• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২২ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের টাইফয়েড টিকা কার্যক্রম নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা

আলোচনা ডেস্ক / ১০১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশে শিশুদের টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে ভ্রান্ত তথ্য ও গুজব ছড়ানোয় জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে প্রাণঘাতী এই রোগের বিরুদ্ধে দেশের বৃহৎ টিকাদান কার্যক্রমে অংশগ্রহণের হার কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি ফ্যাক্ট চেক করেছে। এরপর তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলো মিথ্যাভাবে দাবি করছে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত টাইফয়েড টিকায় ‘রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু শরীরে প্রবেশ করানো হয়’। কিন্তু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, টিকাটি কোনো জীবন্ত টাইফয়েড জীবাণু থেকে তৈরি নয়, বরং এমন এক নিরাপদ ভাইরাস ব্যবহার করা হয়েছে যা স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, টাইফয়েড টিকা কর্মসূচি ‘অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর, যা অকাল মৃত্যু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে।’

২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত একটি দীর্ঘ বাংলা ভাষার ফেসবুক পোস্টে লেখা হয়- ‘আমি অনুরোধ করব, কোনোভাবেই যেন আপনার প্রিয় সন্তানের দেহে এই বিনামূল্যের টিকা প্রবেশ করতে না পারে। এসব থেকে দূরে থাকুন।’ এই পোস্টটি ৩,০০০ বারেরও বেশি শেয়ার হয়েছে। তাতে দাবি করা হয়, ‘এই টিকা হলো সেই রোগের জীবাণুর একটি অংশ, যেটি টিকার নামে শরীরে প্রবেশ করানো হচ্ছে।’ পোস্টটিতে আরও বলা হয়, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অজানা, আর টাইফয়েডের চিকিৎসা থাকলে টিকা কেন প্রয়োজন- তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এমন গুজব ছড়াতে শুরু করে ঠিক তখনই, যখন বাংলাদেশ সরকার ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের নিচের প্রায় ৫ কোটি শিশুকে টাইফয়েড জ্বরের বিরুদ্ধে টিকা দেয়ার জাতীয় কর্মসূচি শুরু করে। টাইফয়েড হলো স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া এক সংক্রামক ব্যাধি। টিকা গ্রহণের মাধ্যমে একে প্রতিরোধ করা সম্ভব।ভ্রমণ গাইড

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে টাইফয়েডে মৃত্যুর প্রায় ৬৮ শতাংশই শিশুদের মধ্যে ঘটে। গ্যাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের মতে, টাইফয়েড এখনো বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বাংলাদেশ পূর্বে পোলিও নির্মূলে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৪ সালে দেশটি পোলিও-মুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০২৪ সালে মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস-এর টিকাদানে যোগ্য মেয়েদের মধ্যে ৯৩ শতাংশেরও বেশি টিকা দেয়া সম্ভব হয়। তবুও, টাইফিবেভ নামের টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো গুজব অভিভাবকদের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে।

ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তিনি এএফপিকে জানান, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে শহরাঞ্চলে টিকা গ্রহণের হার গ্রামীণ এলাকার তুলনায় কমেছে। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় টিকা গ্রহণের হার যেখানে ৭০ শতাংশ, গ্রামীণ এলাকায় তা ৮৫ শতাংশ। শহরে নেতিবাচক প্রচারণা অনেক অভিভাবককে বিভ্রান্ত করেছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালে তাদের পাবলিক অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে বলেছে, টিকার নিরাপত্তা মান সন্তোষজনক হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে। ইউনিসেফের এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. আহমেদ জমশিদ মোহাম্মদ বলেন, ‘টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন একটি এক-ডোজ, অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান, যা অকাল মৃত্যু রোধে সাহায্য করে।’

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. তাজুল ইসলাম বারী ২৮ অক্টোবর এএফপিকে বলেন, ‘টাইফিবেভ টিকা স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি নয়। বরং এতে ব্যবহার করা হয়েছে এক নিরাপদ ভাইরাস সিট্রোব্যাকটার ফ্রেউনডি। এর বৈশিষ্ট্য টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিল রয়েছে। এটি শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরিতে সাহায্য করে।’

বাংলাদেশের স¤প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির সাবেক ব্যবস্থাপক ড. বারী আরও ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে ভাইরাসের প্রকৃতি বদলে গেছে। মানুষ নানা ওষুধ খায় কিন্তু পুরো কোর্স শেষ করে না। ফলে দেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। এই কারণে অনেক সময় মুখে খাওয়া ওষুধে কাজ হয় না। তাই টিকা এখন আরও জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে টিকার প্যাকেজ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে থাকতে পারে ইনজেকশন দেয়ার স্থানে ব্যথা, ফোলাভাব, লালচে ভাব, সামান্য জ্বর ও ক্লান্তি। এএফপি পূর্বেও এমন অনেক ভ্রান্ত প্রচারণা খÐন করেছে, যেগুলো টিকাদান কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category