• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন

আর্থিক অন্তর্ভূক্তি ও সম্পদের সুষম বন্টনে অবদান রাখবে রাষ্ট্রায়ত্ত সর্ববৃহৎ ইসলামি ব্যাংক

Reporter Name / ১০২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)

মোঃ খায়রুল হাসান সিএসএএ

সংকটাপন্ন পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভ‚ত করে শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নতুন এ ব্যাংকটির সম্ভাব্য নাম হতে পারে ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’। বিশ্লেষকগণ সরকারের এই উদ্যোগকে দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ও সাহসী হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে এ নিয়ে ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একীভ‚ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই পাঁচটি ব্যাংক পরিচালনার জন্য প্রশাসক দল বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসক দল কাজ শুরুর পর এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়বে। একীভ‚ত হওয়ার জন্য নির্ধারিত ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গেøাবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।

একীভ‚তকরণের পর নতুন ব্যাংকের তহবিল গঠনের জন্য সরকার থেকে নেওয়া হবে ২০ হাজার কোটি টাকা, আমানত বিমা তহবিল থেকে নেওয়া হবে ১২ হাজার কোটি টাকা, পাঁচ ব্যাংকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ৩ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হবে। এভাবে মিলবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। যা থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের যারা অর্থ পরিশোধ করা শুরু হবে। পাঁচ ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় যাওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের কাছ থেকে আরও আমানত নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে সরকারও সহযোগিতা করবে বিভিন্নভাবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিআরআর ও এসএলআরসহ বিভিন্ন নীতি সহায়তা দেবে নতুন যাত্রা করা এই ব্যাংকটিকে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকগণ এই একীভ‚তকরণকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পুনর্গঠন প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ব্যয়বহুল লিকুইডেশন প্রক্রিয়া এড়ানো, আমানতকারীদের আমানত ফেরত দেওয়া, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এই পদক্ষেপ অত্যাবশ্যক। কারণ দেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের চাহিদা ও এর বাজার পরিসর দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ধর্ম সচেতন মানুষের মাঝে সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় চালু হলে এতে আমানতকারীরা আরও বেশি আমানত রাখতে উৎসাহিত হবেন। বিভিন্ন উপকরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে কর ছাড় চাওয়া হয়েছে। এটি পেলে এ খাত থেকে অর্থ সাশ্রয় হবে। পাঁচ ব্যাংকের গড়ে বিদেশে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক হবে। তা কাজে লাগিয়ে রেমিট্যান্স আহরণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে ব্যাংকে তারল্য বাড়বে। পাশাপাশি আমানতকারীদের টাকা ধীরে ধীরে দেওয়ার সঙ্গে বিনিয়োগও বাড়ানো হবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ধরে রেখে আরও শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এসব প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নতুন ব্যাংকটি শক্তিশালী পাটাতনের উপর দাঁড়াবে বলে আশাবাদী কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে এই একীভ‚তকরণ সত্যিই ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মাঝে এখনো সন্দেহ বিরাজ করছে। কারণ, বাংলাদেশে ব্যাংক একীভ‚ত করণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ইতোপূর্বে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা একীভ‚ত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে যে বিশেষায়িত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি গঠন করা হয় তার ফলাফল মোটেই সন্তোষজনক নয়। এ ছাড়া বিগত সরকারের সময়ে পদ্মা ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক একীভ‚ত করণের উদ্যোগ রাজনৈতিক কারণে সফল হয়নি। অধিকন্তু দেশের বিদ্যমান রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাল দশা দেখে সমালোচকরা মনে করেন, কেবল সরকারি অর্থযোগান এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তরের মাধ্যমে জনআস্থা পুনরুদ্ধার বা প্রয়োজনীয় গতিশীলতা তৈরি নাও হতে পারে। ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, অদক্ষতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল শাসন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল কর্মক্ষমতা দেখিয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান একীভ‚ত করণের মাধ্যমে যেটিকে সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটিই হয়ত আরেকটি অকার্যকর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পরিণত হবে—যা দেশের সবচেয়ে বড়, তবে একই সঙ্গে সবচেয়ে সমস্যাগ্রস্তও হতে পারে।

তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ আশা করছেন যে, গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা বাস্তবায়নে তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোবে এবং একীভ‚ত প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে পরিচালনা করবে। এর ফলে নতুন ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃস্থাপন হবে। নতুন লাইসেন্স ও নতুন নামে একটি শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংকের ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হবে, যা দেশে কর্মরত অন্যান্য ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগী হিসেবে বাজারে আবির্ভূত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত¡াবধান, অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং একটি দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে নতুন এই ব্যাংকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সাথে একটি দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং স্বাধীন শরিয়াহ বোর্ড গঠনের ফলে নতুন ইসলামি ব্যাংকে শরিয়াহ পরিপালন ও জবাবদিহিতা পুরোপুরি নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ইসলামী ব্যাংকে শুরু থেকেই একটি বৃহৎ ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক স্থাপিত হবে। ফলে এক সাথে বহু গ্রাহককে এই ব্যাংকের সেবার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, একীভ‚ত হওয়ার আওতায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের দেশব্যাপী ৭৫৯ টি শাখা, ৬৯৮ টি উপশাখা ৫০৯ টি এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র, ১০২৩ টি এটিএম ও সিআরএম রয়েছে। দেশের প্রায় ৩০০ টি উপজেলায় এই ব্যাংকগুলোর কোনো শাখা বা উপশাখা নেই। ফলে ঐ সকল এলাকায় শাখা ও উপশাখা পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্যের আলোকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সম্পদের সুষম বণ্টনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এছাড়া এই পাঁচটি ব্যাংকের প্রায় এক কোটির মতো গ্রাহক রয়েছেন। এই সকল গ্রাহকদের ইসলামি ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার জন্য এ ব্যাংকগুলোতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। প্রান্তিক পর্যায়ে এই ব্যাংকের সেবা পৌঁছিয়ে দিতে গেলে ব্যাংকটিতে কোনো কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হবে না। বরং আরো নতুন দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি পাঁচটি ব্যাংক একীভ‚ত হয়ে একটি বৃহৎ ব্যাংক হওয়ার কারণে এর পরিচালন খরচ অনেকাংশে কমে আসবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর উন্নতি ঘটবে। আশা করা হচ্ছে, নতুন ব্যাংকটি প্রথম থেকেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু করবে। ফলে সমাজে কর্মসংস্থান, সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিক আর্থিক পরিবেশ এবং সুষম উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। এই ব্যাংক একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে অন্যান্য বৃহৎ ব্যাংকের সাথে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হবে। এতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে।

যেহেতু বাংলাদেশে ব্যাংক একীভ‚ত করণের অভিজ্ঞতা কম, সেহেতু শুরুতে এ কাজে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। পাঁচটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও কালচারগত কিছু বৈচিত্র্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা এবং একই প্লাটফর্মে আনা কিছুটা কষ্টসাধ্য। এছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের আইটি সিস্টেম ও সফ্টওয়্যার একীভ‚তকরণ করা সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং জটিল প্রক্রিয়া। একীভ‚তকরণ চলাকালীন গ্রাহক সেবার নিরবিচ্ছিন্নতা ও গ্রাহক তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বড় চ্যালেঞ্জ। একই সাথে একীভ‚ত করণের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও পর্যাপ্ত পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ, গ্রাহকদের আমানত ও লেনদেনসংক্রান্ত সম্ভাব্য উদ্বিগ্নতা দূরীকরণ এবং সঠিকভাবে খেলাপি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও আইনগত জটিলতা নিরসন করা গেলে একীভ‚ত করণের মাধ্যমে একটি বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী উদ্যোগটি সফল হবে। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃত অর্থেই একটি শক্তিশালী ইসলামি ব্যাংকের সেবা পাবে এবং দেশের আর্থিক খাতে সুশাসনের সংস্কৃতি ত্বরান্বিত হবে।

লেখক: ইসলামি ব্যাংকার এবং বাহরাইনভিত্তিক আওফি’র একজন সার্টিফাইড শরিয়াহ অ্যাডভাইজর অ্যান্ড অডিটর। ইমেইল-hasan.khairul@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category