• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন

পিআর নিয়ে জামায়াতের আন্দোলন বিএনপির বিরোধিতা এবং ভবিষ্যতের সাতকাহন

Reporter Name / ৫০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)

এফ শাহজাহান

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দ্বি-মেরু ভিত্তিক রাজনৈতিক কালচার চলে আসছে। একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বিএনপি। এতোদিন এই দুই দলের পারস্পরিক প্রতিদ্ব›িদ্বতা দেশের নির্বাচনব্যবস্থা, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

দ্বি-মেরু ভিত্তিক রাজনৈতিক কালচার দীর্ঘদিন চলার ফলে দেশের মানুষ ধরেই নিয়েছে যে, আওয়ামী লীগ যেভাবে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, আগামীতে বিজয়ী হলে বিএনপিও সেভাবে ফ্যাসিবাদ কায়েম করবে।

আমজনতার এই আশঙ্কাকে কেন্দ্র করেই জামায়াত ইসলামীসহ অন্যান্য দল শুরু থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের প্রস্তাব করে আসছে। বিএনপিও তখন থেকে পিআর পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

এরমধ্যে লন্ডনে ড. ইউনূস-তারেকের গোপন বৈঠকের পর সরকার প্রবলভাবে বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বিএনপির প্রতিপক্ষরা মনে করছেন, বিএনপি এখন যা চাচ্ছে, সরকার তা বাস্তবায়ন করছে। যেহেতু বিএনপি পিআর পদ্ধতি চায় না, তাই সরকারও এখন আর পিআর পদ্ধতিতে সায় দিচ্ছে না।

এই অবস্থায় বাধ্য হয়ে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল পিআর বাস্তবায়নসহ ৫ দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। এর ফলে বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক দ্ব›দ্ব ক্রমেই সংঘাতের দিকে গড়াচ্ছে।

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে প্রচলিত দ্বি-মেরু ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রবণতা ভেঙে দিয়েছে। জামায়াত এখন বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতো বড় দুই দলের সঙ্গেই টক্কর দেওয়ার মতো শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করেছে। এজন্য তারা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি বহুদলীয় সরকার কায়েমের লক্ষ্যে পিআর (চৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষ ৎবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ) পদ্ধতির দাবি তুলেছে। যেখানে ভোটের অনুপাতে সংসদীয় আসন বণ্টন করা হবে।

দেশজুড়ে প্রায় সব বড় ও মাঝারি রাজনৈতিক দল এই পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিলেও বিএনপি প্রবল বিরোধিতা করছে। বিএনপি কেন পিআর পদ্ধতির বিরোধী, তার পেছনে কেবল মতাদর্শিক কারণ দায়ী নয়, বরং কৌশলগত, সাংগঠনিক এবং বাস্তব রাজনৈতিক নানা কারণ রয়েছে। আজকের এই বিশ্লেষণে সেই বিষয়টিও গভীরভাবে অনুধাবন করা হয়েছে।

জামায়াত এবং বেশ কিছু ইসলামী দল যখন পিআর পদ্ধতিসহ ৫ দফা দাবিতে আন্দোলন নিয়ে মাঠে নেমেছে, বিএনপি তখন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে। এরফলে জামায়াত-বিএনপির ঠান্ডা লড়াই ক্রমেই গরম হয়ে উঠছে। জামায়াত-বিএনপির এই দ্ব›দ্ব এখন আর শুধু একটি নির্বাচনী কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই ; বরং এটি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও গণতন্ত্রের কাঠামো নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

পিআর ইস্যুতে জামায়াত-বিএনপির পরস্পর বিরোধী এই অবস্থান থেকে কে জিতবে আর কে হারবে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে এই অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। আজকের বিশ্লেষণে সেই ভবিষ্যৎ পরিণতির ইঙ্গিত তুলে ধরা হয়েছে। সেই ইঙ্গিত বুঝতে হলে আপনাকে নিচের ৯টি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রথমত : বাংলাদেশে বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থা
বাংলাদেশে বর্তমানে ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট বা এফপিটিপি পদ্ধতি চালু আছে। এখানে প্রতিটি নির্বাচনী আসনে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী বিজয়ী হয়। এর ফলে বড় দলগুলো সবসময় সুবিধা পেয়ে আসছে। এই পদ্ধতির কারণে বার বার তুলনামূলক ছোট দলগুলো জনসমর্থন থাকা সত্তে¡ও আশানুরূপ আসন পেতে ব্যর্থ হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদে ৮০ শতাংশের বেশি আসন অর্জন করে। অন্যদিকে অনেক ছোট দল ২ থেকে ৫ শতাংশ ভোট পেলেও আসন পায়নি বা একেবারেই নগণ্য আসন পেয়েছে।

এফপিটিপি পদ্ধতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বহু বছরধরে পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। এই পদ্ধতিতে একজন প্রার্থী নির্দিষ্ট আসনে সর্বোচ্চ ভোট পেলেই জয়ী হন, যা বৃহৎ সংগঠিত দলগুলোর জন্য লাভজনক। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে এমন দলগুলোকে শতভাগ ভোট না পেলে এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ হারাতে হয়।

এই ব্যবস্থায় “ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব” নিশ্চিত হয় না। ফলে রাজনৈতিক বহুমুখিতা ও ক্ষুদ্র দলগুলোর কণ্ঠস্বর সংসদে প্রতিফলিত হয় না। এই সুযোগে বড় দলগুলো অনায়াসে ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার অবাধ সুযোগ পায়।

দ্বিতীয়ত : পিআর পদ্ধতির মৌলিক ধারণা
পিআর পদ্ধতিতে জনগণের মোট ভোটের আনুপাতিক ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে আসন পায়। এতে ছোট দলগুলোও সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগ পায়। অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই এই পদ্ধতি বিদ্যমান, বিশেষ করে যেসব দেশে বহু দলীয়ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি জোটনির্ভর। বাংলাদেশে এই পদ্ধতি প্রবর্তনের দাবি তুলেছেন বিশেষ করে বামপন্থি দল, ইসলামপন্থি দল ও কিছু আঞ্চলিক দল, যারা প্রচলিত এফপিটিপি নির্বাচনী ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত আসন পায় না।

তৃতীয়ত : পিআর পদ্ধতির তাত্তি¡ক ভিত্তি
পিআর পদ্ধতিতে সংসদে আসন বণ্টন হয় প্রতিটি দলের মোট ভোটের অনুপাতে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি দলগুলো প্রতিনিধিত্ব পায়। বড় দলগুলো আর একচেটিয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না। সংসদে মতামতের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। তাত্তি¡কভাবে এটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গড়ে তোলে।
ইউরোপের অনেক দেশে যেমন, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, জার্মানি পিআর ব্যবস্থার মাধ্যমে শক্তিশালী বহুদলীয় গণতন্ত্র গড়ে উঠেছে। তবে এ ব্যবস্থার দুর্বলতা হলো বড় দলগুলোকে ছোট দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল করে তোলে এবং বারবার সরকার পতনের ঝুঁকি বড়ায়।

চতুর্থত : জামায়াতের দাবি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সারভাইভ করে টিকে গেছে। সারভাইভাল দ্য ফিটেস্ট থিওরি অনুযায়ী অনেক বিতর্ক সত্তে¡ও জামায়তই এখন দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের পিআর পদ্ধতির দাবির পেছনে ৩টি কারণ রয়েছে।
এক : ভোট ব্যাংককে আসনে রূপান্তর
চরাদিক থেকে প্রবল কোণঠাসা অবস্থায় জামায়াতের স্থায়ী সমর্থক প্রায় ১০-১২ শতাংশ ভোটার ছিল। এর ফলে এফপিটিপি পদ্ধতিতে তারা অল্পসংখ্যক আসন পেয়ে আসছে। সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া নির্বাচনেও তারা ১৮ এর ওপরে উঠতে পারেনি প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতির কারণে।

৫ আগস্টের পর জামায়াত আগের অবস্থান থেকে বিস্ময়করভাবে অনেকদূর ওপরে উঠে এসেছে। এখন তাদের জনসমর্থন ৩০-৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই অবস্থায় পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে সংসদে তাদের ৮৫ থেকে ৯০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

দুই : রাজনৈতিক পুনর্বাসন
পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে সংসদে প্রবেশ করলে জামায়াত দেশের সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এতদিন তাদের বিরুদ্ধে যে-সব দোষারোপ করা হয়েছে এবং যেসব কারণে তাদেরকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা হয়েছে তা আর ধোপে টিকবেনা।
তিন : কিং-মেকার হওয়ার সুযোগ
জোট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জামায়াত আবারও মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভ‚মিকা নিতে পারবে, যেমন তারা ১৯৯১ সালে এবং ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে করেছে।
পঞ্চমত: বিএনপির পিআর বিরোধিতার কারণ ও রাজনৈতিক হিসাব
বিএনপি একটি প্রধান রাজনৈতিক দল। তাদের বিরোধিতার মূল কারণগুলো হলো
দ্বি-মেরু কেন্দ্রিক রাজনীতির বিনাশের আশঙ্কা। বিএনপি-আওয়ামী লীগের দ্বিমুখী প্রতিদ্ব›িদ্বতা ভেঙে গেলে বাংলাদেশে বড় এই দুই দলেরই একক আধিপত্য হারাবে।
পিআর চালু হলে জামায়াত সংসদে উল্লেখযোগ্য শক্তি অর্জন করবে, যা বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। পিআর ব্যবস্থায় বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারবে না, ফলে ছোট দলের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে রাজনৈতিক আপোস ও ছাড় দিতে বাধ্য হবে। তখন যা খুশি তাই করার সুযোগ পাবে না বিএনপি।
ষষ্টত : বিএনপি-আওয়ামী লীগের গোপন ঘনিষ্ঠতার কারণ
যদিও আওয়ামী লীগ সরাসরি পিআর প্রসঙ্গে পক্ষে বিপক্ষে কোন অবস্থান নেয়নি। তবে জামায়াতের সংসদে প্রবেশ তাদের জন্যও অস্বস্তিকর হওয়ায় এক্ষেত্রে তারা বিএনপির সঙ্গে মোলাকাত করার সুযোগ ছাড়ছে না। তারা তলে তলে বিএনপিকে রসদ যোগাচ্ছে।
এই ইস্যুতে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যে ভাঙ্গন ধরানো। কারণ, আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মধ্যে ভাঙ্গন তৈরি হলে আওয়ামী লীগ কৌশলগতভাবে লাভবান হবে। আওয়ামী লীগ হয়তো ভবিষ্যতে “গণতান্ত্রিক সংস্কার” হিসেবে পিআর নিয়ে আলোচনায় আসতে পারে, কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা আপাতত কম।
সপ্তমমত : নির্বাচন পদ্ধতির আন্তর্জাতিক তুলনা
১. ভারত: ভারত এখনও এফপিটিপি ব্যবহার করছে। বড় দলগুলো সুবিধা পাচ্ছে, তবে আঞ্চলিক দলগুলোও কিছুটা প্রভাব বিস্তার করছে। পিআর প্রবর্তনের দাবি থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে তা গুরুত্ব পায়নি।

২. নেপাল: ২০০৬ সালের পর নেপাল পিআর পদ্ধতি আংশিকভাবে চালু করেছে। এতে ক্ষুদ্র দল ও সংখ্যালঘুরা সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে, কিন্তু সরকার বারবার অস্থিতিশীল হচ্ছে।
৩. ইউরোপ: নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, সুইডেন-এসব দেশে পিআর শক্তিশালী বহুদলীয় গণতন্ত্র গড়ে তুলেছে। এসব দেশে জোট সরকার প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে।
অষ্টমত : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
পিআর চালু হলে বাংলাদেশে বহুদলীয় রাজনীতি আরো শক্তিশালী হবে। সংসদে সমঝোতা ও জোট ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাড়বে। বড় দলের একক আধিপত্য কমবে। ছোট দলগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। এরফলে কোন শাসকের পক্ষে আর ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সুযোগ থাকবে না।
তবে বাংলাদেশের ভ‚-রাজনৈতিক অবস্থার কারণে এবং শক্তিধর শত্রæ প্রতিবেশির কারণে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সরকার পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং সাংবিধানিক অচলাবস্থাও দেখা দিতে পারে।

নবমত: ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃশ্যপট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে বিদ্যমান এফপিটিপি পদ্ধতি টিকে থাকবে কিনা, নাকি পিআর বা মিশ্র কোনো পদ্ধতি চালু হবে তার ওপর।
জামায়াতের দাবিকে বিএনপি প্রত্যাখ্যান করায় বিরোধী শিবিরে বিভাজন বাড়ছে, যা আওয়ামী লীগের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক অবস্থান তৈরি করছে। সে জন্য দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনের জন্য পিআরকে প্রত্যাখান না করে আংশিক পিআর বা মিশ্র পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার কোন বিকল্প নেই।
পিআর কার্যকর হলে ভবিষ্যতে কী হতে পারে আর কার্যকর না হলে কী হবে, সেটাই এখন দুইটা ধাপে আমরা বুজতে চেষ্টা করবো।
১. পিআর কার্যকর হলে যা হবে
বাংলাদেশে জোটভিত্তিক রাজনীতি স্থায়ী রূপ নেবে। জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাম দলসহ অনেক শক্তি তখন সংসদে সন্তোষজনক আসন পাবে। এতে রাজনীতি আরও বহুমাত্রিক হবে।
ধর্মভিত্তিক দলের উত্থান ঘটবে। বাংলাদেশে বহু ছোট ছোট ধর্মীয় দল রয়েছে, যাদের জাতীয় পর্যায়ে বড় প্রভাব না থাকলেও, সীমিত ভোটব্যাংক রয়েছে। পিআর পদ্ধতিতে তারা ১%-৩% ভোট পেলেও আসন পেয়ে যেতে পারে। এতে করে সংসদে ধর্মভিত্তিক দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বিএনপির মতে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ গঠনতন্ত্র ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
পিআর হলে ছোট দলগুলোর সঙ্গে গোপন বা প্রকাশ্য সমঝোতা করবে। তাহলে সহজেই একটি কৃত্রিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট সরকার গঠন করে ফেলতে পারে। বিএনপি এতে নিজেদের আবারও কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কা দেখছে।
২. পিআর কার্যকর না হলে যা হবে
আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বিমুখী রাজনীতি বজায় থাকবে। আবার ফ্যাসিবাদ ফিরে আশার প্রবল ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। তবে জামায়াতের দাবির কারণে বিরোধী ঐক্যও শক্তিশালী হবে।
পিআর কার্যকর না হলে এখন যে-সব দল জামায়াতের সঙ্গে পিআর বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করছে তারা সবাই জামায়াতের সঙ্গে শক্তিশালী নির্বাচনী জোট গঠন করতে পারে। ফলে, সেটা বিএনপির বাড়া ভাতে ছাই ফেলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মিশ্র মডেলেই ভরসা হতে পারে
দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর জন্য হয়তো ভবিষ্যতে জার্মানির মিশ্র মডেলের মতো বাংলাদেশে আংশিক পিআর পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে পিআর নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে যে বিতর্ক এবং সেই বিতর্ক থেকে রাজপথে আন্দোলন গড়িয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বিএনপির বিরোধিতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং তা কৌশলগত, সাংগঠনিক ও বাস্তব পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত।
বাংলাদেশে পিআর নিয়ে বর্তমান বিতর্ক কেবল একটি নির্বাচনী সংস্কারের প্রশ্ন নয়, বরং তা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের চরিত্র এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।

লেখক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাহী পরিচালক, স্কুল অব জার্নালিজমের

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category