• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৬ পূর্বাহ্ন

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এক সত্যনিষ্ঠ সাধক

Reporter Name / ৯০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)

আফসার নিজাম

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ (১৯০৮-১৯৯৯) বিংশ শতাব্দীর একজন প্রথিতযশা বাংলাদেশী মনীষী, যিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, লেখক, রাজনীতিক ও সমাজসেবক। তাঁর জীবনের কর্মপ্রবাহকে একটি সুতোয় বাঁধলে ‘সত্যনিষ্ঠ সাধক’ পরিচয়টি সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। জীবনব্যাপী আদর্শিক সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত চরিত্রের একটি গভীর প্রতিফলন তার জীবন চেতন বিরাজমান রেখেছেন। তিনি এমন একজন সাধক যিনি পার্থিব লোভ-লালসা ও চিন্তার শুদ্ধতা নিয়ে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। তাঁর সততা শুধু চিন্তায় বা লেখায় সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত, কর্ম এবং জীবন প্রবাহের মধ্য দিয়ে তা বাস্তব রূপ লাভ করেছিল। আমরা যে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফকে দেখি তার এই মহৎ জীবনের ভিত্তি প্রথিত ছিলো তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং তাঁর শিক্ষাজীবনের গভীরতায়। এটিই তাঁকে একজন সাধারণ মানুষ থেকে একজন ব্যতিক্রমী চিন্তক ও সত্যনিষ্ঠ সাধকে পরিণত করেছিল।

একজন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের জীবন ছিলো ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার এক অসাধারণ সম্মিলনের প্রতিফলন। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন তৎকালীন জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি, অন্যদিকে ছিলেন আধুনিক দর্শনের একজন ছাত্র এবং সামাজিক আন্দোলনের সংগঠক। তাঁর এই অনন্য জীবনদৃষ্টির মূলে ছিলো তাঁর পারিবারিক আদর্শের প্রভাব, বিশেষত তাঁর নানা মরমি কবি হাসন রাজার দার্শনিক উত্তরাধিকার।
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১৯০৮ সালের ১ জানুয়ারি (অন্যান্য উৎসে ১৯০৬ সালের ২৫ অক্টোবর) সুনামগঞ্জ জেলার তেঘরিয়া গ্রামে তাঁর নানা হাসন রাজার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ ছিলেন দুহালিয়ার জমিদার মা রওশন হুসেইন বানু ছিলেন হাসন রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা। হাসন রাজা নিজেও একজন জমিদার হওয়া সত্তে¡ও ইসলামের মৌলিক জীবনদর্শন সুফি আদর্শের একজন নিরহংকার ও অনাড়ম্বর মানুষ। এই আদর্শের প্রত্যক্ষ প্রভাব আজরফের ওপর পড়েছিলো। জমিদার পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি আজীবন জমিদারি প্রথার বিরোধী ছিলেন এবং প্রজাদের উপর জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিকতা কোনো সমাজবিচ্ছিন্ন বিষয় ছিলো না, বরং তা ছিলো ইসলামের যে চিরন্তন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা। এটিই তাঁর ‘সত্যনিষ্ঠ সাধক’ সত্তার একটি মৌলিক দিক।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করলেও তাঁর প্রজ্ঞা কেবল একাডেমিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। তার বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষার উপর ছিলো গভীর দখল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জ্ঞান ধারার সাথে তাঁর এই পরিচিতি তাঁকে একটি সমন্বিত ও সর্বজনীন জীবনাদর্শ গঠনে সহায়তা করে। তাঁর এই বহুমুখী জ্ঞানার্জন নিছক পাÐিত্যের জন্য ছিলো না, বরং তাঁর দার্শনিক চিন্তাধারার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এটিই তাঁর ‘সত্যনিষ্ঠা’কে আরও দৃঢ় করে তোলে, কারণ তিনি বাম, সেক্যুলার চিন্তার থেকে বের হয়ে ঐশিক চিন্তার অবগাহনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জ্ঞান থেকে সত্যের নির্যাস আহরণ করেছিলেন।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এটা তার ইসলামের ইনসানিয়াত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। প্রজাদের উপর জমিদারদের জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ‘নানকার’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, যা ছিলো জমিদারি প্রথার এক কঠোর সমালোচনা। সত্যনিষ্ঠতার চরম পরীক্ষা আসে যখন পিতার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা পরিচালনা করেন। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “আমি সত্যের পক্ষে ছিলাম এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করেছি”। পিতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যে-কোনো মানুষের জন্যই একটি কঠিন সিদ্ধান্ত। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তাঁর কাছে সত্যের আদর্শ ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা পারিবারিক বন্ধনের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ রাজনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং আসাম প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন এবং আসামে মুসলমানদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ১৪৪ ধারা ভাঙার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনের কারণে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি শিলচরে দশ মাস কারাদÐ ভোগ করেন। রাজনীতিতে তাঁর অংশগ্রহণ কেবল ক্ষমতার জন্য ছিলো না, বরং তা ছিলো শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক। ১৯৪৮ সালে তিনি সিলেট থেকে প্রকাশিত ‘নওবেলাল’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে লেখালেখি করেন। এজন্য তাকে ১৯৫৪ সালে সুনামগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু তার সত্যনিষ্ঠ অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। তিনি বাংলা ভাষী মুসলমানদের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিশ’-এর ১৯৪৯ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু এই পদে বহাল ছিলেন। এই সংগঠনটিই সর্বপ্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিল।
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফকে নিয়ে আলাপের অবতারণা করার কারণ তার চিন্তার প্রাসঙ্গিকতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া। তার বইয়ের আলোচনা সূত্রপাত কিছুটা একাডেমিক আর নন একাডেমিকতার মধ্য অবস্থিত। তার দার্শনিক অবতারণা ধর্মকে আবর্তন করে। তার পর্যালোচনা কিছুটা দীর্ঘ, কখনো একঘেয়েমি। কারণ ব্যক্তি কেন্দ্রীক সরস, চমক সৃষ্টিকারী আলোচনা থেকে সামষ্টিক আলোচনা সূত্রপাত দেখা যায় তার প্রতিটি বই ও প্রবন্ধে। সমাজবাদীদের একরৌখিক পাঠ থেকে সরে গিয়ে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে তার দর্শন পাঠ করতে হবে। কারণ তিনি একাধারী সাম্রাজ্যবাদী জমিদার শ্রেণির বিরুদ্ধে অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক ধোঁয়াশারও বিরোধী। তিনি এই দুটি পন্থাকে অতিক্রম করে ইসলামের নন্দন চর্চার মধ্যে দিয়ে চিন্তা চেতনার স্বরূপ উন্মোচন করেন। সম্পর্ক, জ্ঞান, জ্ঞাত অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে ন্যাশনের মধ্যে অবগাহন করেন শুদ্ধ ঐশি^ক চিন্তা। সাম্রাজ্যবাদীদের শ্রেণিসংগ্রাম ও পুঁজিবাদীদের আন্তর্জাতিকতাবাদ বা ইন্টারন্যাশনালিজমের ডিফার করে উম্মাহ সংস্কৃতিকে হাজির করেন তার ডিসর্কোসের মধ্য দিয়ে। তিনি ব্রিটিশ খ্রিষ্টীয় উপনিবেশবাদীদের আধুনিকতাবাদ বা সমাজতন্ত্রের প্রগতিবাদকে চ্যালেঞ্জ করে ইসলামের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক পরিসীমানায় একটি ইনসাফভিত্তিক চিন্তার অবতারণা করেন। তার আলোচনায় সত্যনিষ্ঠ একটি ঐশিক অবস্থানে রেখে দুনিয়াবী বহু দাবি বিশিষ্ট, পরিবর্তনশীল চিন্তার আড়ালে গড়ে ওঠা চিন্তাকে খারিজ করে ঐতিহ্য লালিত একক সত্তার চিন্তা, প্রগতি, জ্ঞান ও যুক্তির মাধ্যমে আধুনিক বায়ানগুলো বৈধতার পাটাতন সৃষ্টি করেন। তিনি যুক্তির নিরিখে জ্ঞানকে বিভাজন, যান্ত্রিক উন্নতি এবং ইহলৌকিক জ্ঞান সূত্রকে কেন্দ্রভূত করে ঐহিক জ্ঞানের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন।

উত্তর আধুনিকবাদ চিন্তার প্রস্ফুটন হওয়ার আগেই মূলে ফিরে যাওয়ার যে তত্ত¡ সেই তত্ত¡কে আবিষ্কার করে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। যেহেতু এই চিন্তার উদ্ভব আধুনিক চিন্তাকে ডিফার করে। কিন্তু তারা আর ফিরে যেতে পারে না চিন্তার মৌল অবস্থানে। উত্তর আধুনিকতাবাদও যেহেতু আধুনিকতাবাদের সৃষ্টির কেন্দ্রমূলে সেহেতু আধুনিকতাবাদের জালে তারাও আটকে থাকে। কিন্তু আজরফ তার থেকে মুক্ত। যেহেতু তিনি স্রষ্টার সৃষ্ট তত্তে¡ বিশ্বাস স্থাপন করে তার মধ্য থেকে জাগতিক চিন্তার রূপরেখা তালাশ করে। তাই তার চিন্তা কেন্দ্রের সহজ মানুষ, শ্রেণিহীন সমাজ, এইসকল বিষয় তিনি ডায়ালেক্টিক যৌক্তিকতাকে গ্রহণ করে। এই যৌক্তিকতা নির্মাণ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ধারণ করে সত্যকে উন্মোচন করে তাই তিনি সত্যনিষ্ঠ এক সধাকে রূপান্তর হয়।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের চিন্তাধারায় ইসলাম শুধুমাত্র একটি সত্যনিষ্ঠ অবয়ব হিসেবে হাজির ছিলেন তেমন নয়। তার কাছে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বা ‘দ্বীন’ হিসেবে হাজির ছিলো। যেভাবে নবী মুহাম্মদ সা. উপস্থাপন করেছে ঐশিক চিন্তার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে। সেই চিন্তার আলোকে তাঁর চিন্তাধারা আধুনিকতাবাদের বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত হয়ে ইনসাফ কায়ের অবস্থান অবগাহন করে। চিন্তার স্ফুরণ মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে মানবতার বিকাশ এবং জীবনাবৃত্তের গুণ ও প্রবৃত্তির যথাযথভাবে সংযত, সংহত এবং ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার নিয়ামক। এই নিয়ামক যেহেতু আল্লাহ প্রদত্ত সেহেতু তাঁর দার্শনিক চিন্তায় প্রতিফলন হয়েছে ‘আল্লাহ’র ধারণা মধ্য থেকে। যা ছিল এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের কেন্দ্রীয় ভিত্তি। তিনি আল্লাহকে তার চিন্তার নন্দতত্বে কেবল একজন স্রষ্টা হিসেবে নয়, বরং সার্বভৌম শক্তি এবং বিবর্তনকারক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে জগৎ ও জীবনের সাথে পরম পাওয়ার আধ্যাত্ব বিরাজ করে। ভোগ ও জড়বাদী চিন্তার থেকে বহুদূরে বিচরণ করে। কেবল কল্যাণ কামনাই হয়ে ওঠে সত্যনিষ্ঠ সাধনের মাধ্যম।

তার এই দৃষ্টিভঙ্গি, বৈজ্ঞানিক জগতের কার্যকারণ নীতির চৎরহপরঢ়ষব ড়ভ পধঁংধষরঃু সাথে ধর্মীয় ও নৈতিক মানদÐের সমন্বয় সম্ভবপর হয় বলে প্রতীয়মান। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং তাই তার পক্ষেই বিশ্ব জ্ঞান বা অনন্ত জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সম্ভব। এটা কেবল ইসলাম অনুসরণ করেই মানুষ সত্যিকার মানবতাবাদী হতে পারে এবং ‘ইনসানে কামেল’ বা পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হতে পারে। এই দর্শন নিছক বিমূর্ত তত্ত¡ালোচনা নয়, বরং তা ছিলো মানুষের জীবন ও সমাজের কল্যাণের জন্য একটি প্রায়োগিক দিকনির্দেশনা। যেখানে তিনি জমিদার ঘরের সন্তান হয়েও জমিদারির বিরুদ্ধে অবস্থান করেছেন। তার চিন্তা চেতনায় বিরাজ করেছে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সার্বভৌম। ব্রিটিশ খ্রিষ্টীয় চিন্তার বা আধুনিক চিন্তাধারায় জমির প্রকৃত হকদার না হয়েও পুঁজিবাদী শোষক দখলদারি কায়েম করে। তাকে চিন্তা চেতনায় ও প্রায়গিকভাবে প্রতিহত করা ইনসাফ কয়েক করা। এই চিন্তার স্ফুরণ তার সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজচিন্তা মূলক লেখনী সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি ও শিক্ষার মধ্যে বিরাজ করে।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ইসলামী চিন্তার প্রতিফল হিসেবে দুনিয়াকে শস্যক্ষেত্র হিসেবে কবুল করেছেন সেই প্রাসফেকিটভে তিনি সুফি মতবাদের ওপর গভীর গবেষণা করে এই দর্শনের আলোকেই জীবনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মরমি কবি হাসন রাজার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে আধুনিক দর্শনের সাথে সংযুক্ত করে একটি নতুন সমন্বিত দর্শন উপস্থাপন করেন। এই দর্শনে তিনি আল্লামা ইকবালের ‘খুদি’ ঝবষভযড়ড়ফ এবং ইবনুল আরাবির ‘ইনসানে কামেল’ চবৎভবপঃ গধহ দর্শনের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। আজরফের এই চিন্তাধারায় এরাবিক ও ভারতীয় চিন্তাধারার সমন্বয়ে গঠনে হলেও আধুনিক ইউরোপীও চিন্তার ধারার সংমিশ্রণ প্রতিফলিত হয়েছে। তিনিও ইউরোপীও চিন্তাধারার মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন বর্ণ হিন্দুত্ববাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা ইনসাফের প্রশ্নসমূহ।

তাঁর মতে, দুনিয়াকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হলে বা পরিপূর্ণ মানুষ হতে হলে আধ্যাত্মিক সাধনা অপরিহার্য। এই সাধনা মানুষকে তার সত্তার অন্তর্নিহিত শক্তি ও সৌন্দর্যকে জাগ্রত করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি দুনিয়ার কামিয়াবি কায়েম করতেও সহায়তা করে। তাঁর দর্শনের মূল লক্ষ্য ছিলো এমন একজন মানুষের দেখা পাওয়া, যার মধ্যে হৃদয়ের আবেগ, গতির বেগ এবং যুক্তির প্রজ্ঞা একসাথে সহাবস্থান করবে। এটিই আধুনিক যুগের ভোগবাদীতা এবং যন্ত্রসর্বস্বতার বিপরীতে একটি উন্নত জীবনের রূপরেখা প্রদান করে, যা তাঁর দর্শনকে চিরন্তন প্রাসঙ্গিক হিসেবেও হাজির করে। তার সকল চিন্তা কুরআনের কৈফিয়তের মধ্য দিয়ে যেতে হয় বলে দুনিয়াবী বিচিত্রতা গ্রাস করতে অকৃতকার্য হয়। কারণ আল্লাহ প্রদত্ত চিন্তার বিপরীতে ইনসানিয়াত বা ইনসাফ কায়েম হতে পারে না। ইনসাফ কায়েম করতে হলে এই চিন্তার মধ্য দিয়ে যেতে হবে বস্তুত স্রষ্টাই সৃষ্টির প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে অকিবহাল।

ইনসানিয়াত কায়েম করতে হলে ক্ষুদ্র ইতিহাস থেকে বৃহৎ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মানুষের মধ্যে যে ক্ষুদ্র মানুষ বিরাজ করে তার থেকে সহজ মানুষ বা মহৎ মানুষে রূপান্ত হতে হয়। মহৎ মানুষে রূপান্তর হতে হলে তাকে ভোগবাদী চিন্তার থেকে বের হয়ে আধ্যাত্মিক চিন্তার মধ্যে ফানা হতে হয়। এই ফানা হওয়ার মধ্যেই মানুষের কল্যাণ নিহত আছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি মনে করতেন মহৎ মানুষে রূপান্তর হতে মানুষকে জুলুম করা তেকে বিরত থাকতে হয় বরং ধাবিত হতে হয় কল্যাণের দিকে। যন্ত্রসর্বস্বতার মধ্য দিয়ে মানে পেশিশক্তি চর্চার মধ্য দিয়ে কারো কল্যাণ সাধন করা সম্ভবপর নয়। ভোগবাদী যাত্রিকতার কারণে সহিংসতা ও রক্তপাতের সূচনা হয়। মানুষের তারবিয়াত খারাপ হয়। চিন্তার মধ্যে বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি হয়। চিন্তার এই পতন তাকে মর্মাহত করে। তিনি দুনিয়াবী গলিতে আটকে পড়া মানুষকে শুদ্ধ চিন্তার মধ্য দিয়ে শেকড়ের দিকে ধাবিত করেন। আর হারানো আধ্যাত্মিক জীবনকে পুনঃব্যবহারের ন্যারেটিভ হিসেবে হাজির করেন। যে ন্যারেটিভ তাকে সত্যনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে সমাজে বিরাজ করার সুযোগ তৈরি করে।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ দর্শনের প্রতি সমাজের প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তিনিই প্রথম জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, “দর্শনের ছাত্র মাত্রই নাস্তিকতা নয়”। এই উক্তিটি ছিলো তাঁর সময়ের জন্য অত্যন্ত বিপ্লবী, কারণ এটি দর্শনকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন না করে বরং যুক্তির আলোকে সত্যের অনুসন্ধানের একটি বৈধ পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। আর এই দার্শনিক সত্যকে সমাজে স্টাবিøষ্ট কারার ব্রতে তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন। লিখেছেন, বলেছেন এবং নিজের জীবনে প্রতিপালন করেছেন। তিনি মনে করতেন, দর্শনের কাজ কেবল তত্ত¡কথা বলা নয়, বরং “দর্শন সমাজকে সচেতন করে তোলে”। তাঁর মতে, দর্শন মানুষকে তার জীবনের উৎপত্তি, সমাজের পরিচালনা এবং চিন্তাধারার পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে, তিনি দর্শনকে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখতেন, যা মানুষের আদি প্রশ্নগুলোর সমাধান খুঁজে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

বামপন্থা, প্রগতিবাদী সেক্যুলার, বর্ণহিন্দুবাদ সংস্কৃতি দেশের চিন্তা চেতনায় শোষণ ও শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চরম ফ্যাসিবাদের মধ্যে আবর্তন করেছেন। তার থেকে মুক্তি, ইনসাফ কায়েমের জন্য দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ মনকে জাগিয়ে তুলতে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে, বাম সেক্যুলার, পুঁজিতান্ত্রীক চিন্তা-কাঠামো থেকে বের হয়ে আসতে সর্বোপরি মানুষের মুক্তির পথগুলো বাতলিয়ে দিতে সহায়তা করেছেন। তার লেখাগুলো পাঠের মাধ্যমে পায়ের নিচে জমিন দৃঢ় হবে। তার পাটাতনে দাঁড়িয়ে ইনসাফ কায়েম সহজ হয়। ভোগবাদী দুনিয়া থেকে ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ পুণণির্মাণ, বুদ্ধির মুক্তি ও বিকাশ সহজতর হয়। স্রষ্টার মনীষা, ঐহিক প্রজ্ঞা ও প্রাগ্রসরমান বিজ্ঞান চেতনা, মানবিক ও কল্যাণমূলক পৃথিবীর কাঙ্গা এবং ব্যক্তি সমাজ ও সাহিত্য ন্যায়বিচারের ফ্রয়ডীয় মনস্তত্তে¡র থেকে বেরিয়ে কল্যাণময় চিন্তার মনস্তত্বকে প্রাধান্য দেয়ার শক্তি সঞ্চয় হয়। ভোগবাদিতা, নৈতিক স্খলন এবং আদর্শিক শূন্যতা প্রকট সময়ে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের মতো একজন ‘সত্যনিষ্ঠ সাধক’-এর জীবন ও দর্শন অনুসরণ সমাজের প্রগতিকে চিহ্নিত করে। তাঁর দর্শন আমাদের পথচলার চিন্তার সীমানাকে উন্মোচন করে স্রষ্টাকেন্দ্রীক অপার আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং সামাজিক দায়িত্বের প্রতি অনুগামী করে তোলে। তার চিন্তার যে মানবিক ও নৈতিক সমাজ গঠনের ইলিমেন্টস প্রথিত আছে তা আজও আমাদের কাছে একটি অনুসরণীয় আদর্শ।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (১৯৩৬), আবুজর গিফারী কলেজ (১৯৬৭), ‘দারুল উলুম ইসলামিক একাডেমি’ [ইসলামিক ফাউন্ডেশন] (১৯৫৮)। কওমের চিন্তাধারাকে বিকাশ করার লক্ষ্যে তিনি অসংখ্য বই লিখেছেন তার মধ্যে : তমদ্দুনের বিকাশ, সত্যের সৈনিক আবুজর, ইতিহাসের ধারা, নতুন সূর্য (গল্প গ্রন্থ), ব্যাকগ্রাউন্ড অব দি কালচার অব বেঙ্গল, জীবন সমস্যার সমাধানে ইসলাম, ফিলোসফী অব হিস্টোরি, সায়েন্স অ্যান্ড রেভেলিউশন, ইসলামী আন্দোলন যুগে যুগে, আবুজর গিফারী (ইংরেজি), ইসলাম ও মানবতাবাদ, সন্ধানী দৃষ্টিতে ইসলাম, দর্শনের নানা প্রসঙ্গ, ব্যক্তিত্বের বিকাশ আজাদী আন্দোলনের তিন অধ্যায়, আমাদের জাতীয়তাবাদ, মরমি কবি হাসন রাজা, মানুষের আদি প্রবৃত্তি ও অন্যান্য, কবির দর্শন, ভাববাদ যুগে যুগে, বিশ্বসভ্যতায় আল্লামা ইকবালের অবদান, ইতিহাসে উপেক্ষিত একটি চরিত্র, ইসলামিক মুভমেন্ট, ধর্ম ও দর্শন, অতীত জীবনের স্মৃতি, নয়া জিন্দিগি (উপন্যাস/ ২ খÐে), বিজ্ঞান ও দর্শন (৩ খÐে), অতীত দিনের স্মৃতি, জীবন নদীর শেষ বাঁকে, আত্মজীবনী, সিলেটে ইসলাম, সোনাঝরা দিনগুলি প্রভৃতি প্রধান। তিনি জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও পদক পেয়েছেন। যার মধ্যে স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮১), নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৮৪), আন্তর্জাতিক মুসলিম সংহতি পুরস্কার (১৯৮৫), ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্বর্ণপদক (১৯৮৯), ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৯১), কবি মোজাম্মেল হক পুরস্কার (১৯৯১), একুশে পদক (১৯৯২), জাতীয় অধ্যাপকরূপে নিযুক্তি (১৯৯৩), মাওলানা আকরাম খাঁ স্বর্ণপদক (১৯৯৩), জালালাবাদ স্বর্ণপদক (১৯৯৪), ভাসানী পুরস্কার (১৯৯৫), শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকর পুরস্কার, স্বপ্লাবেশ পুরস্কার প্রভৃতি।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তার চিন্তার মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধ সুস্থ জীবন বোধকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। কওমের ক্রান্তিলগ্নে প্রজ্ঞা ও মননশীলতার চর্চার মাধ্যমে মানুষে যেনো মানুষের কল্যাণ সাধনা করতে পারে তার প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। কারণ পৃথিবীতে মানুষের প্রধান কাজ আল্লাহ প্রতত্ত¡ দ্বীর আলোকে মানুষের কল্যাণ সাধন করা। মানুষের কল্যাণ করার মধ্য দিয়েই নিজের কল্যাণ সাধন করা যায়। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সেই শুভ বুদ্ধিকে জাগ্রত রাখার জন্য সত্যনিষ্ঠ সাধকের ভ‚মিকা পালন করেছেন।

লেখক, কবি, ছড়াকার, চিন্তক ও সম্পাদক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category