• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন

বুড়ো বয়সে যৌবন ভাবনা

Reporter Name / ১১০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

বিমূর্ত চিন্তা

ডাঃ এ.এইচ.এম মুশিহুর রহমান

আজ অনেকটা বছর জীবন পার করে হিসাব কষতে বসেছি। সৃষ্টিকর্তা আমাকে এ পৃথিবীতে কি অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে পাঠিয়েছেন তা আজও ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারিনি। প্রতিদিন সকালে উঠেই মনে হতো, আমার লক্ষ্য হলো বিদ্যা অর্জন করা। যখন দেখতাম নাম করা কোনো শিক্ষক আমাদের সামনে দিয়ে যেতেন। নাহ অর্থ উপার্জন করা, যখন দেখতাম রাস্তা দিয়ে কাদা ছিটিয়ে বা ধুলা উড়িয়ে কোনো গাড়ির মালিক চলে যেতেন, কখনও মনে হতো দেশ বরেণ্য ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হব। কখনও বা আনন্দ ঘন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় মনে হতো, সুরের সাগরে গা ভাসিয়ে গায়ক অথবা কবি হবো। পৃথিবীটা ভালোবাসার সাগরে ভাসবে আর আমি ভালোবাসার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকব। কখনওবা মনে হয়েছে, কিচ্ছু হবো না। আমার যত হত দরিদ্র চাচা মামার সংসারে কিছু একটা করে চাচা-চাচি বা মামা-মামির মুখে, মুহূর্তের জন্য হলেও দুর্লভ মিষ্টি হাসি বা তৃপ্তির মুচকি হাসি ফোটাবো। কখনও মনে হয়েছে, এরা এত অবুঝ কেন, ছোট ছোট বাচ্চা-কাচ্চাসহ সবাইকে অভুক্ত রেখে ক্যামনে নেশা করে, জুয়া খেলে এরা কি একবারও অনুভব করে না তার অবুঝ সন্তানেরা, অসহায় স্ত্রী, মা-বাবা, নাবালোক ভাই বোনেরা, তার দিকে চেয়ে আছে। শুধু ভালোবাসার জন্য নয়, দু মুঠো ভাতের জন্যও। করিম চাচার মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে না টাকার অভাবে, রহিম চাচার ছেলের চাকরি হচ্ছে না মামার অভাবে। রহিম চাচা কিছুতেই বুঝতে চায় না তার ছেলের মামা নয়, বরং চাকরির জন্য দরকার প্রাকটিক্যাল জ্ঞান, যা চাকরি দাতার দরকার। চাকরি দাতা, তার অফিস সাহায্য করার জন্য খুলে বসেনি। বরং তাকে যে মাইনা দেবে তার থেকে শতগুণ কামাই করে নেবে। আমরা এ ভাবে ভাবি না। আমরা ভাবি ১০-৫টা অফিস করবো, চাকরি দাতা হাওয়া থেকে টাকা এনে মাইনে দেবে।

আসলে আমাদের দরকার মেধার। আর আল্লাহ সবাইকে মেধাবী করেননি। করলে দুনিয়া চলতো না। একটা অফিসের সবাই বস হতে পারে না। আর এটাও সত্য যে ক্লাসের মেধাবী ছাত্রকে সব চেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়, সর্বোচ্চ পুরস্কারের জন্য। তাই দরিদ্রতা, অভাব,ক্ষুধা,, ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ সবই পরীক্ষার অংশ। বলবেন, একটা মানুষের কতটুকুই বা জীবন, মৃত্যু পর্যন্ত? ঠিক আছে, ধরা যাক, মানুষের আয়ু ম্যাট্রিক পর্যন্ত। তাহলে অবশ্যই শিক্ষকের শাসন, বেতের বারি, কান ধরে ওঠ-বোস করা, অবশ্যই অমানবিক অত্যাচার। কিন্তু জীবনকে যদি টেনে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মস্থান পর্যন্ত নিয়ে যান, তাহলে এসবই জীবনে উপরে উঠার বা সাফল্যলাভের অনুষঙ্গ। ঠিক তেমনি ভাবে জীবনটাকে যদি জন্ম থেকে অসীম জীবন পর্যন্ত নিয়ে যান, যেখানে মৃত্যুহীন জীবন বা জান্নাত আছে, যার খবর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা আমাদের দিয়েছেন। যেখানে সবুজ গাছ আছে, পানি আছে, স্বাভাবিকভাবেই অক্সিজেন আছে, ফলমূল আছে, আলো আছে, ছায়া আছে, অর্থাৎ বেঁচে থাকার সব অনুসংগই আছে। আমি জানি, নাস্তিক-বিজ্ঞানীরা বলবেন, আমরা তো জান্নাতে বিশ্বাসী নই, এসব আলাপ ছাড়–ন। আমার প্রশ্ন হলো, তাহলে আপনারা বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বেড়াচ্ছেন কেন? আল্লাহতো এরই খবর আমাদের দিয়েছেন। একদিন নিশ্চয়ই সেই বেহেস্ত বা বাসযোগ্য গ্রহ আপনারা খুঁজে পাবেন, কিন্তু সেখানে যাবার দুটি রাস্তা খোলা আছে। একটি ওজনদার, মধ্যাকর্ষণের শৃঙ্খলে আটকানো, শরীরটাকে ছেড়ে হালকা হওয়া, অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করা এবং টাইম টানেলে ঢুকে যাওয়া।

অথবা পার্থিব শরীর নিয়েই বিকল্প কোনো পদ্ধতিতে ভ্রমণ করা। এখনকার বিজ্ঞানীরা তাই তো করছে। নানা প্রযুক্তির পোশাক পরে, বছর ধরে প্র্যাকটিস করে, রকেটে চরে বসেছে, বাস যোগ্য গ্রহের খোঁজে। যদিও এখনও পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু প্রায় ১৫০০ বছর আগে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা. স্ব শরীরেই দেখে এসেছেন, বাসযোগ্য গ্রহ বা জান্নাত।
তাকেও কিন্তু যাবার আগে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। তিন তিনবার সিনা চাক করে, নানা যন্ত্রপাতি বসাতে হয়েছে। তীব্র গতির যানে চরার জন্য এবং মহাকাশের সময়ের সক্সেগ তাল মিলিয়ে পৃথিবীর সময়কে পিছিয়ে দেওয়ার বা এগিয়ে নেয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছে। যা এখনকার বিজ্ঞানীরা সম্ভব বলে স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, টাইম মেশিনে করে অতীতেও যাওয়া যায়, ভবিষ্যতেও যাওয়া যায়। দূর আকাশে তো বটেই।

যাক, থাক এসব গুরুগম্ভীর আলোচনা। কখনো কখনো এমন জটিল, বিমূর্ত চিন্তা মনোজগতে আসে, শত চেষ্টা করেও যার বোধ যোগ্য কোনো রূপ দিতে পারি না। কখনো কখনো ভাবনার সাগরে ঢুকে পড়ি। যে দিকেই তাকাই শুধুই ভালোবাসার আবহ অনুভব করি। নানা রং-এর ভালোবাসা, নানা অনুভূতির ভালোবাসা, মা-বাবার ভালোবাসা, স্ত্রীর ভালোবাসা, সন্তানের ভালোবাসা, ভাইবোনের ভালোবাসা, বন্ধু-বান্ধবের ভালোবাসা, সহকর্মীর ভালোবাসা। অদ্ভুত একটা অনুভূতি, চারদিকে শুধুই ভালোবাসার মিষ্টি আমেজ। এর মাঝে কেউ দুঃখের কথা বললে, তাকেই ভিন্ন জগতের মানুষ মনে হয়। বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ নেয়ামত ভালোবাসার বন্ধন। ভালোবাসার ডোরে আমরা সকলেই কি অদ্ভুতভাবে একে অন্যের হৃদয় কুঠুরে জড়িয়ে আছি। প্রত্যেকেই আমরা ভালোবাসার সৌন্দর্য প্রকাশের সুখ নিতে চাই। আমার কাছে এর চেয়ে বিস্ময়কর অনুভূতির প্রকাশ আর কিছু নাই। যখন কোনো প্রেমী গেয়ে উঠেÑ“ সিনার লগে গাঁথি রাখুম তোঁয়ারে, ও ননাইরে, কলজার লগে বাঁধি রাখুম তোঁয়ারে।”

কখনও বা ডুবে যাই দুঃখের অন্ধকারে। এ পৃথিবীতে সুখ বলে কিছু আছে, মনেই হয় না। মনে হয় মানুষের জীবনটাই দুঃখের। এখানে সুখ বলে কিছুই নাই। সকলেই নানা কষ্টে ডুবে আছেই। কারো ভাত কাপড়ের কষ্ট, কারো সন্তানের দুঃখ, কারো সংসারের, কারো কামাই কার্যের দুঃখ। কোনোভাবেই দুঃখ-কষ্ট পিছু ছাড়ছে না। জীবনে সুখ বলে কিছু আছে ধারণাতেই আসে না। মাঝে মাঝে সুখ উঁকি ঝুঁকি দেয়, তাও কয়েক সেকেন্ড বা ঘণ্টার জন্য, তার পর মিলিয়ে যায়। বিখ্যাত দাঈ নোমান আলী খাঁন ঠিকই বলেছেন, পবিত্র কোরআনেও রাব্বুল আল-আমিন পৃথিবীতে সুখের কোনো সজ্ঞা দেননি। দিয়েছেন শুধু তৃপ্তির ও কৃতজ্ঞতার। নিরবচ্ছিন্ন সুখটা তুলে রেখেছেন পরকালের জন্য।
কখনও মনে হয়, পৃথিবীতে, দেশে-সমাজে এতই নিয়ম কানুন, বাধা-নিষেধ আর আইনের ছড়াছড়ি, মনে হচ্ছে স্বাধীনতা বলতে কিছুই নাই, বিশেষ করে সংসারে। সকালে ঘুম থেকে উঠলেই আল্লাহর নামে, শুরু হয়ে গেল এত দেরি করে উঠলে কেন? বাজার কে করবে? অফিস কখন যাবে? নাস্তা নিয়ে কতক্ষণ বসে থাকবো? এই
তোয়ালেটা ধরলে কেন? ওটাতো তোমার তোয়ালে না। কতবার বলেছি পা মুছে বিছানায় ওঠো।
ও গো, শুনছো, ৫০০০ হাজার টাকা লাগবে, দাও তো, টাচ অ্যান্ড টেকে একটা জিনিস দেখে এসেছি, কিনতে হবে। কিংবা? ওটা তোমার শুনতে হবে না। ঠিক আছে একটু সুন্দর করে বললেও তো পারো, শুরু হয়ে গেল ঝড়, শেষ হলো মুষল ধারায় বৃষ্টি দিয়ে।

স্বাধীনতা যে একেবারে নাই তাও নয়। গিন্নি যখন বাপেরবাড়ী যায়, তখনই আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে, আনন্দের সীমা থাকে না। কেউ ডাকাডাকি করছে না। ঘুম থেকে উঠে দেখি ১২টা বেজে গেছে। সকালের নাস্তাটা ট্রিক্সে গেছে। ঘরটা সিগারেটের ধোয়ায় ভরে গেছে। বাজার করার জন্য কেউ তারা দিচ্ছে না। হঠাৎ করে সব কিছু যেন কেমন কেমন লাগছে- এ ভাবটা কাটানোর জন্যে বন্ধুদেরও ডাকাডাকি করছি। তারাও আসতে চাচ্ছে না। লোভ দেখাচ্ছি, আয় সারা দিন গপ্প করে কাটাবো। আমি কিন্তু খুব ভালো খিচুড়ি রাঁধতে জানি, ডিম ভাজি দিয়ে খাওয়া যাবে। দু-এক জন ভবঘুরে বন্ধু আসেও। কিন্তু দু-দিন যেতে না যেতেই বিস্বাদ লাগে পরিবেশটা, তখন মনে হয় গিন্নি কবে আসবে, মিষ্টি মধুর শাসন গুলি আবার কবে থেকে শুরু হবে?
ওগো শুনছো? কী হলো? এ দিকে আসো তো।
আমার আলাপটা আজ এ পর্যন্তই থাক। দু দিন পরেই গিন্নির বাপেরবাড়ী যাওয়ার কথা আছে, তখন না হয় সারাদিন ধরে গপ্প করা যাবে। কী ব্যাপার, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো? আসছি। যাই ভাই, না হলে ঝড় উঠে যাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category