• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ন

পেশাদার আচরণ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী -জেদান আল মুসা

Reporter Name / ১৮০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বিশেষ সাক্ষাৎকার

বগুড়া জেলা দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা, যেখানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সবসময় আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে বগুড়ার পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।
বগুড়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলেছেন বগুড়ার পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা। নিচে তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

আলোচনা: বগুড়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
জেদান আল মুসা: আমি পুলিশ সুপার হিসেবে বগুড়ার জেলার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল জুলাই-আগষ্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সারা দেশের ন্যায় বগুড়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা। আমি ও আমার সহকর্মীরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বগুড়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।বর্তমানে বগুড়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্ববর্তী যে কোন সময়ের তুলনায় ভালো বলে মনে করি। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু খুনের ঘটনা ঘটলেও প্রত্যেকটি খুনের ঘটনা ও চুরি, ডাকাতি, দস্যুতাসহ অন্যান্য ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন পূর্বক ঘটনার সহিত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করত: যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বগুড়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে চেকপোস্ট, পুলিশী অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আলোচনা: কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কি ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
জেদান আল মুসা: কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণসহ বগুড়া জেলার অন্যান্য অপরাধে বার্মিজ চাকুর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে চেকপোস্ট ও পুলিশী টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিশোর গ্যাং-এর কুফল সংক্রান্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সাথে সচেতনতামূলক আলোচনা অব্যাহত আছে। এছাড়াও বিট পুলিশিং এর মাধ্যমে বগুড়া জেলায় বার্মিজ চাকুর ব্যবহার রোধ করার জন্য শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে এবং জেলার প্রত্যেক থানায় লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই চেকপোস্ট এবং দোকানে পুলিশী অভিযান পরিচালনা করে প্রচুর পরিমাণে বার্মিজ চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। উক্ত অভিযান চলমান রয়েছে।

আলোচনা: বগুড়া জেলায় মাদক নিয়ন্ত্রণে চলমান অভিযান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
জেদান আল মুসা: মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি, যা শুধু ব্যক্তিগত নয় বরং পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বগুড়া জেলায় মাদক নিয়ন্ত্রণ আমাদের অগ্রাধিকারমূলক কাজের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে জেলা পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন স্থানে মাদকবিরোধী অভিযান, চেকপোস্ট কার্যক্রম এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এতে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের একটি বড় অংশকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। চলতি ২০২৫ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৬৮৫ টি মামলায় ৯০৪ জন আসামী গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্যের মধ্যে ৭৭১.৭৫ গ্রাম হেরোইন, ৩০ হাজার ২৮৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১৫ হাজার ৮৫০ পিস ট্যাপেন্টাডাল, ৮৯৪ কেজি ৯৮৫ গ্রাম গাঁজা, ৩ হাজার ৪৬৯ এ্যাম্পুর ইনজেকশন, ০১ লিটার বিদেশী মদ এবং ১ হাজার ৫৪১ লিটার চোলাই মদ এবং ৩ হাজার ৫ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়েছে। যার সর্বমোট আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ টাকা। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে: মাদক সরবরাহ চক্র ভেঙে দেওয়া ও মূল হোতাদের গ্রেফতার করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশি কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করা।
যুবসমাজকে সচেতন করতে স্কুল, কলেজ এবং সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা। সীমান্তবর্তী এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়ানো। মাদক পুনর্বাসন কার্যক্রমে সহযোগিতা ও সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করা।
আমরা বিশ্বাস করি, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বগুড়াকে মাদকমুক্ত একটি নিরাপদ জেলায় পরিণত করা সম্ভব হবে।

আলোচনা: সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে জেলা পুলিশের কী ধরনের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি রয়েছে?
জেদান আল মুসা: বগুড়া জেলায় সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে জেলা গোয়েন্দা শাখায় একটি সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ টিম রয়েছে। সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত কোন ঘটনা সংঘটিত হলে বগুড়া জেলার সাইবার প্রতিরোধ টিম আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনা সনাক্তপূর্বক ঘটনার সহিত জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতার করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বগুড়া জেলায় কোনো সাইবার অপরাধ সংঘটিত হলেও সেই অপরাধের শনাক্ত করণের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা হচ্ছে।সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত সাইবার পেট্রোলিং করা হচ্ছে।

আলোচনা: সাধারণ জনগণের সঙ্গে পুলিশের সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় করতে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?
জেদান আল মুসা: “আমার পুলিশ, আমার দেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ” এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশী সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে জরুরি সেবা ৯৯৯, অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, অনলাইন জিডি’র মাধ্যমে পুলিশী সেবা সহজতর করা হয়েছে। এই সকল সেবার ফলে পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করি।

আলোচনা: নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বগুড়ায় পুলিশের কার্যক্রম কেমন চলছে?
জেদান আল মুসা: নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বগুড়া জেলাধীন সকল থানায় একটি আলাদা নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সার্ভিস ডেস্ক রয়েছে। উক্ত ডেস্কে একজন নারী সাব-ইন্সপেক্টর এবং নারী পুলিশের সমন্বয়ে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের প্রতিনিয়ত সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। বগুড়া জেলায় কোন নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে উক্ত সার্ভিস ডেস্কে কর্মরত অফিসার ও ফোর্স তাদের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করে থাকে।

আলোচনা: আপনার দৃষ্টিতে পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সবচেয়ে জরুরি দিক কোনটি?
জেদান আল মুসা: পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সবচেয়ে জরুরি দিক হলো-নিয়মতান্ত্রিকতা, স্বচ্ছতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও হতে হচ্ছে আরও দক্ষ, মানবিক ও প্রযুক্তিবান্ধব। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, বরং জনগণের আস্থাভাজন অংশীদার হিসেবেও কাজ করতে হবে। এজন্য বাহিনীর সদস্যদের মনোবল দৃঢ় রাখা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিমূলক পরিবেশ এবং সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একমাত্র পেশাদার আচরণ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি আধুনিক, দক্ষ এবং জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী।

উল্লেখ্য, জেদান আল মুসা (পিপিএম) ১৯৭৮ সালের ২৯ অক্টবর কুষ্টিয়া জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনে বিএসসি (অনার্স) ও এমএস এবং লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট হতে এমবিএ সম্পন্ন করেন। জেদান আল মুসা ২৫তম বিসিএস-এর মাধ্যমে ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট এ সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে রেঞ্জ ডিআইজি অফিস সিলেট, কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, নরসিংদী জেলা পুলিশ, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, রেঞ্জ ডিআইজি অফিস সিলেটে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশিক্ষণ ও দাপ্তরিক কাজের জন্য বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি দারফুর, সুদানে ১ বছর ৬ মাস এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ সুদানে ১ বছর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন।
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সাল থেকে তিনি পুলিশ সুপার হিসেবে বগুড়ায় দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক এবং শুদ্ধাচার পুরস্কার-এ ভূষিত হয়েছেন। তিনি ০২ (দুই) বার আইজিপি’স এক্সেমপ্লারি গুড সার্ভিসেস ব্যাজ প্রাপ্ত হয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category