স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া কোনো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে না। তবে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন সেদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামরিক সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য। এসব বিষয়ে ঘাটতি থাকলে সেদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীনভাবে প্রণীত কিংবা বাস্তবায়িত হতে পারে না। ফলে সে হয়ে পড়ে নতজানু পরারাষ্ট্রনীতি অনুসরণকারী দেশ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা। এই সকল নীতি হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র: (ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে৷’
বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লেখিত এই কথাগুলোকে ভিত্তি ধরে এক ক‚টনৈতিক ¯েøাগান তৈরি করে বলা হচ্ছে, ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়।’ কিন্তু এমন ক‚টনৈতিক কথনের (উরঢ়ষড়সধঃরপ জযবঃড়ৎরপ) বাস্তব প্রতিফলন সম্ভব নয়। কেননা বাংলাদেশ যখন সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিশ্বের কোনো স্থানের নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে তখনই সেখানকার সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের শত্রæতে পরিণত হবে। বস্তুত বন্ধু রাষ্ট্র একটি আপেক্ষিক বিষয়। আজকে যে রাষ্ট্রকে বন্ধু গণ্য করা হয় আগামীতে সে শত্রæতে পরিণত হতে পারে। পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার কারণ এই যে এক সময় তাদের পরস্পরের মধ্যে অমিল, বিভেদ, বিভাজন, পার্থক্য ও দ্ব›দ্ব-সংঘাত তৈরি হয়েছিল। এসব রাষ্ট্র যদি পরস্পরের পরম বন্ধুই হতো তাহলে পৃথিবীতে এখনকার মতো প্রায় দুইশত রাষ্ট্র থাকতো না।
‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এমন ক‚টনৈতিক কথন বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখতে পারেনি। যেমন ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমারের আরাকান থেকে দশ লাখের অধিক নির্যাতিত মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। এতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের আমলে স্বাধীন ও কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি না থাকায় এ সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়ে ওঠেনি। শেখ হাসিনা সরকার জনসমর্থিত ছিল না। মিয়ানমার এই দুর্বলতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলো। তাই তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি সৃষ্টি করার স্পর্ধা দেখাতে পেরেছিল। শেখ হাসিনার আমলে ২০১৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ওপর স্বত্ব দাবি করে মিয়ানমার। বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও মিয়ানমার তাতে থাকে অনড়। ২০১২ সালে নেদারল্যান্ডের হেগের আন্তর্জাতিক আদালত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্রসীমা নিরূপণ করে এক রায় দেয়। এরপর ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের আরেকটি রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়। এভাবে আন্তর্জাতিক আদালত যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল তা নাকি মিয়ানমার মেনে নিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর ২০১৯ সালে জানা গেল মিয়ানমার নাকি ওই সমুদ্রসীমা আর মানতে চাচ্ছে না। তাই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠেছে জটিল। আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মিয়ানমার যেভাবে ব্যাখ্যা করছে, বাংলাদেশ সেভাবে করছে না। তাই অন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের ব্যাখ্যা নিয়ে আবার হতে পারে মামলা। এত দিন আমরা ভেবেছি, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে কেবল ভারতের দ্বারাই। কিন্তু এখন মিয়ানমার দ্বারাও সার্বভৌমত্ব হারানোর কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট এবং সমুদ্রসীমা নিয়ে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
বর্তমান ভ‚রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীনের সাথে রয়েছে মিয়ানমারের বিশেষ সম্পর্ক। মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে রাশিয়াও। এ ক্ষেত্রে ভারতের মনোভাবও বাংলাদেশের অনুক‚লে নয়। তাই বর্তমানের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়েই নির্ধারণ করতে হবে এদেশের পররাষ্ট্র নীতি। আমরা শান্তি চাইলেই যে অন্যরা শান্তি চাইবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। আমরা খুব বেশি শান্তিবাদী হয়ে উঠলে তা এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশ ভারতের প্রতি নতজানু পররাষ্ট্র নীতি অবলম্বন করে চলে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি লন্ডনে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারত আর বাংলাদেশের ভাগ্য নাকি এক সূত্রেই গাঁথা। আর তাই দু’দেশের পররাষ্ট্রনীতিও হতে হবে অভিন্ন।’ দীপু মনির এ কথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অবমাননাকর। বাস্তবে ভারত ও বাংলাদেশের স্বার্থ একসূত্রে গাঁথা নয়। যেমন চীন ও ভারতের মধ্যে বিরাজ করছে বিরাট সীমান্ত বিরোধ। তাদের মধ্যে চলছে এশিয়ায় পরাশক্তি হওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে চীনের কোনো সীমান্ত বিরোধ নেই। আর পরাশক্তি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ অভিন্ন হতে পারে না। কিন্তু তারপরও শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রীবর্গ সেই চেষ্টাই করে গিয়েছেন। বস্তুত হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতি হয়ে পড়েছিল ভারতমুখী।
বর্তমান যুগে বিশ্বের কোনো দেশেরই ভবিষ্যৎ কেবলমাত্র আর তার নিজের দেশের ঘটনাবলির প্রবাহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। বিদেশের ঘটনাবলির প্রভাব এসে পড়ে তার ওপর। যুদ্ধের ফলাফল ভয়াবহ। কিন্তু তারপরও এখনও পৃথিবীর নানা দেশের নানা অঞ্চলে যুদ্ধ হচ্ছে। এক দেশ আর এক দেশের সাথে জড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধে। যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য গঠিত হয়েছিল জাতিসঙ্ঘ ১৯৪৫ সালে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো জাতিসঙ্ঘকে অগ্রাহ্য করেই আক্রমণ করছে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে। কখনো আবার ভ‚রাজনৈতিক খেলার অংশ হিসাবে বিশ্বের নানা অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে প্রক্সি যুদ্ধ। সব মিলিয়ে বিশ্বপরিস্থিতি হচ্ছে জটিল থেকে জটিলতর। তাই আমরা একটা নিরাপদ বিশ্বে বাস করছি না। ধনী-দরিদ্র সব দেশেই সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। পৃথিবীর এই সংঘাতময় অবস্থা এবং ভ‚রাজনৈতিক জটিলতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল তার ঘরোয়া রাজনীতি দ্বারা নিরূপিত হবে না। নিরূপিত হবে বিশ্বপরিস্থিতির ওপরও। তাই এই বিশ্বপরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আমাদের চিন্তায় যদি যথেষ্ট ঘাটতি থাকে, আমরা যদি বিশ্বপরিস্থিতির জটিল দিকগুলোকে বিবেচনায় না নিয়ে একে খুব সরল করে ফেলি, তাহলে তা হয়ে উঠতে পারে আমাদের জন্য ভীষণ বিপজ্জনক।
ভারতকে খুশি করতে শেখ হাসিনার সরকার চায়নি পাকিস্তানের সাথে কোনো প্রকার সুসম্পর্ক গড়তে। বরং পাকিস্তানবিরোধী কথা বলে এ দেশের মানুষের কাছে অর্জন করতে চেয়েছে সস্তা জনপ্রিয়তা। কিন্তু ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতি এক নয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে যতটা বন্ধু ভেবেছে, এখন আর তা ভাবতে পারছে না।
বর্তমানকালে অনেক কিছুই ঘটে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ভারত নির্মাণ করছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র, যা চীনের রাজধানী বেইজিং পর্যন্ত পরমাণু বোমা বহন করে আঘাত করতে পারবে। অন্যদিকে পাকিস্তানও নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে এ রকম ক্ষেপণাস্ত্র, যা পরমাণু বোমা বহন করে ভারতের যেকোনো অঞ্চলকে আঘাত করতে সক্ষম। পাকিস্তানের সাথে চীনের সামরিক সহযোগিতা বেড়েছে। শোনা যায়, চীন পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ইতোমধ্যেই নির্মাণ করেছে সাবমেরিনের গোপন নৌঘাঁটি। গত ৭ মে ভারত পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ৯টি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে। এর জবাবে পাকিস্তান পাল্টা হামলা চালিয়ে ভারতেরই অভ্যন্তরে ভারতীয় আকাশ সীমায় কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভ‚পতিত করে। ভারত মনে করেছিল তার অপারেশন সিঁদুর নামের সামরিক অভিযান পাকিস্তানকে ঘায়েল করে ফেলবে। কিন্তু মাত্র চার দিন যুদ্ধের পর ভারত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়। এবারের এই পাক-ভারত যুদ্ধে ভারতের ক্ষয়ক্ষতি হয় ব্যাপক। ক‚টনৈতিক অঙ্গনেও ভারত ইসরাইল ছাড়া অন্য কোনো দেশকে পাশে পায়নি। ভারতের এই সামরিক ও ক‚টনৈতিক পরাজয়ের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। ভারতের প্রতিবেশী ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো এখন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলবে। এই পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান চীনের তৈরি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতকে ধরাশায়ী করেছে। এতে প্রমাণ হলো যে উন্নত প্রযুক্তির চীনা সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্র ভারতের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী। তাই এখন ভারতের প্রতিবেশী ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো চীনের সাথে আরও বেশি সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। আর এমন সমীকরণ আগামী দিনে বাংলাদেশকে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অভিমুখ নির্ধারণে উৎসাহিত করবে।
বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ২০ বছর যাবত একই অক্ষে অবস্থান করলেও এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের স্বার্থকেই বড় করে দেখতে চাইছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এক দিকে যেমন প্রভাবিত হচ্ছে ইসরাইল প্রীতি ও মুসলমান ভীতি দিয়ে, অন্যদিকে তেমনি আবার প্রভাবিত হচ্ছে চীন আতঙ্ক দিয়ে। এই দুই আতঙ্ক নির্ধারণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে। ভ‚রাজনৈতিক ও ভ‚-অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে চীনের উত্থান ঠেকাতে। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে দিয়ে এশিয়ায় চীনকে সংযত রাখতে চেষ্টা করছে। এসব পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশকে ভাবতে হবে বিশেষভাবে। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার সব সময় ভারতকে খুশি করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে। এটা জাতির অস্তিত্বের জন্য হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। আমাদের মহান ও পবিত্র মুক্তিযুদ্ধকে ফেরি করে এর আড়ালে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালে দেশপ্রেমিক যারাই শেখ হাসিনা সরকারের ভারতমুখী নতজানু পররাষ্ট্র নীতির সমালোচনা করছিল, তাদের সবাইকেই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। ভীষণ তর্জন-গর্জন করে বলা হচ্ছিল
এদের দমন করা না হলে বাংলাদেশ আবার পরিণত হবে পাকিস্তানে। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয় যথেষ্ট পাকিস্তান-বিদ্বেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো এভাবে যথেচ্ছ পাকিস্তান-বিদ্বেষ ছড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করা যাবে না। আমাদের ভাবতে হবে বর্তমান পরিস্থিতির উপযোগীভাবে। কোনো জাতির জীবনে একটি যুদ্ধই শেষ যুদ্ধ হয় না। অনেক যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয় একটা জাতিকে। আমাদের জাতীয় জীবনে অবশ্যই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এক মহান যুদ্ধ যার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম। কিন্তু এই একাত্তরের যুদ্ধকে শেষ যুদ্ধ ভাবার কোনো কারণ নাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য লড়তে হতে পারে আরও একাধিক যুদ্ধ। যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি অবিস্মরণীয় দিন হলো ১৮ এপ্রিল ২০০১ সালে সংঘটিত বড়াইবাড়ি যুদ্ধ। সেদিন দেশের অতন্ত্র প্রহরী বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) বাহিনী রুখে দেয় ভারতীয় আগ্রাসন। স্থানীয় বীর জনতা তাদের প্রিয় বিডিআর বাহিনীর সাহায্যে এগিয়ে আসেন। দিনভর লড়াইয়ে ভারতীয় আগ্রাসী বাহিনী পরাজয় বরণ করে পিছু হটে। এভাবে বড়াইবাড়ি যুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রেরণা হয়ে আছে। কিন্তু একে বিস্মৃত করার অপচেষ্টা চলেছে দীর্ঘদিন। অথচ স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সংঘটিত বড়াইবাড়ি যুদ্ধই আমাদের সবচেয়ে গৌরব জনক ইতিহাস।
বাংলাদেশের মানুষ এখন আর একাত্তরের মতো ভারতপ্রেমী হয়ে নেই। এদেশে ভারতবিমুখী প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাজনীতির কারণে নয়। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আগ্রাসী আচরণ এ দেশের মানুষের মনোভাবকে করে তুলছে ভারতবিমুখী। এটা কোনো পাকিস্তান-প্রবণতার পরিচয় বহন করে না। পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে ১৭০০ কিলোমিটার দূরে। সে আর আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টিকারী দেশ নয়। কিন্তু ভারত আছে আমাদের তিন দিক ঘিরে। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে এ দেশের মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সচেতন ও সন্দিহান হয়ে উঠছে। এদেশের মানুষ চাচ্ছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে, দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে নয়। ২০২৫ সালের ৭ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সংঘটিত পাক-ভারত যুদ্ধে চীনের সামরিক সহযোগিতার কারণে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষিত হয়েছে। এমতাবস্থায় ভারত যদি কখনও বাংলাদেশের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে এদেশকে তাদের কব্জায় নিতে চায় তাহলে আমাদের দেশকে রক্ষায় কোন দেশ এগিয়ে আসবে সে সম্পর্কে আমাদেরকে যথেষ্ট ভাবতে হবে। দৃশ্যত মনে হচ্ছে কোনো এক সময় এ উপমহাদেশে একটা বড় রকমের যুদ্ধ হতে পারে। তাই যুদ্ধ মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ভারতের মতো এমন এক বৃহৎ প্রতিবেশীর পাশে বাস করে যার পররাষ্ট্রনীতি স¤প্রসারণবাদী। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠা লাভের পর দেশটি যে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে তা এর প্রতিবেশী ছোট ছোট দেশগুলোকে ভাবিত করে তোলে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। ভারতীয় সংবিধানের ৩৬৭ নম্বর ধারার ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ভারত ব্যতীত যেকোনো রাষ্ট্রই বিদেশী রাষ্ট্র, তবে ভারতের রাষ্ট্রপতি যেকোনো রাষ্ট্রকে বিদেশী রাষ্ট্র নয় বলে ঘোষণা করতে পারে।’ ভারতের সংবিধানের এই ধারার সহজ ব্যাখ্যা হলো, ‘ভারত কোনো দেশকে জয় করে তাকে ভারতের অংশ বলে ঘোষণা করতে পারে।’ ভারতের স¤প্রসারণবাদী পররাষ্ট্রনীতির কারণে অতীতে কাশ্মীর, হায়দারাবাদ, সিকিম, ভ‚টান, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কোনো দেশেরই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিরাপদ থাকেনি।
বাংলাদেশ ভ‚-রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে না, বরং এ দেশই ভ‚-রাজনীতির শিকারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ধরনের জাতীয়তাবাদ চর্চা করা হয় তাকে আত্মরক্ষামূলক বলা চলে। স্বদেশ ভাবনার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ স¤প্রসারণবাদী নয় এবং তা অপর কোনো রাষ্ট্রের জন্য হুমকিও নয়। পক্ষান্তরে ভারতীয় রাজনীতির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট রাষ্ট্রের জনগণ ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদ স¤প্রসারিত হওয়ার ভয়ে ভীত। এমন ভীতি থেকেই ১৯৪৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর এখন সাবেক পূর্ব পাকিস্তান তথা স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ সেই ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভীতি থেকেই গড়ে তুলতে চাইছে অপরাপর দেশের সাথে সখ্যতা। বাংলাদেশের মানুষের এই আকাঙ্ক্ষাকে কোনোভাবেই ভারত বিরোধিতা বলা চলে না। বস্তুত জার্মান নাৎসিবাদ ইউরোপের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে যেভাবে হুমকির মুখে ফেলেছিল, তেমনি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ এ অঞ্চলের দেশগুলোকে শংকিত করে তুলেছে।
ভারতের প্রতিবেশী প্রত্যেকটি দেশ সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে যত শক্তিশালী হবে তা বাংলাদেশের জন্য ততই সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করবে। যেমন চীন কিংবা পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ভারতের সাথে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষেত্রকে প্রসারিত করবে, অর্থাৎ ভারতের সাথে সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ কার্যকর ক‚টনৈতিক পন্থা অবলম্বন করতে পারবে। অতীতের চিন্তা, প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস অনুসরণ করে পররাষ্ট্রনীতিকে স্থায়ী হিসেবে গণ্য করা চলে না। ভ‚-রাজনীতির পালাবদলে আন্ত:রাষ্ট্রিক শত্রæ-মিত্র পাল্টে যায়। তাই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি সময় সময় বদলাতে হয়। পররাষ্ট্রনীতির বাহ্যিক প্রতিরূপ হলো ক‚টনীতি। ক‚টনৈতিক তৎপরতা পূর্ব সিদ্ধান্তের স্থিরকৃত বিষয় নয়। বরং তা চলতে চলতে সিদ্ধান্ত নেবার কৌশল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে যুক্তরাষ্ট্র ফেলেছিল আণবিক বোমা। কিন্তু পরবর্তীকালে নয়া ভ‚রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাপান-যুক্তরাষ্ট্র হয়ে পড়ে পরস্পরের বন্ধু। চীন-রাশিয়ার সমর্থনে ভিয়েতনাম দীর্ঘ ৩০ বছর লড়াই করে দখলদার মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে। যুদ্ধ জয়ের পর ভিয়েতনামের বৈদেশিক সম্পর্ক চীন-রাশিয়ার চেয়ে অতীত শত্রæ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। এভাবে অতীতের শত্রæ বর্তমানের মিত্র হওয়ার উদাহরণ বিশ্বে আরও অনেক আছে। বস্তুত শত্রæ-মিত্র বদলানোর পর্ব সংঘটিত হয় নিজ নিজ রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়।
বাংলাদেশের ভ‚খÐ ভারত ও মিয়ানমারের স্থল সীমান্ত দিয়ে পরিবেষ্টিত হলেও এদেশ নেপাল-ভুটানের মতো স্থলভাগ দ্বারা আবদ্ধ দেশ (ল্যান্ড লকড কান্ট্রি) নয়। এদেশের রয়েছে বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপক‚ল। সমুদ্র পথে বহির্বিশ্বের সাথে এদেশের ঘটে চলে উন্মুক্ত যোগাযোগ। এই ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। ক‚টনৈতিক অঙ্গনে সফলতার জন্য বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জোটকে ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের সন্নিকটে অবস্থিত ভারত, চীন ও পাকিস্তানের রয়েছে আণবিক বোমা। বহি:শত্রæর আক্রমণ ও আগ্রাসন মোকাবেলার জন্য এটিই তাদের সর্বোচ্চ অস্ত্র। বাংলাদেশ কোনো পারমাণবিক শক্তিধর দেশ নয়। তাই এদেশকে নিরাপদ রাখতে হলে সক্রিয় সদস্য হতে হবে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটের।
বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ ছাড়াও কমনওয়েলথ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) , ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর জোট ডি-৮, আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক জোট সার্ক, বিমসটেক এবং বিবিআইএন-এর সদস্য। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংগঠন আসিয়ানের সদস্য হতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসিয়ানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী দুই মুসলিম সদস্য রাষ্ট্র। মিয়ানমারের হুমকি মোকাবেলায় আসিয়ান হতে পারে বাংলাদেশের জন্য অন্যতম উপযুক্ত ফোরাম। কেননা মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য হওয়ায় তাকে দেশটি এ জোটের কাছে দায়বদ্ধ।
পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় চীনের নেতৃত্বে সাংহাই কো-অপারেশন (ঝঈঙ) এবং ব্রিকস (ইজওঈঝ) নামক দুটো প্রভাবশালী সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এই দুই সংগঠনে যুক্ত হতে পারলে তা বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী ক‚টনৈতিক অবস্থান তৈরি করবে। এভাবে ভারত নির্ভর নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পরিত্যাগ করার যথেষ্ট সুযোগ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধকালের পৃথিবীতে মার্কিন ও সোভিয়েত শিবিরভুক্ত রাষ্ট্রগুলো বিভক্ত হয়ে থাকতে পেরেছিল। এমনকি তারা পরস্পর অর্থনৈতিকভাবেও সম্পর্কহীন থাকত। কিন্তু বর্তমান দুনিয়ায় আর কারো পক্ষে সম্পর্কহীন থাকা সম্ভব নয়। কেননা এখন ভ‚রাজনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে ভ‚অর্থনীতি। শত্রæগণ্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক কর্মকাÐ সেতুবন্ধন হয়ে কাজ করে। বাস্তব প্রয়োজনেই এমনটা ঘটে চলে। সুতরাং বাংলাদেশ কোনো জোটের সাথে সংযুক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে অপর কোনো দেশকে অবজ্ঞা করা কিংবা বৈরিতা সৃষ্টি করে দূরে থাকা। বরং বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য পররাষ্ট্রনীতিতে তার জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া।
লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক