৫ আগস্ট, ২০২৪। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে, আমাদের জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসা এক স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জিত হয়। সেই সাথে একদলীয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, পুলিশি দমন পীড়ন ও গুম-খুনের অপশাসন, ভোটহীনতা ও দখলীকরনের সংস্কৃতি, মিডিয়া সন্ত্রাস, মত প্রকাশের স্বাধীনতাহীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে চেতনার বাণিজ্য, অনৈতিক ও বিকৃত মনোভাবের শিক্ষানীতি প্রণয়নের অপকৌশল, অর্থনৈতিক লুটেরা, বৃত্তি ও অর্থ পাচার নীতি এবং নতজানু পররাষ্ট্রনীতির পতন হয়।
১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস ধরে রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পরাধীনতার গøানি মুছে, সর্বপ্রথম স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয় আমাদের এই শস্য-শ্যামল মাতৃভূমি। আশা ছিল মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় ডানা মেলে আকাশে উড়ব। কারও চোখ-রাঙানি আমাদেরকে অবদমিত করতে পারবে না। শোষণের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হব না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আমরা পাবো ভোট দেয়ার অধিকার। গণতন্ত্রের ভেলায় ভেসে মাঝির ভাটিয়ালি গানের মতো আমরা পাবো মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পাবো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। পাখির গানের মতো আমরা পাবো বাক্ স্বাধীনতা। ঝর্ণার পানির মতো থাকবে আমাদের প্রাণের উচ্ছলতা, স্বাধীন ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে সাথে আমরা পাবো অর্থনৈতিক মুক্তি, আর আমাদের থাকবে সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে নৈতিকতাপূর্ণ এক শক্ত মজবুত ভিত্তির উপরে। আমরা পাবো নিপীড়নহীন এক শান্তিময় সমাজ।
এখন প্রশ্ন হলো – আমাদের স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরে আমরা যদি পর্যালোচনায় বসি, তাহলে কি দেখতে পাই- আমরা কি মুক্তি পেয়েছি অর্থনৈতিক শোষণ থেকে? প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কী অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাম্য? মুক্তি পেয়েছি কী সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে? আমরা কি ফিরে পেয়েছি আমাদের বাক্? স্বাধীনতা? স্বাধীন এই বাংলাদেশে রক্ষিত হচ্ছে কি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার? সুসংহত হয়েছে কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র? না, হয়নি। বরং উলটো হয়েছে।
যে গণতন্ত্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধ, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, সেই গণতন্ত্রের অবস্থা আজও প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে কি না, তাও এখন পর্যালোচনায় আনা দরকার। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন দলগুলো পরমত সহিষ্ণুতার পরাকাষ্ঠা দেখানোর মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং তার পরিবেশ আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি কিনা, সেটাও বিবেচনায় আনা আবশ্যক বটে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মতামতকে আমরা কতটুকু গুরুত্বে নিতে পেরেছি? গুটিকতক লোকের জনসমর্থনহীন মতামত দেশবাসী মানুষের ঘাড়ে চাপাচ্ছি কিনা- সেটাও বিশ্লেষণে যুক্ত করতে হবে। বহুমত আর বহুপথের যাত্রা আজ কতটা উন্মুক্ত। দলবাজি, আত্মীয়করণ, এলাকাকরণ, আর সীমাহীন দলীয়করণে আজ মানুষের নাভিশ্বাস যাতে না উঠে সে দিকটা নিশ্চিত করতে না পারলে গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তার লেশমাত্র থাকবে না। একটা নষ্ট সময়ের ঘূর্ণি আবর্তে চলে যাবে দেশ।
অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলতে গেলে সত্যিকার অর্থে যা বোঝায় সেটি আমরা করতে পারিনি এখনও। মালেশিয়া এবং সিঙ্গাপুরকে আমরা যদি বিবেচনায় নেই, দেখতে পাবো- গত ত্রিশ বছরে তারা কোথা থেকে কোথায় গেছে, আর আমরা কোথায় আছি। আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি যাতে সীমাহীন দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতে না পারে, সেদিকে নজরদারি থাকা ছাড়া অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়বে বারবার। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যাতে দুর্নীতির কালসাপ বাসা বাঁধতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কি জনপ্রশাসন, কি পুলিশ প্রশাসন, কি বিচার বিভাগ – সর্বত্রই দুর্নীতির কালো বিড়াল যাতে প্রবেশ করতে না পারে- সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দুর্নীতিবাজ দেশ হিসেবে আমাদের মাথা হেট হতেও বাঁকি নেই। দেশ যাতে চোর বাটপাড়ের খনিতে পরিণত না হয়, সেদিকে চাই কঠিন নজরদারি।
গার্মেন্টস সেক্টরে একের পর এক অস্থিরতা, বিদেশি কূটকৌশলে শ্রমিক অসন্তোষ, অগ্নিকাÐ ইত্যাদি যাতে আমাদের সোনার ডিমপাড়া হাঁস এই গার্মেন্টস সেক্টরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। একের পর এক আন্তর্জাতিক মার্কেট হাত ছাড়া হয়ে গেলে আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভে বড় ধরনের আঘাত লেগে যাবে। আমার দেশের পিঁয়াজ রসুন, চাল, ডাল, গম, মশলা সব কিছুই এখনো বহুলাংশে বিদেশের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও চক্রান্তকারী বিদেশিদের প্রভাব নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে আমাদের পুরো অর্থনীতিকে। আমরা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, পরাধীন সেই পাকিস্তানী আমলের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে আমরা কি খুব বেশী ভালো আছি? আমাদের অর্থনীতিকে আমরা কি করতে পেরেছি পুরোপুরি স্বাধীন? তবে আশার কথা- আমরা এখন উন্নয়নের সড়কে চলতে শুরু করেছি। কিন্তু গতি বাড়াতে না পারলে ছিটকে যাবার আশংকাকেও মাথায় রাখতে হবে সবসময়।
আর সংস্কৃতির কথা যদি বলি, তাহলে বাজ পড়ে যে কোনো বিবেকবান মানুষের মাথায়। আকাশ-সংস্কৃতির আড়ালে বিদেশি সংস্কৃতির সয়লাব হয়ে গেছে পুরো বাংলাময়। বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলগুলোর দেউলিয়াপনা এবং অন্তঃসারশূন্য ও সংকীর্ণ, একপেশে মনোভাবাপূর্ণ অনুষ্ঠানমালার অযাচিত উপস্থাপনার কারণে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া থেকে রুচিবান সচেতন মানুষেরা যাতে মুখ ফিরে না নেয়, সেটা বিবেচনা করার সময় এখনই। অপরপক্ষে, প্রতিবেশী দেশে আমাদের কোন চ্যানেল প্রদর্শনের অনুমতি না থাকলেও বিনোদনপ্রিয় বাংলাদেশী মহিলারা বিদেশি বিভিন্ন সিরিয়ালের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছেন পুরোদস্তুর মতো। এমনকি সিরিয়াল দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যের জের ধরে ঘর সংসার ভাঙার উপক্রমও নাকি হয়েছে আমাদের এই সমাজে। সন্ধ্যা হলেই স্ত্রীর হাতে টিভি রিমোটের রাজত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন অনেক সংসারের কর্ণধার। আর শহুরের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাই বিদেশি সংস্কৃতিমুখী হয়ে উঠেছে শিশুদের বিনোদন মূলক নানা অনুষ্ঠানের কারণে। এমন কী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এবং বাঙালিদের নিজস্ব অনুষ্ঠান বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতাও পালিত হয় মোড়ে মোড়ে, অন্য ভাষার গান আর যুবক যুবতীদের নাচের তালে তালে। তাহলে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার হাল কী- সে প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে এখনই।
এমতাবস্থায়, আমাদের আজকে শপথ নিতে হবে যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র যাতে বিপন্ন হয়ে না পড়ে, বিপর্যস্ত হয়ে না পড়ে, যেন আমাদের স্বাধীনতার এই অর্জন। সকল হঠকারিতা, দলীয় সংকীর্ণতা, একপেশে মনোভাব আর ক্ষমতার লোভের কারণে আমাদের রক্তে-কেনা স্বাধীনতা যেন প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে কেউ- সে শপথও নিতে হবে বিজয়ের এই শুভক্ষণেই। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু অপশক্তি আমাদের এই উত্তরণের পথে বাধা সৃষ্টি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। তারা নানাভাবে এই বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। কোনো অপশক্তি আমাদের এই আত্মবলিদানকে যেন বৃথা করে দিতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার যেন কোনো স্বৈরাচার, দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের হাতে দেশ না পড়ে- সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে সকলকেই।
[লেখকঃ কবি, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক ।
ইমেইলঃ ধশধুধফশড়নর@মসধরষ.পড়স