(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিয়ের পরে পড়াশোনা, আর্থ-সামাজিক বা পেশাগত কারণে প্রায়ই দম্পতিদের পৃথক থাকতে হয়। সন্তানসমেত অথবা সন্তান ছাড়া। পুরুষেরা সখ করে নিজেদের ম্যারিড ব্যাচেলর বলে আখ্যায়িত করে। এতে সাময়িক ও কিঞ্চিত স্বাধীনতা অর্জন হলেও আখেরে ফল খুব একটা মধুর হয় না।
একত্রে থাকার ইতিবাচক দিক:
১. সম্পর্ক ও বন্ধনের মজবুতি অর্জন। ২. পারস্পরিক সহযোগিতা। ৩. পারিবারিক ঐকতান। বিচ্ছিন্নতার নেতিবাচক দিক:
১. বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর ঝুঁকি। ২. সন্তান লালন-পালনে সমস্যা। ৩. আবেগীয় অস্থিতি
একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক-
বিবাহ বা সম্পর্ক ব্যাপারটা আসলে কী বা কেমন? আপনারা কী মনে করেন?
সম্পর্ক তৈরি হয় দুজন মানুষকে ঘিরে। সম্পর্ক হল দুটি জীবনের ঐকতান, ইচ্ছা-আকাঙখা-স্বপ্ন আরও কত কিছুর সম্মিলন! কাছাকাছি বা একত্রে থাকাটাই সম্পর্ক গড়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সম্পর্ক গড়ে ওঠার সময়টাতে যদি আপনি আলাদা থাকার চিন্তা করেন, সেটা যে কারণেই হোক, আপনার সম্পর্কের দফারফা ওখানেই হয়ে যাবে। বাংলাদেশেরই একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মসূত্রে সঙ্গী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে বিবাহিতদের মধ্যে ৬৪.২% পুরুষ, ৮.৬% নারী পরকীয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়ে।
ফল কী হল? দুজনে মিলে একটি টিম না হয়ে আপনারা হয়ে গেলেন একেকটি বিচ্ছিন্ন জগত, নির্জন দ্বীপ যারা একাকী নিজের জীবনের বোঝা বয়ে বেড়াবেন। কালেভদ্রে কেবল প্রয়োজন আর স্বার্থের তাগিদেই আপনাদের কথা হবে কিংবা সাক্ষাত!
অবস্থা আরও জটিল থেকে জটিলতর হতে পারে যখন কোলজুড়ে সন্তান আসে, শুরু হয় প্যারেন্টহুড। সন্দেহ নাই, শিশুর প্রাথমিক দিনগুলোতে মায়ের ভ‚মিকাই প্রধান, বাবা খুব সীমিত ভ‚মিকা রাখতে পারে। আচ্ছা বলুন তো? ইদানিং বাচ্চা লালন-পালন কেন এত কঠিন হয়ে পড়ছে?
কারণ বাচ্চা লালন-পালন তো একটি টিমওয়ার্ক। এখন আপনার তো টিম নাই। আপনি একা। একাই চেষ্টা করছেন বাচ্চাকে যথাসম্ভব সঠিকভাবে বেড়ে তুলতে। কিছু নির্দিষ্ট জিনিস আছে যা শুধু বাবাই শেখাতে পারে। কিছু আবদার কেবল বাবাই পূরণ করতে পারে। নিয়ম-কানুন, শিষ্টতা বাবা শেখাতে পারে। বাচ্চা ছেড়ে আলাদা থাকেন যারা, খেয়াল করবেন, দেখবেন বাচ্চার সাথে আবেগীয় বন্ধন ধীরেধীরে কমে যাচ্ছে, সে আপনাকে আগের মতো শুনছে না, যত বড় হচ্ছে আদেশ-নিষেধ মানতে চাচ্ছে না। কিন্তু যখন আপনি এই উপলব্ধি করবেন, তখন জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে!
মায়েদের ক্ষেত্রে যা হয়, আপনি একজন স্ত্রী ও মা, আপনি তো একজন মানুষও। আপনি তো আপনার স্বভাব-প্রকৃতিকে অস্বীকার করতে পারবেন না। আপনি একাই সকল বার্ডেন কিভাবে নেবেন? আপনি একাই বাচ্চাদের পধৎৎু করতে পারবেন না। আপনি অবশ্যই ভধষষ করবেন। আপনি কি খেয়াল করেছেন, দিন দিন আপনি রৎৎরঃধনষব, টক্সিক হয়ে যাচ্ছেন? এবং হাজবেন্ড থেকে দূরে থাকার সময়ের সাথে সমানুপাতিক হারে তা বাড়ছে, যদিও আপনাদের মধ্যে সম্পর্ক খুব ভালো। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সঙ্গী থেকে বিচ্ছিন্ন বসবাস করে তাদের মধ্যে ৭ গুণ বেশি বিষণœতা ও উদ্বিগ্নতা কাজ করে।
আপনি ক্রমাগত একা হয়ে যাচ্ছেন, নিঃসঙ্গ বোধ করছেন। তখন কী ঘটতে পারে বলেন দেখি? মানুষ তখন কথা বলার জন্য একজনকে খোঁজে, যার সাথে ছোটখাটো দৈনন্দিন অনুভ‚তি, অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করা যায়। আপনি হয়তো তার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি করতে রাজি নন কিংবা প্রস্তুত না কিন্তু কথা বললে ভালো লাগে, স্বস্তি পান। এভাবে অন্য একটি সম্পর্কে জড়ানো অস্বাভাবিক নয় এবং এটি স্বামী, স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রে সত্য। এবং আপনি ক্রমাগত ভার্চুয়াল রিলেশন, স্মার্ট ফোন, সোশাল মিডিয়া সার্ফিং এর কারণে আপনার শিশুর মনোজগৎ ও ব্রেইন দখল করে বসছে বিজাতীয় আদর্শ, কৃষ্টি, কালচার, কারণ আপনি তাকে সময় দিতে পারছেন না।
সুতরাং আপনারা দেখতে পেলেন, একটি সুস্থ জীবনের ভিত্তি হল সুস্থ সম্পর্ক, যেখানে স্বামী-স্ত্রীকে একটি টিম বা ইউনিট হিসেবে কাজ করতে হবে। আচ্ছা একসাথে থাকলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে? সেখানে কি কোন সমস্যা নতুন করে তৈরি হবে না? অবশ্যই নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হবে। নঁঃ ঃযবৎব রং ধ ঢ়ৎড়নষবস, ঃযবৎব রং ধ ংড়ষঁঃরড়হ। সমস্যা ছাড়া কোন জীবন বা কারো জীবন আছে কি? বিষয়টা আপনাদের উপরে ছেড়ে দিলাম, কোন সমস্যা সলভ করবেন, আর কোনটা ইগনোর করবেন?
লেখক, কলামিস্ট ও মনোরোগ বিষেজ্ঞ