রোদে পুড়ছে মাঠ, গ্যালারিতে ঢেউ খেলছে মানুষের উল্লাস। ঢাকঢোলের শব্দ, পতাকা, টুপি আর স্লোগানে মুখর চারপাশ। ষোলো বছর পর শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরেছে। কিন্তু এই উৎসবের মধ্যেই কোথাও একটা অজানা শূন্যতা যেন গ্যালারির এক কোণে কেউ নেই, যাকে থাকা উচিত ছিল। নাম তাঁর হুমায়ুন আহমেদ রুমেল। যে রুমেল একদিন শহরের সাতমাথায় কাফনের কাপড় গায়ে জড়িয়ে বসেছিলেন আমরণ অনশনে। যার একটাই দাবি ছিল – চান্দু স্টেডিয়ামকে ভেন্যু থেকে বাদ দিও না। আজ সেই স্টেডিয়ামেই আবার খেলা ফিরেছে, কিন্তু রুমেল ফিরলেন না। ২০২৩ সালের ২ মার্চ বিসিবি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে চিঠি পাঠায় বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম আর আন্তর্জাতিক ভেন্যু নয়। মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় কর্মকর্তাদের, তুলে নেওয়া হয় যন্ত্রপাতি। খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই রুমেল ব্যথিত হয়ে পড়েন। অন্যেরা যখন ফেসবুকে ক্ষোভ জানাচ্ছিল, তিনি নেমে আসেন রাস্তায়। কাফনের কাপড় পরে, গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে, সাতমাথার মোড়ে পাটি পেতে বসেন আমরণ অনশনে। শহরের মানুষের কৌতূহল- কে এই ছেলে? রুমেল শান্ত গলায় বলেছিলেন, বগুড়ার উন্নয়ন থেমে গেছে। এখন এই মাঠও গেল। এটা শুধু একটা স্টেডিয়াম না, এটা আমাদের পরিচয়। আমি মরতে রাজি, কিন্তু চান্দুর মর্যাদা হারাতে দেব না। তার সেই প্রতিবাদের ছবি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। সাংবাদিকেরা লেখেন তাঁর গল্প। কিছুদিন পর জেলা ক্রীড়া সংস্থা তাঁকে আশ্বাস দেয়- বিসিবির সঙ্গে আলোচনা চলছে। রুমেল আশ্বাসে অনশন ভাঙেন, কিন্তু প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না। তখন তিনি আবার মাঠে নামেন- এবার হাতে গলায় শিকল বেঁধে, কাফনের কাপড় পরে। ব্যানারে লিখে ফেলেন, প্রতিবাদী অনশন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিন কেটে যাচ্ছিল। শহরের মানুষ কখনো পানি দেয়, কখনো ফল। কেউ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে এমন তরুণ আজকাল দেখা যায় না। সাংবাদিকেরা এসে ছবি তোলে, লাইভ করে, কেউ কেউ চোখ মুছে ফিরে যায়। এক সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কী পাবে এতে? রুমেল ধীরে বলেছিলেন, আমি না থাকলেও বগুড়ার মাঠে যদি আবার খেলা ফেরে, সেটাই আমার পাওয়া। সেই কথাই যেন ভবিষ্যতের জন্য রেখে গিয়েছিলেন তিনি। ২০ এপ্রিল ২০২৩ ভোর। নাটাই পূর্বপাড়ার ছোট্ট ঘরে নিঃশব্দ সকাল। ঘুমের ভেতরেই হারিয়ে গেলেন রুমেল। আগের রাতে নিজের ফেসবুকে লিখেছিলেন – জীবনের প্রথম স্মৃতি এবং জীবনের শেষ স্মৃতি প্রতিটি মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই পোস্টই আজ বগুড়াবাসীর চোখে তাঁর শেষ কথা। মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের বন্যা বয়ে যায়। মানুষ তখনও বুঝতে পারেনি একটা স্বপ্নও যেন থেমে গেল তাঁর সঙ্গে। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে স্টেডিয়ামে আবার কাজ শুরু হলো। মাঠের ঘাসে ফিরে এলো সবুজ। আর ২০২৫ সালের অক্টোবরের সকালে খবর এল আফগানিস্তান অনূর্ধ্ব–১৯ দল খেলবে বগুড়ায়। ষোলো বছর পর শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে ফিরছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। সেদিন সকাল থেকে বগুড়ায় যেন উৎসব। শহরের বিভিন্ন দিক থেকে ভিড় জমে মাঠে। কেউ পতাকা হাতে, কেউ ব্যানার নিয়ে, কেউ শুধু উচ্ছ্বাসে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে। মধ্য কার্তিকের রোদে দর্শকরা ঘাম ঝরিয়েও খেলা দেখছে। প্রতিটি ছয় চারে ওঠে উল্লাসের গর্জন। আবার কেউ পোস্ট দিচ্ছেন- রুমেল তুমি আজ থাকলে সবচেয়ে খুশি হতে। চান্দু ফিরেছে, কিন্তু তুমি নেই। সাংবাদিক আব্দুল আউয়াল লিখেন, শহীদ চান্দুর ২২ গজে আন্তর্জাতিক ম্যাচ ফিরেছে, তবে আমরা রুমেলকে ভুলে গেছি। আরিফুর রহমান আরিফ লিখেন, রুমেলের নামে একটি গ্যালারির নামকরণ করা হোক। সুরঞ্জিত সরকার লিখেন, তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, কিন্তু সে আজ নেই। আর শাকিল আহমেদ লিখেন, চান্দু স্টেডিয়াম চালু হওয়ার আগেই আল্লাহ তাঁকে নিয়ে গেছেন। বগুড়ার মানুষের কণ্ঠস্বর এই মানুষটাকে আল্লাহ জান্নাতবাসী করুন। রুমেল ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিনের ছেলে। ভাইয়েরা বাইরে থাকতেন, তিনি মায়ের সঙ্গে একা। টাকার অভাব ছিল, কিন্তু স্বপ্নে অভাব ছিল না। “চ্যানেল বগুড়া” নামের একটি ফেসবুক পেজ চালাতেন, নিজেই ভিডিও বানাতেন, নিজেই সম্পাদনা করতেন। তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠত শহরের খবর, মানুষের গল্প, উন্নয়নের দাবি। আজ যখন সেই শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম আবার আলোয় ঝলমল করছে, তখন অনেকেই মনে করছেন এই আলোয় রুমেলের আত্মত্যাগের ছায়াও আছে। হয়তো তিনি না থাকলে কেউ ভাবতেও না, এই মাঠে আবার খেলা ফিরতে পারে। গ্যালারির ওপরে বাতাস বইছে, পতাকা উড়ছে। সন্ধ্যার আলোয় মাঠের ফ্লাডলাইট জ্বলতেই দর্শকরা হাততালি দিচ্ছে। কেউ কেউ ধীরে বলে উঠছে “রুমেল, দেখো, তোমার চান্দু আবার জেগে উঠেছে।” বগুড়ার মানুষ আজ মাঠে গিয়ে খেলা দেখছে, কিন্তু হৃদয়ের গ্যালারিতে বসে আছেন এক তরুণ চিরদিনের জন্য।