• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১১ পূর্বাহ্ন

তিস্তা মহাপরিকল্পনা আলোর মুখ কি দেখবে?

Reporter Name / ১০৯ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

মো: আকতার হোসাইন

অতি সম্প্রতি, উত্তরবঙ্গের তিস্তা তীরবর্তী পাঁচ জেলায় একসঙ্গে ১০৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিশাল মশাল প্রজ্বালন করে দাবি আদায়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রতিবাদ জানায় সাধারণ জনগণ। যা সোশ্যাল মিডিয়াসহ সারাদেশে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। যেখানে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবাদী আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়। অংশ নেন উত্তরবঙ্গে লাখো মানুষ। কেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা জরুরি এবং কেন-ইবা সরকার অবহেলা করছেন, তা কারোই বোধগম্য নয়। বিগত সরকার ৩ লাখ কোটি টাকা ব্যয় করে দশটি মেগা প্রকল্পে কাজ করেছেন। অথচ এই প্রকল্পগুলো ছিল জীবন মান উন্নয়নের জন্য, আর তিস্তা মহা পরিকল্পনা ছিল, উত্তরবঙ্গকে মরুভ‚মি থেকে রক্ষা করার জন্য এবং মানুষকে বাঁচানোর অত্যাবশ্যকীয় একটি প্রকল্প। একটু ব্যাখ্যা করা যাক উত্তরবঙ্গের জন্য কেন জরুরি এই তিস্তা মহাপরিকল্পনা।

কৃষি নির্ভর এই বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের পুরোটাই কৃষি নির্ভরশীল। কৃষির জন্য প্রধান নিয়ামক হলো সেচ প্রকল্প বা পানি ব্যবস্থা। তিস্তা নদীর উজানে ভারতের বাদ দেওয়ার ফলে বাংলাদেশ খরা মৌসুমে পানির প্রবাহ মৃদু প্রায়। যেখানে বর্ষা মৌসুমে ২ লক্ষ আশি হাজারের বেশি কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়, অথচ খরা মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে দশ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়, আবার কোথাও কোথাও তা ১ হাজার কিউসেকে পরিণত হয়। এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের পাঁচ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী ২ হাজার বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত হলেও, এই অঞ্চলে প্রায় দশ হাজার বর্গকিলোমিটার চাষাবাদযোগ্য জমির পানির উৎস হলো এই তিস্তা নদী। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আই এফ আর আই) তথ্য মতে, তিস্তা নদীর অববাহিকা অঞ্চলগুলোতে সেচ প্রকল্প বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে বাৎসরিক প্রায় দেড় মিলিয়ন টন বোরো ধান উৎপাদন কম হয়, যা জাতীয় উৎপাদনের প্রায় নয় শতাংশ কম। অথচ তিস্তা নদী অববাহিকায় সেচ প্রকল্প বাধাগ্রস্ত না হলে জাতীয় উৎপাদন প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেত। বর্ষায় তিস্তা নদীর উজানে ভারত বাঁধ গুলো খুলে দিলে আকস্মিক বন্যায় তিস্তা অঞ্চল অববাহিকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়, ক্ষয় ক্ষতি হয় গবাদি পশুর, রাস্তাঘাট ভেঙে যায়, ঘরবাড়ি ভেসে যায় দুপাড়। নদী ভাঙনসহ প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটে। যা এই তিস্তা নদীকে চীনের হোয়াংহো নদীর মতই উত্তরবঙ্গের দুঃখ বলা যেতে পারে। এসব হতে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সরকার তিস্তা রিভার ক¤িপ্রহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট (টিআরসিএমআরপি) যা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামে পরিচিত কর্মসূচি হাতে নেয়। যা আজ অবধি আলোর মুখ দেখতে পায়নি। পূর্বের মতো বর্তমান সময়ে আশার আলো জাগলেও উত্তরবঙ্গের মানুষের শঙ্কা কাটেনি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে খরচ হবে প্রায় এক বিলিয়ন টাকা, কিন্তু এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে এতে প্রায় প্রতিবছর তিন বিলিয়ন টাকা লাভ হবে বলে ধারণা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চীন মুখিয়ে থাকলেও, বিগত সরকার ভারত প্রীতির কারণে বা উত্তরবঙ্গে মানুষের প্রতি উদাসীনতার কারণে, অথবা ভারতের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির কারণে ও নানা ছলাকলায় প্রকল্পটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। কারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মঙ্গা পিরিত এই উত্তরবঙ্গে মঙ্গা নিরসনে অগ্রণী ভ‚মিকা রাখতো। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যে-সব বিষয় কাজ করা হতো, তার মধ্যে অন্যতম হলো, তিস্তা নদীর প্রশস্ততা; কোথাও কোথাও ৫ কিলোমিটার থেকে তিন কিলোমিটার, তা কমিয়ে করা হবে ০.৮১৬ কিলোমিটার। নদীটির গড় গভীরতা ৫ মিটার, যা ১০ মিটারে উন্নীত করা হবে। প্রকল্পটি ঘিরে বেশ কয়েকটি জেটি বন্দর তৈরি করা হবে, নদীটির দুই পাশে চার লেনের রাস্তা কাজ করা হবে। নদীটি খনন করা হবে দীর্ঘ ১০৮ কিলোমিটার, চর রক্ষা করা হবে প্রায় ১৭৩ বর্গকিলোমিটার, বালু সরিয়ে উদ্ধার করা হবে কৃষি জমি।

কিন্তু এই প্রকল্পটি নিয়ে ছলাকলা হয় প্রথমে ২০১১ সালে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এবং ওই সময় তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার মুখে তা আটকে যায়। এরপর ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো হবে। কিন্তু এরপর প্রায় দশ বছর পার হয়ে গেলেও ভারতের সাথে তিস্তা সমস্যার কোনো সমাধান এখনো হয়নি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনা অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হলেও নানা জটিলতায় সেটি থমকে যায়। পুনরায় ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা চীন সফর করে ব্যর্থ হন এবং ওই বছর ২১ ও ২২ জুন ভারত সফর করলে; ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছিল দিল্লি কুনই মেরে চীনকে সরে দিয়েছে। বর্তমানে চীন যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কর্মসূচি দিয়েছে।
তিস্তাকে ঘিরে মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে, মাছ চাষ, আধুনিক কৃষি সেচ ব্যবস্থা, নদী ভাঙন রোধ ও নদী খনন করা হবে। যা থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ, ১৩ হাজার কোটি টাকা সম্পদ রক্ষা পাবে এবং প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। দুপারে তৈরি হবে স্যাটেলাইট শহর। তৈরি করা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার জন্য তৈরি করা হবে নদী বন্দর, নৌ থানা, কোস্টগার্ড ও সেনা ক্যাম্প।

আর এতেই ভারতের ঘুম হারাম হয়েছে। তারা চিকেন নেক খ্যাত শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে চীনের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। তারা হয়ত ভুলে গেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এটি বাংলাদেশের একটি প্রকল্প, এটি চীনের কোনো প্রকল্প নয়। চীন শুধু এখানে অর্থায়ন করতে রাজি হয়েছে। কারণ অন্যরা সে অর্থ দিতে পারছে না।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর পুনরুজ্জীবন ও কৃষি-জীবিকার উন্নয়ন। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আহŸানই ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারতের বৈরিতার কারণেই হোক আর অন্য কারণেই হোক, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ গত ২০ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে একনেকের সভায় বলেন, ‘তিস্তা প্রকল্প, যে পানি আসে ভারত হতে, সেই ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এটা আসলে কী হবে? সত্যিকার অর্থে আমরা যতটুকু পানি পাই, সেটার পূর্ণ ব্যবহার কীভাবে করতে পারি, জলাধার কিছু নির্মাণ করা যায় কিনা, কিছু পানি আটকে রাখা যায় কিনা, এটার পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিকল্পনা এখনও তৈরি হয়নি’। তিনি প্রকৃত অর্থ বোঝাতে চেয়েছেন, ভারতের সহায়তা ছাড়া তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ নয়।
যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে, প্রায় দশ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানসহ, আধুনিক কৃষির উন্নয়ন, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানবন্দর চালু হওয়ার সম্ভাবনা, চিলমারী নৌবন্দর চালু হওয়ার সম্ভাবনাসহ উত্তরবঙ্গের ভাগ্য উন্নয়নে জাতীয়ভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হবে বাংলাদেশর। তবুও কেন এ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। যা দেশবাসীকে হতাশার সাগরের নিমজ্জিত করছে। সকলের প্রত্যাশা দেশের অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে অতিদ্রæত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হোক।

           লেখক, ব্যাংকার ও কলামিস্ট aktarrofikul@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category