• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ন

চব্বিশের অভ্যুত্থান একটি গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস

হাসান রুহুল / ১৬৩ Time View
Update : শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ঈদের পর ১ জুলাই আন্দোলন শুরু হলেও ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ শুরু হয় ৫তারিখ থেকে। ৫জুন মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। সেইদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়।
বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে মুক্তির পথ খুঁজছিল। কিন্তু আমজনতা কোন পথ খুঁজে পাইতেছিল না। মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার স্টিম রুলার। কোন রাজনৈতিক নেতারাও জনগণকে মুক্তির আশা দেখাতে পারেনি। তারাও চার দেওয়ালের ভেতর বন্দি হয়ে গুমরে কাঁদছিল।
মেধাবীরা যখন চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পাচ্ছিল না তখন তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা যথাযথ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যখন চাকরি পাচ্ছিল না পাচ্ছিল না তখন কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। যা একটি স্বাধীন জাতির জন্য অশনি সংকেত।
ছাত্ররা তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে পথে নেমে আসে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালু কণা, বিন্দু বিন্দু জলের মতো ছাত্র আন্দোলন বিশাল আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলন গতানুগতিক বিগত আন্দোলনের মতো ছিল না। আন্দোলনে সব সময় ভিন্ন ধরনের কর্মসূচি থাকতো ‘হরতাল-অবরোধ’ এর পরিবর্তে ছাত্ররা কর্মসূচি দেয় ‘বাংলা ব্লকেড’, বাংলা ব্লকেড দিয়ে শিক্ষার্থীরা গাইছে ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’, কারার ঐ লোহ-কবাট’, ‘আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত’।

দোয়া-মোনাজাত, গায়েবানা জানাজা এই কর্মসূচিগুলোর মধ্য দিয়ে শহুরে মধ্যবিত্তরা যুক্ত হয়। যুক্ত হয় জেন-জি প্রজন্মরা। আরো যুক্ত হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। যা আন্দোলনে আরো গতি এনে দেয়।
আন্দোলনের বিশেষ কৌশলগত দিক ছিল একক নেতৃত্ব না থাকা এবং পরিচিত কাউকে ফ্রন্টলাইনে না আনা। তাই এই আন্দোলনে বামপন্থি-ইসলামপন্থিরাও দলে দলে অংশ নেয়।
যখন আন্দোলন সফলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে তখন শেখ হাসিনা দেশে ছিল না, চীনে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছি, চীন সফর শেষ করে দেশে ফিরে আন্দোলনরত ছাত্রদেরকে ইতিবাচক কিছু একটা বলে সমাধানের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু হলো তার বিপরীত। ১৪ জুলাই সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে কটূক্তি করে। কথাটা সবার আত্মমর্যাদায় আঘাত করল। ওই রাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন হল থেকে বেরিয়ে এলো ক্যাস্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শুরু হলো তুমুল আন্দোলন। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল সব সময় শান্তিপূর্ণ। শুরু হয় ৯ দফার আন্দোলন। ৯ দফা ছিল চুক্তিভিত্তিক।
১৫ জুলাই আন্দোলনকারী মেয়েদের ওপর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী মাথায় হেলমেট পরে পুলিশের সহযোগিতায় হামলা করে। আহত হয় নিরপরাধ ছাত্রীরা। এতে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের উপর ফুঁসে উঠে সাধারণ ছাত্রসমাজ। পরিবেশ হয়ে উঠে উত্তপ্ত।
১৬ জুলাই এক গুরত্বপূর্ণ দিন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র প্রথম সারির সমন্বয়ক আবু সাঈদ। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পোষা সন্ত্রাসী বাহিনী পুলিশেরা ছাত্র আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে অকুতোভয় আবু সাঈদের বুকে গুলি করে। প্রথম গুলি বুকে লাগার পর একটু ঝাঁকুনি দিয়ে আবর বুক টান করে দাঁড়ায় সত্যের সৈনিক আবু সাঈদ। নির্মম পিশাচ পুলিশ নিরপরাধ আবু সাঈদের বুকে আবার গুলি করে। কী সহ্য শক্তি! ভিস্যুভিয়াসের মতো ধৈর্য্যশীল আবু সাঈদ দ্বিতীয় গুলি বুকে লাগার পরও সত্যের অধিকার আদায়ের দাবির আন্দোলনকে বেগবান করা জন্য আবর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই নরঘাতক পুলিশের শেষ গুলি আবু সাঈদের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। লাল-সবুজের পতাকা মাথায় বাঁধা আবু সাঈদ পরম মমতায় শেষবারের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শহীদ হয় বাংলার বীর ‘আবু সাঈদ’।

সেইদিন সারাদেশে আবু সাঈদসহ ছয়জন শহীদ হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথম গুলি চলে ১১ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিছিলে। কিন্তু আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর থেকেই মূলত আন্দোলন সর্বব্যপকতা লাভ করে। গণজোয়ার শুরু হয়। জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করে তাদের বিতাড়িত করে শিক্ষার্থীরা।
“বিশ্বের যাহা কিছু মহান চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর” জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী’ কবিতায় নারীদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ঠিক তেমনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মেয়েদেরে ভূমিকা ছিল ব্যাপক। আন্দোলনের বড় শক্তি ছিল তাঁরা। এই আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চার করেছেন মেয়েরা। ১৬ করেছেন পর থেকে মেয়েদের হলে হলে শুরু হয় প্রতিরোধ।

এই আন্দোলন সফলতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গোয়েন্দাদের করেছেন দিতে পারা। ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধের ঘোষণা দেয় ইউজিসি। ১৭ জুলাই ছিল কফিন মিছিল। ওই দিন আবার মহররম। সেদিনিও পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি সম্মিলিতভাবে ছাত্র আন্দোলনে আক্রমণ করে। আহত হয় শত শত নিরপরাধ শিক্ষার্থীরা। এখানে ডিজিএফআইয়ের সাথে চমৎকার গেম খেলেছে সমন্বয়করা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সংলাপের কথা বলা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থা সংলাপে বসার জন্য সমন্বয়কদের জোর চাপ দিচ্ছে। সমন্বয়ক নাহিদরা গোয়েন্দাদের সাথে মিটিংয়ে বসেছে কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই বাহিরে থাকা আসিফ মাহমুদ সজীব পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে দিয়েছে। গোয়েন্দারা প্রথম সারির সমন্বয়কদের তুলে নিয়ে গেল। ডিবি হারুনের ভাতের হোটেলের বাহিনীরা সমন্বয়কদের অনেক নির্যাতন করে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকতে। সাংবাদিক সম্মেলন করে কী কী বলতে হবে তা সমন্বয়কদের শিখিয়ে দেয় গোয়েন্দারা। এরপর সমন্বয়করা সাংবাদিক সম্মেলন করে গোয়েন্দাদের শিখানো কথা না বলে গোয়েন্দাদের আচরণ ফাঁস করে দেয় । তখন গোয়েন্দাদের সকল কৌশল নষ্ট হয়ে যায়।

৩২ জুলাই(১ আগস্ট) থেকে আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ জনতা। সারাদেশ উত্তাল। এমন কী গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে মুক্তিার আন্দোলন। সবুজে ছাওয়া গ্রামের রাস্তার মোড়ে মোড়ে, স্কুলকলেজের মাঠে, মুক্তিকামী মানুষের ঢল। রাজপথ থেকে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসী দল ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ। চা স্টলের আড্ডায়, ক্ষেতে কাজ করার অবসরে কৃষকেরা জমিয়ে তোলে কথার ফুলঝুড়ি। সবার একটাই দাবি খুনি হাসিনারে কী ভাবে গদি থেকে নামানো যায়।
অত:পর ৩৪ জুলাই (৩ আগস্ট) নয় দফা বাদ দিয়ে শুরু হয় এক দফার আন্দোলন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলন। গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন। শুরু হয় ছাত্র-জনতার একত্রে আন্দোলন। হাসিনা সরকার এবার উৎখাত হবেই।

৩৫ জুলাই(৪ আগস্ট) ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটুয়া বাহিনী পুলিশের গুলিতে অনেক লোক শহীদ হয়। মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার আন্দোলন স্তব্ধ করে দিতে আগে থেকেই জরুরি অবস্থা জারি করে তৎকালীন অবৈধ সরকার। বন্ধ করে দেয় ইন্টারনেট সহ যোগাযোগের মাধ্যম। ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি পর গুলি চালায়, এপিসি(রায়ট কার) দিয়ে গুলি চালায়, জলকামান দিয়ে কেমিক্যাল ছিটিয়ে দেয়, এমন কি হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশ পথ থেকে গুলি করে সরকারের পুলিশ বাহিনী। ফ্যাসিস্ট সরকারের কোনো কৌশলই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন দাবিয়ে রাখতে পারেনি।
রাজু চত্বর, শাহবাগ, বাংলামটর মিছিল আর মিছিল। পুলিশ নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে। মিছিল চলছে সামনের দিকে এগিয়ে। আহত-নিহত মানুষ নিয়ে একটার পর একটা রিকশা আসছে। কী হৃদয়বিদারক দৃশ্য! রিকশার মাইক থেকে ভেসে আসছে ‘সাইড দেন প্লিজ রিকশায় গুলি লাগা ভাই আছে, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে। কোথাও গুলি লাগা মানুষ থাকলে আমাকে জানান আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো।’ চারদিক থেকে ¯ে¬াগান আসছে ‘কারফিউ ভেঙ্গে ফেলো, শেখ হাসিনা গেল গেল।’

রাজধানী থেকে জেলা শহর, জেলা থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে গ্রামে গ্রামে একই দৃশ্য। সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে। রাস্তার দুই পাশ দিয়ে মা-বোনেরা শরবত, পানির কলস, জগ, গ্লাস, ড্রাম নিয়ে ছুটে এসেছে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে পানি খাওয়াতে। মা-বোনেরা রুটি, খিচুড়ি প্যাকেট করে বিতরণ করছে আন্দোলকারীদের মাঝে। কী সহমর্মিতা, সহযোগিতা।
৩৬ জুলাই (৫আগস্ট) সকাল থেকে সারাদেশের রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। বিজয়কে ছিনিয়ে আনতে রাস্তায় মানুষ। দেশের সকল টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার করছে সেই বিজয়ের জন্য অপেক্ষা করা মিছিলগুলো। দুপুরে টেলিভিশনের স্ক্রলে লেখা দেখা গেলো ‘ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে হাসনিা দেশ ছেড়েছে’। কী আনন্দ! দু’চোখে পানি এসে গেলো। বিজয়ের আনন্দ যে কত আনন্দের তা শুধু ৫ আগস্ট’২৪ জানে। জানে দেশবাসী। বর্তমান প্রজন্ম এবং বাংলাদেশ সাক্ষী হলো আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের।

                   লেখক, কবি, গল্পকার ও সম্পাদক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category