভিত্তি রচনার জন্য। মশক দমনের ক্ষেত্রে মশার লার্ভা এবং পূর্ণাঙ্গ মশার ঘনত্ব জরিপ অত্যাবশ্যক। এটা যত বেশি বেশি হবে তত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হবে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় সিডিসি যে অর্থায়নে এটা পরিচালনা করতো তা ওপি বা অপারেশনাল প্ল্যান। যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত¡াবধানে পরিচালিত। এই ওপি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই নিয়মিত মশক ঘনত্ব জরিপের ছন্দপতন হয়েছে। ছন্দপতন হয়েছে সিডিসি এর কার্যক্রমে। তাই এসব বিষয়গুলোর উপর নজর দিতে হবে।