যুদ্ধ বিরতির ৬ মাসের মাথায় ইরানে আবারও মার্কিন হামলার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরায়েলও। এরফলে ইসরাইল এবং আমেরিকা যৌথভাবে যে কোন সময় ইরানে ভয়াবহ সামরিক হামলা চালাতে পারে।
ইরানও বসে নেই। ইরানে যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় তবে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান।
দেশের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতের মধ্যেই মার্কিন-ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলার জবাব দিতে প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইরান বলছে, যেকোনো মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলকে “বৈধ লক্ষ্যবস্তু” হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ১১ জানুয়ারি রোববার ইরানের পার্লামেন্টকে একথা জানিয়েছেন স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ।
এর আগে, গতবছর জুন মাসে এ ধরনের সতর্ক অবস্থান জানানোর পর যুদ্ধ জড়িয়ে পড়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। পরে আমেরিকাও সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছিল।
১২ দিনব্যাপী ওই যুদ্ধ চলে ছিলো। তাতে উভয়পক্ষ হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিলো। ইসরায়েলের সঙ্গে ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেয় এবং ইরানের পরমাণুকেন্দ্রে বিমান বড় ধরণের বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা হামলা চালিয়ে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমানবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছিলো ।
২০২৫ সালে সংঘটিত ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সামরিক সংঘাত। যুদ্ধের ভয়াবহতা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং সামরিক ধ্বংসযজ্ঞের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে এক আকস্মিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে।
ঐ সময় সেই যুদ্ধবিরতি আপাতদৃষ্টিতে সংঘর্ষের অবসান ঘটালেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্লেষকদের মধ্যে তখন থেকেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, এই যুদ্ধবিরতি টেকসই হবে কি না?
বাস্তবে ৬ মাস পর আবারও ইরানে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ হামলার হুমকী এবং ইরানের পাল্টা হুমকীতে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে এবং আবারো যুদ্ধের আশঙ্কা ঘণীভূত হচ্ছে।
এদিকে, শনিবার রাতেও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে আন্দোলনকারীরা। বিক্ষোভের বিরুদ্ধে ইরান সরকার আরো কঠোর অবস্থানে গিয়েছে।এই আন্দোলন ইরানের প্রতিটি প্রদেশের একশটিরও বেশি শহর ও নগরে ছড়িয়ে পড়েছে।
দুইটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দুইদিনে একশটিরও বেশি মরদেহ আনা হয়েছে। দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই আন্দোলনকারীদের নিহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে।
১. ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক পটভূমি
প্রথমত: আদর্শিক শত্রুতা
ইরান ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইসরায়েলকে ‘জায়নিস্ট দখলদার রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে এসেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বহুবার ইসরায়েলের ‘নির্বাচনী মানচিত্র থেকে বিলুপ্তি’ কামনা করেছেন।
অপরদিকে, ইসরায়েল মনে করে ইরান হলো তার অস্তিত্বের প্রধান হুমকি; বিশেষত হিজবুল্লাহ, হামাস এবং অন্যান্য ছায়াযুদ্ধ পরিচালনাকারী মিলিশিয়াদের মদদদাতা হিসেবে।
দ্বিতীয়ত : ভূরাজনৈতিক সংঘাত
ইরান দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও গাজা অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করেছে, যেখানে ইসরায়েল বারবার বিমান হামলা ও সাইবার অপারেশনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এই সংঘাতের বাস্তবতাই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলেছে এবং আবারো ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল হামলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি হয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে। তবে সেই যুদ্ধবিরতির চারটি প্রধান দুর্বলতা ছিল। সেগুলো হলো-
১. কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছিলো না। এটি ছিলো মুখে-মুখে ঘোষিত এক ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতি। এর পেছনে কোনো বৈধতা ভিত্তিক শান্তি চুক্তি ছিলো না। ২. আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের অনুপস্থিতিও সেই যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর করে তুলেছিলো। যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে জাতিসংঘ, ইইউ, বা কোনো নিরপেক্ষ পরিদর্শক ছিল না। ৩. তখনকার ঐ যুদ্ধবিরতি মূলত কৌশলগত যুদ্ধবিরতি ছেল। তখন উভয় পক্ষই নতুন করে সংগঠিত হওয়ার জন্য সময় নিয়েছিল মাত্র। ৫. অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ যুদ্ধবিরতিকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে ছিলো না।
এসব কারণেই ৬ মাসের মাথায় সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙ্গে গিয়ে নতুন করে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং সেই যুদ্ধে আমেরিকা সরাসরি ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং যে কোন সময় হামলার হুমকী অব্যাহত রেখেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত ১০ জানুয়ারি শুক্রবার এক ভাষণে বলেছেন, “কয়েক লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে” এবং বিক্ষোভের মুখে তারা “পিছু হটবেন না। ”যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীরা “মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে” বলে মন্তব্য করেছেন আলি খামেনি।
এ ঘটনার ছয় মাসের মাথায় ইরানে শতাধিক শহরে গণবিক্ষোভ হতে দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, সরকারি বাহিনীর হামলায় ইতোমধ্যে শত শত বিক্ষোভকারী আহত ও নিহত হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে গত কয়েক দিন ধরে লাগাতার হামলার হুমকি দেওয়ার পর শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের জনগণ এখন স্বাধীনতা চায়। সেটা হয়ত অন্য যেকােনো সময়ের চেয়ে এখন আরো বেশি। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মনোভাবের কারণে এটা স্পষ্ট যে যেকোন সময় ইরানে আবার মার্কিন হামলা প্রায় নিশ্চিত। আর সেই হামলা ইসরাইলকে দিয়ে শুরু করতে চায় আমিরিকা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ইসরাইলের আলোচনা হলেও ইরানে সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত দিতে দেখা যায়নি ইসরায়েলকে। যদিও ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে দুই চির বৈরী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত দ্য ইকোনমিস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা চালালে সেটার ‘পরিণতি হবে ভয়াবহ’। ইরানে যে গণবিক্ষোভ চলছে, সেটির দিতে নজর রাখছেন বলেও জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
আজ থেকে ৬ মাস আগের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ছিলো একটি কৌশলগত বিরতি মাত্র। শান্তি চুক্তি নয়। ভূ-রাজনীতি, আদর্শিক সংঘাত, সামরিক প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিবেচনায় ধরে নেওয়া যায় যে, সেই যুদ্ধবিরতি আর টেকসই হচ্ছে না।
ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের মধ্যেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্ররোচনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বশক্তিগুলোর সক্রিয় ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে সংঘর্ষে নিমজ্জিত হবে এটাই বাস্তবতা। তখন এটি আর আঞ্চলিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখা দেবে।
লেখক : সাংবাদিক। স্কুল অব জার্নালিজমের নির্বাহী পরিচালক।