• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন

পলাশীর ট্র্যাজেডি : কুশীলবগণের জাতিসত্তা এবং তাদের ক্রিয়াশীলতা

ড. বেলাল হোসেন / ১৪৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন বাংলার ইতিহাস তো বটেই উপমহাদেশের ইতিহাসেও একটি ট্যাজিক দিন। এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে কী ঘটেছিল এবং তার ফলাফল কী হয়েছিল-বাঙালি মাত্রই তা কমবেশি জানে। পলাশীর প্রান্তরে যে ট্রাজেডি রচিত হয়েছিল, সেই ট্র্যাজেডির নায়ক, প্রতিনায়ক ও খলনায়ক কারা ছিলেন এবং তাঁদের কার কী ভূমিকা ছিল সেটাও আমরা প্রায় সকলেই জানি। তবুও আমাদের বর্তমান আলোচনার সুবিধার্থে সেই কুশীলবগণের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে উপস্থাপন করছি :
১. নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৭৩২-১৭৫৭);
২. মীর জাফর আলী খান (১৬৯১-১৭৬৫);
৩. রবার্ট ক্লাইভ (১৭২৫-১৭০৪) গং;
৪. জগৎশেঠ (?-মৃত্যু ১৭৬৩);
৫. উমিচাঁদ (? – মৃত্যু ১৭৬৭);
৬. রায় দুর্লভ (?-মৃত্যু ১৭৬০);
৭. রাজা রাজবল্লভ (১৬৯৮-১৭৬৩/৬৪)।

তালিকাটি বেশ দীর্ঘ কিন্তু এই কয়েকজন যেহেতু ছিলেন পলাশী ট্র্যাজেডির প্রধান কুশীলব সে কারণে এখানে কেবল এদের নামই উল্লেখ করা হলো। পলাশীর ট্র্যাজেডিকে একটি ত্রিভুজ চিত্রের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এর আরোহ বা শীর্ষবিন্দু-ক’তে কল্পনা করা যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে এবং অবরোহ তল- খ ও গ ‘তে প্রতিস্থাপন করা যায় যথাক্রমে-রবার্ট ক্লাইভ গং এবং মীর জাফর ও অন্যান্য সকলকে। পলাশীর ট্র্যাজেডির মূলে ছিল এর কুশীলবগণের ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কুশীলবগণের জাতিগত পরিচয়টিকে একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। কেননা, শাসকবর্গের জাতিগত পরিচয় অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের অন্দরমহলে প্রবেশ করা যায়। এতে ইতিহাসের পরাপাঠ অনেকটা সহজ হয়ে ওঠে।

 

পলাশীর ট্র্যাজেডির আগে বাংলায় আগত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের সমন্বয়ে বাংলার শাসন কাঠামোর উচ্চস্তর গড়ে ওঠেছিল। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রভাব বা অংশগ্রহণ সেখানে খুব একটা ছিল না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল শাসন কাঠামোর নিম্নস্তরে জমিদারি বা সামন্ত ব্যবস্থায়। আঠারো শতকের একটি ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মুর্শিদকুলি খানের (১৬৬০-১৭২৭) রাজত্বলাভের সময় (১৭০০) থেকে সিরাজউদ্দৌলার পতন পর্যন্ত মোট ৫৭ বছরে বাংলার নবাবি শাসনামলে পাঁচজন মুসলিম শাসক রাজত্ব করেন। এঁরা হলেন-মুর্শিদকুলি খান (১৭০০-১৭২৭), মুর্শিদকুলির খানের জামাতা সুজাউদ্দিন খান (১৭২৭-১৭৩৯), মুর্শিদকুলির নাতি সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খান (১৭৩৯-১৭৪০), আলিবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬) এবং আলিবর্দি খানের দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭)। এঁরা কেউই বাংলার স্থানীয় শাসক ছিলেন না। সবাই ছিলেন বিদেশাগত। মুর্শিদকুলি খান জন্মসূত্রে মহারাষ্ট্রী বা তেলেঙ্গানী হিন্দু ব্রাহ্মণ হলেও শৈশবে দাস হিসেবে বিক্রিকালে মুনিবের ধর্ম শিয়া ইসলাম গ্রহণ করে পারস্য হয়ে মোঘল দরবারে আশ্রয় লাভ করেন এবং পরবর্তীতে বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যার দিউয়ান হন। বাংলা তিনি জানতেন না, ফার্সি ও হিন্দুস্থানি ভাষায় কথা বলতেন। নবাব সুজাউদ্দিন খান ছিলেন একজন পারসিয়ান। ধর্মে শিয়া মুসলিম। আলিবর্দি খানের বাবা ছিলেন আরব বংশদ্ভুত, মা ছিলেন তুর্কি। নবাব সিরাজউদ্দৌলারও জাতিক পরিচয় তুর্ক-আরব। নানা নাতি উভয়ের ধর্মীয় পরিচয় শিয়া মুসলিম। এই শাসকগণের মন্ত্রী ও আমলাদের মধ্যে (যারা মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, পাটনা, কটক প্রভৃতি জায়গায় সরকারি দায়িত্ব পালন করতেন) হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই ছিলেন। মুসলিমদের সকলেই ছিলেন বিদেশাগত-মোঘল, আফগান, তুর্কি, পারসিয়ান, আরব প্রভৃতি বংশজাত। ধর্মীয় মতাদর্শে এরা ছিলেন শিয়া মুসলিম। হিন্দুদের মধ্যে যারা ছিলেন তাদের অধিকাংশই হলো অবাঙালি।

পলাশীর কুশীলবগণের মধ্যে পক্ষ ও বিপক্ষদলের সদস্যদের জাতিসত্তার পরিচয়টি একনজরে একটু দেখে নেয়া যাক-
১. মীর জাফর-নবাবের প্রধান সেনাপতি, জাতিতে ইরানি, ধর্ম-শিয়া মুসলিম, মাতৃভাষা-ফার্সি।
২. জগৎশেঠ-নবাবের কোষাধ্যক্ষ, জাতিসত্তা-রাজপুত (রাজস্থানী) ধর্ম-হিন্দু , পেশা- ব্যবসা (মাড়োয়ারি)।
৩. উমিচাঁদ-নবাবের সভাসদ, জাতিসত্তা-পাঞ্জাবী, ধর্ম- শিখ, পেশা- দাদন ব্যবসায়ী।
৪. রায় দুর্লভ-ঊড়িষ্যার দেওয়ান, জাতিসত্তা-কর্ণাটকী (দক্ষিণ ভারত), ধর্ম-হিন্দু, পেশা-ব্যবসা।
৫. রাজা রাজবল্লভ-ঢাকার কোষাধ্যক্ষ, জাতিসত্তা-বাঙালি (বিক্রমপুর), ধর্ম- হিন্দু ।
৬. মোহনলাল-সেনাপতি, জাতিসত্তা-কাশ্মীরী, ধর্ম-হিন্দু।
৭. মীর মদন – সেনাপতি, জাতিসত্তা- ইরানি, ধর্ম- শিয়া মুসলিম।
৮. সিনফ্রে – সিরাজের পক্ষ অবলম্বনকারী ফরাসি দলের সেনাপতি, জাতিসত্তা- ফরাসি, ধর্ম – কৃশ্চান।
৯. রবার্ট ক্লাইভ গং – ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার, জাতিসত্তা- ইংরেজ, মাতৃভাষা- ইংরেজি, ধর্ম- কৃশ্চান।

এবার নবাব সিরাজ এবং ক্লাইভের সেনাবাহিনীর জাতিসত্তার তথ্যটি দেখা যাক। নবাবের মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার (কারো মতে ৬০ হাজার)। সেনাবিগ্রেডের কাঠামোটি ছিল নিম্নরূপ :
১. মীর মদনের অধীনে-৫ হাজার মোঘল অশ্বারোহী সৈন্য।
২. মোহনলালের অধীনে-৭ হাজার রাজপুত ও পাঠান সৈন্য এবং
৩. মীর জাফর, ইয়ার লতিফ ও রায় দুর্লভের অধীনে বাকি-৩৮ হাজার মোঘল, আফগান, তুর্কি ও রাজপুত সৈন্য।
৪. নবাবের পক্ষে সিনফ্রের অধীনে ছিল ৪৫ জন ফরাসি গোলন্দাজ সৈন্য।

রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীতে ছিল ৩ হাজার সৈন্য। এর মধ্যে ৮০০ জন ছিল ইংরেজ ও পর্তুগিজ। বাকি ২২০০জনের একটি অংশ ছিল মাদ্রাজী বা তেলিংগাল এবং অপর অংশটির নাম ছিল- বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি বা লাল পল্টন। লাল পল্টন গঠিত হয়েছিল- পাঠান, রোহিলা আফগান, জাট, রাজপুত প্রভৃতি জাতির লোক নিয়ে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, নবাবের বাহিনীতে বাঙালি সৈনিক ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে কিন্তু কোম্পানির সেনাবাহিনীর এই বিগ্রেডটির নাম বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বাঙালি হিন্দু বা মুসলমান কাউকেই নিয়োগ দেয়া হতো না, তারা যুদ্ধ ভর এক অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রথমবারের মতো বাঙালিদের অন্তর্ভুক্তি করার অনুপযোগী বলে! প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৭ আগস্ট লর্ড কারমাইকেল ঢাকায় লেজিসলেটিরে ঘোষণা দেন। বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে গঠিত হয় ডবল রেজিমেন্ট। পরবর্তীতে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুন এই রেজিমেন্টের নাম হয় ৪৯ তম বেঙ্গল রেজিমেন্ট। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই রেজিমেন্টেই দ্বিতীয় ব্যাচে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। স্মর্তব্য, ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহকালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ১৮ হাজার ২০ জন। সমগ্র বাহিনী বঙ্গ, মাদ্রাজ ও বোম্বাই-এই তিনটি প্রধানভাগে বিভক্ত ছিল। এই তিন বাহিনীতে ইউরোপীয়দের সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার ৩১৬ জন। বেঙ্গল রেজিমেন্টে মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৭০ হাজার। এর মধ্যে ব্রিটিশ সৈন্য ছিল ৩০ হাজার। বাদবাকি ১ লক্ষ ৪০ হাজার জন সিপাহী ছিল অযোধ্যায়ী, বিহারী, উত্তর প্রদেশী, রাজপুত, জাঠ, পাঠান প্রভৃতি ভারতীয় জাতির লোক। এ কারণেই সিপাহী বিদ্রোহে বাঙালিদের অংশ গ্রহণ খুব একটা ছিল না।

উপর্যুক্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, নবাবি শাসনামলে মুর্শিদাবাদকেন্দ্রিক শাসন কাঠামোর উচ্চ স্তরে (মন্ত্রী ও বড় আমলা) সিভিল ও সেনা উভয় পর্যায়ে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের কোনো স্থান ছিল না! রাজধানী মুর্শিদাবাদের অবস্থান বাংলার প্রায় কেন্দ্রস্থলে হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্র ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা ছিলেন তারা সকলেই ছিলেন অবাঙালি হিন্দু ও মুসলিম। আলিবর্দির সময় (১৭৫৪) শাসন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সাতটি (দিউয়ান, তন-দিউয়ান, সাব-দিউয়ান, বকশি প্রভৃতি) পদের মধ্যে ছয়টিই ছিল হিন্দুদের দখলে, একমাত্র মুসলমান বকশি ছিলেন মীর জাফর। সিরাজের সময় প্রশাসনের এই কাঠামোই বজায় ছিল। নবাবি আমলের শাসন কাঠামোর নিম্নতমস্তরে বাঙালি হিন্দুর প্রাধান্য থাকলেও সেখানে বাঙালি মুসলমানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

সাধারণত জমিদার, নায়েব, গোমস্তা, তালুকদার প্রভৃতি ভূস্বামীদের নিয়ে গড়ে ওঠেছিল শাসন কাঠামোর নিম্নস্তর। এই স্তরে দেখা যায়, বৃহৎ বাংলার ২২ জন বড় জমিদারের মধ্যে ২১ জনই ছিলেন হিন্দু জমিদার। বাকি একজন জমিদার (শেলবর্ষ পরগনা) ছিলেন বহিরাগত মুসলমান সৈয়দ। প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় ও সামরিক উচ্চ পদগুলোতে (নাজিম, দেওয়ান, নায়েব, আমিল, বক্সি, কাজি, দারোগা প্রভৃতি) শাসক ও অভিজাত শ্রেণির লোকেরাই কেবল নিয়োগ পেতেন, যারা সকলেই ছিলেন বহিরাগত মুসলমান। এরা ছিলেন সমাজের আশরাফ শ্রেণি। অন্যপক্ষে দেশি মুসলমানগণ- সমাজের কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, তাঁতি প্রভৃতি শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন আতরাফ শ্রেণি। নবাবি আমলে প্রশাসনিক, বিচার ও সামরিক কোনো স্তরেই এই আতরাফ শ্রেণির অংশ গ্রহণ ছিল না। অর্থাৎ শাসক শ্রেণি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও শাসন ক্ষমতার কোনো স্তরেই দেশি মুসলমানদের অংশ গ্রহণের সুযোগ ছিল না। সুতরাং নবাব সিরাজের পতনের পেছনে যারা দায়ী বা ষড়যন্ত্রী ছিলেন তারা সকলেই ছিলেন ক্ষমতালোভী বিদেশি বিভাষী। বাঙালিদের মধ্যে যে দু একজন ষড়যন্ত্রী ছিলেন তারা সকলেই ছিল হিন্দু (যেমন- রাজা রাজবল্লভ ও তাঁর পুত্র কৃষ্ণবল্লভ)। সে সময় বাঙালি মুসলমান বলে যারা ছিলেন তারা সকলেই ছিলেন শাসন ক্ষমতার বাইরে সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ-কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, তাঁতি প্রভৃতি পেশার আতরাফ শ্রেণির লোক। সিরাজের পতনের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category