দীর্ঘদিন থেকে আমরা দেখি না সুশীল সমাজ। সমাজের দর্পণ বাংলাদেশীও সুশীল সমাজ। বলতে গেলে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের সুশীল সমাজ বা যাদেরকে আমরা বুদ্ধিজীবী বা বুদ্ধিবৃত্তিক বলে গণ্য করা হতো তারা মোটামুটি দ্বিখণ্ডিত বা নানা খণ্ডে বিভক্ত হলেও রাষ্ট্রের চরম সংকট মুহূর্তে তারা একীভূত হয়ে শাসকদের পাশে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার অখণ্ড রক্ষার্থে সৎ-বস্তুনিষ্ঠ ও নানাভাবে দেশের চরম বিপদ থেকে রক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কালের পরিক্রমায় সেইসব বুদ্ধিজীবী বা সুশীল সমাজ আজ আর চোখে পড়ে না। আমাদের সুশীলগণ কেনাবেচার দলে বা রাজনৈতিক দলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই সুশীলরাই স্ব-স্ব বুদ্ধি বিবেক বিক্রি করে লাটবাবু সেজে ঘাপটি মেরে বসে আছে। বলতে গেলে তাদের আর চোখে পড়ে না।
এই অপকালচার শুরু হয়েছে মূলত আওয়ামী সরকারের যুগে। পতিত সরকার দেশের সুশীল সমাজের আঁতুর ভূমি বলে কিছু আর অবশিষ্ট রাখেনি। লন্ডভন্ড করে দিয়েছে সুশীল নামক শব্দটি। দেশের সিনিয়র সিটিজেন বলে খ্যাত এই সমাজকে রাষ্ট্রের ভেতরে বহুধা ভাঙ্গনে ভেঙে ফেলেছে । অর্থ, অবাঞ্ছিত ও অবারিত ক্ষমতা, পদ পদবির লোভ দেখিয়ে রাষ্ট্রের সবগুলো সাংবিধানিক অবকাঠামো চুড়ান্তভাবে গুড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে বিশেষ করে গত পনেরো বছরে রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ সচিবালয়, বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র বিভাগ, যাদের হাতে দেশের জনগণকে দেখভাল করা ও রক্ষা করার দায়িত্ব স্বৈরতান্ত্রিক সরকার প্রায় সকল বিভাগকে দলীয় করণ করে জনগণের রক্ত পিপাষুতে পরিণত করেছে।
দেশের এই সংকটাপূর্ণ মুহূর্তে একমাত্র আস্থার স্থল দেশের বুদ্ধিজীবী, সুশীল ও সাংবাদিক সমাজÑতারাও যখন অর্থের কাছে মাথা বিকিয়ে সরকারের তাঁবেদার হয় তখন এ সমাজ অন্ধকারই বলা চলে। ফলে দেশরক্ষার দায়িত্ব নিতে হয়েছ বিবেকবান ছাত্র সমাজকে ও জনসাধারণকে।
আজ যারা বিভিন্ন মিডিয়ায় বীরত্বের সাথে কলাম লেখেন, টকশোতে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেন, তাদের আলোচনা-সমালোচনা শুনলে বা তাদের রাজনৈতিক কলাম পড়লে মনে হয় তারা পতিত সরকারের রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হয়ে বিবৃতি দিচ্ছে। দেশের জনগণ বর্তমানে নানাবিধ সংকটাপূর্ণ অবস্থা থেকে কীভাবে উদ্ধার হবে, তার কোনো রূপরেখা বা সমাধানের পথ কথিত সুশীরগণ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা বিশেষ করে জনগণের মৌলিক চাহিদাÑসামাজিক নিরাপত্তা, লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, আইন শৃঙ্খলার অবনতি, দেশের ভেতর ও সীমান্তবর্তী একই পরিণতিতে মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এর ভেতরে চালছে প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা খুন ধর্ষণের মতো লোমহর্ষক নিত্য দিনের ঘটনা। আমরা লক্ষ্য করছি, এসব রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও কোনো তৎপরতা নেই। দেশের মানুষকে এক পাগলা ঘোড়া তার খুরে পিষিয়ে মারছে, অথচ দেখার কেউ নেই।
বলছিলামÑএ রকম অরাজক পরিস্থিতির মুখে সুশীল সমাজের ভূমিকার কথা। প্রবাদে আছেÑ’ কেতাবে গরু আছে, বাস্তবে নেই’। বর্তমান সময়ে আমরা এটাই দেখছি। অজস্র সুশীল দেশে ঘুরছে-ফিরছে, কিন্তু তাদের মুখের আদল, ভাষা ও চরিত্র বর্তমানে পাল্টে গেছে। বিকৃত এইসব সুশীল খুব দাপটের সাথে লিখছে প্রায় সব মাধ্যমে, কিন্তু কি লিখছে তা পরিষ্কার বা বুঝবার উপায় নেই। অধরা সব লেখার উদ্ধার করা পাঠকের জন্য বড় কঠিন। তাদের লেখার মধ্যে সারবস্তুও তীব্র অভাব। বাতাসের মতোÑএকবার এদিকে তো আরেকবার ওদিকে দোলে। আদতে কারপক্ষে তারা কথা বলছে তাও উদ্ধার যোগ্য নয়। বেশিরভাগ লেখায় পতিত স্বৈরচার সরকারের পেটুয়া বাহিনীর দিকে ঝুঁকে থাকছে। আমি বিশ্বাস করি ভয়ে নয়, অঢেল অর্থের বিনিময়ে তারা বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকার এবং দেশে যে-সব রাজনৈতিক দল সক্রিয় আছে তাদের বিপক্ষে যেন তাদের কলম শানিত। সাদা চোখে এটুকু বোঝা যায়, তারা চাইছে স্বৈরশাসকের দল আবার ফিরে আসুক। তাদের ভাষায়Ñনা হলে নাকি দেশ রসাতলে তুলিয়ে যাবে।
এটা পরিষ্কার যে, তাদের লেখায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার কথা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। তাদের মিশন ও ভীত এতোটাই মজবুত যে তাদের বডি ল্যাংগুয়েজ বুঝিয়ে দেয়, তারা পতিত সরকারের প্রেতাত্মা এবং প্রতিনিধি হয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন টকশোতে অংশ নেয় এমন সুশীল বা কথিত বুদ্ধিজীবী পলাতক আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে এক ধরনের চাপ বা জনগণকে উত্তেজক পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছে বীরদর্পে। তাদের কথাবার্তার মধ্যেও কোনো রাখঢাক নেই। মূলত এরাই দেশের মধ্যে প্রতিনিয়তই উত্তেজক বীজ রোপণ করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে চলেছে। আমরা লক্ষ্য করছি প্রায় প্রতিদিনই পলাতক স্বৈরশাসকের পালিত সুশীলরা এখনো প্রায় সবগুলো মিডিয়া দখল করে স্বৈরাচারের পক্ষে অবাধে গুণকীর্তন করে চলেছে।
এতোদিন যাদের ভাবা হতোÑ’এরা বোধ হয় নিরপেক্ষ, দলবাজি রাজনীতির বাইরে’ তারা এখন নিজেদের কথিত ভদ্রতার খোলস ছেড়ে ফ্যাসিস্ট দলের পক্ষে গুণগান শুরু করেছে। গত দেড় দশকে এই ঘামটি মেরে থাকা সুশীলরা উস্কে দিচ্ছে সারাদেশে ঘামটি মেরে থাকা নব্য আবিষ্কার ’মব’ কালচারকে জীবন্ত করতে। আমরা লক্ষ্য করছিÑ এই ঘাপটি মারা সুশীল সমাজ একেবারে ছোট নয়, বরং তারা বুঝাতে চাইছেন এবং কথিত জরিপ চালিয়ে দেখাতে চাইছেন, দেশের আটত্রিশ পারসেন্ট জনগণ ফ্যাসিস্টদের পক্ষে রয়েছেন যারা নাকি সবাই আওয়ামী লীগের। এরা আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকবেন! কতটা বিভ্রান্ত ও অশুভ যুক্তি তারা দাঁড় করাচ্ছে জনগণের সামনে! ভাবতে অবাক হতে হয়!
আমরা গত পনেরো-ষোলো বছর দেখেছি, তৎকালীন ক্ষমতাশীন দল দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত এমন কোনো দপ্তরের কর্মরত ব্যক্তি বা পতিত দলের কমিটি নেই যারা আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেনি। এই সুযোগ সুবিধা ও অঢেল ভোগের মাধ্যমে ভিন্ন মতের উপর অমানুষিক অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, গুম খুন, মামলা-হামলা করেনি। এমন কি তাদেরকে বাড়িতে পর্যন্ত থাকতে দেয়নি।
এখন প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘ সময়ে ভিন্ন মতের জনগণ যখন দিনের পর দিন ক্ষমতাসীনদের অত্যাচারে যখন নাস্তানাবুদ তখন এই কথিত সুশীল সমাজ কোথায় ছিলেন, যারা এখন নিপীড়কদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বীরত্বের সাথে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বড়ো বড় বুলি ঝাড়চ্ছে? এরা কত টাকা খেয়ে বা কতটা অর্থের বিনিময়ে পতিত হাসিনা সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ধারাবাহিকভাবে গণবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে মিডিয়াতে, দিচ্ছে অশুভ মন্তব্য। সবার আগে এদের এই সব সমাজবিরোধী, ধান্ধাবাজ, ঘুসখোর, পেটুয়া বাহিনীকে চিহ্নিত করা দরকার। কারণ এরা গা-ছাড়া বেঁধে অহেতুক ইস্যু তৈরি করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির মিশনে নেমেছে।
আমরা জানি পতিত সরকারে অর্থের অভাব নেই। রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা তারা লুটপাট করেছে। যারা দেশের ভেতরে সমস্ত সেক্টরে ঘাপটি মেরে এতোদিন ছিলেন তারাই এখন কিছুটা অর্থ দেশের প্রান্তে প্রান্তে এমনকি গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে দিয়ে বর্তমান সরকারে অর্গান বা সবগুলো কমিশনের প্রধান বা কমিশনের মুখ্য সদস্যদের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অলস করে অরাজকতা তৈরিতে ঝিমিয়ে রেখেছে। ফলে দেশে আইন পরিস্থিতি অবনতি ঘটছে অহরহ। আর কথিত সুশীলরা জোর দিয়ে বলছেনÑ আওয়ামী লীগ ছাড়া আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রতিটি দলের ভেতরে তারা এজেন্ট পুশ করেছেন, যারা এতোদিন আওয়ামী লীগের নাম শুনলে তীব্র প্রতিবাদে মুখর ছিলেন , তারাও এখন মিনমিন করে কথা বলছেন। কী রাজনৈতিক দল, কী সামাজিক-সাস্কৃতিক সংগঠন, কী শিক্ষক সংগঠন সবাইকে লেলিয়ে দিয়েছে দেশে অরাজক পরিবেশ সৃষ্টিতে।
সুশীলদের এমন নগ্ন ভূমিকা গত পঞ্চান্ন বছরে আমরা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এই সব স্বঘোষিত জাতীয় ক্রিমিনালদের চিহ্নিত করে সময় মতো বয়কট-সমূলে উৎপাটন ও দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে যারা পতিত সরকারে অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর, তাদেরকেও চিহ্নিত করা দরকার বলেও সাধারণ জনতা মনে করেন।