বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ‘বেতন বৃদ্ধি’ একটি অবধারিত এবং জনপ্রিয় দাবি। বিশেষ করে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে থাকা মানুষেরা নীতিনির্ধারকদের কাছে এই দাবিটিই সবার আগে পেশ করেন। কিন্তু আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে অর্থনীতির কঠিন লজিকে যদি তাকাই, তবে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে: বেতন বৃদ্ধি কি আসলেই সাধারণ মানুষের জীবনমানের কোনো পরিবর্তন ঘটায়, নাকি এটি সংকটকে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী করে তোলে?
বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অর্থনীতির সাধারণ সূত্র বলছে, বেতন বৃদ্ধি মূলত একটি ‘স্বল্পমেয়াদি পেইনকিলার’-এর মতো। এটি সাময়িক স্বস্তি দেয় বটে, কিন্তু মূল রোগ সারে না। যখনই বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে কিন্তু সেই অনুপাতে পণ্য বা সেবার উৎপাদন বাড়ে না, তখন অবধারিতভাবেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। দিনশেষে দেখা যায়, পকেটে টাকার নোটের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কেনা পণ্যের পরিমাণ বাড়েনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। একেই আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি ‘ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস’ বা ইনফ্লেশন।
এই বেতন বৃদ্ধির সুফল বা কুফল কি সবাই সমানভাবে পায়? একদমই না। বেতন বাড়লে লাভবান হয় মূলত সরকারি ও করপোরেট খাতের নির্দিষ্ট একটি অংশ। কিন্তু এই ‘টাকা বাড়ানোর উৎসব’-এর মাশুল গুনতে হয় দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যাদের নির্দিষ্ট কোনো ‘বেতন স্কেল’ নেই, তারা পড়েন বিপাকে। বাজারের আগুনের আঁচ তাদের গায়ে লাগে সবচেয়ে বেশি। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের দেয়াল আরও উঁচু হয়।
তাহলে সমাধান কী? সমাধান বেতনের অঙ্ক বাড়ানো নয়, সমাধান টাকার ‘মান’ বা ভ্যালু বাড়ানো। টাকার মান বৃদ্ধি মানে হলো একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের চেয়ে বেশি বা উন্নত পণ্য ও সেবা কেনার সক্ষমতা অর্জন করা। যখন দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকে বা কমে আসে, তখন বেতন না বাড়লেও মানুষের জীবনযাত্রার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হয়। এটিই হলো টেকসই অর্থনীতির মূলমন্ত্র।
কিন্তু টাকার মান বাড়ানোর পথে প্রধান বাধাটি কোথায়? এখানেই আমাদের অর্থনীতির ‘স্ট্রাকচারাল’ বা কাঠামোগত গলদ নিয়ে কথা বলতে হবে। আর সেই গলদের নাম: সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা।
সুদ বা ইন্টারেস্ট মূলত উৎপাদন খরচের একটি অদৃশ্য বোঝা। যখন কোনো উদ্যোক্তা বা শিল্পমালিক ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন, তখন সেই সুদের টাকা তিনি নিজের পকেট থেকে দেন না। তিনি তা পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে দেন। অর্থাৎ, সুদের ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাকেই। এই প্রক্রিয়ায় পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। তাছাড়া সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় সম্পদ ধীরে ধীরে ব্যাংক এবং মুষ্টিমেয় ধনী শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়, আর সাধারণ মানুষ ঋণের চক্রে হাবুডুবু খায়।
এই চক্র ভাঙার এবং টাকার মান বাড়ানোর কার্যকর সমাধান হতে পারে:
১. সুদমুক্ত বা মুনাফাভিত্তিক অর্থনীতি: ঋণের বদলে যদি অংশীদারিত্ব বা প্রফিট-শেয়ারিং মডেলে বিনিয়োগ করা হয়, তবে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। সুদের বাড়তি চাপ না থাকলে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। এটি টাকার মানকে প্রাকৃতিকভাবেই শক্তিশালী করবে।
২. উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ: টাকা ছাপিয়ে বাজারে না ছেড়ে সেই টাকা প্রকৃত পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে হবে। সাপ্লাই বাড়লে ডিমান্ডের চাপ কমবে, ফলে দাম কমতে বাধ্য।
৩. সাপ্লাই চেইন ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ: উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পণ্যের দাম যে কারণে কয়েক গুণ বেড়ে যায়, সেই মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেট প্রথা কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
৪. অপচয় ও দুর্নীতি রোধ: রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং অর্থপাচার রোধ করা গেলে মুদ্রার মান স্থিতিশীল থাকে।
বেতন বৃদ্ধি সাময়িক হাততালি পাওয়ার মতো বিষয় হতে পারে, কিন্তু টাকার মান বৃদ্ধি হলো স্থায়ী সমাধান। নীতিনির্ধারকদের এখন সস্তা জনপ্রিয়তার পথ ছেড়ে কঠিন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। জনগণের প্রকৃত মুক্তি টাকার অঙ্ক বাড়ানোতে নয়, বরং টাকার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোতে; আর তার জন্য সুদভিত্তিক শোষণের অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।
লেখক, অর্থনীতিবিদ, সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা