• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১২ পূর্বাহ্ন

মহৎ খুন;

Reporter Name / ৫৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)

মতিউল ইসলাম সাদী

মহৎখুন; এই বাক্যটি শুনেছিলাম আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে। যিনি বলেছিলেন তিনি আর এখন নেই। অর্থাৎ তিনি এখন মৃত। সেদিন বাক্যটি শুনে তাঁর দিকে তাকিয়ে বিষ্ময় প্রকাশ করি। বলি খুন আবার মহৎ হয় কিভাবে? ভদ্রলোক বললেন, অবাক হচ্ছো? অবাক হওয়ার কিছু নেই। মানুষ খুন মহা পাপ। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যাদের হত্যার মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্তি আসে। মানুষ জুলুম নির্যাতন থেকে মুক্তিপায়। যেমন ধর, কোন শাসক জনগণের উপর জুলুম নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের পুরো বিচারব্যবস্থা আইনশৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনী তার ইচ্ছেমতো পরিচালনা করে যাচ্ছে। দেশের মানুষ বিচার পায়না। বিচার চাইলে শুরু হয় নির্যাতন। গুম, খুন। সেখানে নেই কোনো নির্বাচনীব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শাসকের পরিবর্তন ঘটানো যায়। সেই ব্যবস্থা শাসকের হাতে। অর্থাৎ মানুষ চাইলেই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ পায় না। জীবন চালানো কঠিন হয়ে ওঠে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে ওঠে। দলীয় লোকজনের লুটপাট, কর্মসংস্থানের অভাব, সব মিলিয়ে মানুষ না খেয়ে আধা পেট খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকে। প্রতিবাদ করলে নেমে আসে জেল-জুলুম নির্যাতন। সেই ক্ষেত্রে জনগণকে মুক্তি দিতে যদি সেই শাসককে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী খুন করে আর জনগণ জুলুম নির্যাতন থেকে মুক্তি পায় তাহলে সেই খুনকে তুমি কি বলবে? অন্যায় বলবে? অপরাধ বলবে? অবশ্যই না। তাই এমন খুন হলো মহৎ খুন। যে শাসক ন্যায় বিচারের সকল পাথ বন্ধ করে দিয়ে দেশ পরিচালনা করে, নির্যাতন চালায় তাকে হত্যা করা আইনের দৃষ্টিতে যাই থাকুক মজলুম জনতা মুক্তি পেয়ে উল্লাস করে।

 

একে অপরকে মিষ্টি মুখ করায়। পাড়ায় মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ করে। মানুষের মাঝে ফিরে আসে স্বস্তি। এক্ষেত্রে কি বলবে? সেই দিন তার মহৎ খুনের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক দিন পর্যন্ত উত্তর খুঁজেছি। আসলেই অনেক সময় খুন মহৎ হয়? বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকদের ইতিহাস দেখলে মনে হয় এসব নির্যাতনকারী অর্থাৎ জালিম সরকারের মৃত্যু কামনা করা ছাড়া কোন পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই নির্যাতিত মানুষ সব সময় স্বৈরশাসকদের মৃত্যু কামনা করে থাকে। আবার কিছু কিছু স্বৈরশাসক আছেন যারা জনগণের মতামতকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করে থাকেন। এমন স্বৈরশাসকে জনগণের অধিকাংশের পক্ষ থেকে সমর্থন দেওয়া হয়ে থাকে। এই স্বৈরশাসকদের বলা হয় এনলাইটেনমেট স্বৈরশাসক বা আলোকিত স্বৈরশাসক। এরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে অনেকেই লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে স্বরণ করে থাকেন। তিনি ছিলেন আরব বিশ্ব ও আফ্রিকার জনপ্রিয় নেতা। অন্য দিকে পশ্চিম বিশ্বের চক্ষুশূল। জরাজীর্ণ এক লিবিয়াকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেলে গড়ে তুলেন। তার সময় লিবিয়ার মাথা পিছু আয় আফ্রিকার সর্বোচ্চ আয়ের দেশেগুলির মধ্যে একটিতে গড়ে উঠে। যাই হোক বিংশ শতাব্দীতে আলোকিত স্বৈরশাসক এবং ঘৃনিত শাসক উভয় পর্যায়ের শাসকের অভ্যূদয় ঘটে। এমন অনেক স্বৈরশাসকরে আবির্ভাব ঘটে যাদের অনেকেই দেশে ছেড়ে পালিয়ে গেছেন অথবা খুন হয়েছেন। যাই হোক গতশতাব্দীতে যে কয়েকজন স্বৈরশাসক আবির্ভাব হয়েছিল তার মধ্যে বাংলাদেশের বাইরে অন্যতম ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো এবং চিলির অগাষ্টো পিনোচেট। এছাড়াও ইতালীর বেনিত মুসোলিনি, জার্মানীর এডলক হিটলার নাম উল্লেখযোগ্য।

এরা সবাই স্বৈরশাসক হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তবে এটা বলতেই হবে স্বৈরশাসকের সৃষ্টি সেই প্রাচীন যুগেই। সেই যুগে বছরের পর বছর যুগের পর যুগ রাজতন্ত্র কায়েম ছিল। এই রাজতন্ত্রকে বলা যেতে পারে স্বৈরচারের একটি অন্যতম চেহেরা। সেই যে প্রচীন যুগে যে স্বৈরতন্ত্র চালু হয় তা আধুনিক বিশ্বেও চালু থাকে। স্পেনের ফ্রান্সিস্কো ফ্রাঙ্কো, ইউরোপের একজন ভয়ংকর স্বৈরশাসক। তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থক। অগুনতি বহু মানুষকে তিনি হত্যা করেছেন। বিশেষ করে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ ছিল তার প্রধান টার্গেট। তার সময় কালকে বলা হয় হোয়াইট টেরর যুগ। ১৯৭৮ সালের ২০ নভেম্বর ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুতে গোটা স্পেন জুরে স্পেনের জনগণ আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে। বিরোধী মতের মানুষ হত্যাসহ অসংখ মানুষের উপর নির্যাতন ও কারাগারে প্রেরণ করা হয় তার শাসন কালে। আরেক স্বৈরশাসক ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো। তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণকে উৎখাৎ করে ক্ষমতা দখল করেন। সুকর্ণ ইসলাম ও কমিউনিজমকে একত্রিত করে দেশ পরিচালনার কারিগর। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে সুহার্তো ইন্দোনেশিয়ার মানুষ হত্যা করেছেন। তার শাসন কালেই তিনি স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে দেশেব্যাপী চরম দাঙ্গা ও বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন। এই দাঙ্গা ও বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় বিরোধী মতের ৪ জন ছাত্রকে গুলি করে হত্যার জেরে। ইন্দোনেশিয়ার মানুষের মতে সুুহার্তোর শাসন আমলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এরা ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠাত প্রেসিডেন্ট আদর্শের মানুষ। এছাড়াও নিহতদের মধ্যে ছিলেন চিনা ইন্দোনেশিয়ান। সুুহার্তো তার শাসনকালে ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছেন। অথচ এই সুহার্তোকে বার বার পদোন্নতি দিয়ে সামরিক বাহিনীর জেনারেল বানিয়েছিলেন সুকর্ণ। সে সময়ের আরেক স্বৈরশাসক ছিলেন চিলির অগাস্টো পিনোচেট। চিলির জনপ্রিয় সমাজতন্ত্রী নেতা প্রেসিডেন্ট সালভেদর আলেন্দেকে উৎখাৎ করে ক্ষমতা দখল করেন। পিনোচেট ক্ষমতা দখলের মাত্র ১৮ দিন আগে আলেন্দে তাকে সেনা প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন।

 

পিনোচেটের নিষ্ঠুরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে হাজার হাজার আলেন্দে সমর্থিত নেতা কর্মীদের হত্যা করে এবং গুম করে। প্রথম ৩ বছর প্রায় দেড়লাখ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৪ সালে চিলির রাষ্ট্রপতি হিসেবে একক ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার শাসন আমলে মানুষ গুম করে রাখা হতো গোপন ঘরে। অর্থাৎ আয়না ঘরে। সেখানেই কাকে ছেড়ে দেওয়া হবে আর কাকে হত্যা করা হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। তার শাসন কালে একদিন ছাত্ররা মিছিল করে ফিরে যাওয়ার সময় ২জন ছাত্রকে আগুনে পুড়ে হত্যা করা হয়। বিচার বিভাগের উপর তার ছিল পূর্ণপ্রভাব। তার বন্দীশালার প্রধান ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য তার সাজা হয়েছিল ৩শ বছর। চিলির কমিউনিষ্ট নেতা আলেন্দেকে উৎখাত করা পিনোচেট প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হলেও সে দেশের সেনাবাহিনীর সহায়তায় মৃত্যুর আগ- পর্যন্ত সেনাবাহিনীতেই ছিলেন। চিলির জনগণের অধিকাংশের মতে আলোন্দেকে হত্যা করে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয়। অপর দিকে ইতালীর স্বৈরশাসক ছিলেন ফ্যাসিবাদের জনক বেনিতো মুসোলিনি। প্রথম দিকে মাকর্সবাদে বিশ্বসী থাকলেও এক পর্যয়ে মাকর্সবাদে বিশ্বাসীদের উপর চরম জুলুম নির্যাতন চালান। তার প্রতিঠিত দল ন্যাশনাল ফ্যাসিষ্ট পার্টির নীতির মধ্যে ছিল কর্তত্ববাদ, জাতীয়তাবাদ, অভিজাতিবাদ এবং সামরিকবাদ। সে সময় রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধীদের দমনে ব্যাপক নির্যাতন,অপহরণ,নির্বাসন রাজনৈতিকদল নিষিদ্ধ করাসহ গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রন ছিল ফ্যাসিষ্ট পার্টির নিয়ন্ত্রনে। এছাড়াও বিরোধীদের বিশেষ করে মার্কসবাদীদের হত্যা করা ছিল তাদের কাছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এত জুলুম নির্যাতন চালায়েও মুসোলিনির শেষ রক্ষা হয়নি। বিরোধী গোষ্ঠির হাতে ধরা পড়ে বিচারের মুখোমুখি হন মুসোলিনি। বিচারে তার মৃত্যুদন্ড হয়। স্বৈরশাসক সুহার্তো, পিনোচেট এবং মুসোলিনির মত স্বৈরশাসকদের যদি যে দেশের কোন গোষ্ঠী বা ব্যাক্তি হত্যা করতো তা হলে তারা অথবা তিনি হতেন সে দেশের মহানায়ক।

কারণ হত্যা ছাড়া এ ধরনের স্বৈরশাসকদের হাত থেকে দেশ ও দেশের জনগণকে রক্ষা করা সময় স্বাপেক্ষ হয়ে উঠে। সে ক্ষেত্রে এমন হত্যাকে হয়তো মহৎ খুন বলা যেতে পারে। একজন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মানবতাবাদীরা যেমন সোচ্চার তেমনি ধর্মীয় ভাবেও স্বৈরশাসকদের চরম বিরোধীতা করা হয়েছে। কোরআন হাসিদ সম্পর্কে আমার সীমিত জ্ঞান দিয়ে বুঝি এমন স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা যায়। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুল (সঃ) বলেছেন , জুলুম থেকে সাবধান। কেননা এর শাস্তি আখেরাতের আগে দুনিয়াতেই দেওয়া হয়। (সুনান ইবনে মাজহা, হাদিস : ৪২২৪)। এই হাদিস জুলুমের দ্রæত শাস্তির বিষয় উল্লেখ করে। জালিম ব্যক্তি দুনিয়াতেই অপমান, ক্ষতি বা দুঃখের মুখোমুখি হতে পারে। যা আখেরাতের শাস্তির আগাম বার্তা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে ¯্রষ্টার কাছে দু’ হাত তুলে আবেদন জানান। তারা জালিম শাসকের মৃত্যু কামনা করেন। রাসুল (সাঃ) বলেছেন মজলুমের বদ দোয়াকে ভয় কর। কারণ মজলুমের বদ দোয়া এবং আল্লাহর মধ্যে কোন অন্তরাল নেই (সহিহ বুখারী,হাদিস : ২২৮৬)। ইসলামে সব ধরনের জুলুম বা নির্যাতন কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

লেখক, সিনিয়র সাংবাদিক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category