• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫২ অপরাহ্ন

“আরডিএ হবে পল্লী উন্নয়নের বিশ্বস্ত গবেষণাগার”: ড. আব্দুল মজিদ প্রামানিক

Reporter Name / ১৩৯ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

বিশেষ সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন ও কৃষি গবেষণার ইতিহাসে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ) এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। আর এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সফল উদ্ভাবন ও মাঠ পর্যায়ের বিপ্লবের পেছনে মিশে আছে কিছু নিবেদিতপ্রাণ মানুষের নিরলস শ্রম। তেমনি একজন কর্মবীর হলেন কৃষি বিজ্ঞানী ও গবেষক . মো: আব্দুল মজিদ প্রামানিক। সম্প্রতি তিনি আরডিএ বগুড়ার মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার এই নতুন পথচলা দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তৃণমূল মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগের এক অনন্য স্বীকৃতি।

ড. মজিদের কর্মজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল ঢেউয়ে জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলোতে। তিনি দীর্ঘ সময় আরডিএ-র চর উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র’ (সিডিআরসি) প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ছিল চরম অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি। সেখানে শিক্ষার আলো ছিল ক্ষীণ, স্বাস্থ্যসেবা ছিল স্বপ্ন আর কৃষি ছিল কেবল প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল। ড. মজিদ সেই চরাঞ্চলকে গবেষণার মূল ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। তার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্প চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। চরবাসীর জন্য জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, দুর্যোগকালীন বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি এবং ক্ষুদ্র ঋণের বদলে স্থায়ী সম্পদ বা গবাদি পশু প্রদানের মতো উদ্ভাবনী মডেলগুলো তার হাত ধরেই সফল হয়েছে। আজ চরাঞ্চলের অনেক পরিবার যে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তার নেপথ্যে রয়েছে ড. মজিদের গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার এক অসাধারণ সমন্বয়।

বর্তমানে তিনি আরডিএ-র ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেছেন এবং তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়িত করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়দের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একজন গবেষক হিসেবে যেমন তিনি কুশলী, প্রশাসক হিসেবেও তেমনি সুশৃঙ্খল। তার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তার নিজ কার্যালয়ে। মাসিক আলোচনা ম্যাগাজিনের পাঠকদের জন্য সেই অন্তরঙ্গ ও জ্ঞানগর্ভ কথোপকথনের সারসংক্ষেপ এখানে তুলে ধরা হলো।

 আলোচনা: আপনি দীর্ঘ সময় আরডিএ-র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘চর উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র’ (সিডিআরসি) প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এখন আপনি পুরো প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এই ব্যক্তিগত ও পেশাগত উত্তরণকে আপনি কীভাবে দেখছেন এবং বৃহত্তর পরিসরে আরডিএ-কে নিয়ে আপনার প্রাথমিক দর্শন বা ভিশন কী?

. মো: আব্দুল মজিদ: আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি এই গুরুদায়িত্ব লাভ করেছি। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের প্রতি। আমার পেশাগত জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে চরাঞ্চলের মানুষের সাথে, তাদের অভাব এবং সম্ভাবনাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সিডিআরসি-র প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আমি শিখেছি কীভাবে সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ ফলাফল আনা যায়। আজকের এই উত্তরণ আমার কাছে কেবল পদমর্যাদার পরিবর্তন নয়, বরং এটি সেবার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করার একটি বড় সুযোগ।

আমার প্রাথমিক দর্শন হলো আরডিএ-কে কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, বরং একে একটি ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ বা পল্লী উন্নয়নের বিশ্বস্ত গবেষণাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। চরাঞ্চল থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক জনপদের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আরডিএ উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যেন সরাসরি কাজ করে, সেটাই আমার লক্ষ্য। আমি চাই আরডিএ এমন কিছু টেকসই মডেল তৈরি করুক যা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়নের পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃত হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গবেষকদের কাজের উদ্দীপনা বাড়ানো আমার অন্যতম অগ্রাধিকার।

আলোচনা: চরাঞ্চলের মানুষের প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। সিডিআরসি-র মাধ্যমে আপনি তাদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলেন, নদীবেষ্টিত প্রান্তিক জনপদের মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে কোন ধরণের উন্নয়ন মডেল সবচেয়ে বেশি টেকসই বলে আপনি মনে করেন?

. মো: আব্দুল মজিদ: চরাঞ্চলের বাস্তবতা দেশের সমতল ভূমির চেয়ে একেবারেই আলাদা। সেখানে উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তাঘাট তৈরি নয়, বরং সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া। আমার অভিজ্ঞতা বলে, চরাঞ্চলে ‘সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন মডেল’ সবচেয়ে বেশি কার্যকর। এর মানে হলো কৃষি, পশুপালন, এবং ক্ষুদ্র শিল্পের একটি সফল মেলবন্ধন ঘটানো। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন এবং ছোট ছোট সঞ্চয় গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা অত্যন্ত জরুরি।

চরাঞ্চলের জন্য টেকসই মডেল হতে হবে এমন যা বন্যা বা নদী ভাঙনেও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না। আমরা সিডিআরসি-র মাধ্যমে ভাসমান সবজি চাষ, দুর্যোগ সহনশীল ঘরবাড়ি এবং সৌরশক্তির ব্যবহারকে জনপ্রিয় করেছি। আমি মনে করি, স্থানীয় জ্ঞান এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে যদি প্রতিটি পরিবারকে আত্মনির্ভরশীল করা যায়, তবেই চরাঞ্চল থেকে দারিদ্র্য স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব। চরাঞ্চলের মানুষের সাহসিকতা ও শ্রমকে যদি আমরা সঠিক বাজার সংযোগ বা মার্কেট লিংকেজ দিতে পারি, তবে তারা দেশের মূল অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

আলোচনা: পল্লী উন্নয়ন একাডেমী বা আরডিএ মূলত একটি গবেষণানির্ভর প্রতিষ্ঠান। বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব আমরা দেখছি, বিশেষ করে চরাঞ্চলে এর অভিঘাত তীব্র। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে আরডিএ-র ভবিষ্যৎ গবেষণার প্রধান লক্ষ্যমাত্রাগুলো কী হওয়া উচিত?

. মো: আব্দুল মজিদ: জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। আরডিএ-র ভবিষ্যৎ গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে ‘অ্যাডাপ্টেশন’ বা অভিযোজন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের এমন জাতের ফসল উদ্ভাবনে মনোযোগ দিতে হবে যা লবণাক্ততা বা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। এছাড়া পানির অপচয় রোধে আমরা যে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি, তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে।

আমাদের গবেষণার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হবে পরিবেশবান্ধব গ্রামীণ অবকাঠামো। গ্রামগুলো যেন শহরমুখী না হয়েও শহরের সকল সুবিধা পায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা কাজ করছি। আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের গবেষণায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার যুক্ত করতে হবে, যাতে করে ফসলের রোগবালাই বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছানো যায়। এক কথায়, আমাদের গবেষণার লক্ষ্যমাত্রা হতে হবে কৃষকের খরচ কমানো এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করা, যা সরাসরি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি নিশ্চিত করবে।

আলোচনা: সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্য অর্জনে ‘স্মার্ট ভিলেজ’ বা আধুনিক গ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরডিএ-র উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তি (যেমন: গভীর নলকূপের বহুমুখী ব্যবহার বা সৌরচালিত সেচ) কীভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে চরাঞ্চলসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূমিকা রাখতে পারে?

. মো: আব্দুল মজিদ: স্মার্ট বাংলাদেশ মানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনকে সহজ করা। আরডিএ দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। আমাদের গভীর নলকূপের বহুমুখী ব্যবহার মডেলটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। এটি শুধু সেচ নয়, একইসাথে সুপেয় পানি সরবরাহ এবং ক্ষুদ্র শিল্পে পানির ব্যবহার নিশ্চিত করে। স্মার্ট ভিলেজ গড়ার ক্ষেত্রে এটি একটি চমৎকার ভিত্তি। যখন একজন কৃষক তার মোবাইল ফোনে অ্যাপের মাধ্যমে সেচ যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কিংবা তার উৎপাদিত পণ্যের বাজার দর জানতে পারেন, তখনই সেই গ্রামটি স্মার্ট গ্রামে রূপান্তরিত হয়।

চরাঞ্চলে আমরা সৌরচালিত সেচ এবং বিদ্যুতায়নকে গুরুত্ব দিচ্ছি। যেহেতু সেখানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছানো কঠিন, তাই সোলার প্রযুক্তি সেখানে বিপ্লব ঘটিয়েছে। আমরা এখন কাজ করছি কীভাবে এই প্রতিটি তথ্য ও সেবা একটি ডিজিটাল প্লাটফর্মে নিয়ে আসা যায়। আমাদের লক্ষ্য হলো গ্রামেই ই-কমার্স এবং আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ তৈরি করা যাতে তরুণ প্রজন্মকে কাজের সন্ধানে ঢাকা বা বিদেশে ছুটতে না হয়। প্রযুক্তির এই সুফল যখন তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, তখনই স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে।

আলোচনা: আপনি মাঠ পর্যায়ে চরের মানুষের সুখ-দুঃখ যেমন কাছ থেকে দেখেছেন, তেমনি এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করছেন। মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন নীতিমালা তৈরিতে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি বিশ্বাস করেন?

. মো: আব্দুল মজিদ: নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা থাকেন, তাদের জন্য মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থাকাটা এক বিশাল সম্পদ। আমি যখন এসি রুমে বসে কোনো ফাইল দেখি, তখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে যমুনার পাড়ে রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে কাজ করা সেই অভাবী মানুষের মুখ। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝতে সাহায্য করে যে, কোনো একটি নীতি বা প্রকল্প বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। অনেক সময় দেখা যায় কাগজ-কলমে কোনো প্রকল্প চমৎকার, কিন্তু মাঠের ভৌগোলিক বা সামাজিক বাস্তবতায় তা ব্যর্থ হয়।

জাতীয় পর্যায়ের নীতিমালায় আমি সবসময় ‘বটম-আপ অ্যাপ্রোচ’ বা নিচ থেকে উপরে যাওয়ার পদ্ধতিতে বিশ্বাস করি। অর্থাৎ সমস্যাটি আগে নিচ থেকে বুঝতে হবে, তারপর সমাধান দিতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি নীতিমালায় এমন পরিবর্তনের কথা বলি যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে প্রান্তিক মানুষের হাতে দ্রুত সুফল পৌঁছে দেবে। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থাকলে উন্নয়ন বাজেটের অপচয় রোধ করা সহজ হয় এবং সঠিক জায়গায় সঠিক বিনিয়োগ করা যায়। আমি চেষ্টা করছি আরডিএ-র গবেষণালব্ধ প্রতিটি সাফল্যকে জাতীয় নীতিমালার অংশ করতে।

আলোচনা: ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে, বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন ও জিরো হাঙ্গার নিশ্চিত করতে চরাঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকার উন্নয়ন কতটা অপরিহার্য? আরডিএ-র পক্ষ থেকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি?

. মো: আব্দুল মজিদ: এসডিজি-র মূল মন্ত্র হলো ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ (Leaving no one behind)। বাংলাদেশ যদি চরাঞ্চল, হাওর বা পাহাড়ি এলাকার মানুষকে পেছনে ফেলে রাখে, তবে জাতীয়ভাবে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। দারিদ্র্য বিমোচন এবং খাদ্য নিরাপত্তা বা জিরো হাঙ্গার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এই প্রতিকূল জনপদগুলোকে উৎপাদনশীল করতে হবে। আরডিএ চরাঞ্চলে ‘লাইভস্টক ব্যাংক’ বা গবাদি পশু পালন মডেল নিয়ে কাজ করছে, যা অভাবী মানুষের কাছে একটি জীবন্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো।

এছাড়া আমরা উচ্চ ফলনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ শস্য উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতিটি বাড়িতে ছোট ছোট পারিবারিক পুষ্টি বাগান বা কিচেন গার্ডেন তৈরিতে আমরা উৎসাহিত করছি। দারিদ্র্য শুধু টাকার অভাব নয়, এটি সুযোগের অভাব। আমরা আরডিএ-র মাধ্যমে সেই সুযোগগুলো তৈরি করছি। আমাদের উদ্ভাবনী পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কমিউনিটি ভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই জীবিকায়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের অনেক আগেই আমরা দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারব ইনশাআল্লাহ।

আলোচনা: একজন সফল গবেষক এবং দক্ষ প্রশাসক হিসেবে আপনার কাজের মূল প্রেরণা কী? আরডিএ-র মহাপরিচালক হিসেবে আপনার মেয়াদের শেষে প্রতিষ্ঠানটিকে ঠিক কোন উচ্চতায় দেখে যেতে চান এবং পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য আপনি কী বার্তা রেখে যেতে চান?

. মো: আব্দুল মজিদ: আমার কাজের মূল প্রেরণা হলো সাধারণ মানুষের হাসি। যখন দেখি চরাঞ্চলের কোনো অভাবী নারী আরডিএ-র প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন এবং তার চোখে-মুখে স্বাবলম্বী হওয়ার আনন্দ, সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দেয়। আমি বিশ্বাস করি মানুষের সেবাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। প্রশাসক হিসেবে আমি নিয়ম-শৃঙ্খলার ওপর জোর দিই, আর গবেষক হিসেবে আমি সবসময় সত্য এবং নতুনত্ব খুঁজি।

আমি যখন আরডিএ-র দায়িত্ব থেকে বিদায় নেব, তখন যেন এই প্রতিষ্ঠানটিকে দক্ষিণ এশিয়ার পল্লী উন্নয়নের এক অনন্য মডেল হিসেবে রেখে যেতে পারি। আমি চাই আরডিএ-র লোগোটি যেন বিশ্বজুড়ে আধুনিক গ্রামীণ উন্নয়নের সমার্থক হয়ে ওঠে। পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের প্রতি আমার বার্তা হলো: গবেষণাগার বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের কাছে যান। সাধারণ মানুষের জ্ঞান এবং বিজ্ঞানকে একীভূত করুন। দেশপ্রেম আর সততাকে পুঁজি করে যদি কঠোর পরিশ্রম করেন, তবে আমাদের এই সবুজ ভূখণ্ডে ইনসাফ এবং সমৃদ্ধি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category