• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৭ অপরাহ্ন

গোলটেবিল বৈঠক: ‘রাজনৈতিক বিভাজন, অনৈক্য, স্বৈরাচারকে দ্রুত ফিরে আসার জন্য উৎসাহিত করছে’ ড. মুহা. হাছানাত আলী

Reporter Name / ২৪০ Time View
Update : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়, অর্থাৎ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনগণের ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষা, তা নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় জীবনের এক গভীরতর সংকট ও প্রত্যাশার চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই গণতন্ত্রের জন্য লড়েছে, রক্ত দিয়েছে; কিন্তু স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও আমরা একটি স্থিতিশীল, বৈষম্যহীন এবং নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজ গঠনে বারবার হোঁচট খাচ্ছি। এই ব্যর্থতা নিছক রাজনৈতিক নয়, এর মূলে রয়েছে সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এবং সর্বস্তরে আত্ম-সমালোচনার অভাব।

১. উন্নয়ন বনাম আত্ম-সমালোচনার অভাব:
আমাদের উন্নয়ন-প্রত্যাশা প্রায়শই একপেশে হয়ে থাকে। আমরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে সব সুবিধা চাই, অথচ নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই। বগুড়া শহরের কথাই ধরুন, যেখানে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও, আমার ছাত্র, যিনি ডেপুটি এডিশনাল কমিশনার অফ ট্যাক্সেস, তার দেওয়া তথ্যমতে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষ ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেন না। তাহলে ট্যাক্স না দিয়ে আমরা কোন জাদুতে বগুড়ার উন্নয়ন চাইব? যখন পৌরসভার হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর প্রস্তাব আসে, তখন জনবিদ্বেষ তৈরি হয়। অথচ, সুষম উন্নয়নের জন্য এই কর দেওয়া আমাদের মৌলিক নাগরিক কর্তব্য। আমরা সর্বদা সুবিধা চাই, কিন্তু দায় নিতে প্রস্তুত নই।
বগুড়ার ট্রাফিক অব্যবস্থা আজ শহরকে অচল করে তুলেছে। যখন রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখন ‘ব্যবসা বিরোধী’ স্লোগান তুলে তা আটকে দেওয়া হলো। তখন ৪০ ফুট রাস্তা ভাঙা যেত না, কিন্তু আজ মনে হয় বগুড়াকে বাঁচাতে ১২০ ফুটের রাস্তাও দরকার ছিল। আমরা শুধু সমালোচনা করি। একজন বিদেশী সাংবাদিক বাংলাদেশের মানুষদের সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য: “তারা খুবই আতিথিয়াপরায়ণ, ভালোবাসতে পছন্দ করে। কিন্তু তারা অসম্ভব সমালোচনামুখর এবং অসম্ভব কেওটিক। তারা শুধুমাত্র ঝগড়াঝাঁটি করে, একজনের সমালোচনা করে।” আমরা এই সমালোচনা অন্যদের দিকে ছুড়ে দিই, কিন্তু নিজের সমালোচনা করি না। আর এই আত্ম-সমালোচনার অভাবই আমাদের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
২. কৃষক, মধ্যস্বত্বভোগী ও শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ চিত্র:
সাধারণ মানুষ আসলে বেশি কিছু চায় না। আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, কৃষক সমাজ, যারা এখনো জিডিপিতে সবচেয়ে বড় অবদানকারী, তাদের চাওয়াটা খুব সরল। তারা শুধু চায়, তাদের উৎপাদিত শস্য মহাস্থান হাটে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারবে, রাস্তায় রাজনৈতিক দলের চাঁদাবাজি বন্ধ হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগী (ফড়িয়া) শ্রেণির দৌরাত্ম্য থাকবে না। এইটুকু নিশ্চয়তাও তারা পায় না।
অন্যদিকে, ৩০ বছর ধরে শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি ভয়াবহ। যে শিক্ষকরা জাতি গঠন করবেন, তারাই নিয়োগ বোর্ডে গিয়ে শিক্ষক নিয়োগ না করে কামলা নিয়োগ করেছেন। মোটা খামের বিনিময়ে নৈতিকতা বিক্রি হয়ে যায়। আমরা ভিসিরা, অধ্যক্ষরা, উপ-অধ্যক্ষরা, আমরা সবাই এই দুর্নীতির সাক্ষী এবং অংশীদার। “চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম” (সংশোধন নিজ ঘর থেকেই শুরু হোক) কথাটি ভুলে গিয়ে আমরা অন্যের দিকে আঙুল তুলি।


শিক্ষায়তন ধ্বংস করে আমরা জাতিকে কী উপহার দিচ্ছি? স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও শিক্ষাখাতে জিডিপির ২% কেন স্পর্শ করতে পারলো না? যেখানে আমরা শিক্ষা কমিশন সংস্কার চাই, ভোটাধিকার সংস্কার চাই, সেখানে আমাদের তরুণ প্রজন্ম কেন এই মৌলিক দাবি তুললো না? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭% গ্রাজুয়েট বেকার তৈরি হচ্ছে, তথাপিও আমরা কর্মমুখী শিক্ষার কথা বলছি না। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ফাঁকি দিচ্ছেন, কিন্তু বাড়িতে টিউশনি পড়ালে ছাত্ররা বোঝে—তাহলে শ্রেণিকক্ষে কেন বোঝে না? শিক্ষক হিসেবে যখন আমি ঘুষ দেই, তখন নৈতিকতার ভিত্তিতে আমার ছাত্রদের কাছে আমি কী জবাব দেব? এই আত্ম-সমালোচনার অভাব এবং দুর্নীতি আমাদের সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
৩. রাজনীতি, নৈতিকতা ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা
আজকে আমরা নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ চাই, কিন্তু সেই বাংলাদেশ কি এমন হবে যেখানে আমাদেরই তরুণ প্রজন্ম নৈতিকতার ন্যূনতম মান ভুলে গিয়ে একজন নির্বাসিত নেতা সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যখন ছাত্রদের মুখ থেকে অশ্রদ্ধার ভাষা বের হয়, তখন লজ্জা লাগে। আমরা এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে কেউ কাউকে অশ্রদ্ধা করবে না। আমাদের রাজনীতিতে বিভেদ এসেছে। ১৮ বছর ধরে যারা একসাথে রাজনীতি করলেন, মন্ত্রী পরিষদে বসলেন, সেই মিত্রদের মধ্যে আজকে বিভাজন কেন? জামায়াত আজ খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু তারা নাগরিকত্ব পেলেন, বিরোধী দলে থাকলেন, ৯৬ এ মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তাদের খারাপ মনে হয়নি? জামায়াতকেও বলবো, যাদের সাথে এতো দিন এক সাথে চললেন আজ হঠাৎ কেন তাদের সাথে বিরোধে জড়াচ্ছেন? এই বিভাজন, এই অনৈক্য, স্বৈরাচারকে দ্রুত ফিরে আসার জন্য উৎসাহিত করছে।
‘২৪-এর আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা শ্রেণির ছিল না, এটা ছিল সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের, কৃষকের, শ্রমিকের, আইনজীবীর। এই ঐক্যে ফাটল ধরলে তার ফল হবে মারাত্মক।
এই কারণেই আমি বলতে চাই, বেগম খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির সম্পদ নন, তিনি সারা দেশের মানুষের সম্পদে পরিণত হয়েছেন। যখন তিনি নির্বাসিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হন, যখন ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমের মতো নেতারা গুম হয়ে যান, তখন সেই বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে রাজনীতিতে ঘৃণা ও অশ্রদ্ধা তৈরি করা কাম্য নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছিল যখন সামরিক বাহিনীর সমর্থন ছিল। ‘২৪-এর আন্দোলনেও যদি সেদিন সেনাবাহিনী সাপোর্ট না দিত, হয়তো আরো রক্ত ঝরতো। এই সহযোগিতা এবং ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো আমাদের উচিত।

৪. জনগণের মালিকানা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
আমরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জর্জরিত। একটি সাধারণ নথি স্বাক্ষরের জন্য ফাইল মাসের পর মাস টেবিলে পড়ে থাকে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি একটি রিট মামলাও বছরের পর বছর শুনানি করাতে পারিনি, কারণ আমাদের প্রসিডিউরাল হ্যাজার্ড (পদ্ধতিগত বিপদ) কাটেনি। এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্য আমাদেরই বদলাতে হবে।
জনগণের প্রত্যাশা আসলে খুব সহজ: ব্যবসায়ী: চাঁদাবাজমুক্ত ব্যবসা করতে চান। শিক্ষার্থী: শিক্ষা উপযোগী ও নিরাপদ ক্যাম্পাস চান। কৃষক: পণ্যের ন্যায্য মূল্য চান। সাধারণ মানুষ: থানায় গেলে হয়রানি মুক্ত সুশাসন চান।
এবং সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, সংবিধান যে রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণ মানুষকে দিয়েছে, সেই মালিকানা তারা ফিরে পেতে চায়।
নির্বাচন হবে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে সেই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, তার উপর নির্ভর করছে জনগণ তাদের এই মালিকানা কতটা প্রয়োগ করতে পারে। গোটা জাতি অধীর আগ্রহে বসে আছে, কবে তারা তাদের নির্বাচিত নেতাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিতে পারবে এবং তাদের সকল প্রত্যাশা পূরণ হবে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে, আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক স্তর পর্যন্ত আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

 

প্যানেল আলোচক, উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category