• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৭ পূর্বাহ্ন

রাজনীতি ও ন্যায়বিচার: শাসনের ভাষা বনাম নাগরিকের অধিকার

অধ্যাপক ড.মোহা: হাছানাত আলী / ৯৬ Time View
Update : শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

রাষ্ট্রগঠন ও তার কার্যকর পরিচালনার কেন্দ্রে রয়েছে রাজনীতি ও ন্যায়বিচার। এই দুটি ধারণা, যাদের উদ্দেশ্য এক হলেও বাস্তবে বহুক্ষেত্রে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। শাসনের ভাষা যদি হয় আদেশ, দমন ও কর্তৃত্বের প্রতিচ্ছবি, তবে নাগরিকের অধিকার প্রকাশ করে স্বাধীনতা, সমতা ও মর্যাদার আবশ্যকতা। এই দ্বৈততা বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশসমূহে স্পষ্টতর। যেখানে রাজনৈতিক শাসন অনেক সময় ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেয়।
এই প্রবন্ধে আমরা রাজনীতি ও ন্যায়বিচারের দ্বন্দ্বকে বিশ্লেষণ করব শাসকের ভাষা ও নাগরিকের অধিকারের মুখোমুখি দৃষ্টিকোণ থেকে। বিষয়টির বিশ্লেষণে আমরা ব্যবহার করব দার্শনিক তত্ত্ব, বাংলাদেশের সমসাময়িক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট।
রাজনীতি ও শাসনের ভাষা: ক্ষমতার ভাষাগত প্রকাশ
রাজনীতি যখন ক্ষমতা চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তখন তার ভাষাও হয় কর্তৃত্ববাদী। শাসকের ভাষা, যেমন-”রাষ্ট্রের নিরাপত্তা”, “উন্নয়নের স্বার্থে”, বা “জনস্বার্থে আইন প্রয়োগ”-অনেক সময় এমন নীতি ও আইনের জন্ম দেয়, যা নাগরিকের মতপ্রকাশ, সমালোচনা ও অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে।
মিশেল ফুকো তাঁর ‘উরংপরঢ়ষরহব ধহফ চঁহরংয’ বইয়ে বলেন, রাষ্ট্র কেবল বাহ্যিক বলপ্রয়োগ নয়, বরং ভাষা, অনুশাসন ও বিধি দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করে। আধুনিক শাসনের ভাষা তাই নিছক নির্দেশ নয়, বরং একধরনের ‘দৃষ্টির বল’, যা নাগরিককে নিরবভাবে নিয়ন্ত্রিত করে তোলে।
বাংলাদেশে এই নিয়ন্ত্রণের ভাষা প্রকাশ পায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর প্রয়োগে। সমালোচনামূলক ফেসবুক পোস্ট, সাংবাদিক রিপোর্ট, বা রাজনৈতিক বক্তৃতার জন্য সাধারণ মানুষকে হয়রানি, গ্রেফতার ও নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই আইনি কাঠামো শাসনের ভাষাকে শাস্তিমূলক রূপ দেয়, যা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নাগরিকের অধিকার: ন্যায়ের ভিত্তি ও রাজনৈতিক নৈতিকতা
ন্যায়বিচারের আধুনিক ধারণা নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে কেন্দ্রে রেখে গড়ে উঠেছে। জন লক ও রড়ঁংংবধঁ সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে বলেছিলেন, রাষ্ট্রের বৈধতা আসে নাগরিকের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে। রাষ্ট্র যদি সেই অধিকার হরণ করে, তবে তার নৈতিক বৈধতা হারায়।
বাংলাদেশের সংবিধানে (১৯৭২) অনুচ্ছেদ ৩৯ অনুযায়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু এই অধিকার কিভাবে প্রয়োগ হচ্ছে? সাংবাদিক শরীফুল ইসলাম খোকন বা লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনা এবং অনেক সাধারণ নাগরিকের গ্রেফতার এই প্রশ্নের উত্তর দেয়-অধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় থাকলেও, বাস্তবতায় তা অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষিত হয় না।
আইন যখন বৈষম্যমূলক প্রয়োগে ব্যবহৃত হয়, তখন তা ন্যায়বিচারের বদলে ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হয়ে ওঠে। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে নাগরিক আর বিশ্বাস করে না-ন্যায় পাবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: শাসনের ভাষা বনাম গণতন্ত্রের চেতনা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায়শই দেখা যায় শাসনব্যবস্থার একমুখীতা। ক্ষমতাসীন দল অনেক সময় প্রশাসন, পুলিশ, ও বিচারব্যবস্থাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে বাধা, নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, এবং গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করে-রাজনীতি ও শাসনের ভাষা একাধারে দমনমূলক ও নিয়ন্ত্রণমূলক।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা রাজনীতির নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গণতন্ত্র কেবল নিয়মিত নির্বাচন নয়, বরং তা এক ধরনের রাজনৈতিক ন্যায়বিচার-যেখানে সব নাগরিকের কণ্ঠস্বর ও অংশগ্রহণের সমান সুযোগ থাকে।
দার্শনিক পর্যালোচনা: ন্যায়ের মাপকাঠিতে রাজনীতি
ন্যায়বিচার ও রাজনীতির সম্পর্ক নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক হয় জন রলসের “অ ঞযবড়ৎু ড়ভ ঔঁংঃরপব”। তাঁর মতে, ন্যায়বিচার মানে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে যে কেউ ‘াবরষ ড়ভ রমহড়ৎধহপব’-এর আড়াল থেকে নীতি নির্ধারণ করলে সেগুলো সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত হবে।
রলসের আলোকে বাংলাদেশের শাসনের ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেটি বৈষম্যমূলক ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট। তাই ন্যায়ের দাবি পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক কাঠামোতে এমন নীতি ও আচরণ প্রয়োজন, যা সর্বজনীন এবং প্রশ্নাতীত নৈতিকতা বজায় রাখে।
রাজনীতি যদি হয় ক্ষমতার ভারসাম্যহীন চর্চা এবং শাসনের ভাষা যদি হয় নিয়ন্ত্রণ ও দমনের হাতিয়ার, তবে ন্যায়বিচার সেখানে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু একটি সুশাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতি এবং ন্যায়বিচার পরস্পরের পরিপূরক। সেখানে শাসনের ভাষা হয় জবাবদিহিতার, সংলাপের এবং অংশগ্রহণের ভাষা; আর নাগরিকের অধিকার হয় বাস্তবচর্চার বিষয়, কাগুজে ঘোষণার নয়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, ন্যায়ের শাসন, এবং এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা নাগরিককে শত্রু নয়, সম্মানিত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। এটাই হবে সেই রাষ্ট্র, যেখানে রাজনীতির ভাষা ও ন্যায়ের ভাবনা একই সুরে উচ্চারিত হবে।

লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভিসি, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category