(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)
বগুড়া শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথা থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বাংলার প্রাচীন রাজধানী পুÐ্রনগরের কেন্দ্রীয় দুর্গ। ধ্বংসপ্রাপ্ত এই দুর্গনগর বর্তমানে মহাস্থান নামে খ্যাত। মহাস্থান কেন্দ্রীয় দুর্গের (আয়তকার ২০৮ হেক্টর ভ‚পরিসীমা) বাইরে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বগুড়া সদর, কাহালু ও শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতœবিজ্ঞানীগণ ১৩২টি প্রতœতাত্তি¡ক ঢিবি (ধাপ) চিহ্নিত করেছেন (নিচের মানচিত্র দ্রষ্টব্য)। এ সকল ঢিবির মধ্যে ১৪টিতে আদি-ঐতিহাসিক যুগের এবং ৮০টিতে প্রাক মধ্যযুগের প্রতœনমুনা পাওয়া গেছে (সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ২০০৭ : ৪৯৯)। বাকিগুলিতে এখনো খনন কার্য পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।

পুÐ্রনগরীর প্রতœমানচিত্র (সৌজন্যে প্রভাসচন্দ্র সেন, ১৯২৯ সা.অ.)
বগুড়া জেলার আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে রিপোর্টে (১৯৮৬) এই ঢিবিগুলিকে স্থানিক নামেই চিহ্নিত করা হয়েছে । উপর্যুক্ত ১৩২টি প্রতœস্থাপনার মধ্যে নিচে কয়েকটি ঢিবির স্থানিক নাম পরিচিতি উল্লেখ করা হলো (বন্ধনীতে আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে রিপোর্টের ক্রমিক নং নির্দেশ করা হয়েছে) :
গোকুল ইউনিয়ন : নেতাই ধোপানীর ধাপ (২), সত্যপিরের ভিটা (৩), গোকুল মেধ (৪), কাঞ্চের ধাপ (৫), দত্ততারার ধাপ (৬), নড়িয়া ধাপ (৭), চালানের ধাপ (৮), টঙ্গির আড়া (৯), স্কন্দের ধাপ (১১), রাজা গোপিনাথের ধাপ (১২), ময়নামতি মন্ত্রীর ধাপ (১৩), মাদারের দরগা (১৪), ষষ্ঠী তলা মঠ (১৬), দোলমঞ্চ মঠ (১৭), সন্ন্যাসীর থান (১৮), বুড়ির থান (১৯), সন্ন্যাসীর ধাপ (২০), ওঝা ধনন্তরীর ভিটা (২২) ।
নামুজা ইউনিয়ন : দেউলি রাজার বাড়ি (২৩), ভগুড় ধাপ (২৬), মন্নার ধাপ (২৭), নরপতির ধাপ (২৯), সন্ন্যাসীর ধাপ (৩০), ফইলার ধাপ (৩১), বৈরাগীর ধাপ (৩৩), চাঁন্দের ধাপ (৩৪), গোঁসাইয়ের ধাপ (৩৫), কানাই ধাপ (৩৬), মঙ্গলকোট বা মঙ্গল নাথের ধাপ (৩৮), মাদারের থান (৩৯), পদ্মার বাড়ি (৪০), বিষমর্দনের ভিটা (৪১), খুল্লনার ধাপ (৪২), লহনার ধাপ (৪৩), যোগীর ধাপ (৪৪), গোদার ধাপ (৪৫), বলাই ধাপ (৪৬) ।
নূনগোলা ইউনিয়ন : ধান সুখা (৪৮), চাঁন্দের বাড়ি (৪৯), ধাপ (৫০) । ফাঁপোড় ইউনিয়ন : মঠ পুকুর (৫১), কাঁনাড় ধাপ (৫২), কাঁনাড় মঠ (৫৩) ।
এরুলিয়া ইউনিয়ন : বাসোবানিয়া সদাগরের বাড়ি (৬০) ।
রায়নগর ইউনিয়ন : মানকালীর কুÐ (৭৭), জীয়ৎকুÐ (৭৮), মুণিরঘোন (৮১), চুনার দিঘির ধাপ (৮৫), ধনার ধাপ (৮৭), মালিনীর ধাপ (৮৮), ধাপ (৯০), কানজির হাঁড়ি (৯১) ।
বিহার ইউনিয়ন : নিশানঘাটা মাদারতলা (৯৫), নরপতির ধাপ বা ভাসুবিহার (৯৭), তোতারাম পÐিতের বাড়ি (৯৮) ।
পাইকড় ইউনিয়ন : বুড়ির থান (১৫২), ঘোপা বা গোরক্ষের ধাপ (১৫৩), শালিবন রাজার কাছারি (১৫৪), চিরিঙ্গি ধাপ (১৫৫), যোগীর ভবন (১৫৬), শালিবন রাজার বাড়ি (১৫৭), আকরাইল ধাপ (১৫৮) ।
মোট ধাপ সংখ্যা = ৬১ টি ।
উপর্যুক্ত স্থাননামগুলিতে চর্যাপদ, নাথপন্থা, মনসামঙ্গল, বৈষ্ণবপদাবলী এবং পিরসাহিত্য (মাদারপির) এই চার ধরনের মিথের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ করা গেলেও মূল উদ্দীপক প্রসারণটি ঘটেছে চর্যাপদ ও নাথপন্থার। চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সাধকদের সাধন সংগীত। ৭ থেকে ১১ শতকের মধ্যে পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মূল চর্যাপদগুলি লিখিত হয়। পÐিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, চর্যাপদের ২৪ জন পদকর্তার মধ্যে অন্তত কয়েকজন (যেমন- কাহ্নপা, সরহপা, হাড়িপা, ঢেÐণপা প্রমুখ) পুÐ্ররে অধিবাসী ছিলেন।
চর্যাপদের উত্তরসূরী হচ্ছে নাথসাহিত্য। নাথসাহিত্য মূলত মৌখিক সাহিত্য। মৌখিক ঐতিহ্য থেকেই নাথসাহিত্য ষোল-সতেরো শতকে লিখিত রূপ পায়। চর্যাপদের কয়েকজন পদকর্তা, যেমন-মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ, হাড়িপা, কাহ্নপা, চৌরঙ্গী ( চিরিঙ্গা ) প্রমুখের সঙ্গে গোরক্ষনাথ, ময়নামতী, মানিকচাঁদ, গোপীচাঁদের কাহিনি সংমিশ্রিত হয়ে নাথসাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে। নাথসাহিত্যের পরিচিত কিছু মোটিফ হচ্ছে- মীননাথ, গোরক্ষনাথ, হাড়িপা, কানুপা, চৌরঙ্গী, ময়নামতী, দুর্গা, দত্ততারা, নড়িয়া, মানিকচাঁদ, গোপীচাঁদ, যোগী, যোগিনী, ভগু, মালিনী, শালিবন রাজা, দেউলি রাজা ইত্যাদি।
এ ছাড়াও নাথসাহিত্যে ৮৪ মহাসিদ্ধার কথা বলা হয়েছে। চর্যাপদের ২৪ জন পদকর্তা এই ৮৪ সিদ্ধারই অংশিজন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’য় (১৩২৩) ৮৪ সিদ্ধার উল্লেখ করে ৭৬ জনের একটি তালিকা দিয়েছেন (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৩২৩/১৪১৫ : ৩৬)। তিনি কবি শেখরাচার্য রচিত (১৩০০ – ১৩২১ খ্রি.) বর্ণন রতœাকর নামক গ্রন্থ থেকে এ তালিকা সংগ্রহ করেছেন। জার্মান পÐিত গ্রæয়েনওয়েডেল তিব্বতী উপকরণের সাহায্যে অনুরূপ ৮৪ জন মহাসিদ্ধার আর একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। তিব্বতী বৌদ্ধমতে ‘গ্রæব-ছেন গ্যাবশি’ বা ৮৪ জন মহাসিদ্ধা স্বীকার করা হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর বাংলা সাহিত্যের কথা – প্রথম খÐ (১৯৫৩/২০০৬ : ২০) গ্রন্থে তিব্বতী উৎস থেকে ৮৪ জন মহাসিদ্ধার একটি এবং কবি শেখরাচার্য থেকে ৭৮ জন সিদ্ধার আরেকটি তালিকা দিয়েছেন। নিচে ৮৪ সিদ্ধার তালিকাটি দেয়া হলো :
১. লূহি পা, লুই পা, লুয়িপা, মৎস্যেন্দ্র বা মৎস্যান্ত্রাদ। ২. লীলাপাদ। ৩. বিরূপা। ৪. ডোম্বি হেরুক। ৫. শাবর। ৬. শরহ বা রাহুল ভদ্র। ৭. কঙ্কালিপাদ। ৮. মীনপাদ বা বজ্রপাদ। ৯. গোরক্ষ । ১০. চৌরঙ্গী। ১১. বীণাপাদ। ১২. রতœাকর শান্তি। ১৩. তন্তিপাদ। ১৪. চর্মারু। ১৫. খড়গ্ পাদ। ১৬. নাগার্জুন। ১৭. কৃষ্ণচারী, কানহ পাদ বা কনপ। ১৮. কাণের, কাণারী বা আর্যদেব। ১৯. স্থগন। ২০. নাড়পাদ বা যশোভদ্র। ২১. শৃগালপাদ। ২২. তৈলিকপাদ। ২৩. ছত্রপাদ। ২৪. ভদ্র। ২৫. দ্বিখÐী। ২৬. অজোগি বা যোগিপাদ। ২৭. কড়পাদ। ২৮. ধোবী। ২৯. কঙ্কণ। ৩০. কম্বল। ৩১. টেঙ্কি। ৩২. ভন্ধেপা বা ভাÐারী। ৩৩. তন্ধী। ৩৪. কুক্কুরীপাদ। ৩৫. কুব্জিপাদ। ৩৬. ধর্ম। ৩৭. মহী। ৩৮. অচিন্ত বা অচিন্ত্য ৩৯. বভহি। ৪০. নলিন। ৪১. শান্তিদেব বা ভুসুকু। ৪২. ইন্দ্রভ‚তি। ৪৩. মেঘপাদ। ৪৪. কুঠারী। ৪৫. কর্মারপাদ। ৪৬. জালন্ধরী। ৪৭. রাহুল। ৪৮. ধর্মপাদ। ৪৯. টোকরী। ৫০. মেদিনীপাদ। ৫১. পঙ্কজ। ৫২. ঘণ্টাপাদ বা বজ্রঘণ্ট। ৫৩. যোগী। ৫৪. চলুক। ৫৫. বাগুরী। ৫৬. লুঞ্চক। ৫৭. নির্গুণশ্রী। ৫৮. জয়ানন্দ। ৫৯. পচরী বা পাচল। ৬০. চম্পক। ৬১. বিষাণ। ৬২. তেলী বা তৈলী। ৬৩. কুম্ভকার। ৬৪. চর্পটি। ৬৫. মণিভদ্রা। ৬৬. মেখল। ৬৭. কঙ্খালা। ৬৮. কলকলপাদ। ৬৯. কন্থড়ি। ৭০. দৌড়ী। ৭১. উড্ডীয়। ৭২. কপালপাদ। ৭৩. কিলপাদ। ৭৪. পুষ্কর। ৭৫. সাভিক্ষ। ৭৬. নাগবোধি। ৭৭. দারিকপাদ। ৭৮. পুত্তলী। ৭৯. উপনাহী। ৮০. কোকিলী। ৮১. অনঙ্গ। ৮২. ল²ীঙ্করা । ৮৩. সমুদ্র। ৮৪. ব্যাড়ি।
নাথসাহিত্যের উপর্যুক্ত একাধিক মোটিফ এবং ৮৪ মহাসিদ্ধার একাধিক নামের সঙ্গে উল্লিখিত ধাপনামের কয়েকটি হুবহু মিলে যায় । যেমন – গোরক্ষনাথ (ঘোপা বা গোরক্ষের ধাপ), চৌরঙ্গী (চিরিঙ্গি ধাপ), কাণের, কাণাড়ী বা আর্য্যদেব (কাঁনাড় ধাপ, মঠ ও কাঁনাড় গ্রাম – ফাঁপোড় ইউনিয়ন), যোগী (যোগীর ভবন ও যোগী ধাপ), কৃষ্ণচারী, কানহ পাদ বা কনপ (কানাই ধাপ), চম্পক (চাঁদমুহা গ্রাম, গোকুল ইউনিয়ন), নড়িয়া ধাপ, মঙ্গলনাথের ধাপ, মালিনীর ধাপ, দত্ততারার ধাপ, ময়নামতি মন্ত্রীর ধাপ, শালিবন রাজার কাছারি/বাড়ি ইত্যাদি ।
এখানে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন জাগে, উপর্যুক্ত সিদ্ধাচার্যগণ কী এ সকল ধাপে বসবাস করতেন যে, তাঁদের নামানুসারে ধাপগুলি পরিচিতি পেয়েছে? আবার এমনও হতে পারে উপর্যুক্ত সিদ্ধাগণের শিষ্য-প্রশিষ্যরা পরবর্তীতে তাঁদের গুরুদের নামানুসারে ধাপগুলির নামকরণ করেছেন এবং লোকমুখে সেইগুলিই প্রচার পেয়েছে!
মহাস্থানের আশেপাশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নাথবিষয়ক যত স্থাননাম পাওয়া যায়, বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষের আর কোনো একক স্থানে এতো পাওয়া যায় না! শুধু স্থাননাম নয়, এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির দিকে তাকালেও প্রবল নাথ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
এ অঞ্চলের মানুষ (হিন্দু-মুসলিম উভয়েই) গোরক্ষনাথকে গরু-বাছুর রক্ষাকারী দেবতা বলে মনে করে। নাথসাহিত্যে গোরক্ষনাথকে একজায়গায় রাখাল রূপে পাওয়া যায় :
গরু চড়াএ গোর্খনাথ তাহার পুরিত।/ গরু চরাএ গোর্খনাথ না খাএ অন্নপানি ।
(আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ২০১৭ : ২৪২)
সম্ভবত সে কারণেই তিনি গরু-বাছুর রক্ষার দেবতা। গাভী প্রথম প্রসব করলে মহাস্থান বা এর আশেপাশের মানুষেরা শালদুধ দিয়ে ক্ষীর রান্না করে এখানকার (পিড়াপাঠ) গোরক্ষের মন্দিরে (স্থানীয় ভাষায়- ঘোপার মন্দির) ভোগ দেয় (বেলাল হোসেন ২০১৪/২০১৮ : ২৭০)। এ ছাড়াও গরু-বাছুরের অসুখ হলে, সদ্যপ্রসূত বাছুর গাভীর দুধ পান না করলে অথবা সাপে গাভীর দুধ পান করলে (লোকবিশ্বাস) এই এলাকার মানুষ গোরক্ষের ধাপে মানত করে, ক্ষির রান্না করে গোরক্ষের ধাপে ভোগ দেয় এবং এখানকার একটুকরো মাটি একটি ত্যানায় (ছেড়া কাপড়ের ছোট টুকরোয়) করে গরুর লেজে বেঁধে দেয়। গাভীর বাট ফুলে গেলে গোরক্ষের ধাপের মাটি সেখানে লেপে দিলে বাট দ্রæত বাট ভালো হয় বলে লোকবিশ্বাস (বেলাল হোসেন, পূর্বোক্ত)।
বগুড়ায় একসময় যোগিনী ও নারী ওঝার ব্যাপক অস্তিত্ব ছিল (আবদুল মতীন ১৯৬৮ : ৬৮) । লেখক নিজেও শৈশবে তার গ্রামে (সারিয়াকান্দি উপজেলার মথুরাপাড়া হাটে) জটাধারী দুজন যোগিনীকে দীর্ঘদিন প্রত্যক্ষ করেছেন। এদের একজনের নাম সত্যভান এবং অপরজনের নাম খ্যাতাপাগুনি। শেরপুরের কেল্লাপুষি, কাহালু ও শিবগঞ্জের নিশানের মেলা মাদারপিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেও এর মূল নাথপন্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রতি বছর বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠিত মহাস্থানের সন্ন্যাসীর মেলা আজও নাথপন্থাকেই ধারণ করে আছে। এ ছাড়াও এ এলাকার মাদারবাঁশের কৃত্যানুষ্ঠান (বিভিন্ন কেরামতি প্রদর্শন- শরীর বা জিভ ফুটো করা, জীবন্ত মানুষের কবরে অবস্থান, চুলে ঢেঁকিবেঁধে নাচানো প্রভৃতি), পাতাখেলা, কার্তিক সংক্রান্তিতে ভুল্যা খ্যাদানো, মুঠরাখা, মাগন প্রভৃতি কৃষিভিত্তিক উৎসব এ অঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতি – যা অস্ট্রিকনৃউৎসজাত হলেও নাথপ্রভাবমুক্ত নয় ।
বগুড়া জেলায় একসময় যুগীরগান, মানিকচাঁদের গান, গুপিচাঁদের গান, বেলেসখির গান, চাঁদসদাগরের গান বা পালার খুব প্রচলন ছিল । বগুড়ার গ্রামাঞ্চলে এখনও মাঝে মধ্যে এসব গান বা পালার পরিবেশন লক্ষ করা যায় (১৯)। এ থেকে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন জাগে – বগুড়ায় এতো নাথপ্রাবল্যের কারণ কী ? এর উত্তরটি এ অঞ্চলের ইতিহাসের মধ্যে নিহিত রয়েছে ।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত থেকে আমরা জানি, প্রাচীন পুÐ্রনগরী ছিল বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। সম্রাট অশোকের সময়ের পূর্বেই পুÐ্রবর্ধনে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন হয়েছিল বলে মনে করা হয় (সারিতা ক্ষেত্রী ২০১৯ : ২৬৩)। সুতরাং খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দ থেকে একাদশ/দ্বাদশ শতাব্দ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার বছর বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির অনন্য লীলাক্ষেত্র ছিল এই জনপদ! কখনও এককভাবে, কখনও হিন্দু বা জৈন ও শৈব ধর্মের সঙ্গে সংমিশ্রিত আকারে এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ঘটে। এখানকার উপাসনালয় ও ধর্মীয় গোষ্ঠী সম্পর্কে হিউয়েন সাঙ (সপ্তম শতাব্দী) তাঁর ভারত ভ্রমণবিবরণীতে লিখেছেন :
এখানে কুড়িটির মতন সংঘারাম আছে। ভিক্ষু আছেন তিন হাজার প্রায়। হীনযান ও মহাযান দু’য়েরই চর্চা করেন তারা। শ’খানেকের মতো দেবমন্দির রয়েছে। বিভিন্ন স¤প্রদায়ের অন্য ধর্মাবলম্বীরা সেখানে বসবাস করেন। নগ্ন নির্গ্রন্থ উপাসকের সংখ্যা সব থেকে বেশি।
রাজধানী (মহাস্থান মূল দুর্গ) থেকে ২০লি মতন দূরে গেলে পো-চি-পো সংঘারামটি (বিহার বা ভাসুবিহার) দেখা যাবে। এর আঙিনাগুলি বড়ো ও আলোক ভরা। গম্বুজ ও মÐপগুলি খুব উঁচু। ৭০০ জনের মতো ভিক্ষু রয়েছেন। এরা মহাযান শাখার চর্চা করেন। ভারতের পূর্ব অঞ্চলের অনেক নামকরা ভিক্ষু এখানে থাকেন। অশোকের তৈরী একটি স্তূপ রয়েছে। অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্তে¡র মূর্তি থাকা একটি বিহারও দেখলাম (প্রেমময় দাশগুপ্ত, পূর্বোক্ত : ১৪০-১৪১)।
হিউয়েন সাঙের উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে বুঝা যায়, প্রাচীন পুÐ্রনগরীতে (মহাস্থানে) বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি কী পরিমাণ বিস্তারলাভ করেছিল! শুধু বিহার বা ভাসুবিহারে ৭০০ মহাযানপন্থীর অবস্থান এদের সংখ্যাধিক্যকেই প্রমাণ করে। এ ছাড়াও সোমপুর মহাবিহার, হলুদ বিহার, জগদ্দলবিহার প্রভৃতি এই জনপদের অন্যতম বৌদ্ধ স্মারক।
বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ পÐিত (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ২০০৬ : ৪০-৪১; ড. সুকুমার সেন ১৩৫৬: ভ‚মিকা ; ড. পঞ্চানন মÐল ১৩৫৬ : ভ‚মিকা ; ড. আহমদ শরীফ ২০০৫ : ৩৫০-৩৫১ প্রমুখ) নাথপন্থাকে পুÐ্ররে নিজস্ব ধর্মমত এবং নাথসাহিত্যের ভাষাকে উত্তর ও পূর্ববঙ্গের ভাষা বলেছেন। আট থেকে এগারো সাধারণ অব্দের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের ক্রমবিবর্তনের ধারায় মহাযানপন্থা থেকে বজ্রযান এবং বজ্রযান থেকে বৌদ্ধ সহজিয়াপন্থার উদ্ভব ঘটে। এই সহজিয়াপন্থা বা সহজ-যানতন্ত্র থেকেই সমকালে বা এর কিছুকাল পরে পুÐ্র জনপদে নাথপন্থার উদ্ভব হয় (আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ২০১৭ : ১১৯)।
মহাস্থানের আশেপাশে নাথপন্থাবিষয়ক যতগুলি স্থাননাম রয়েছে তার অধিকাংশকেই প্রতœতাত্তি¡কগণ বৌদ্ধধর্ম ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেছেন। যেমন- প্রতœতাত্তি¡ক উৎখননে প্রমাণ হয়েছে নরপতির ধাপ হচ্ছে- ভাসুবিহার। তোতারাম পÐিতের ধাপ হচ্ছে- বিহার (যার নামানুসারে গ্রামের নামই হয়েছে বিহার)। এছাড়া বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দভিটা, গোকুল মেড় (বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর), নেতাইধোপানীর পাট, স্কন্দের ধাপ, গোপীনাথের ভিটা, ওঝা ধন্বন্তরীর বাড়ি, মঙ্গলকোট বা পদ্মার ধাপ, খামার ধাপ, মঙ্গলনাথের ধাপ, শালিবন রাজার বাড়ি, ময়নামতীর মন্ত্রীর বাড়ি প্রভৃতি প্রতœস্থান উৎখননে এগুলো বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানা গেছে (আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ২০০৭ : ১৯৩-২০২ এবং আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে রিপোর্ট ১৯৮৬ : ৭-৮৫)। মহাস্থান কেন্দ্রীয় দুর্গের বাইরে প্রতœবিদগণ যে ৭৬টি গুচ্ছ-বসতির কথা বলেছেন সেগুলো ব্যতীত বাকি ধাপগুলি হিউয়েন সাঙ নির্দেশিত শ’খানেক দেবমন্দিরের অংশবিশেষ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ।
বগুড়ায় নাথপন্থার অন্যতম পীঠ যোগীরভবনের সর্বপ্রাচীন মন্দিরের (সর্বমঙ্গলার) নামফলক পাওয়া যাচ্ছে- “… ১০৮৯ মেহের নাথ সাদক শ্রী অভিরাম মেহেতর” এবং ধর্মডুঙ্গি – ১১৪৮ সন ও কালভৈরবী ১১৭৩ সন (প্রভাসচন্দ্র সেন, পূর্বোক্ত : ৯৯)। ১০৮৯ সন ১৬৮২/৮৩ খ্রিষ্টাব্দ হয়। ১১৪৮ ও ১১৭৩ সন যথাক্রমে খ্রিষ্টাব্দ সাল ১৭৪১/৪২ ও ১৭৬৬/৬৭ হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, নাথপন্থার একটি ভিত্তি এখানে ছিলই। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দ থেকে শুরু করে ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখানে বৌদ্ধ ঐতিহ্য সক্রিয় ছিল। ধর্মীয় রূপান্তরের পরও (ইসলামের প্রভাব) সুদীর্ঘকাল ধরে এখানকার সংমিশ্রিত বৌদ্ধ-সংস্কৃতি এ অঞ্চলের অস্ট্রিকনৃউৎসজাত মানুষের জীবন এবং সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে অনিবার্যভাবে। উপর্যুক্ত প্রতœস্থাননামগুলি সেই অনিবার্য প্রভাবের ফল।
তথ্য নির্দেশ ও সহায়ক গ্রন্থ : তথ্য নির্দেশ ফল্ট ছোট হবে
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, (ভ‚মিকা ও সম্পাদনা) ২০১৭, গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস রামন পাবলিশার্স, ঢাকা।
আবদুল মতীন, ১৯৬৮, পৌÐ্রবর্দ্ধনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (প্রবন্ধ) আজকের বগুড়া আমান উল্লাহ খান (সম্পাদিত ) বগুড়া। আহমদ শরীফ, (১৯৭৮) ২০০৫, বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য প্রথম ও দ্বিতীয় খÐ, নিউ এজ পাবলিকেশন- ঢাকা। পঞ্চানন মÐল, ১৩৫৬, গোর্খুবিজয় বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, কলকাতা। প্রভাসচন্দ্র সেন, (১৯২৯) ২০০০, বগুড়ার ইতিহাস, বগুড়ার ইতিহাস পরিষদ, বগুড়া। প্রেমময় দাশগুপ্ত, ২০১৬, হিউয়েন সাঙের দেখা ভারত অরিত্র, ঢাকা। বারিদবরণ ঘোষ, ২০১১, নাথ স¤প্রদায়ের ইতিহাস শ্রী পাবলিশিং হাউস কলকাতা। বেলাল হোসেন, ২০০৮, লোকসাহিত্যের কাঠামোগত স্বাতন্ত্র্য পূর্ববগুড়া বাংলা একাডেমি, ঢাকা। (২০১৪) ২০১৮, (প্রধান সমন্বয়কারী) বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা বগুড়া বাংলা একাডেমি, ঢাকা (প্রধান সম্পাদক- শামসুজ্জামান খান)। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ২০০৬, বাংলা সাহিত্যের কথা প্রথম খÐ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা। সারিতা ক্ষেত্রী, ২০১৯, বৌদ্ধ ধর্ম (প্রবন্ধ) বাংলাদেশের ইতিহাস আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা দ্বিতীয় খÐ, সম্পাদক- আবদুল মমিন চৌধুরী, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা। সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, ২০০৭, ঐতিহাসিক যুগে মানব-বসতি, প্রতœতাত্তি¡ক ঐতিহ্য বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (সম্পাদক), (১৩২৩) ১৪১৫, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলকাতা।
অষর, গড়যধসসধফ ধহফ ঝধিঢ়ধহ ইরশধং ইযধঃঃধপযধৎলবব, ঊফরঃড়ৎং : উৎ. ঘধুরসঁফফরহ অযসবফ, উৎ. অ.ক.গ ঝযধসংঁষ অষধস ১৯৮৬. অজঈঐঅঊঙখঙএওঈঅখ ঝটজঠঊণ জঊচঙজঞ – ইঙএজঅ উওঝঞজওঈঞ, উরৎবপঃড়ৎধঃব ড়ভ অৎপযধবড়ষড়মু ধহফ গঁংবঁসং, উযধশধ.
লেখক, গবেষক ও অধ্যক্ষ, সরকারি মজিবর রহমান ভাÐারী মহিলা কলেজ, বগুড়া