• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৪ অপরাহ্ন

নতুন ভোরের পথে বাংলাদেশ ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ ও আগামীর সম্ভাবনা

Reporter Name / ১৯০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

ফেব্রুয়ারি -২০২৬ সংখ্যা

প্রতীক ওমর

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সাল এক অভাবনীয় পরিবর্তনের বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন এবং দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এক বিশাল জনম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দলের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানের এক নতুন দলিল। বঙ্গভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক রাজকীয় অনুষ্ঠানে তিনি যখন ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তখন দেশজুড়ে তৈরি হয় এক নতুন আশার আবহ। নতুন আলোর উল্লাস।

নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও জনরায়:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর একটি নির্বাচন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি নির্বাচনে ২৯৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি জয়ী হয়েছে ২০৯টি আসনে। একেবারে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৪টি আসনে জয়ী হয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পায়। এই নির্বাচনে দেশবাসী স্পষ্টভাবে জাতীয় ঐকমত্য এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে নিজেদের রায় প্রদান করে। একই দিনে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই সনদ’ সংক্রান্ত গণভোটেও দেশের সিংহভাগ মানুষ ইতিবাচক সায় দেয় যা নতুন সরকারের জন্য একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

শপথ গ্রহণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত:
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ বিকেল ৪টা ১৩ মিনিটে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। বঙ্গভবনের চিরাচরিত প্রথা ভেঙে এবার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠানে দেশি বিদেশি কূটনীতিক উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডাইরিতে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত যে একজন নেতার বাবা ও মা উভয়েই আগে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন এবং এখন তিনিও সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন।

নতুন মন্ত্রিসভার গঠন ও বৈচিত্র্য: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তারুণ্যের এক অনন্য সমন্বয় দেখা গেছে। ৪৯ সদস্য বিশিষ্ট এই মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। চমকপ্রদ তথ্য হলো এই মন্ত্রিসভার ৪১ জন সদস্যই এবার প্রথমবার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অভিজ্ঞদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সালাহউদ্দিন আহমেদ এর মতো বর্ষীয়ান নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ৯ জন প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন যা তরুণ নেতৃত্বের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আস্থার প্রতিফলন ঘটায়। মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেওয়ার পরপরই এক ঘোষণা দেন যে তাঁরা কোনো শুল্কমুক্ত গাড়ি বা সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ করবেন না যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তারেক রহমানের ভিশন ও প্রথম বার্তা:
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রথম বার্তায় তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে এই সরকার কোনো একটি দলের নয় বরং এটি পুরো বাংলাদেশের সরকার। তাঁর ভাষণে ‘জাতীয় ঐক্য’ এবং ‘সমঝোতা’ শব্দ দুটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তিনি বলেন যে আমাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমাদের সবাইকে এক সুতায় গাঁথা থাকতে হবে। তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো গত দেড় দশকের ভেঙে পড়া বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানো এবং একটি জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া এখন তাঁর সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব:
তারেক রহমানের বিজয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক সাড়া পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দ্রুত অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণকে স্বাগত জানিয়েছে। বিশ্ব নেতারা আশা করছেন যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগে আরও বেশি সক্রিয় হবে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট মোকাবিলা এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ নিয়ে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থাগুলো।

চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার হলো তাঁর আশু কর্তব্য। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করাও একটি বড় পরীক্ষা। তবে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে এই সংকট উত্তরণে সহায়তা করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তিনি ইতিমধ্যেই প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত পরিবর্তনের সুফল ভোগ করতে পারে।

তারেক রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ এখন এক নতুন সূর্যের প্রত্যাশা করছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ দেশের মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই যাত্রা সফল হলে বাংলাদেশ কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় নয় বরং পুরো বিশ্বের বুকে একটি সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। ইতিহাসের ছাত্ররা ভবিষ্যতে ২০২৬ সালকে বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ এবং ‘গণতান্ত্রিক পুনর্জন্মের’ বছর হিসেবে মূল্যায়ন করবেন। এখন দেখার বিষয় তারেক রহমানের এই ‘ক্যারিশমেটিক’ নেতৃত্ব কত দ্রুত দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category