সৈয়দ আব্দুল আজিজ
শিক্ষামন্ত্রী জনাব আ ন ম এহসানুল হক মিলন ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দের একজন রাজনীতিবিদ। শিক্ষাখাতের সংস্কার সাধনে তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিও আমি শ্রদ্ধাশীল। অধিকন্ত বিগত বছরগুলোতে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে আমি আশা করি যে, তাঁর নেতৃত্বে দেশের শিক্ষা খাতে একটি অর্থবহ পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর দীর্ঘ ৫৪ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দূরারোগ্য ব্যাধি বাসা বেঁধেছে, তার একটি মৌলিক চিকিৎসাপর্ব তথা সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হবে; অদক্ষ শিক্ষা প্রশাসন, ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহন এবং সর্বসÍরে জেঁকে বসা দুর্নীতি থেকে শিক্ষা খাতকে মুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে, এমনটাই জনমানুষের প্রত্যাশা।
শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় প্রায়শই দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খোদাই করা নেলসন ম্যান্ডেলার একটি উক্তি উদ্ধৃত করেন, “একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দাও; পারমাণবিক বোমার প্রয়োজন নেই।” দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ আজ যেন সেই ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন এক গভীর ও বহুমুখী সংকটে নিমজ্জিত, যেখানে একদিকে নাগরিকগণ শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির চাহিদার ও সরবরাহের ব্যবধান ক্রমাগত বেড়েই চলছে। ‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’ এই আপ্তবাক্যটি শুধুই বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে সমৃদ্ধ জাতিগঠন করার উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি।
বিশ্বে প্রায় ১৩৫টি দেশে শিক্ষাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে আইনি স্বীকৃতি থাকলেও এবং বাংলাদেশের সংবিধানে এ বিষয়ে বাধ্যবাধকতা থাকলেও আজ অবধি দেশে কোনো সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণীত হয়নি। ২০১৩ সালে এসংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া তৈরি হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখেনি। বিগত অন্তবতীকালীন সরকারের শেষ মূহুর্তে তড়িঘড়ি করে শিক্ষা আইনের খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে এক সপ্তাহের মধ্যে জনমত চাওয়া হয়, যা শুধু হাস্যকরই নয়, বরং শিক্ষা আইনের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তুচ্ছজ্ঞান করার শামিল। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ১৩টি ভিন্ন শিক্ষাক্রমে বিভক্ত। এর অর্থ হলো, আমরা আমাদের শিশু প্রজন্মকে ১৩টি ভিন্ন শিক্ষাক্রমে শিক্ষাদান করছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক মান ২৪ ধরণের, যা রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ। এর বাইরে রয়েছে ইংরেজি মাধ্যম, কিন্ডারগার্টেন এবং কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা, যেখানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। প্রতি বছর যে সংখ্যক শিশু জন্মগ্রহণ করে, তাদের জন্মনিবন্ধন এবং শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্র এখনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।
‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও দীর্ঘ ১৪ বছরেও তা বাস্তবায়নে আলোর মুখ দেখেনি। এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবতা বিবর্জিত এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। মাদ্রাসা শিক্ষার উভয়ধারা আজও সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে বিপুলসংখ্যক মেধাবী মাদ্রাসা শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি তুল্য কারিগরি শিক্ষা এখনো সামাজিকভাবে অবহেলিত এবং প্রান্তিক পর্যায়ে রয়ে গেছে যাতে অংগ্রহনের হার ১৫-২৪ বয়সসীমার মধ্যে মাত্র ৫%, এখাতে বিপুল বিনিয়োগ হলেও তা আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির কবলে নিমজ্জিত। সরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসমূহে চোখধাঁধানো ভবন থাকলেও প্রয়োজনীয় ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নেই, শিল্পচাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম নেই, শ্রমবাজারের সাথে কারিগরি শিক্ষার সংযোগ নেই। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যমান শিক্ষক পদের ৮২ শতাংশই শূন্য রয়েছে। এই শূন্যপদ পূরণে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে পিএসসি’র সাধারণ ক্যাডার প্রার্থীদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে। সেইসাথে প্রকৌশল শিক্ষার সাথে কারিগরি শিক্ষার এক অযৌক্তিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে প্রকৌশল টিমের এক অংশকে অপর অংশের বিরুদ্ধে ঘৃনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে টীমওয়ার্ক ও মেলবন্ধন তৈরির পরিবর্তে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
অপরিকল্পিত ও লক্ষ্যহীনভাবে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সংগতি না রেখে লাগামহীনভাবে কোর্স পরিচালনার ফলে উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বৈশ্বিক শ্রমবাজাওে দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে বাংলাদেশিদের প্রবেশের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। তথ্যমতে, ১৯৭৬ সালে বৈশ্বিক শ্রমবাজাওে আমাদের উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার যেখানে ৯ শতাংশ ছিল, ২০২৩ সালে তা ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হারে বাংলাদেশ আজ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সর্বনিম্ন বিনিযোগকারী দেশ হিসেবে লজ্জাজনক পরিচিতি পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ খাদের কিনারে। একদিকে প্রাথমিক স্তরের বহুমুখী বিভাজন ও বৈষম্য, অন্যদিকে মানহীন কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নকে ভীতিকর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারলে দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ (এলডিসি গ্রাজুয়েশন) অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসব ব্যাধি যেভাবে জেঁকে বসেছে, তা থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বের করে আনার জন্য শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় কি কার্যকর উদ্যোগ নেবেন? নাকি সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে সমস্যার ফলে সৃষ্ট উপসর্গে (যেমন শিক্ষার্থীদের নকল প্রবণতা রোধ) চড়াও হয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনে সময় ও শ্রম ব্যয় করবেন? মনে রাখতে হবে, রোগীর দেহে সংক্রামিত রোগের চিকিৎসা না করে রোগীর সাথে যুদ্ধ করা কোনো যুক্তিসঙ্গত সমাধান নয়। বিস্ময়ের দিক হলো, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে এক ধরণের ‘জনতুষ্টিবাদী’ (চড়ঢ়ঁষরংঃ) মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে; যেখানে তিনি লোকদেখানো কিছু তৎপরতার আড়ালে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিরাজমান সংকটের গভীরতাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। টেকসই পরিবর্তনের জন্য যেখানে সম্মিলিত ‘টিমওয়ার্ক’ প্রয়োজন, সেখানে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব প্রদর্শন করছেন। তাঁর এসব কর্মকাণ্ডে বিগত দুই মাসে পুরো শিক্ষাখাতে এক ধরণের অস্বস্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষকরা তাঁর কাছে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন, পেশাজীবীরা উপেক্ষা ও অসম্মানের মুখোমুখি হচ্ছেন, শিক্ষার্থীসমাজের কাছে খোদ শিক্ষামন্ত্রী হাসির পাত্র হচ্ছেন যা আমাদের কাছে অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা এখন রীতিমতো প্রহসনে পরিনত হয়েছে; দলান্ধতাই এখন নিয়োগ ও পদায়নের একমাত্র মানদণ্ড! বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির অসুস্থ্য ও অসহনশীলতার সংস্কৃতি আবারো ফেনা তুলে সমগ্র শিক্ষাঙ্গণকে সন্ত্রস্ত করে তুলছে। আর শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ও গুণগত পরিবর্তনের পরিবর্তে জনতুষ্টিমূলক এবং কম গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়েই বেশি মনোনিবেশ করছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে শিক্ষার অনিবার্য মৌলিক সংস্কারের প্রত্যাশা আবারো হতাশায় রুপান্তরিত হচ্ছে যা একজন জননন্দিত রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীর কাছেও অপ্রত্যাশিত!
এপ্রসঙ্গে শিক্ষাখাতে সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যার মাধ্যমে একদিকে সরকার বলছে যে শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তন করা হবে, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্য অর্জন এবং কর্মসংস্থান ও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে, অন্যদিকে এসব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রার সাথে প্রাসঙ্গিক নয় এমন অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গিকারের অন্যতম দিক হচ্ছে মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, ৯,০০০ ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ, মাদ্রাসা শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা প্রশাসনকে শক্তিশালীকরণ, শিক্ষার্থীদের আর্থিক বোঝা লাঘবে পুন: ভর্তি ফি বাতিলকরণ, বৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ করণ, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান, প্রাথমিক স্তরে বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করণ, ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করতে ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই,‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ এবং স্মার্ট ক্লাসরুমের উদ্যোগ, শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর প্রভৃতি। এছাড়াও টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে ভাষা দক্ষতা, শিল্প সংযোগ তৈরি এবং সরকারি দপ্তরের প্রায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার শূন্যপদ পূরণ, শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের এসব পদক্ষেপ এর সাথে শিক্ষামন্ত্রীর মনোযোগের যেমন পার্থক্য রয়েছে আবার এসব পদক্ষেপ এর ফলে বিদ্যমান সমস্যার কিছু বিচ্ছিন্ন সমাধান হলেও তা দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন, মানোন্নয়ন ও দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা পুরণে কার্যকর কোন মানোন্নয়ন নিশ্চিত করেনা। ফলে শিক্ষাখাতে বিচ্ছিন্নভাবে জনতুষ্ঠি অর্জিত হলেও সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে কার্যকর পরিবর্তন নিশ্চিত করেনা।
এজন্য শিক্ষা খাতের চলমান কর্মসূচিগুলোকে সফল করতে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে সবার আগে একটি কার্যকর ও স্থায়ী ‘শিক্ষা কমিশন’গঠন করতে হবে। এই কমিশন কেবল অতীতের আটটি কমিশন/কমিটির মতো গৎবাঁধা প্রতিবেদন দাখিল করেই দায়মুক্ত হবে না; বরং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশমালার আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং পরিবীক্ষণ (গড়হরঃড়ৎরহম) নিশ্চিত করবে। শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা সংকট চিহ্নিত করে তা নিরসন তথা একটি সার্বজনীন, গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে শাসনতান্ত্রিক, প্রশাসনিক,প্রাতিষ্ঠানিক ও কর্মসূচি পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে সংগতি রেখে শিক্ষা খাতকে মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রূপান্তরের জন্য প্রবর্তন করতে হবে একটি রোডম্যাপ যার মাধ্যমে শিক্ষার সকল ধারার মধ্যে গড়ে উঠবে কার্যকর সমন্বয় এবং শিক্ষা হবে পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি।
প্রবন্ধটি শেষ করতে চাই শ্রীলঙ্কার ‘বিনামূল্যে শিক্ষার জনক’ হিসেবে খ্যাত ড. সি. ডাব্লিউ. ডাব্লিউ. কান্নানগারা (১৮৮৪-১৯৬৯) এর গল্প দিয়ে। তিনি টানা ১৬ বছর শ্রীলংকার শিক্ষামন্ত্রী (১৯৩১-১৯৪৭) থাকাকালীন একবার জাতীয় বাজেটের অর্ধেক অর্থ শিক্ষা খাতে দাবি করে বসেন। উত্তাল সংসদে কেউ কেউ তাঁকে ‘পাগল’ বলে টিপ্পনী কাটলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ, আজ আমি পাগল! কিন্তু শিক্ষাকে যদি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া না হয়, তবে পুরো জাতি পাগল হতে বেশি সময় লাগবে না”। ১৯৪৫ সালে ধনিক ও প্রভাবশালী শ্রেণীর তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও কিন্ডারগার্টেন থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার আইন পাস করেন। এমনকি ১৯৪৭ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর কান্নানগারা গর্বভরে বলেছিলেন, সাধারণ মানুষের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা। মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসারে তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশগুলো আজও এশিয়ার শিক্ষা সংস্কার ও সাফল্যের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক নতুন বাংলাদেশের উদ্ভব ঘটেছে! তরুণদের সম্ভাবনাময় এদেশে আমরা কি একজন কান্নানগারার দেখা পাব? যিনি সস্তা জনপ্রিয়তার কাঙাল না হয়ে ঘুণে ধরা একটি অকার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠনে উদ্যোগী হবেন? যিনি সব জঞ্জাল আর প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে একটি সাম্য ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। মেধাবী প্রজন্মের হাত ধরেই গড়ে উঠতে পারে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক-শিক্ষাবিদ, কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞ। ইমেইল- ংুবফধুরু৬১@মসধরষ.পড়স