• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৯ অপরাহ্ন

প্যারিস রোডের মীম বই নিয়ে যার স্বপ্ন, সংগ্রাম

Reporter Name / ৬৯ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

 

ডালিম হোসেন শান্ত, রাজশাহী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ও নয়নকাড়া প্যারিস রোড এখন কেবল আড্ডার জায়গা নয়, বরং জ্ঞানচর্চার এক উন্মুক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। এর কারিগর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেরুন্নেসা মীম। ছোটবেলা থেকেই যার ধ্যানজ্ঞান ছিল বই পড়ার নেশা, সেই নেশাকেই তিনি এখন জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তে পড়তে একসময় বইয়ের সঙ্গেই তার মিতালি গড়ে ওঠে। সেই সখ্যতা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি গত ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর থেকে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে শুরু করেছেন তার ব্যতিক্রমী ভ্রাম্যমাণ বইয়ের দোকান। শুরুতে মীম চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় একটি শরৎ উৎসবের বই প্রদর্শনী করতে, কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় তা সফল হয়নি। তবে দমে না গিয়ে তিনি সরাসরি ঢাকার বড় বড় প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বই সংগ্রহ করেন এবং সাহসের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বই বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম দিনেই তার ৩৭টি বই বিক্রি হওয়ার অভাবনীয় সাফল্য তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং তিনি বুঝতে পারেন যে, ভালো কাজের কদর সবসময়ই থাকে। বর্তমানে প্রতি শুক্রবার ও শনিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মীমের এই ভ্রাম্যমাণ দোকানে ভিড় জমান বইপ্রেমীরা। তার সংগ্রহে থাকা প্রায় ৫০০টি বইয়ের মধ্যে রয়েছে বিশ্বসাহিত্যের ক্ল্যাসিক অনুবাদ, ইংরেজি সাহিত্য, রোমাঞ্চকর থ্রিলার, উপন্যাস ও কিশোর পাঠকদের পছন্দের সব বই। মীমের এই উদ্যোগের সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো, এখানে বই কেনা ছাড়াও পাঠকরা অনায়াসে দোকানে বসে বিনামূল্যে তাদের প্রিয় বই পড়তে পারেন, যা ক্যাম্পাসের পরিবেশে এক নতুন পাঠ-সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।

তবে এই সফলতার পথটি মীমের জন্য মোটেই মসৃণ ছিল না। একজন নারী হয়ে রাস্তায় বই নিয়ে বসার কারণে তাকে সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতা ও সহপাঠীদের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে নানা তির্যক মন্তব্য। কেউ কেউ তাকে উপহাস করে বলেছে, তাকে কি এখন বই বিক্রি করেই জীবন চালাতে হবে? কিন্তু মীম এসব নেতিবাচক কথায় কান না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, কোনো কাজই ছোট নয় এবং বইয়ের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে বড় কাজ আর হতে পারে না। তিনি কেবল সশরীরে দোকানেই সময় দেন না, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত বইয়ের রিভিউ ও নতুন লেখকদের পরিচিতি তুলে ধরেন। প্রযুক্তির এই যুগে যেখানে তরুণ প্রজন্ম স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকে, সেখানে মীম তাদের ফিরিয়ে আনছেন কাগজের ঘ্রাণে। তার এই সৃজনশীল উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, কেবল টিউশনি বা প্রথাগত চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েও সম্মানজনকভাবে আয় করা এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়া সম্ভব। মীমের এই পথ চলা অন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় বার্তা যে, অলস সময় নষ্ট না করে সৃজনশীল কাজে নিজেকে নিয়োগ করলে সমাজ ও নিজের উভয়ই মঙ্গল হয়। ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী লাইব্রেরি বা বুক ক্যাফে গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা মীম আজ হাজারো তরুণের অনুপ্রেরণা। তার এই ভ্রাম্যমাণ দোকানটি কেবল একটি ব্যবসার জায়গা নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মনন বিকাশের এক মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডের শান্ত পরিবেশে মীমের এই জ্ঞানের বাতিঘরটি এখন ক্যাম্পাসের এক অনন্য পরিচয়ে রূপ নিয়েছে, যা শিক্ষিত সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে হাঁটতে শেখায়।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category