জুবায়ের হাসান
গত ৩১ আগস্ট ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীন সফরে গিয়েছিলেন। এটা ছিল সাত বছর পর তাঁর প্রথম চীন সফর। সেখানে তিনি সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন বা ‘এসসিও’ জোটের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন। এছাড়া এসসিও শীর্ষ সম্মেলন শুরু হওয়ার পূর্বে নরেন্দ্র মোদি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। ওই বৈঠককালে নরেন্দ্র মোদী বলেন, ভারত-চীন সহযোগিতা সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ বয়ে আনবে। পৃথিবীর ২৮০ কোটি মানুষ এই দুটো দেশে থাকে। দুই দেশের মধ্যে এখন একটা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ বিরাজ করছে। ওদিকে চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন: আমরা বিশ্বের দুই প্রাচীনতম সভ্য দেশ এবং সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র। আমাদেরকে পরস্পরের বন্ধু ও সৎ প্রতিবেশী হয়ে একসাথে এগিয়ে যেতে হবে। চীন ও ভারত পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোগিতার অংশীদার। বিশ্ব আজ একটি রূপান্তরের পথে। এশিয়ার ড্রাগন আর হাতি একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়টাই এখন সময়ের দাবি। এখানে চীনা প্রেসিডেন্ট ড্রাগন বলতে চীন আর হাতি মানে ভারতকে বোঝান। বস্তুত নরেন্দ্র মোদি এবং শি জিনপিংয়ের এসব কথা থেকে মনে হচ্ছিলো, ভারত এবং চীন নয়া সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রধানতম বাধা হলো ভারত ও চীনের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ। এই দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার। যা ম্যাকমোহন লাইন দ্বারা চিহ্নিত। কিন্তু তা সত্বেও এই দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ এখনও অমীমাংসিত। চীন লাদাখের বিস্তীর্ণ এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এছাড়া চীন ভারতের অরুণাচল প্রদেশকে তার নিজের এলাকা দাবি করে আসছে। চীন অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে যে নাছোড়বান্দা তার প্রমাণ পাওয়া গেলো সাম্প্রতিককালের এক ঘটনায়। তা হলো: গত ২১ নভেম্বর চীনা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রেমন ওয়াংজম নামের একজন ভারতীয় নারীকে ১৮ ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটক করে রাখে। এর কারণ ওই ভারতীয় নারীর পাসপোর্টে জন্মস্থান অরুণাচল প্রদেশ লেখা ছিলো। তিনি ব্রিটেনে বসবাস করেন এবং সেখান থেকে জাপান যাচ্ছিলেন। পথে চীনের সাংহাই পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন ঘণ্টার ট্রানজিট যাত্রা বিরতি ছিল। আর সেখানেই তাকে আটক করা হয়। এ ঘটনার পর ভারত ও চীনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়।
এখন কথা হলো, চীন ও ভারতের এই সীমান্ত বিরোধের উৎস কোথায়? এর উত্তর পেতে হলে ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে।
দীর্ঘ কয়েক হাজার বছর পর ১৯১১ সালে চীনে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়। ফলে চীন পরিণত হয় একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। ১৯১২ সালে চীনা জাতীয়তাবাদী নেতা সান ইয়াৎ-সেন ওই চীনা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হন। সেসময় চীনের তিব্বত অঞ্চলটি কার্যত হয়ে উঠেছিল একটা স্বাধীন দেশ। সে নামমাত্র ছিল চীনের অধীন। উল্লেখ্য যে বৃহত্তর তিব্বতের একটি অংশ হলো লাদাখ এবং দক্ষিণের আরেকটি অংশ হলো অরুণাচল। যা-ই হোক, এদিকে ১৯১৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার ব্রিটিশ-ভারত এবং তিব্বতের মধ্যে সীমান্ত চিহ্নিত করতে চায়। এই লক্ষ্যে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার সিমলায় একটি সম্মেলন ডাকে। এতে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন ম্যাকমোহন। আর সেই সম্মেলনে তিব্বত এবং মূল চীনের দুইজন প্রতিনিধি অংশ নেন। অতঃপর ম্যাকমোহন বৃটিশ ভারত এবং তিব্বতের মধ্যে একটি সীমান্তরেখা অঙ্কন করেন। যাকে বলা হয় ম্যাকমোহন লাইন। তিব্বতের প্রতিনিধি ওই ম্যাকমোহন লাইনের সীমান্তরেখাকে মেনে নেন। কিন্তু চীনের প্রতিনিধি চীনা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে ওই ম্যাকমোহন লাইনকে ভারত ও তিব্বতের মধ্যে সীমান্তরেখা হিসাবে মানতে অস্বীকার করেন এবং চীনা প্রতিনিধি কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেই ফিরে যান নিজ দেশে।
এরপর চীন দেশে ঘটে যায় মহা বিপ্লব। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে চীনা জাতীয়তাবাদী সরকারকে উৎখাত করে ১৯৪৯ সালে চীনের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। এই চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সরকার ১৯৫১ সালে তিব্বতের ওপর পুনরায় চীনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু এই কমিউনিস্ট সরকারকে চীনের প্রকৃত সরকার হিসেবে মেনে নেন। তিনি ১৯৫৪ সালে ২৯ এপ্রিল চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ককে দাঁড় করাবার জন্য চীন-ভারত একটা বিশেষ চুক্তিতে উপনীত হন। ওই চুক্তিতে তিব্বতের ওপর চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বময় কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে কিছুদিন পর, এ থেকেই উদ্ভব হয় চীনের তিব্বত ও ভারতের সীমান্ত নিয়ে জটিলতা। ভারত চায়, চীন ম্যাকমোহন রেখাকে মেনে নিক। কিন্তু চীন সেটা মানতে অস্বীকার করে। চীন বলে তার প্রতিনিধি ১৯১৪ সালে ম্যাকমোহন সীমারেখাকে তিব্বত এবং ভারতের মধ্যে সীমারেখা বলে মানেনি এবং এখনও সে ম্যাকমোহন রেখাকে ভারত-চীনের মধ্যে সীমারেখা বলে স্বীকার করবে না। চীন যুক্তি দেখায় অতীতে তিব্বতের প্রতিনিধি ম্যাকমোহন রেখাকে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যে সীমানা হিসেবে মেনেছে। কিন্তু তিব্বত সরকারের ব্রিটিশ ভারতীয় সরকারের সাথে ওই ধরনের কোনো চুক্তি করার কোনো অধিকার ছিল না। এখন যেহেতু ভারত সরকার ১৯৫৪ সালে তিব্বতের ওপর চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বময় কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছে, তাই নতুন করে চীনের সাথে ভারতের সীমান্ত চুক্তি হতে হবে। এভাবে চীন এই যুক্তি তুলে ধরে তৎকালীন বৃহত্তর তিব্বতের দুটো অংশ লাদাখ অঞ্চল এবং অরুণাচল প্রদেশ নিজের এলাকা হিসেবে দাবি করতে থাকে। উল্লেখ্য যে, লাদাখ অঞ্চল একসময় ছিল তিব্বতের অংশ। কাশ্মিরের ডোগরা রাজা ১৮৮৪ সালে এই অঞ্চল দখল করেছিলেন। ফলে লাদাখ পরিণত হয় কাশ্মিরের একটি জেলা হিসেবে। কিন্তু চীন ম্যাকমোহন লাইনকে অস্বীকার করার কারণে লাদাখকে তার এলাকা হিসেবে দাবি করতে থাকে।
এদিকে তিব্বতের অভ্যন্তরে চীনা কমিউনিস্ট সরকারের শাসন এবং ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে। ১৯৫৯ সালে এই বিদ্রোহ চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলে চীনা কমিউনিস্ট সরকার আরো কঠোরভাবে তা দমন করতে থাকে। এতে তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু বা দালাইলামা তিব্বত থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এতে ভারতের ওপর চীনা কম্যুনিস্ট সরকার ক্ষুব্ধ হয়। শুরু হয় চীন-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন। দুপক্ষই সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং মাঝে মাঝে সীমান্ত সংঘর্ষ হয়। এদিকে ১৯৬২ সালে কিউবা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যুদ্ধ অবস্থা তৈরি হয় এবং সারা বিশ্বের নজর থাকে সেখানে। এই সুযোগকে ব্যবহার করে চীন ১৯৬২ সালের ২০ অক্টোবর ভারত আক্রমণ করে। এতে শুরু হয় চীন-ভারত প্রচণ্ড যুদ্ধ, যা চলে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত। এক মাস একদিনের ওই যুদ্ধে ভারত চীনের কাছে খুব করুণভাবে পরাজিত হয়। চীন ভারতের কাছ থেকে লাদাখ অঞ্চলের প্রায় চল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা দখল করে নেয় এবং সেই দখল এখনও বজায় রেখেছে। উল্লেখ্য যে, লাদাখ অঞ্চলের মানুষ দেখতে তিব্বতিদের মতোই এবং ধর্মে তারা হিন্দু নন। তারা তিব্বতিদের মতোই লামা বৌদ্ধবাদী।
ওদিকে ১৯৬২ সালে সংঘটিত চীন-ভারত যুদ্ধ অরুনাচল প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। এখানকার যুদ্ধে ভারত চীনের কাছে আরো করুণভাবে পরাজিত হয়। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি অরুণাচল প্রদেশের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। তবে কয়েকদিন পর চীনা বাহিনী স্বেচ্ছায় অরুনাচল ত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু চীনা সেনাবাহিনী সরে গেলেও বর্তমানে ভারতের সৈন্যবাহিনী মূল ম্যাকমোহন সীমান্ত রেখা থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দক্ষিণে সরে এসে অবস্থান করছে। এই সীমান্তে এখন নতুন একটি যুদ্ধ বিরতি রেখা টানা হয়েছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে লাইন অফ একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি।
উল্লেখ্য যে ব্রিটিশ শাসনামলে বৃহত্তর তিব্বতের এই অরুণাচল এলাকাকে বলা হতো নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি (বা ঘঊঋঅ)। এই নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি এলাকাকে ব্রিটিশরা প্রশাসনিক দিক দিয়ে আসাম প্রদেশের একটা অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এবং তা শাসিত হতে থাকে আসাম প্রদেশের গভর্নর দিয়ে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর এই নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি এলাকা ভারতের শাসনাধীন হয় এবং এর নাম দেয়া হয় অরুণাচল। কিন্তু চীন ম্যাকমোহন লাইনকে অস্বীকার করার কারণে সে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সাতাত্তর হাজার সাতশ বর্গকিলোমিটার জায়গা তার নিজের অংশ হিসেবে দাবি করতে থাকে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীন অরুনাচল প্রদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়ে আবার স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছিল। এর কারণ চীন সম্ভবত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে অরুণাচল ভারতের থাক, আর এর বিনিময়ে লাদাখ অঞ্চল তার দখলে থাক। অর্থাৎ চীন লাদাখ ও অরুনাচল এই দুই অংশের মধ্যে একটি দরকষাকষির জায়গা রেখে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে চীন তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে। ওদিকে ভারত ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি এই অরুণাচল প্রদেশকে তার অংশ হিসাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে চরম সীমান্ত বিরোধ বিদ্যমান থাকে।
এখানে আরও উল্লেখ্য যে, ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীন ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকা লাদাখের প্রায় চল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের যে এলাকাটি দখল করেছিল তার নাম দেয় আকসাই চিন। এই এলাকার ভেতর দিয়েই চীন তার মূল ভূখণ্ডের সাথে জিয়ানজিং বা উইঘুর প্রদেশের সংযোগ স্থাপন করে। আর এ বিষয়ে পাকিস্তানও চীনকে সহযোগিতা করে। পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে লাদাখের পূর্বে অবস্থিত গিলগিট বালটিস্তানের একটি অঞ্চল চীনকে লিজ দেয়। অঞ্চলটির নাম হলো শাক্সগাম ভ্যালি, যার আয়তন প্রায় পাঁচ হাজার একশত আশি বর্গকিলোমিটার। এভাবে চীন তার মূল ভূখণ্ড থেকে তিব্বত হয়ে তাদের জিয়ানজিং বা উইঘুর প্রদেশে যাওয়ার জন্য লাদাখের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ করে। তখন অবশ্য ভারত এই সড়ক নির্মাণে কোনো জোড়ালো আপত্তি কিংবা বাধা প্রদান করেনি। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত দাবি করতে আরম্ভ করে যে, লাদাখ ভারতের অংশ। তবে ভারত চীনের দখলকৃত লাদাখ অঞ্চল পুনরুদ্ধারে তৎপর হয় না। মুখেই শুধু এলাকাটি ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি করতে থাকে। যদিও ২০২০ সালে লাদাখ অঞ্চলের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘটিত হয় এক ভয়াবহ সংঘাত, যাতে অনেক ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়।
বস্তুত ভারত দখল হয়ে যাওয়া লাদাখ অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে যতটা না তৎপর তার চেয়ে অরুণাচল প্রদেশ রক্ষা করতে অনেক বেশি তৎপর।
১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারত লাদাখের বিরাট অঞ্চল চীনের কাছে হারানো ঠেকাতে পারেনি। তবে এখন নতুন করে আর কিছুতেই অরুণাচল প্রদেশকে চীনের কাছে হাতছাড়া করতে প্রস্তুত নয়। ওদিকে চীনও অরুণাচলের দখল নিতে তৎপর এবং চীন অরুণাচলকে জাঙনান নামে সম্বোধন করে থাকে। বস্তুত ভারত ঘিরে চীন যতো সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তার প্রধান টার্গেট হলো এই অরুনাচল প্রদেশ দখল করা। এ বিষয়ে চীন এতটাই সিরিয়াস যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ এবং ২০২৪ সালে অরুণাচল প্রদেশে সফরে গেলে চীন তার সফরের কড়া প্রতিবাদ জানায় এবং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে।
চীন ও ভারতের মধ্যকার এই সীমান্ত বিরোধের উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত কর্তৃক তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামাকে ভারতে আশ্রয় দান। এছাড়া সাম্প্রতিককালে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে চীন ১৩৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ শুরু করেছে। এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বার্ষিক ৩০ কোটি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটাই হবে পৃথিবীর বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এখন এই বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা নিয়েও ভারত ও চীনের মধ্যে বিরোধের সূচনা হয়েছে। কেননা এতে ভাটির দেশ ভারত কম পানি পাবে। সুতরাং ভূমির মালিকানা বিরোধ এবং পানির বিরোধ এই দুই বিরোধের মীমাংসা না হলে ভারত ও চীনের সাথে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব স্থাপিত হবে না, বরং তা ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ লাভ করতে পারে। আর এমন যুদ্ধ বাস্তবতার নিরিখেই সাবেক ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ ১৯৯৮ সালে বলেছিলেন, ভারতের ১ নম্বর শত্রুদেশ হলো চীন। উল্লেখ্য যে জর্জ ফার্নান্দেজ ছিলেন বিজেপির বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
এদিকে ভারতের প্রতিবেশী মিয়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও পাকিস্তান-এসব প্রত্যেকটি দেশেই চীনের বন্ধুত্বমূলক উপস্থিতি বেড়েই চলেছে। চীন এখন ভুটানের পূর্বভাগের সাতশত সাতাত্তর বর্গকিলোমিটার জায়গা তার নিজের বলে দাবি করছে। দোকলাম গিরিপথ এই অঞ্চলে অবস্থিত। ২০১৭ সালে দোকলাম গিরিপথের মধ্য দিয়ে চীন একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারত তাতে বাধা দিতে সৈন্য পাঠায়। এতে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত হয়। দৃশ্যত মনে হচ্ছে ভুটান দোকলামের ওপর চীনের কর্তৃত্ব মেনে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু ভারত এর ঘোরতর বিরোধিতা করছে। আসলে ভারত ও চীনের বৈরিতায় ভুটান পড়েছে দোটানায়। তবে মনে হচ্ছে ভুটান ভারতকে টপকে চীনের সাথে কোনো একটা চুক্তি করে ফেলতেও পারে।
বস্তুত ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ বাধবে কি-না, আমরা তা আগাম বলতে পারি না। সেটা নির্ভর করবে ভারত ও চীনের নীতির ওপর। তবে মনে হচ্ছে, চীন অগ্রসর হচ্ছে একটা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে। চীন পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে একটি বিরাট গোপন সাবমেরিন ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। এ বছরের মে মাসে চার দিনের পাক-ভারত যুদ্ধে চীন সর্বাত্মকভাবে পাকিস্তানকে সামরিক সাহায্য দিয়েছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিককালে চীন শ্রীলঙ্কার কাছ থেকে হামবানতোতা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। সেখানেও চীন গড়ে তুলছে একটা বিরাট সাবমেরিন ঘাঁটি। এদিকে মালদ্বীপে ২০২৩ সালের নির্বাচনে ভারতপন্থী প্রেসিডেন্ট পরাজিত হয়ে এখন সেখানে চীনপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ভারত মহাসাগরের এ অঞ্চলেও চীনা নৌ শক্তির উপস্থিতি বাড়ছে। এদিকে মিয়ানমারের সাথে চীনের রয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঘনিষ্ঠতা। ১৯৮০-এর দশক থেকে মিয়ানমার যখন আন্তর্জাতিকভাবে এক ঘরে হয়ে পড়েছে তখন একমাত্র চীন অবিরামভাবে তাকে সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে চলেছে। মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগ যেমন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি সে দেশের সমুদ্র বন্দরগুলোতেও চীনা উপস্থিতি বেড়েছে। এদিকে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতপন্থী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশের কাছে রয়েছে চীনা নির্মিত যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন। সুতরাং এসব থেকে মনে হচ্ছে চীন ভারতকে নৌপথেও ঘিরে ফেলতে চাচ্ছে।
এদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালও এখন হয়ে উঠেছে খুবই ভারতবিরোধী। যদি চীন-ভারত সঙ্ঘাত বাধে সেক্ষেত্রে মনে হচ্ছে নেপাল নেবে চীনের পক্ষ।
ওদিকে ১৯৪৭ সালের পর থেকে সিকিম ছিল ভারতের একটি আশ্রিত রাজ্য। কিন্তু তা সত্বেও ভারত সিকিমকে বিশ্বাস করতে না পেরে ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে তা দখল করে নেয়। এই সিকিমের ল্যাপচা জনগোষ্ঠী এখন চাচ্ছে তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে চীনের সাহায্য পেতে। মনে হচ্ছে চীন তাদের সাহায্য করতেই ইচ্ছুক। বস্তুত চীন তার বিমান, নৌ এবং স্থল বাহিনীর জন্য নিত্যদিন এমন সব অত্যাধুনিক অস্ত্রের পরীক্ষা করছে যা সারা বিশ্ব বিস্ময়ভরে দেখছে। অর্থনীতির পাশাপাশি চীনের এই সামরিক উত্থান ও সক্ষমতা তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে বিচলিত করে তুলছে।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন। চীনের চুম্বি উপত্যকা থেকে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর মাত্র ১৩০ কিলোমিটারের মতো দূরে অবস্থিত। চীন-ভারত যুদ্ধ বাধলে চীন এই করিডোর দখল করে নিতে চাইবে। উল্লেখ্য, শিলিগুড়ি করিডোর বলতে বোঝায় বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে অবস্থিত ২৭ কিলোমিটার চওড়া ভারতীয় জায়গাকে। এই জায়গার মধ্য দিয়ে ভারতের প্রধান ভূভাগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পূর্ব-ভারতের সাতটি বোন রাজ্য। চীনের আক্রমণে এই জায়গার ওপর ভারতের দখল না থাকলে ভারতকে তার পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি ভারতকে এটা করতে দেবে? যদি বাংলাদেশ ভারতকে এটা করতে দেয় তাহলে এদেশও আক্রান্ত হতে পারে চীনের দ্বারা। সুতরাং বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক