• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৩ পূর্বাহ্ন

পুরনো প্রতিষ্ঠানে নতুন সম্ভাবনা: এটিআইকে কৃষি বিদ্যালয়ে রূপান্তরের সময় এখনই

আফতাব হোসেন / ১০০ Time View
Update : শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

গাইবান্ধাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই)-কে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর পুনরায় জোরালো হয়েছে। ৮১ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি সকল প্রকার সম্ভাবনা ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায়নি। অথচ প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যেই জমি, স্থাপনা, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও পরিবেশের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেবার উপযুক্ততা বহন করে।

১৯৫৪ সালে পাকিস্তান আমলে ‘ভিএইড’ নামে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ হয়েছে চারবার।  তৎকালীন পাকিস্তান আমলে ভিএইড (ভিলেজ এগ্রিকালচারাল ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ঢেভেলপমেন্ট) নামে শহরের বাংলাবাজার এলাকায় বিশাল ক্যাম্পাস নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমেরিকা সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে শুরুতে কৃষি বিভাগে চাকুরিরত কর্মচারীদের প্রথম বছরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ১৯৬১ সালে ভিএইড এর নাম পাল্টিয়ে এনডিটিআই(ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং ইন্সিটিটিউট) রাখা হয়। তখন জাপান সরকার প্রতিষ্ঠানটিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। আবার ১৯৬৯ সালে এনডিটিআই-এর নাম পাল্টিয়ে এইটিআই(এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন ট্রেনিং ইন্সটিটিউট) রাখা হয়। এসময় এসএসসি পাশ ছাত্রদের জন্য ২বছরের কৃষি প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করা হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে প্রতিষ্ঠানটির নাম ফের পরিবর্তন করে এটিআই(এগ্রিকালচার প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউট) রাখা হয়। এসময়ে প্রশিক্ষণের মেয়াদকাল বাড়িয়ে ৩বছর করা হয় এবং ডিপ্লোমা কোর্সের সনদপত্র দেয়া হয়। প্রতিবছর ৬০জন করে ছাত্র এই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার সুযোগ লাভ করে। পরবর্তীতে ২০১১ সাল থেকে এটিআইতে ৪বছরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা হয়।

গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই)

সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে উঠেছে দেশের একটি অন্যতম কৃষি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বর্তমানে এখানে ৪ বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে প্রতিবছর প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকে। কর্মসংস্থানে সাফল্য এবং কৃষি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে এটিআই এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে।

প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে ৪৭.৯৫ একর জমি, আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আবাসিক হোস্টেল, ল্যাব, ক্লাসরুম, দপ্তর ভবন, সুবিশাল ৫টি পুকুর, লেক, কৃষি জমি, গবাদিপশুর ঘর, গেস্ট হাউজসহ নানা অবকাঠামো। মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু কৃষি শিক্ষা নয়, পর্যটন সম্ভাবনাও বহন করছে। লেক ঘিরে গড়ে তোলা যেতে পারে নৌভ্রমণ ও শিশু পার্ক। কৃত্রিম স্রোতের মাধ্যমে সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে একটি আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিক্ষানগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

ভৌগোলিক দিক থেকে গাইবান্ধা শহরের অদূরে গাইবান্ধা-সাঘাটা রোডে বাংলাবাজার থেকে বোর্ডবাজার ঘেষা অবস্থিত এটিআই। দক্ষিণে প্রাণিসম্পদ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পাশে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, পশ্চিম পাশে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সদর উপজেলা অফিসসহ বহু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এটিকে একটি শিক্ষাবান্ধব জোনে পরিণত করেছে।

গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই)

এই এটিআই-কে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হলে উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙন ও চরাঞ্চল অধ্যুষিত জেলা চিলমারী, রৌমারী, রাজীবপুর, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, গাইবান্ধা সদর ছাড়াও বগুড়া, কুড়িগ্রাম, রংপুর, জামালপুর, লালমনিরহাটসহ বহু জেলার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে যাবে। একইসাথে স্থানীয়ভাবে বহুমাত্রিক  কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বাজার ব্যবস্থাপনার প্রসার, আবাসন প্রকল্প ও কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান বিস্তারে বিপ্লব ঘটতে পারে।

এই ইনস্টিটিউটটের ছাত্র সাব্বির হোসেন বলেন বাড়ির কাছে প্রতিষ্ঠানটি থাকায় কম কম খরচে পড়ালেখা করেছি। আর সহজে চাকুরিও পেয়েছি। সাঘাটার নয়ন বলেন এখানে পড়ে উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা পদে চাকুরী করছি। তিনি বলেন এটিআই এর পড়ালেখার মান অত্যন্ত ভালো। এখানে চরাঞ্চলসহ উত্তরাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় হলে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার সুযোগ পাবে-যা গাইবান্ধার উন্নয়ন ভূমিকা রাখবে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ আধ্যাপক মাজহার উল মান্নান জানান, গাইবান্ধার এটিআইকে একটি পূর্ণ্ঙ্গা বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তর করা অত্যন্ত যৌক্তিক। কেননা উত্তরাঞ্চলসহ দেশের সব জেলায় ইউনিভার্সিটি হয়েছে অথচ গাইবান্ধায় জেলায় এধরণের কোনপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

অধ্যাপক জহরুল কাইয়ুম বলেন, অবকাঠামো, জমি-জমাসহ সবধরনের সুযোগ সুবিধা আছে এটিআইএ। এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবী এটিকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা, কিন্তু কোন কাজ হয়নি। তিনি মনে করেন, কৃষিনির্ভর গাইবান্ধা জেলায়  উন্নয়নে এটিআই এর সুনাম ও ঐতিহ্য রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত করলে অবহেলিত গাইবান্ধা জেলাসহ উত্তর জনপদের ব্যাপক উন্নয়ন হবে।

উন্নয়ন গবেষক ও গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) এর নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্্ সালাম জানান, রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাইবান্ধা একটি দুর্যোগ কবলিত দরিদ্রপ্রবণ জেলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা গড়ে না ওঠায় সারা বছর মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে না। এজন্য বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর।  তিনি মনে করেন এটিআই-টিকে বিশ্ববিদ্যালয় করা এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবী। এজন্য বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে জানানো হয়েছে, কিন্তু কেউ দৃষ্টি দেয়নি। এজন্য তিনি বলেন, জনগণের যৌক্তিক দাবীর সাথে সরকার যদি পদক্ষেপ নেয় তাহলে অবশ্যই ্এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। কেননা জমির জন্য সরকারের বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে না। আর গাইবান্ধা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হলে উন্নয়নের ভিন্নমাত্রা যোগ হবে।

­­­­উল্লেখযোগ্য যে, দিনাজপুরের কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে রূপান্তরিত করা হয়েছে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তেমনি গাইবান্ধার এটিআই সরকারি সদিচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর সম্ভব।গাইবান্ধার কৃষি উন্নয়ন, শিক্ষা প্রসার এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এটিআই-কে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category