ডায়াবেটিস মূলত: অনিয়তিব্রত খাদক, মোটা, অলস, কর্মহীন বা হালকা কর্ম জীবির সমস্যা। সেই জন্য দেখা যায় শহরেই এই সমস্যা বেশী। গ্রামেও আছে, তাদের যারা নব্য অর্থনৈতিক সুবিধা প্রাপ্ত।
কোন ব্যক্তি যে কোন কারনেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে যদি ডায়াবেটিস ধরা পরে তখন সে ভীতিগ্রস্থ হয়ে পরে। মনে করে সারা জীবনের জন্য বিপদে পরে গেলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই দুঃশ্চিন্তায় শারীরিক ওজন হাড়িয়ে ফেলে, কাজে হতোউদ্দাম হয়ে পরে, কপালে হতাশার ভাজ দেখা যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি।
আসলেই কি ডায়াবেটিস ভয়ঙ্কর অসুখ? অবশ্যই নয়। যে কারনে ডায়াবেটিস হয়, তা স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিটি মানুষের শরীরে বেশির ভাগ সময়ই থাকে। অর্থাৎ হাই ব্লাড সুগার। কম পক্ষে দিনে ৩ বার অর্থাৎ খাবার পর ১৫ মিনিটের মধ্যে সুগার এত হাই হয় যে, জানলে আপনার চোখ কপালে উঠবে। কিন্তু শরীরের ব্যবস্থাপনা রাববুল আল-আমিন এমন ই করে দিয়েছেন যে খাবার ২ ঘন্টার মধ্যেই তা স্বাভাবিক হয়ে আসে।
তাহলে সমস্যা কোথায়? ডায়াবেটিসই বা হচ্ছে কেন? এটাই আমাদের আলোচ্য বিষয়।
প্রতিদিন খাবার সংগে সংগেই রক্তে সুগার বা গ্লুকোজ হাই অর্থাত ১৫ থেকে ৩৫ বা তারও বেশি হয়ে যায়। তা কি ধরনের খাবার ও তার পরিমান কত তার উপর নির্ভর করে। শরীর প্রায় ২ ঘন্টার মধ্যেই সাপ্লাই চেন অর্থাৎ রক্ত থেকে তার প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ নিয়ে নেয়। যা বাকি থাকে (অর্থাৎ ৭ থেকে ৪ এর মধ্যে) তা আমাদের মস্তিষ্ক বা Brain ব্যবহার করে। Brain আমাদের Super Computer এবং Brain গ্লুকোজ ছাড়া আর কোন শক্তি ব্যবহার করে না। ফলে শরীর যখন খাবার থেকে ঢুকোজ সাপ্লাই পায় না, তখন নিজেই গ্লুকোজ তৈরী করে নিয়ে (৪-৭ এর মধ্যে) Brain কে চালু রাখে (অনশন দুর্ভিক্ষ, রোজা, ডায়েটিং এর সময়)। এক জন রুগীকে ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত কখন বলবো? যখন খালি পেটে কম পক্ষে ৮ ঘন্টা অভুক্ত থাকার পরেও যদি ৭ পয়েন্ট এর উপর সুগার থাকে তখন আমরা ডায়াবেটিস বলবো।
এটা নানা কারণেই হতে পারে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও যখন শরীরের অংঙ্গ প্রত্যংঙ্গ, বিশেষ করে মাংসপেশি গ্লুকোজ গ্রহন করো না যা করতে পারে না তখন ডায়াবেটিস, হিসেবে আমরা চিহ্নিত করি। এ ক্ষেত্রে আমরা ডাক্তাররা গবফরপরহব দিয়ে চিকিৎসা শুরুর আগেই, আমরা রুগীকে প্রাকৃতিক উপায়ে সুস্থ করার চেষ্টা করি এবং রুগী যদি মেনে নেয়, তাহলে বহু দিন সে রোগ মুক্ত থাকতে পারে। সে পরামর্শ গুলি এমন কঠিন কিছুই না। রুগীর শুধু খাদ্যভাস ও কর্ম অভ্যাস পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট। কিন্তু রোগীর পক্ষে এই অভ্যাস গুলি পরিবর্তন করাই কঠিন হয়ে পরে।
এক্ষেত্রে আমরা ডাক্তাররা এমন কিছু কিছু Counseling করতে পারি যা রোগীকে বহুমুখী উপকার করতে পারে আগে দেখা যাক Counseling মূল বিষয়গুলি কি?
১. কাজের ধরন পাল্টানোর পরামর্শ। যাতে শারীরিক পরিশ্রম বেশী হয়।
২. হালকা কাজে যারা আছেন তাদের ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়া।
৩. খাবার পরিমান কমানোর পরামর্শ, বিশেষ করে মিষ্টি জাতীয় খাবার।
৪. মাঝে মাঝে খাবার বন্ধ রাখার পরামর্শ, যেমন দিনে ২ বার খাওয়া।
উপরিউক্ত বিষয়গুলিতে আমরা যে পরামর্শ দিতে পারি।
১ম ও ২য় বিষয়টির সমাধান আমরা নামাজের মাধ্যমে দিতে পারি। রোগীকে পরামর্শ দেয়া যেতে পারে যে পাঁচওয়াক্ত নামাজ অবশ্যই। পরবেন। কোন সুন্নত ও নফল নামাজ ও ছাড়বেন না। পারত। পক্ষে মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়ুন। একটু দূরের মসজিদ হলে আরো ভালো হয়। এতে শারীরিক ব্যায়াম হবে ও হাটাহাটির উপকারিতাও পাওয়া যাবে। একই সংগে আল্লাহর হুকুম পালন করার ও তার কাছে আত্মসমর্পন করার মানসিক প্রশান্তি ও পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও আধ্যাতিক উপকারীতাও আছে, যা ধর্মীয় আলেমদের আলোচ্য বিষয়।
খাবার ব্যবস্থাপনার পরামর্শ: খাবার কম খাওয়ার চেষ্টা করুন। কি পরিমান খাবেন? রাসূল (সাঃ) এর সুন্নত হলো তিনি পাকস্থলির ৩ ভাগের ১ ভাগ খালি রেখে খাবার খেতেন। এই খালি অংশ পানি দিয়ে পুরন করতেন। এ ছাড়াও প্রতিদিনের খাবার কমিয়ে দিন। রাসূল (সাঃ) সুন্নতমত প্রতি সপ্তাহে ২ দিন রোজা রাখুন। বাৎসরিক রোজার মাসের রোজা অবশ্যই পালন করবেন। আমরা লক্ষ্য করি আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন কুরআন নাজিল করেছেন মানুষকে জীবন পরিচালনার ও দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য। সেই জন্যেই কুরআনের শুরুতে আল্লাহ রাজুল আল- আমিন বলেছেন এই কিতাব মানুষের সাহায্যের জন্য। আল্লাহর আইন কানুন শুধুই তাকে খুশি করার জন্য নয় বরং আল্লাহ চান তার বান্দা সুস্থ সবল থাকুক। তবে আল্লাহ রাসুল আন- আমিন বলেছেন তোমাদের যে সব নিদর্শন দিয়েছি তা যদি বুঝতে বা জানতে অবশ্যই তোমরা আত্মসমর্পন করতে ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে।
সুতরাং ডায়াবেটিস কে ভূলে যান, দুঃচিন্তা কে পরিহার করুন এবং সুস্থ থাকুন।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ টিপস: ডায়াবেটিস রোগী, যারা ঔষধ ব্যবহার করেন বা ইনসুলিন নেন তারা প্রায়শঃই গুকোজ শূন্যতা বা হাইপোতে আক্রান্ত হন, বিশেষ করে মাঝরাতে। এ সময় রোগী অজ্ঞান হয়ে যান এবং জানা মুশকিল হয় কোন করবেন উনি অজ্ঞান হয়েছেন। রোগীর আত্মীয় স্বজন জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু অজ্ঞান হওয়া থেকে হাসপাতালের চিকিৎসা নেওয়া পর্যন্ত প্রায় ১ থেকে ২ ঘন্টা সময় পার হয়ে যায় এবং এতে ডায়াবেটিস রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। রোগীর আত্মীয় স্বজন কোন ভাবে যদি রোগীকে গ্লুকোজ খাওয়াতে পারে বা ইনজেকশন হিসেবে দিতে পারেন তাহলে ১০ মিনিটেই রোগী সুস্থ হয়ে যাবেন। এটা তাৎক্ষনিক করার ডাক্তারি জ্ঞান না থাকা আত্মীয় স্বজনের জন্য ৩ টি সহজ পদ্ধতি আছে।
১) মধু বা গুকোজ পানি মুখে দেয়া। যদি খেতে না পারে?
২) ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্লুকোজ দেয়া। এই পদ্ধতিতে গুকোজ দেয়ার কাউকে পাওয়া না গেলে।
৩) ২ টেবিল চামচ গ্লুকোজ বা চিনি ১ গ্লাস পানিতে গুলে নিতে হবে। এবং সূচ ছাড়া ১০ সি সি সিরিজ দিয়ে, ২ সিরিঞ্জ সরবত পায়খানার রাস্তায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। ইনশাল্লাহ যদি হাইপো হয়ে থাকে ৫-১০ মিনিটেই রুগি সুস্থ হয়ে যাবেন। যদি বেশি বা হাইপার হয়ে থাকে জ্ঞান ফিরবে না কিন্তু অসুখের কোন ক্ষতি হবে না।
লেখক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক/ বগুড়া/০১৭১১-০১৬৮৭