• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫২ অপরাহ্ন

‘উত্তরের অবহেলিত মানুষদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার তাড়না থেকে ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসের চেয়ে ‘হেলথ ম্যানেজমেন্ট’কে বেশি গুরুত্ব দেই।’ – ডা. মো. মতিউর রহমান

Reporter Name / ১৫৩ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

বিশেষ সাক্ষাৎকার

বাংলাদশেরে স্বাস্থ্য এবং শক্ষিা খাতরে অন্যতম পথকিৃৎ রোটা. ডা. মো. মতউির রহমান । তনিি একাধারে এমববিএিস, এমপএিইচ এবং পএিইচডি ডগ্রিধিারী একজন বশিষেজ্ঞ। র্দীঘ দুই দশকরেও বশেি সময় ধরে তনিি টএিমএসএস বাংলাদশেরে ডপেুটি এক্সকিউিটভি ডরিক্টের হসিবেে তৃণমূলরে মানুষরে স্বাস্থ্যসবো ও জীবনমান উন্নয়নে নরিলসভাবে কাজ করে যাচ্ছনে। একইসাথে তনিি উত্তরাঞ্চলরে প্রথম বসেরকারি বশ্বিবদ্যিালয় পুণ্ড্র ইউনভর্িাসটিি অব সায়ন্সে অ্যান্ড টকেনোলজ’ির ট্রাস্টি র্বোডরে ভাইস চয়োরম্যান হসিবেে উচ্চশক্ষিার প্রসারে ভূমকিা রাখছনে। টএিমএসএস বাংলাদশে এর গ্র্যান্ড হলেথ সক্টের এবং এর সবচয়েে বড় উদ্যোগ টএিমএসএস মডেকিলে কলজে ও রফাতুল্লাহ কমউিনটিি হাসপাতাল (১০০০ শয্যাবশিষ্টি) তার হাত ধরইে সফলতার সাথে মানুষরে চকিৎিসা সবোর নশ্চিতিে কাজ করে যাচ্ছ।ে বাংলাদশেরে স্বাস্থ্য খাতরে র্বতমান চ্যালঞ্জে, টএিমএসএস এর র্অজন এবং ভবষ্যিৎ পরকিল্পনা নয়িে সম্প্রতি তনিি কথা বলছেনে আলোচনা ম্যাগাজনিরে সাথ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করছেনে, আলোচনার নর্বিাহী সম্পাদক ও বাংলাদশে সুপ্রমি র্কোটরে আইনজীবী মহেদেুল হাসান স্বপন।

আলোচনা: টিএমএসএস এর সাথে আপনার দীর্ঘ পথচলার সূচনা কীভাবে হয়েছিল? একজন চিকিৎসক হিসেবে প্রথাগত ক্যারিয়ারের বাইরে এসে এই বিশাল ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্ব পালনের মূল প্রেরণা কী ছিল?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: আসলে ২০০২ বা ২০০৩ সালের দিকে যখন আমি চিকিৎসা পেশায় পদার্পণ করি, তখন আর দশজন নবীন চিকিৎসকের মতো আমারও স্বপ্ন ছিল একজন সফল ফিজিশিয়ান হওয়া। স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতিই নিচ্ছিলাম। তবে টিএমএসএস এ মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদানের পর প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগমের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। সেটিই ছিল আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। তার অনুপ্রেরণায় আমি বুঝতে পারি যে, একজন স্পেশালিস্ট হিসেবে আমি হয়তো প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু রোগীকে সেবা দিতে পারব। কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত হলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। সেই দূরদর্শী চিন্তা থেকেই আমি ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসের চেয়ে ‘হেলথ ম্যানেজমেন্ট’কে বেশি গুরুত্ব দেই। আজ যখন দেখি কয়েক হাজার মানুষ আমাদের সিস্টেমের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছে, তখন সেই সিদ্ধান্তটিকেই জীবনের বড় সার্থকতা বলে মনে হয়।

আলোচনা: টিএমএসএস বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নারী নেতৃত্বাধীন এনজিও। আপনাদের বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আপনারা কোন কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: উত্তরবঙ্গের মানুষ অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে উন্নত চিকিৎসা থেকে দীর্ঘকাল বঞ্চিত ছিল। জটিল রোগের জন্য তাদের ঢাকা বা দেশের বাইরে যেতে হতো। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষায়িত সেবাগুলো সহজলভ্য করা। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা ২৫০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক ‘ক্যান্সার সেন্টার’ এবং ২৫০ শয্যার ‘হার্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের এখানে কার্ডিও লজি, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি এবং কার্ডিয়াক সার্জারির মতো উন্নত সেবাগুলো এখন নিয়মিত প্রদান করা হচ্ছে। মানুষ যখন নিজের পরিচিত পরিবেশে সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের সেবা পায়, তখন তারা মানসিকভাবেও দ্রুত সুস্থ বোধ করে।

আলোচনা: উত্তরবঙ্গে প্রথম ‘বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট’ শুরু করাকে আপনারা কীভাবে দেখছেন? এটি এই অঞ্চলের চিকিৎসায় কতটা প্রভাব ফেলবে?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: এটি আমাদের জন্য এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য এক বিশাল অর্জন। সাধারণ সলিড টিউমার ক্যান্সারের চিকিৎসার পাশাপাশি ব্লাড ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন আমরা অনুধাবন করি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল ই প্রথম প্রতিষ্ঠান যারা সফলভাবে হেমাটোলজি ও বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার পরিচালনা করছে। এর মাধ্যমে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই সেবাটি আমরা সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে পেরেছি।

আলোচনা: টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল এ স্থাপিত ‘বায়োমলিকুলার ল্যাব’ সম্পর্কে কিছু বলুন। আধুনিক চিকিৎসায় এটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার অন্যতম ভিত্তি হলো ‘প্রিসিশন মেডিসিন’ বা টার্গেটেড থেরাপি। প্রতিটি মানুষের জেনেটিক মিউটেশন আলাদা হয়। আমাদের এই ল্যাবে ডিএনএ এবং জিন বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব। এর আগে এই পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল দেশের বাইরে পাঠাতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অস্ট্রেলিয়ার ‘মাই হেলথ ওমিক্স’এর কারিগরি সহায়তায় আমরা বাংলাদেশে প্রথম এই বায়োমলিকুলার ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছি। এর ফলে শতভাগ নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা প্রদান এখন অনেক সহজ হয়েছে।

আলোচনা: বাংলাদেশের সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো আপনার দৃষ্টিতে কী কী?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: আমার বিশ্লেষণে চ্যালেঞ্জগুলো তিন ধরনের। প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে মানুষের সচেতনতার অভাব। ছোটখাটো রোগের জন্যও মানুষ বড় বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে ভিড় করেন, ফলে প্রকৃত জটিল রোগে আক্রান্তরা পর্যাপ্ত সময় পান না। দ্বিতীয়ত, পলিসি বা নীতিগত সীমাবদ্ধতা। আমাদের রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে ঢাকা এবং মফস্বলের মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে। তৃতীয়ত, যোগ্য লিডারশিপ ও ম্যানেজমেন্টের অভাব। আমাদের দেশে অনেক ভালো চিকিৎসক আছেন, কিন্তু স্বাস্থ্য খাত পরিচালনার জন্য দক্ষ ‘হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ এর সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই শূন্যতা পূরণ করা জরুরি।

আলোচনা: প্রান্তিক ও দরিদ্র রোগীদের জন্য আপনাদের বিশেষ কোনো কর্মসূচি বা সুবিধা রয়েছে কি?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: টিএমএসএস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল বেসরকারি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত। তবে আমাদের চার্জগুলো যেকোনো প্রাইভেট হাসপাতালের তুলনায় সর্বনিম্ন। মাত্র ২০০ টাকা বেড ভাড়া এবং ৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১০ শতাংশ ফ্রি বেড ছাড়াও আমাদের নিজস্ব ‘লিল্লাহ তহবিল ও ‘হাসপাতাল সমাজসেবা কেন্দ্র’রয়েছে। অর্থের অভাবে কেউ চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যাবে, এমন নজির এখানে নেই।

আলোচনা: নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী হবে?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: চিকিৎসা পেশা এখন আর শুধু রোগী দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক বিশ্বে ক্যারিয়ার গড়ার অনেক বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আমি নবীনদের বলব, মেডিকেল প্র্যাকটিসের পাশাপাশি মেডিকেল রিসার্চ, হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বায়োমলিকুলার টেকনোলজি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়েও তারা যেন দক্ষতা অর্জন করেন। শুধু সার্জন বা ফিজিশিয়ান হওয়া নয়, স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নে নিজেকে দক্ষ লিডার হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করা উচিত।

আলোচনা: এত ব্যস্ততার মাঝেও আপনি নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেন, গবেষণা করেন। এই একাডেমিক চর্চা ধরে রাখার রহস্য কী?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের কোনো শেষ নেই। আমি মনে করি, আমি যে সেক্টরটি পরিচালনা করছি, সেই সেক্টর বা বিষয় সম্পর্কে আপডেটগুলো যদি আমি না জানি, তবে আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। গবেষণায় আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ আছে বলেই ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করি। নলেজ শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে যেমন নিজের দক্ষতা বাড়ে, তেমনি সারা বিশ্বের চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে একটি কানেক্টিভিটি তৈরি হয়।

আলোচনা: শেষ প্রশ্নে আসি। ব্যক্তিগত জীবনে আপনি রোটারিয়ান হিসেবে সামাজিক কাজ করছেন, গোলফ খেলছেন, ইয়োগা করছেন। এই যে মানুষের সাথে সম্পৃক্ততা, এটি আপনার পেশাগত জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: সামাজিক সম্পৃক্ততা পেশাদার জীবনের পরিপূরক। রোটারি বা অন্য সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভাবনা বোঝা যায়। এতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। আর শারীরিক সুস্থতা কাজের গতি বাড়ায়। আমি মনে করি, একজন চিকিৎসকেরও দায়বদ্ধতা আছে সমাজের সব স্তরের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রাখবার।

আলোচনা: আমাদের পাঠকদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে ‘পড়ার অভ্যাস’গড়ে তোলার। বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে ইন্টারনেটের কল্যাণে সবকিছু হাতের মুঠোয়। নিজের কাজের দক্ষতা, সমন্বয় এবং পারফেকশন বাড়াতে বই, জার্নাল বা ভালো মানের ম্যাগাজিন পড়ার কোনো বিকল্প নেই। ক্রমাগত জ্ঞান অর্জনই আপনাদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যোগ্য করে তুলবে।
আলোচনা: মূল্যবান সময়ের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ। ‘আলোচনা’র পাঠকদের জন্য শুভকামনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category