বলতে গেলে নাটকীয়তার মধ্যে অবশেষে জুলাই সনদ স্বাক্ষর হলোÑ যা দল বিশেষে জাতীয় সনদ নামে স্বীকৃতি বলে গণ্য হলো। ২০২৪ সালে জুলাই ছাত্র-জনতা সর্বোপরি সকল সেকল সেকল সেকল পেশার মানুষ এক নায়কতন্ত্র ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসকের ইতিহাসের জঘন্যতম গুণ-খুন-দমন-পীড়ন-দলীয় সর্বপর্যায়ে লুটপাট-রাহাজানি ১৭ বছর ধরে চলছিল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার অবসান হয়Ñ’৩৬ জুলাই’ বা ৪ আগস্ট-এ। তারপর থেকে চলছিল নানা রকম গুজপ। গুজপের মূল হোতা স্বৈরচারী সরকারের প্রধান পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা স্বয়ং। তিনি পাশর্^বর্তী দেশ থেকে একের পর এক আজগুবি ভুয়া খবর প্রচার করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে বানচালের হেন চেষ্টা নেই, যা প্রচার থেকে তিনি বিরত ছিলেন। বিশেষ করে ফেইজবুক, ইউটিউব, নেট চ্যানেলগুলোকে অবারিত ব্যবহার করে চলেছেন, এখনও চলছে। এর ভেতর দীর্ঘ আলোচনা-সমালোচনা, বিশেষ করেও আমাদের দেশের স্বাধীনতাকামী রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে সেসব গুজব প্রচার জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। বিভ্রান্ত করতে পারেনি প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস, সব অপপ্রচারকে উপেক্ষা করে তাঁর সময় চিত ঘোষণা Ñ ফেব্রæয়ারি ১২ তারিখে নির্বাচন দেবেন, সেটাইকে আমূলে রাজনৈতিক দল নির্বাচন দেবেন। আগামী সাধারণ নির্বাচনে কীভাবে নির্বাচনি বৈতরণি পার হওয়া যায় সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।
তারপরও কথা থাকে। পতিত পলাতক সরকার দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রেখে গেছেন অসংখ্য স্তাবক, যাদের হাতে রয়ে গেছে কোটি কোটি টাকা। যারা এক সময় দেশের মিডিয়াসহ সবগুলো প্রচার মাধ্যমে গঠনমূলক আলোচনা করছিলেন, ধীরে ধীরে তারা স্বমহিমায় তাদের মুখোশ বা খোলস ছেড়ে বের হয়েছেন। দেশকে অস্থির করার যত পথ-ঘাট আছে সবগুলোতে সরকারের সমালোচনায় তারা এখন মুখর। আবু আলম শহীদ খান, গোলাম মওলা রণি, সুভাষ সিংহ রায়সহ বেশ কিছু বেশ কিছু মুখোশধারী এখন সরব রয়েছেন। আবু আলম শহীদ খান গ্রেপ্তার হয়েছেন, গোলাম মওলা রনি গংরা এখন সক্রিয় এবং বুক উঁচিয়ে লিখে চলেছেন, সুভাষ সিংহ রায় দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আত্মগোপনে। যে যেখানেই থাকুক না কেন, তারা গোপনে প্রকাশে ঘোষিত নির্বাচন বানচালসহ দেশের মব সৃষ্টির ইন্দনকারী হিসেবে সরকারের ভেতর-বাহিরে নানারকম কূট-কৌশলে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
অপর দিকে, বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই আন্দোলনে গৃহীত সনদে সই করলেও, জুলাই আন্দোলনের অগ্রনায়কদের দল এনসিপি সহ কয়েকটি ক্ষুদ্র দল সনদে সই করা থেকে বিরত আছেন। তাদের মতে, আইনি ভিত্তি না হলে সনদে স্বাক্ষর প্রহসনে হতে বাধ্য। আন্দোলন প্রতি আন্দোলন, তারা বুঝতে চাইছেন নাÑসকল দলের কাঙ্ক্ষিত সনদে স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়ে নির্বাচনের অভিযাত্রায় আর কোনো বাধা রইল না।
এনসিপি ক্ষমতার অংশীজন না হয়ে যদি ক্ষমতার বাইরে থেকে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর উপর প্রেশার গ্রæপ হিসেবে কাজ করতেন, জনগণ তাদেরকে সমীহ ও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। গোড়াতেই যে তারা ভুল করেছেন, ক্ষমতার মোহে ভেসে, সে ভুল এখন আর সংশোধন যোগ্য নয়Ñ সে সুযোগ তাদের হাতের বাইরে চলে গেছে। আমরা মনে করি, জুলাই আন্দোলনের নায়কগণ অধিকাংশই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র বা সদ্য পাশকরা ছাত্র। তারা যদি দেশের পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানের পোষ্য কোটাসহ বিভিন্ন সমস্যাবলি নিয়ে আন্দোলন অব্যাহত চালিয়ে যেতেন, সে ক্ষেত্রে জুলাই আন্দোলনের নায়করা বেশি লাভবান হতেন। যে-সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, সেখানে সরব থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে আমাদের বিশ্বাস, তারা অধিক লাভবান হতেন, এবং নির্বাচনের ফলাফল একটি ক্যাডারভিত্তিক দলের অনুকূলে নাও যেতে পারতো। সে নির্বাচনে তাদেরও প্রার্থী জয়লাভ করতো বলে অনেকেই মনে করেন। একক দলীয় শাসন যে ভালো হয় না, আমরা বহুবার দেখেছি। কেন যে তারা এমন ভুল করলো, আমাদের বোধে আসে না।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে নাÑ স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের আন্দোলনই শুরু হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা পোষ্যদের কোটা নিয়ে। সে আন্দোলন যদি তারাসহ সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণের সহায়তায় সফলতা লাভ করে, তাহলে এ-ও বিশ^াস করতে হয়Ñ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনো যে ভর্তির-চাকরির ক্ষেত্রে পোষ্য কোটা রয়ে গেছে, সেটিও সমূলে উৎপাটন সম্ভব হতো। এতে করে সাধারণ শিক্ষার্থী মেধাভিত্তিক, অধিকহারে ভর্তি হতে পারতো। এই সাধারণ চিন্তা-চেতনা কেন তাদের মাথা থেকে সরে এলো, দেশের বিপুলসংখ্যক অভিভাবকদের বোধগম্য নয়। অপর দিকে বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে তাদের আধিপত্য অধিকহারে বেড়ে যেতো। সেখান থেকেই তারা আগামী দিনে নেতা তৈরি হয়ে সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিলে জয়লাভ সহজ হতো। তাদের জেনেশুনে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একটি কট্টরপন্থি মৌলবাদী দলের একক আধিপত্য হয়ত না আসতে পারতো। এটাও তাদের মস্তবড় ভুল Ñজনগণ এবং সাধারণ ছাত্রসমাজ ও অবিভাবকদের ধারণা।
২.
আমাদের দেশে স্বৈরচারী আওয়ামী লীগ বিহীন যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদের মধ্যে বিএনপি একটি অন্যতম প্রধান দল। এই দলের সাথে আছে ছোট-খাটো অনেক দলের সমন্বয়ে জোট। আগামী ফেব্রæয়ারিতে নির্বাচন হলে, এই জোট যে সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করবেÑদেশের জনগণ তা মনে করেন। তা ছাড়া, সারাদেশ জুড়ে বিএনপির রয়েছে ঘরে ঘরে কর্মী, বিএনপির এমন কর্মী নেই যাদের নামে গত ১৭ বছরে অসংখ্য মামলা- খুন-হামলা-গুমÑকোর্ট-কাছারিতে নিঃস্ব হয়ে গেছে। শুধু বিএনপির কর্মী নয়, স্বয়ং বিএনপির প্রধান আপোশহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শত রকমের অত্যাচার, মিথ্যা মামলা, ঘরছাড়া, মৃত্যু কামনা করে শুধু ক্ষান্তই হননি, প্রতিনিয়তই পরিহাস ও নিগ্রহ করেছেন পতিত স্বৈরচারী সরকার ও তার দোসররা। জিয়া পরিবারকে ধ্বংস করার মিশন নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মেরে ফেলার জন্য যত প্রকার দৈহিক নির্যাতন করেছেন তা বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আমাদের ভাবতে হবে, তারেক রহমান এখন রাজনীতিবিদ হিসেবে অনেক পরিণত ও সংযোগ। বিএনপির বিশাল কর্মীবাহিনী, তারা অবাধ নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে।
অপর দিকে, জামায়াতও চান ক্ষমতার বড় স্বাদ পেতে। তাদেরও স্বৈরচারী সরকারে রোষালে পড়তে হয়েছে। অনেক নেতা নিপীড়ন ও অত্যাচারের মধ্যে গুম-খুন-ঊধাও হন। সে কারণে জামায়াতের আমির মনে করেন, ’বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়ের ধারা সারা দেশে সাধারণ নির্বাচনে পড়তে পারে। কারণ জামায়াত সারাদেশে তিন’শ আসনে তাদের একক প্রার্থী ঘোষণাও দিয়েছে অনেক আগেই। তারা কাজ করছেন নিজেদের মতো করে। যদিও তারা সাধারণ নির্বাচনে জিততে পারবে কি না, শঙ্কায় আছে। সেজন্য তারা পিআর পদ্ধতি চাল করার দাবিও নির্বাচনের মাঠে রেখেছেন, কিংবা সনদ বাস্তবায়নে গণভোট তারা নির্বাচনের আগে চাইছে। সে যাই-ই চান না কেন, আগামী নির্বাচনে জামায়াত যে এককভাবে নির্বাচন করবে এটা নিশ্চিত।
বাকী থাকে বাম ঘরানার দল। এই দলগুলো ছক কষছেন কোন জোটে ভিড়ে তাদের অবস্থান শক্ত করতে। নির্বাচন এখনো তিন মাস দলগুলোর হাতে আছে। এর মধ্যে কত রকমের উলোট-পালট খেলা হবে, কতো রকমের দও কষাকষি হবে বা পর্দার অন্তরালে হচ্ছে তা এখনো পরিস্কার নয়। কারণ রাজনীতিতে শত্রæ-মিত্র বলে কোনো অভিমান নেই। রাজনীতি হলো লাভ-অলাভের। যেখানে যে দল লাভবান হবে সেখানে তারা মাথা গুঁজিয়ে দেবেন- এটাই সত্য। এবি পাটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু তো বলেই বসলেন, তারা জুলাই বিপ্লবের আদর্শে বিশ্বাসী সমমনা কয়েকটি দল ছোট করে নির্বাচনে যাবার চিন্তা করছেন। এর ভেতর এনসিপিও রয়েছেন। তাদের মধ্যে আলোচনাও অব্যাহত রয়েছে।
দেশের সাধারণ মানুষ চায়-দ্রæত নির্বাচন হোক, একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসুক। দেশের বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক। দেশের প্রশাসান ব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। প্রয়োজনীয় নিত্য পণ্যের দাম সবারই নাগালের বাইরে। প্রতিনিয়তই দাবির পর দাবিতে ঢাকা প্রায় অচল, শুধু ঢাকা নয়, তার রেশে ঢাকাসহ দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। এই অচলআয়তন খুব দ্রæত কেটে যাক। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নাগালে মধ্যে আসুক। মব কালচার কিছুটা হলেও আয়ত্বে আসুক। আইন পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরুক। কর্মসংস্থান বাড়–ক, বেকারত্ব সহনশীলতার মধ্যে আসক। আর সে জন্য দরকার সব রাজনৈতিক দলের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ। সবার মধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, মহান জুলাইয়ের গণঅভ্যুাত্থনের চেতানা কাজ করুক। সব ঝামেলা এড়িয়ে জনগণ চান জাতীয় নির্বাচন।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট